উড়ো লেখকের কাব্য

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
উড়ো লেখকের কাব্য

রং আলাদা

কাপড় খোল
উলঙ্গ হয়ে দেখ;
দেখ নিজেকে।
কিছু আলাদা?
চোখ-মুখ নাক-কান
সবই আছে! অদ্ভুত!!
হাত পা মাথা পিঠ
সেই পরিচিত বুক-পেট,
যৌনাঙ্গটিও অপরিবর্তিত!
ভাল করে আতশ কাঁচে দেখ,
পেছনে নিতম্বদেশে সেই কালো তিল।
তাহলে আলাদা?
আরেকবার আতস কাঁচে দ্যাখ তো;
রং কি? লাল সবুজ গেরুয়া?
রং তো নেই।
ম্যাগ্নিফায়িং পাওয়ার বাড়িয়ে দেখ।
শুধু কালো আর সাদা!
নীল রং ও নেই?
না। শুধু সাদা আর কালো!!

 

উড়ো লেখকের কাব্য

আমি সৃষ্টির ওপর চেয়ার লাগিয়ে
পা দুলিয়ে চুরুটে টান দিয়ে দেখি
ধ্বংসের নৃত্য !!
আমি গল্প- পদ্য, আমিই কাব্য !!

আমার বিনাশ নেই.
আমার নেই সমাপ্তি
আমি ধূমায়নে অস্থির
এবং আমি মগ্ন !!
আমি গল্প – পদ্য, আমিই কাব্য !!

আমি পাথর চকচকিয়ে
সৃষ্টি করি আগুন,
আমি কাগজে আঁচড় কেটে
জ্বালাই স্বর্গ মর্ত !!
আমি গল্প – পদ্য, আমিই কাব্য !!

আমি বিষধর। আমি সর্বগ্রাসী,
আমি দুগ্ধনখর
ও নখের দুগ্ধ।
আমিই সমাজের চাণক্য
আমি গল্প – পদ্য। আমিই কাব্য !!

আমি শিশিরে ভেজা ঘাস নই
আমি অ্য‌‌‌‌সিডে পোড়া মূর্ত।
আমি সাইক্লোন ঘূর্ণী, আমি টরপেডো!
আমি গল্প – পদ্য, আমিই কাব্য !!

আমি আগুন, আমি জল।
আমি বিমান, আমি রথ
আমি সর্বস্ব, আমি অল্প;
আমি গল্প – পদ্য, আমিই কাব্য !!

 

