এইচ বি রিতা’র একগুচ্ছ কবিতা

এইচ বি রিতা
কবিতা
Bengali
এইচ বি রিতা’র একগুচ্ছ কবিতা

ভঙ্গুর

স্বৈরী তাণ্ডব ভেঙ্গে দেয় ঘর, ভাঙ্গে অধিকার
স্বাধীনতা হরণে কারো বুকের পাড়
শুক্লাদশমী তিথিতেও আবার
দশহরা গঙ্গাস্নানে সমাজ চিবুই পান
চেপে রাখা দশজন্মের মল-মূত্র
ভেসে যায়; নির্ধিদ্বায়
পবিত্রতায় সমাজ তখনো
আগামী শুক্লাদশমীর অপেক্ষায়।

 

তোমাকে স্বাগতম

তোমাকে দেখি, পিছু পিছু ছুটো
রাত্রি এলে আরো বেশী
চেপে ধরো টুঁটি; চুম্বনে
ঠিক যেন রেড ওয়াইনের মত
ঈর্শা জাগে, অন্তর্দাহও বলা যায়
অনেকটা বন্য ক্যুগারের মত।
অতঃপর,
জলকেলীতে দু’টি বুনোহাঁস
নাড়া দিয়ে যায় ভিতর, মহাবিপ্লবে
চোখে ভাসে মধ্যরাত, সীমালঙ্ঘনে
মনে হয়,
ক্ষতি কী? যদি খুলে দেই উন্মুক্ত বুক;
তোমার স্বাগতমে!

 

কিউপিড

আত্মার গুহায় যেখানে বরফজমা নদী
জলকেলিতে উশৃঙ্খল দেহ সেখানেও পবিত্র স্নানে;
মন ভেজাতে চায়।
তুমি জানো মধ্য রাতের আঁধারের কোলে
একটি নির্ঘুম নক্ষত্র অহর্নিষি জ্বলে
বলো, কার অপেক্ষায়?
জানো তুমিও
সমঝোতায় আমি বড্ড পারদর্শী
কিউপিড!
তোমাকে ছুঁয়ে দেখি প্রতি মধ্যরাতে
অদৃশ্য তুমি’তে তীরবিদ্ধ হয় হৃদয়
‌অথচ তখনো প্রকৃতির নিয়মে
ব্যাঙাচির খেলায় বিভোর সঙ্গমে মগ্ন;
দু’টি আহত পাখী।

 

অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেম

প্রেম নয়; তবু প্রেমেরই মত
সবুজের বুকে উঁকি দেয়া হলদে কলির মত
কুয়াশা ভোরে শ্বাসরুদ্ধকর
জ্যাক ড্যানিয়েলে নেশাতুর স্পর্শের মত
কামুকিনী উচ্ছ্বল শাণিত নদীর মত
পৃথিবীর অপরূপ অগ্নিশিল্প; সময়ের প্রণয়ের মত
রাত্রির নক্ষত্রালোকিত রূপ, অথবা
পাখীর পিপাসার মত
চির সত্য শিল্প সাধনার মত
উন্মুক্ত খোলা বুকে, বিরতিহীন প্রবেশের মত
অনাকাঙ্ক্ষিত জানি, তবু প্রেম জাগে মনে।

 

