একজন মানবমুখী ঈশ্বর

ওয়াহেদ সবুজ
প্রবন্ধ
Bengali
একজন মানবমুখী ঈশ্বর

‘রিলিজিয়ন অথবা হিউম্যানিজম’, না কি ‘রিলিজিয়ন এবং হিউম্যানিজম’- এ বড় একঘেঁয়ে আলোচনার বিষয়। তবে ঊনিশ শতকে আবির্ভূত হওয়া একজন দৃশ্যমান ‘ঈশ্বর’-এর জীবনালোচনায় বিষয়টি খুবই প্রসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়; সনাতনী ধ্যান-ধারণা, ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামি, মানববিমুখ রীতিপ্রথার ঘন অন্ধকার মেঘ ভেঙে দীপ্তিমান সূর্যের মতোই একজন ঈশ্বরের ভূমিকা নিয়ে যে মানুষটির আবির্ভাব ঊনিশ শতকের বঙ্গদেশকে পুণ্যভূমিতে পরিণত করেছিল, তিনি হচ্ছেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঙলার ইতিহাসে রামমোহনের পরে তিনিই বোধ করি প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র হিউম্যানিস্ট সমাজ-সংস্কারক।

যদিও ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনই এ স্থানে মূল আলোচ্য হওয়া উচিত; তবু, সে স্বার্থেই, তাঁর ধর্মীয় মানসিকতা ও মানবমুখিতাই মূল আলোচ্য হয়ে দাঁড়ায়; এবং তাঁর এ সম্পর্কিত জীবনদর্শনের আলোকেই তাঁর সাহিত্যজীবনের মূল্যায়ন ফলপ্রসূ হবে বলে বোধ করি।

খ.

ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনবিশ্লেষণে জানা যায়, তিনি কোনোভাবেই ধর্মভীরু ছিলেন না, বরং তাঁর জীবনদর্শনের মূল ভিত্তিই ছিল হিউম্যানিজম। শুরুতেই ‘হিউম্যানিজম’ বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার হয়ে নেয়া দরকার। অনেকে এ শব্দটিকে ‘মানবিকতা’ বা ‘মানবতা’ বলে ব্যাখ্যা করেন; তবে প্রকৃত অর্থে ‘হিউম্যানিজম’ হচ্ছে মানবমুখিতা। সমাজ-প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণা, মানবমুখি চিন্তা-চেতনা হিউম্যানিস্ট হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্রকে যেভাবে মহিমান্বিত করেছে, তার পেছনে বোধ করি তাঁর ধর্মবিরূপ জীবনদর্শনেরও যথার্থ ভূমিকা রয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্রের ধর্মচিন্তা বিষয়ে ডক্টর বিনয় ঘোষ শিবনাথ শাস্ত্রীর উদ্ধৃতিতে লিখেছেন,

বিদ্যাসাগর জিজ্ঞাসা করলেন, “ওহে হারাণ, তুমি তো কাশীবাস করছ, কিন্তু গাঁজা খেতে শিখেছ তো?” উত্তরে শিবনাথ শাস্ত্রীর বাবা বললেন, “কাশীবাস করার সঙ্গে গাঁজা খাওয়ার কি সম্বন্ধ আছে?” বিদ্যাসাগর বললেন, “তুমি তো জান, সাধারণ লোকের বিশ্বাস যে কাশীতে মরলে শিব হয়। কিন্তু শিব হচ্ছেন ভয়ানক গাঁজাখোর। সুতরাং আগে থেকে গাঁজা খাওয়ার অভ্যাসটা করে রাখা উচিত নয় কি? তা না হলে যখন প্রথম গাঁজা খাবে তখন তো মুস্কিলে পড়তে পার।”

[ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বিনয় ঘোষ; পৃষ্ঠা ১৫২]

একবার রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ঈশ্বরচন্দ্রের বাসায় গেলেন তাঁকে ধার্মিক করার বাসনা নিয়ে। তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে বললেন, “আমি সাগরে এসেছি, ইচ্ছা আছে কিছু রত্ন সংগ্রহ করে নিয়ে যাব।” ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, “আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হবে বলে তো মনে হয় না, কারণ এ সাগরে কেবল শামুকই পাবেন।” প্রত্যুত্তরে রামকৃষ্ণ বললেন, “এমন না হলে আর সাগরকে দেখতে আসব কেন?” তারপর তিনি পরকাল আর মোক্ষলাভের অনেক কথা বললেন; কিন্তু সুবিধে করতে না পেরে তাঁকে খালি হাতেই ফেরত যেতে হলো। তাই রামকৃষ্ণ পরে এক সময় ঈশ্বরচন্দ্র সম্পর্কে বলেছিলেন,