নষ্টা

সূর্য যেদিন আমায় ছুঁয়েছিল নষ্টা ছিলাম না আমি,
নষ্ট তো হলাম সেদিন,
যেদিন বাধা দিয়েছিলাম তাকে আমি ।
ভালোবাসা ছিল আমাদের, গভীর ভালোবাসা ।
এই ভালোবাসাটা কখন যে
তার মন থেকে শরীরে চলে এলো,
বুঝতে পারিনি । যখন বুঝতে পারলাম,
তখন নষ্ট হলাম আমি ।।
আমার ক্লাস নাইন, প্রতিদিন স্কুলের পথে
আমাকে দেখত, তবে দূর থেকেই তাকিয়ে থাকত,
ভাবিনি কখনো সামনে আসবে ।
সেদিন নির্মল বালকের মতো কাছে এসে
বলে কি না আমায় ভালোবাসে,
আমার চোখ-মুখে ছিল লজ্জা,
হাতে ছিল তার দেওয়া গোলাপ,
বান্ধবীদের রসিকতার আর তার
কাব্যিক স্টাইলের পাত্রী হলাম আমি ।
প্রতিদিন নতুন নতুন কাব্য গড়ত আমায় নিয়ে,
সেদিন বুঝেছিলাম কবিরা
হয়তো এভাবেই তাদের প্রেম জাহির করে ।
কবিতার সংখ্যা যখন ত্রিশ, তখন তার কবিতায়-
দেখলাম ছন্দের অভাব আর নতুন করে খুঁজে
পেলাম তার লেখায় আমার বদনের সৌন্দর্য ।
কিন্তু তখনও নষ্টা ছিলাম না আমি,
নষ্ট তো হলাম যেদিন বাধা দিয়েছিলাম ।।
আমাদের প্রেম কাব্যের ‘মিলাপ পর্বের’
পরে হঠাৎ ঢুকে পড়ল যৌন পর্ব,
আবিষ্কার করলাম তার লেখায় ঢুকেছে
আমার চুল, চোখ, ঠোঁট আর পরপর
তার কাব্যিক কৌতুহল জন্মালো
আমার বুকে, স্তনে, স্তনবৃন্তে ।
আমি আরও লজ্জা পেলাম সেদিন,
শিহরণে জেগে উঠল আমার রোমকূপ!
তার পরের দিনের কবিতা পেতে হলে
আমাকে যেতে হল তার বাহুবন্ধনে,
তার বুকে যখন আমায় আঁকড়ে ধরল,
পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোতে ইচ্ছে হল,
তার জামার মধ্যে আমি প্রথমবার
পেলাম পুরুষালি ঘামের গন্ধ,
কিন্তু সেদিনও আমি নষ্টা হয়নি ।
নষ্ট তো হয়েছিলাম আমি আমার দোষে ।
তার রচনা তার হাত ধরে যেদিন;
আমার ফাঁকা ঘরে যেতে চাইল,
আমার সাথে একান্তে গল্প করতে চাইল,
চাইল একটু কবিতা রচনা করতে
সেদিন তার কলম আবিষ্কার করল
আমার নাভির গভীরতা আর
আমার জঠর বেয়ে নেমে পড়ল
আমার দুপায়ের মাঝে ছন্দহীন যোণীগহ্বরে,
ভালোবেসে বাধা দিলে দেখতে পেলাম
তার পুরুষসত্তার দম্ভ।
খোলস ছেড়ে গেল তার কবি ভাবের,
জন্ম নিল এক নতুন সূর্য।
পেশিবলের সাথে সাথে শুনতে পেলাম
আমার নতুন নাম –
আমি নাকি খানকি বেশ্যা,
আর আমি নাকি তাকে তুষ্ট না করলে “নষ্টা”।।

 

সাড়ে তিনশ গ্রাম কবিতা

সাড়ে তিনশ গ্রাম কবিতা দিতে পারব,
তোমায় আমি ছড়াও দেব,
বদলে কি আমাকে দু’ পেগ রাম দেবে?
দুটো গদ্য বা গল্পের বিনিময়ে
হুয়িস্কি পাব? কিম্বা ব্রাণ্ডি?
যা খেয়ে আমি নেশাতুর হয়ে ওলট পালট
করব আমি রাস্তায় মাতলামু।
কলারটা হাওয়ায় ভাসবে, চোখ লাল হবে।
“শালা,খানকি!” বউ-এর পেটে লাথি মারব।
মরদ হওয়ার সামাজিকপিতৃপরিচয় দেব।
বাড়িতে এক বাটি বাসি ভাত আছে,
একটা কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে সপাট দেব।
আমি আর কিই বা করতে পারব?
কলম ঘষে কাগজের গুষ্ঠি উদ্ধার ছাড়া
দুটো কাঁচা খিস্তি ছাড়া,
একশ গ্রাম বিপ্লবের কথা ছাড়া
আমি আর কিছুই পারব না।
ফাটা পান্জাবি আর পায়ে শশুর বাড়ির
হাওয়াই চটি পরে বিড়ির টানে আমি
সমাজকে পোড়াতে পারব।
ভোটে জিতে জণগণকে মদের সাদা বোতলে
ডুবিয়ে ‘মুন্নী বদনাম’ গানে নাচাতে পারব।
আমি সাড়ে তিনশ গ্রাম কবিতা দিতে পারব।
দুটো গদ্য বা গল্পও দিতে পারব।

 