বেশ্যা

দায়বদ্ধ জীবন হঠাৎ জেগে উঠে আবেগী আহ্লাদে
পিছু ফিরে মাপা সম্মুখপথ; ফুরায়না কতদিন
ক্রমেই গাঢ় হয় অন্ধকার কুয়াশার বনে
সুগন্ধি মাখা শরীরে কতক ‘কীট’
শুঁষে খেয়ে যায় উচ্ছিষ্ট রস!
নিখোঁজ হবে বলে বেহায়া চোখ তার
হেঁটে যায় চিতাকাঠ বনে।
পুরে নিয়ে উচ্ছিষ্ট জীবন ব্যাগে,
ভাবে সে পঙ্গু পিতা কতদিন বিছানা ছাড়েনি
লড়াকু মাতা বসন্ত ঘ্রাণে চোখ মেলে দেখেনি আকাশ
কতবার সে আকাশে উড়ে গেছে গাঙচিল
সোনাঝড়া বিকালে কেউ গুজেছিল খোপায় চামেলী;
কারো হাতে হাত রেখে
দুধ-কলা পাতে পড়েনি সহোদরের কোনদিন
দৈন্যতা হামেশা রেখে গেছে জলছাপ দুয়ারে,
নিরাশায় বিলাসী মন কেঁদে গেছে তার নিভৃতে
কতদিন দেখেনি সে প্রভাতী কিরণ; ঘুম ভেঙ্গে।
সলতেহীন লণ্ঠন জ্বালাবে বলে শিরদাঁড়া সটান
ছুটে সে শহুরে রোদে কীট-পতঙ্গ গা ঘেঁষে
বোঝেনি সে শকুন ওৎ পেতে থাকে
শ্মশান নয়, সবুজের মাঠে
খেয়ে গেলে ওরা প্রকাশ্য দিবালোকে তিনজন;
উচ্ছিষ্ট কুল-কলঙ্কিনী বেঁধে নেয় চোখে সাড়ে তিনহাত কাপড়।
স্বপ্ন ছিল তার যতটুকু কেবল অন্ন বস্ত্রের দাবী
সংসারী হওয়ার এতটুকু ছিলনা প্রয়োজন
আজ পচে যাওয়া দেহে মানুষের গন্ধ উবে যায়
দোষারোপে অঙ্গুলি তাক, বিভ্রান্তি সূচনায় হাসে
অন্তরালে দৃষ্টিপাতে দেখেনা কেউ কী চরম বিপর্যস্ত মৌলিক অধিকার
দায়িত্বের শিকলে বাঁধা গর্ভজাত কন্যার দায়বদ্ধতা
কী নামে আজ ডাকি তারে?
লড়াকু যোদ্ধা? না বেশ্যা?

 

অ্যানাবেল হিগেন

কে হেঁটে যায় দাম্ভিকতায় ওষ্ঠে ঝাঁঝালো মাদকতা
এখানে মৃত স্তবকে বহুকাল অতৃপ্ত বাসনা হামাগুড়ি খায় নিত্য
মাংস পোড়ায় অনবরত অমরত্বের তৃষ্ণায়,
কী নিষ্ঠুর! কী নিষ্ঠুর!
অবুঝ শিশুটি শো-কেসে কারাবন্দি আজ হাজারবছর।

মধ্যরাতে স্তব্ধ শব্দভূগোল, দেবতা আর আমার আক্রোশ বাক্যালাপ
মগজে কিটকিট কালো পোকা, নিমগ্ন জেগে বিষ ছড়ায় এপাশ-ওপাশ
নিষ্প্রয়োজন ছিল মৃত্যু; তবু গুপ্তকক্ষে রক্তদ্বীপে একটি শিশু
ঈশ্বর জন্মান্ধ, বধীর নিশ্চল পদতলে থেঁতলে দেয় গোঙানি
অনিশ্চয়তা সময় ক্ষীপ্রবেগে ঢুকে পরে ঘরে।

আমি নিদ্রাহীন; সৎকার নয়
মৃত প্রতিবিম্বে অমরত্বের সংকল্প,
বুনো শক্তির প্রচ্ছদে অনৈতিক হস্তে অঙ্কিত আয়ুরেখা
চতুরতায় নিষিদ্ধ রাত্রীযাপনে সেঁটে যাবো জড়বস্তুর গায়ে
শরীরের ভিতর প্রতিশোধের বাসা বাঁধে থেমে থেমে!
ঈশ্বর! তুমি চোখ বুঝে রও
জালিমের মত অমরত্ব খুঁজে নেই আজ কোন অবুঝ প্রাণে।