“এমনকি তাঁর নিজের মোক্ষলাভের জন্য ভগবানের নাম করবারও তাঁর কোন স্পৃহা নেই, সেইটাই বোধ হয় তাঁর সবচেয়ে বড় ত্যাগ। অন্য লোকের উপকার করতে গিয়ে তিনি নিজের আত্মার উপকার করার প্রয়োজন অগ্রাহ্য করেছেন।”

[ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বিনয় ঘোষ; পৃষ্ঠা ১৫৭]

ধর্ম নিয়ে মাতামাতি তিনি কখনোই পছন্দ করতেন না। সংস্কৃত পণ্ডিত হওয়ার সুবাদে বিধবাদের পুনর্বিবাহ প্রবর্তন করার লক্ষ্যেই শুধু একবার তাঁকে ধর্ম বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়। বীরসিংহ গ্রামে এক বালিকা ঈশ্বরচন্দ্রের খেলার সাথী ছিল। মেয়েটি বাল্যবিধবা। ঈশ্বরচন্দ্র তাকে খুব পছন্দ করায় বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁদের মধ্যে এক ধরনের অনুরাগ সৃষ্টি হয়। মূলত, ঈশ্বরচন্দ্র যখন মেয়েটির বাল্যবৈধব্য সম্পর্কে জানলেন এবং বুঝতে পারলেন যে তাকে সারাজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে শুধু শাস্ত্রের কারণে, তখনই তিনি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। পরবর্তিতে মেয়েটি আত্মহত্যা করলে তিনি বিধবা-বিবাহের পক্ষে শাস্ত্রীয় যুক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যেই কেবল শাস্ত্র-বিশ্লেষণ শুরু করেছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন ধর্ম-গোঁড়ার সমাজে তাঁকে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দিয়েই বিধবা-বিবাহকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে হবে। তিনি যে ধর্মে নিতান্তই অবিশ্বাসী ছিলেন, তা তাঁর একটি উক্তিতে বিশেষভাবে লক্ষিত হয়; ঈশ্বরচন্দ্র একবার কথাপ্রসঙ্গে রামমোহন রায়ের পুত্র রাধাপ্রসাদের পৌত্র ললিতমোহনকে হাসতে হাসতে বললেন,

“তোমার কথা শুনে বেশ মধুর লাগছে, যদিও হাসি পাচ্ছে। আমার এই জরাজীর্ণ বার্ধক্য অবস্থায় শুনে খুব শান্তনা পেলাম যে মৃত্যুর পর আমি উপযুক্ত প্রতিদান পাব।”

[ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বিনয় ঘোষ; পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫]

ঈশ্বরচন্দ্রের এই ধর্ম-উদাসীনতা কেন, তা আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখিত রামকৃষ্ণ পরমহংসের কথাতেই পেয়েছি; আর তা হলো- ‘অন্য লোকের উপকার’, অর্থাৎ ‘হিউম্যানিজম’!

গ.