ল্যাম্পপোস্ট

ল্যাম্পপোস্টের পড়ন্ত আলোতে
দেখা যায় ঘুমন্ত ফুটপাথ আর চোমাথার মোড়।।
শত শত মাথা শুয়ে থাকে ম্যানহোলের পাশে,
ভাত-কাপড়-ছাদের আশায় হন্যে হয় শহরের পথে।
সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যায় বেসরকারি কনডোম
আর বেসরকারি পল্লিতে পাওয়া যায় সরকারি শরীর।।
পুলিশের গাড়ি দেখে ভয় পায় মানুষের বাচ্চা,
আর আঁতেল ভেকধারীদের দেখে আঁতকে ওঠে পুলিশ।
জীবন্ত শরীর আজ মগজের অভাবে ঘুমিয়ে,
আর ঘুমন্ত চেতনা বারবার উঠতে চায় শিউরে।।

সুসভ্য সমাজ

আর গভীর রাতের অন্ধকার নয়,
এবার তো দিনের প্রত্যক্ষ আলোতেই;
আর পরীক্ষা করতে হলো না সূর্যাস্তের,
এবার তো সূর্য দেবের উপস্থিতিতেই;
আর করতে হলো না লোকচক্ষুর লজ্জা,
এবার তো ক্যামেরার সামনেই-
বেআব্রু হলো ভিখিরি রূপী
তোর মা, বোন, মেয়ের ইজ্জত !
তুই, আমি, সুসভ্য ব্যক্তি পথচারী
সেই অটোচালক, ওই কাঁধে ব্যাগ ধারী
সকলে দেখতে পেরোলো অর্ধনগ্না
বিদীর্ণ বেহুলার মতো নারী উপত্যকা।
খিল্লি হচ্ছে নাকি?
প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে তো!
কবি তোমার কলম থামাতে হবে!
তুমি পারোনা এসব কুকথা লিখতে;
জেলে ভরা হোক কবির বালের খাতাকে!
আগে গো-মাতা কে রক্ষা করা হোক!
কবি তুমি বাঁচতে পারো, যদি
শোনো সন্ন্যাসী যোগীর কথা!
যদি লেখো গোশালয়ের কথা!
দুটো ভালো হিন্দু কবিতা!

 

তবু আমি লিখবো

তবু আমি লিখবো;
তবু আমি লিখে যাবো।
কাফের করবে? শুট এট সাইট?
শত প্রহরী দিয়ে ঘিরে রেখে দাও-
নজরবন্দি গ্যালিলিও করে দাও,
তবু আমি লিখবো; আমি লিখে যাবো।
তোমাদের মুখোশের ছবি আঁকবো।
নিষিদ্ধ হতে রাজি,বাকিটা কলমের বাজি
চক পেনসিল দিয়ে মেঝে ঘোষবো।
পলিটিক্যাল পোস্টারের পাশে
দেওয়াল লিখবো,
আমি আঁকবো; ঘটা করে আঁকবো-
তোমাদের উলঙ্গ ছবি দেখাবো।
সেন্সরে কাঁচি চালাবে না ছুরি?
শিল্পীদের বারণ করতে হলে করে দিও
অশিল্পীদের শিল্পকে হাতিয়ার করবো;
আমি তবু সিনেমা বানাবো,
সূচনাতে লিখে দেবো- সমস্তই কাল্পনিক;
অতঃপর দাড়ি ছিড়ে দেব বরকতের
আসারামের ধুতি খুলে নাচ করব।
আজ আমি বলে দিলাম-
জেলে বন্দি করলে পাথর ঘোষবো
গৃহবন্দী করলে রঙে আঁকবো
বনবাস দিলে মাটি খুঁড়বো
তবু আমি লিখবো, আঁকবো;
বলবো মান-হুঁশের ধর্মের কথা,
নেতাদের রাজ-নীতির চালের কথা,
মৌলবী পন্ডিতদের গীঁঠের কথা,
ব্যবসায়ীদের ভেজালের কথা,
সৈনিকদের বিদ্রোহের কথা।
আমি লিখবো।

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়। জন্মেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের পুরুলিয়ায়। কর্মসূত্রে ওড়িশা রাজ্যে বসতি। সাহিত্যের পাশাপাশি অনির্বাণের নেশা সিনেমা তৈরি করা। কিছুদিন বাংলা সিনেমায় সহ-পরিচালকের কাজও করেছেন। প্রকাশিত বই: 'অনির্বাণ' (২০১১) এবং 'অনুভব' (২০১১)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