ক্ষুধিত মানুষ সব খায়

ক্ষুধিত মানুষ চেটে দেখে ইট-বালি-পাথর
নোনতা ঘাম,
মুখে ঠেসে দেয় লজ্জা, আবরণ, অনুভূতি ভয়
ওরা খায় রোদ-বৃষ্টি-মেঘ
সুযোগ পেলে কাগজ, লোহা, মাটি
সব খায় ওরা
ঘরের ছাদ-দরজা-জ্বানালা, টেবিল
আঁরশোলা, ইদুর
সুখ খায়, দুঃখ খায়
কষ্ট-কান্না-বিষাদ খায়
ওরা বোঝেনা মুখের স্বাদ
সেদ্ধ, লবণ, না মিঠা
শুধু মুখে পুরে দিলেই ব্যাস!
ক্যালিডোনিয়া দ্বীপ, সাইবেরিয়া জেলখানা
লেনিনগ্রাদ- ফ্রান্সিস মেরি জাহাজ, বার্গেন-বেলসেন ক্যাম্প
সর্বকালে ক্ষুধার্ত মানুষ বন্যতায় বিহ্বল;
ইতিহাস সাক্ষী।
ক্ষুধার্ত মানুষ সব খায়
ভাত-রুটি-কাপড়
ওরা রক্ত খায়, হাড়-গোর মগজ
যা পায় সব খায়
মানবতা, নীতিবোধ, আত্মসন্মান
ঢেঁকুর তুলে খায়
ওরা চাবুক খায় লাথি খায়
গোলা বারুদ, পেট্রোল বুলেট সব খায়
তবু ওরা মরেনা
ক্ষুধার্ত মানুষ মৃত্যুকেও গিলে খায়।

নরখাদক-ক্ষুধার্ত মাংশাসী ওরা
খেয়ে নেয় স্বৈরশাসন প্রশাসন
অধিকার, সংবিধান
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব
আইন-আদালত, শৃঙ্খলা
দেশ, মানচিত্র-রাষ্ট্রীয় সম্পদ
মিথ্যে অঙ্গীকার, পদমানক্রম
ক্ষুধার্ত মানুষ ব্যবধান জানেনা
ওরা সব খায়।

 

জ্যাক দ্য রিপার

তলপেট থেকে নীচে পুরোটা, জরায়ুসমেত হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে
পাঁচটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জ্যাক দ্যা রিপার;
আজো এক রহস্যময় সিরিয়াল কিলারের নাম।

রিপারোলজি ঢের হয়েছে
স্যাডিস্ট নাকী পণ্ডিত, মীমাংসা হয়নি তার
স্টোনম্যান, দ্য জোডিয়াক কিলার
গবেষণা বিস্তর, মীমাংসা; অমীমাংসিত।

সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী
এক একজন দৃশ্যমান সিরিয়াল কিলার
পর্দার অন্তরালে অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছে মাদকদ্রব্য
কৌশল কিংবা কটাক্ষ
সবারই নিজস্ব ধরন আছে, লক্ষ্য কেবল একটাই;
নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

ডানপিঠে টগবগে যুবক
ঘুমিয়ে পরে ছাইপাশ শরীরে নিয়ে
রাষ্ট্র তার মুনাফা লাভে ব্যস্ত;
কে দেখে এখানেও জ্যাক দ্যা রিপার,
আড়ালে হত্যা করে ছিঁড়ে নিয়ে যায় জননীর;
নাড়ি ছেঁড়া ধন।

জঙ্গি নিধনে নিরাপত্তা বাহিনী
স্বেচ্ছায় মানুষ মরে একক-শতক
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য
রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত
সরকারের কঠোর নিপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন শেষে
হত্যা হয় জঙ্গি জনগোষ্ঠী, নিরপরাধ কত
কৌশলে অন্তরালে উদীয়মান হত্যাকারী
এখানেও জ্যাক দ্যা রিপার;
ছিঁড়ে নিয়ে যায় মানবতা।

ঘরে, বাহিরে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র
সামাজিক অবস্থান, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ
সমাজ ছুঁড়ে দেয় কটাক্ষ
আশ্রয়হীন জনগোষ্ঠী দিকবিদিক শূন্য
জ্যাক দ্যা রিপার, আত্মহত্যার নীল কার্পেট বিছিয়ে ডাকে
তোরা আয়; তোরা আয়
রিপারোলজি অক্ষম এখানে
দায়মুক্ত পৃথিবী ছুঁড়ে দেয় শীতল বাতাস
বলে,
ভুলে যা! তোরা ঘুমিয়ে পড়।

জ্যাক দ্যা রিপার
ঘুমায়না
অদৃশ্য কালো এপ্রোনে হত্যা করেই চলে।

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