জানা যায়, ঈশ্বরচন্দ্রের জন্মের সময় তাঁর পিতামহ বলেছিলেন, ‘এঁড়ে বাছুর জন্মেছে‘। কথাটি নিতান্তই হাস্যোচ্ছলে উড়িয়ে দেবার নয়; কারণ বিদ্যাসাগরের জাজ্বল্যমান ব্যক্তিত্ব, অতুলনীয় কর্মনিষ্ঠা, অদৃষ্টপূর্ব মানবমুখিতা- এ সব কিছুর মূলেই ছিল তাঁর সুদৃঢ় প্রত্যয়। প্রচ- সংকল্পবদ্ধতা তাঁকে বাস্তবক্ষেত্রে এক মহাশক্তিমান মানব-ঈশ্বরে পরিণত করেছে, যিনি একান্ত নিজ উদ্যোগে নিজ নেতৃত্বে নিজ বুদ্ধি-বিবেচনা-শ্রম দিয়ে তৎকালিন ‘গুহাজাতি’ সদৃশ অন্ধকারাচ্ছন্ন সংস্কারমুখি হিন্দু জাতির অন্ধকার অমানিশা দূর করতে ব্রতি হয়েছিলেন। সেকালে তিনিই কেবল অপার্থিব, অদৃশ্য, অলৌকিক জগৎ থেকে মানুষের চিন্তা-চেতনাকে পার্থিব, দৃশ্যমান এবং লৌকিক জগতের দিকে ধাবিত করতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, হিন্দু সমাজের এ সকল অন্ধতা, অশিক্ষা, ও ক্রমনিুগামিতা রোধ করে এ জাতিকে অগ্রগতির আলোকপথে নিয়ে যেতে হলে সুশিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং বিদ্যমান শিক্ষা-ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের বিকল্প আর কোনো উত্তম পন্থা নেই। আর তাই হিউম্যানিস্ট ঈশ্বরচন্দ্র শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল সংস্কারের স্বার্থে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করলেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার দিকটি অনুধাবন করে তিনি বিদ্যালয় স্থাপন এবং পাঠ্যপুস্তক রচনায় ও প্রকাশনায় হাত দেন। বর্ণপরিচয়, বোধোদয়, আখ্যানমঞ্জরী, কথামালা, ইতিহাস, উপক্রমণিকা ও ব্যাকরণ কৌমুদী, ঋজুপাঠ, বেতালপঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস প্রভৃতি তাঁর রচিত ও সম্পাদিত বেশিরভাগ গ্রন্থই পাঠ্যপুস্তক। প্রভাবতীসম্ভাষণ ও অসমাপ্ত আত্মচরিত ব্যতীত তাঁর প্রায় সব রচনাই শিক্ষা-বিস্তার ও সমাজ-সংস্কারমূলক। দেশে সাধারণ শিক্ষা ও স্ত্রী-শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষার আধুনিকায়নের জন্যেও তিনি দিনরাত চিন্তা করেছেন। ১৮৪১ ও ১৮৪৬ সালে তিনি যথাক্রমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শিক্ষক এবং সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এ সকল কলেজে শুধু ব্রাহ্মণ ছেলেদেরই পড়ার ব্যবস্থা ছিল, ঈশ্বরচন্দ্র পারিষদকে সুপারিশ করেছিলেন যাতে অন্তত কায়স্থ ছেলেদেরও তাদের সাথে পড়তে অনুমতি দেয়া হয়। কলেজের পণ্ডিতেরা তাঁর এ ধরনের কর্মপ্রচেষ্টার তুমুল বিরোধিতা করেন। কিন্তু কোনো বিরোধই ঈশ্বরচন্দ্রকে মানবকেন্দ্রিক কাজ থেকে রহিত করতে পারে নি। একদা বিধবা বিবাহ প্রচলনে তিনি যেভাবে বাধা পেয়েছিলেন, তাতে আক্ষেপ করে তিনি ডক্টর দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখিত একটি পত্রে বলেছিলেন,

“আমার দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনোই বিধবা বিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।”

[বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, ওরিয়েন্ট লং ম্যান, পৃ. ৪৫৩]

এতদ বাধা-বিরোধিতা-প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি থেমে থাকেন নি; যখন কাউকেই কাছে পান নি, তখন একাই পথ চলেছেন, মানবকল্যাণে তাঁর তুঙ্গস্পর্শী প্রচেষ্টা, অভূতপূর্ব মানবমুখিতা তাঁকে কখনোই থামতে দেয় নি; কারণ “বিদ্যাসাগরের পাণ্ডিত্য ছিল মানবকেন্দ্রিক, ঈশ্বরকেন্দ্রিক নয়।” [ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বিনয় ঘোষ; পৃ. ৪৬]

এখানে প্রশ্নের অবকাশ থাকতে পারে যে বাঙালি সমাজের সংস্কারের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র মুসলিমদের কথা ভেবেছিলেন কি না? প্রকৃত অর্থে, তাঁর কার্যক্রম হিন্দু সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিল। শিক্ষা-সংস্কারের ক্ষেত্রেও তিনি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিবেচনা করেন নি। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে- তখনকার সময়ে শিক্ষা বিষয়ক সমস্যা মূলত বেশি প্রকট ছিল কলকাতা ও এর আশপাশের জেলাগুলোর উচ্চ বর্ণের শিক্ষিত সমাজে। তাছাড়া সে সময়ে অর্থনীতিক ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সকল ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজের সাথে উচ্চ বর্ণের ও উচ্চ বিত্তের হিন্দু সমাজের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়াও, সমকালে নওয়াব আবদুল লতিফ প্রমুখের নেতৃত্বে মুসলিম শিক্ষা-পদ্ধতি অস্থির সময় পার করছিল। আবদুল লতিফ নিজে ছিলেন উর্দুভাষী এবং তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন যাতে মুসলমানদের মাতৃভাষারূপে উর্দু প্রবর্তন করা যায় এবং নিম্নবিত্ত মুসলিমদের জন্য কমপক্ষে আরবি-ফারসি মিশ্রিত দোভাষী রীতির বাংলা প্রচলন করা যায়, যাতে পরবর্তিতে তাদের জন্য উর্দুকে গ্রহণ করা সহজ হয়। এমন কি তাঁর বাংলা-বিরোধী সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। এ অবস্থায় ঈশ্বরচন্দ্রের পক্ষে মুসলমানদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বা তাদের শিক্ষা-সংস্কারে কাজ করা সম্ভব ছিল না; সে অধিকারই আসলে তাঁর ছিল না।

সামাজিক অন্যান্য সংস্কারমূলক কাজ, যেমন- বিধবা বিবাহ ও বহুবিবাহের ক্ষেত্রেও ঈশ্বরচন্দ্র শুধু হিন্দু সমাজকে নিয়েই কাজ করেছেন। এরও সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। এমনিতে মুসলিম সমাজে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই এ সমস্যাটি মূলত হিন্দু সমাজেরই ছিল। অন্যদিকে বহুবিবাহ সম্পর্কে বিদ্যাসাগর বলেছেন,

“বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত থাকাতে বাঙ্গালা দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যত দোষ ও যত অনিষ্ট ঘটিতেছে, বোধ হয়, ভারতবর্ষের অন্য অন্য অংশে তত নহে, এবং বাঙ্গালা দেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে, সেরূপ দোষ বা সেরূপ অনিষ্ট শুনিতে পাওয়া যায় না।”

ঈশ্বরচন্দ্র জানতেন যে চারের অধিক স্ত্রী গ্রহণ ইসলামে নিষিদ্ধ। তাছাড়া মুসলমান সমাজে তালাক ও পুনর্বিবাহের ব্যবস্থা থাকায় হিন্দু নারীর দাম্পত্য-সমস্যা বা বৈধব্য-যাতনা মুসলিম নারীতে অনুপস্থিত। বোধ করি সে কারণেই তিনি এ সকল ক্ষেত্রে সমাজ সংস্কারে হিন্দু সমাজকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। সুতরাং দেখা যায়, ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর চারপাশের সকল সমস্যা অত্যন্ত সুক্ষ্ম দূরদৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করে তার স্বরূপ অনুধাবনের প্রয়াস পেয়েছেন এবং তা সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্রের এহেন মানবমুখিতা প্রত্যক্ষ করে বিনয় ঘোষ বলেন, “আমাদের এই মানুষের সমাজে দেবতার চেয়ে অনেক বেশী দুর্লভ মানুষ। তপস্যা করে জীবনে দেবতার দর্শন পাওয়া যায়, কিন্তু সহজে এমন একজন মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না, যিনি মানুষের মতন মানুষ। মানুষের পক্ষে এ সমাজে দেবতায় রূপান্তরিত হওয়া যত সহজ, মানুষ হওয়া তত সহজ নয়। আজও আমাদের সমাজে, বৈজ্ঞানিক যুগের দ্বিপ্রহরকালে, অতিমানুষ ও মানবদেবতাদের মধ্যে দেবত্বের বিকাশ যত স্বল্পায়াসে হয়, সামাজিক মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের বিকাশ আদৌ সেভাবে হয় না। আজ থেকে শতাধিক বছর আগে, আমাদেরই এই সমাজে তাই যখন দেখতে পাই বিদ্যাসাগরের মতন একজন মানুষ পর্বতের মতন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলেন, কোন অলৌকিক শক্তির জোরে নয়, সম্পূর্ণ নিজের মানসিক শক্তির জোরে, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতে হয়।” [বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, ১ম খ- (প্রথম সংস্করণ): বিনয় ঘোষ, পৃ. ১]

সে সময়ে ঈশ্বরচন্দ্রকে কেবল মধুসূদনই সঠিকভাবে বুঝেছিলেন; তিনি ঈশ্বরচন্দ্রকে Greatest Bangali বলে অভিহিত করেছিলেন। মধুসূদন বলেছিলেন,

“The man to whom I have applied has the genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an Englishman and the heart of a Bengali mother.”

ঘ.

প্রশ্ন হতে পারে, সমাজ-সংস্কারক বিদ্যাসাগরের সাহিত্য-অবদান কোথায়? নিতান্তই শ্রীবিবর্জিত, গতিহীন, নিস্পন্দ বাংলা গদ্যভাষার শ্রীবৃদ্ধি এবং একে রুচিশীল মার্জিত ভাষায় রূপ দিয়ে ভদ্রসমাজের উপযোগী করে তুলে তিনি বাংলা ভাষার যে অসামান্য উপকার সাধন করেছেন, সেটিই মূলত বাংলা সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য,

“সেনাবাহিনীকে সুসংহত, সুবিন্যস্ত করে সুপরিচালিত করতে পারলেই যেমন যুদ্ধজয় সম্ভব, বিদ্যাসাগর ঠিক তেমনি একজন সেনাপতির ন্যায় বাংলা গদ্যের উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন এবং সুসংযত করে তাকে সহজ গতি ও কর্মকুশলতা দান করে মানবীয় ভাব প্রকাশের সকল বাধা জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”

[চারিত্র পূজা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য]

আর এর স্বীকৃতিস্বরূপ তাই তিনি ‘বাংলা গদ্যের জনক’ অভিধায় অভিহিত হয়েছেন। সাহিত্যক্ষেত্রে লেখক হিসেবে তাঁর ভূমিকা কতটুকু অগ্রগণ্য ছিল তা পরের আলোচনার বিষয়; মূলত বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে তিনি শিক্ষা-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর গুণগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়নের জন্য যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা-ই তাকে বাংলা সাহিত্যের একজন অবিসংবাদিত আত্মোৎসর্গী কর্মী এবং পথপ্রদর্শকরূপে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। তিনি শিক্ষা-সংস্কারের নানান পদক্ষেপ নেবার শুরুতেই বলেছিলেন যে শিক্ষা-সংস্কার প্রচেষ্টার প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত “এক সুন্দর সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য গড়ে তোলা।” [বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ (৩য় খ-): বিনয় ঘোষ; পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য] কারণ তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে শিক্ষা-সংস্কারমূলক কাজে সার্থকতা লাভ করতে হলে এবং বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে হলে বাংলা ভাষায় জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যথার্থ বিকাশের স্বার্থে তিনিই প্রথম বেদান্তের মতো দেশীয় দর্শনকে পাঠ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে পাশ্চাত্যের জীবনমুখি দর্শন এবং সংস্কৃত শিক্ষার সাথে ইংরেজি বিদ্যার সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি বলেন, “কতকগুলো কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়তেই হয়। কী কারণে পড়তে হয় তা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন সে সম্বন্ধে আর বিশেষ মতভেদ নেই। তবে ভ্রান্ত হলেও এই দুই দর্শনের প্রতি হিন্দুদের গভীর শ্রদ্ধা আছে। ….. যখন এগুলো পড়তেই হবে তখন তার প্রতিষেধক হিসেবে ছত্রদের ভাল ইংরেজি দর্শন শাস্ত্রের বই পড়ানো দরকার।” [ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনবিংশ শতকের বাঙালী সমাজ: অধ্যাপক বদরুদ্দিন উমর] বাংলা ভাষা-সাহিত্যের মানোন্নয়নে সংস্কৃত কলেজের পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের সুপারিশ করে তিনি একাধিক রিপোর্ট পেশ করেন; তার চৌম্বকাংশ নিম্নরূপ:

১. বাংলাদেশে শিক্ষাকার্য তদারকের দায়িত্ব যাদের উপর বর্তেছে তাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিপূর্ণ আধুনিক জ্ঞানালোক-সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করা।

২. যারা ইউরোপীয় উৎস থেকে মালমশলা সংগ্রহ করে তাকে চমৎকার প্রকাশক্ষম বাংলা ভাষায় প্রকাশ করতে অপারগ, তাদের পরিশ্রম ও সাধনার দ্বারা এ ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়।

৩. সংস্কৃতে ভাল জ্ঞান না থাকলে কখনই চমৎকার প্রকাশক্ষম বাক্রীতিগত বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ বাংলা রচনাশৈলী আয়ত্তে আসতে পারে না। আর ঐ কারণে সংস্কৃত পণ্ডিতদের ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে সুশিক্ষা গ্রহণের যথেষ্ট প্রয়োজন আছে।

৪. অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করছে যে কেবল ইংরেজী বিদ্যায় দক্ষ ব্যক্তিরা সুন্দর ইডিয়মসমৃদ্ধ বাংলায় নিজেদের ভাব প্রকাশে নিতান্তই অক্ষম। তারা ইংরেজিয়ানার প্রভাবে এতই আবিষ্ট যে বর্তমান অবস্থায় তাদের পক্ষে, সংস্কৃত বিদ্যার গৌণচর্চাজনিত প্রলেপ সত্ত্বেও, সমস্ত ভাবনাকে ইডিয়মসমৃদ্ধ, সুন্দর বাংলায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

৫. তাই এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের যদি ইংরেজী সাহিত্যে সুশিক্ষিত করে তোলা যায়, তাহলে তারাই সুন্দর সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও সার্থক অবদান যোগাতে সমর্থ হবে।” [বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ (৩য় খ-): বিনয় ঘোষ; পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য]

প্রকৃত অর্থে ঈশ্বরচন্দ্রের যাবতীয় কর্মপ্রচেষ্টা- সমাজ, শিক্ষা, এমনকি সাহিত্য-সংশ্লিষ্ট- সবই ছিল সংস্কারমূলক। তিনি পরিবর্তন চেয়েছিলেন; চেয়েছিলেন বাঙালি সমাজের সনাতনি ধ্যান-ধারণা, পশ্চাৎপদ শিক্ষাপদ্ধতি এবং জরাজীর্ণ সাহিত্যাবস্থার গুণগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এ জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে অন্যান্য জাতির পাশাপাশি অবস্থান সৃষ্টি করতে।

ঙ.

লেখক হিসেবে, বস্তুত, ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত, হিন্দী ও ইংরেজি সাহিত্যভাণ্ডার থেকে রস সঞ্চয় করে বাংলা সাহিত্যে তার সার্থক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এর সমৃদ্ধি আনয়নের প্রয়াস পেয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের সমসাময়িক কনিষ্ঠ বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ভাষার অপরূপ মাধুর্যের প্রশংসান্তে বলেছিলেন যে তাঁর সৃষ্টি অনুবাদমূলক। বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বরচন্দ্রকে মৌলিক সাহিত্যস্রষ্টার স্বীকৃতি দিতে চান নি। তবে, ক্লাসিক সংস্কৃত সাহিত্য থেকে মালমশলা সংগ্রহ করে রচিত শকুন্তলা ও সীতার বনবাস গ্রন্থ, শেকসপীয়রের দি কমেডি অব এরার্স থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রায় সরাসরি অনুবাদমূলক রচনা ভ্রান্তিবিলাসসহ অন্য প্রায় সকল রচনায় ঈশ্বরচন্দ্রের যে শিল্পীমনের পরিচয় লাভ করা যায়, তাতে ঈশ্বরচন্দ্রকে মৌলিক স্রষ্টার খেতাব দিতে আমাদের খুব বেশি দ্বিধান্বিত হতে হয় না। এছাড়া জীর্ণশীর্ণ বাংলা ভাষা-সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে তাঁর এ ধরনের সৃষ্টিকর্ম যে অত্যন্ত ফলদায়কই ছিল তা বুঝতে পারি, যখন দেখি “তাঁর আহরিত সংস্কৃত শব্দের সবগুলি বাংলা ভাষা সহজে গ্রহণ করেছে, আজ পর্যন্ত তার কোনটিই অপ্রচলিত হয়ে যায় নি- তাঁর দান বাংলা ভাষার প্রাণপদার্থের সঙ্গে চিরকালের মতো মিলে গেছে। কিছুই ব্যর্থ হয় নি।” [বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দিরে প্রবেশ উৎসবে রবীন্দ্রনাথের বাণী; মেদিনীপুর, ১৩৪৬] এ পর্যায়ে ঈশ্বরচন্দ্রের প্রত্যক্ষ সাহিত্য-সাধনার স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা চালানো যাক। তাঁর রচিত গ্রন্থ সম্পর্কে আমরা একাধিক ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পেয়ে থাকি। ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর জীবদ্দশায় মোট ৫২টি গ্রন্থ রচনা করেছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে, মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনিসুজ্জামান কর্তৃক প্রদত্ত গ্রন্থপঞ্জী থেকে মনে হয় চণ্ডীচরণের তালিকা থেকে Marriage of Hindu Widows (১৮৫৬), পাঠমালা (১৮৫৯), রামের অধিবাস (১৮৫৯), বাল্মীকি রামায়ণ (১৮৬০)- এই গ্রন্থ চারটি বাদ পড়ে গেছে। জীবনীকার চণ্ডীচরণের মতে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে ১৭টি সংস্কৃত, ৫টি ইংরেজি এবং ৩০টি বাংলা। বাংলা ৩০টির মধ্যে ১৪টি ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুন্তক, ৩টি সম্পাদিত গ্রন্থ এবং ১৪টি সাধারণপাঠ্য।

মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনিসুজ্জামান কর্তৃক প্রদত্ত গ্রন্থপঞ্জী অনুযায়ী ইংরেজি গ্রন্থের সংখ্যা হওয়ার কথা ৬টি এবং বাংলা গ্রন্থ ৩৩টি। ঈশ্বরচন্দ্রের রচনা সম্পর্কে জানা যায়, “তাঁহার রচিত পুস্তকগুলির মধ্যে দুই চারিখানি বাদ দিলে বাকি সমস্তই অনুবাদ, অনুসৃতি বা পাঠ্যপুস্তক।” [বিদ্যাসাগর: চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়; পৃ. ১৭৬] শকুন্তলা ও সীতার বনবাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “ধন্য ভাষায় (সংস্কৃত) রচিত গ্রন্থের অনুবাদ বা ভাবালম্বনে লিখিত হইয়াছিল।” [ঐ; পৃ. ১৭৬] তবে মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনিসুজ্জামান বেতালপঞ্চবিংশতি ও ভ্রান্তিবিলাস এর মতোই শকুন্তলা ও সীতার বনবাসকে অনুবাদমূলক রচনা বলে বিবেচনা করেছেন। এক্ষেত্রে সঠিক মূল্যায়নের স্বার্থে আমরা ঈশ্বরচন্দ্রের বক্তব্যকেই সর্বাগ্রে গ্রহণ করতে পারি- শকুন্তলা প্রসঙ্গে: “ভারতবর্ষের সর্বপ্রধান কবি কালিদাসের প্রণীত অভিজ্ঞান শকুন্তলম সংস্কৃত ভাষায় সর্বোৎকৃষ্ট নাটক। এই পুস্তকে সেই সর্বোৎকৃষ্ট নাটকের উপাখ্যান ভাগ সঙ্কলিত হইল।” এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, অভিজ্ঞান শকুন্তলম আদর্শ হলেও শকুন্তলা তার অনুবাদ নয়। ভ্রান্তিবিলাস সম্পর্কে: “কিছুদিন পূর্বে, ইংলন্ডের অদ্বিতীয় কবি শেকসপীয়র প্রণীত ভ্রান্তিপ্রহসন পড়িয়া আমার বোধ হইয়াছিল, এতদীয় উপাখ্যানভাগ বাঙ্গালা ভাষায় সঙ্কলিত হইলে লোকের চিত্তরঞ্জন হইতে পারে।” বিনয়ী ঈশ্বরচন্দ্রের অকপট স্বীকারোক্তি! তবে, তিনি তাঁর বেশিরভাগ রচনাই অন্য ভাষার সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করলেও তাঁর নিজস্ব শব্দচয়ন, ভাষাগত মাধুর্য, কাহিনীর প্রেক্ষাপটে নতুনত্ব ও অভিনবত্ব আনয়ন ইত্যাদি নিরীক্ষাসমূহ পরিদৃষ্ট হওয়ার পর তাঁকে বঙ্কিমচন্দ্রের মতো শুধুই অনুবাদক বলতে দ্বিধা হয়। মূলত তিনি অনুবাদক নন, শিল্পী ছিলেন; আর তাই তাঁর অনুবাদকর্মগুলোও এক একটি প্রাণময় শিল্পকর্ম হিসেবে ধরা দেয়, যার দরুণ তাঁকে মৌলিক সাহিত্য-স্রষ্টা বলতে আমাদের আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশই থাকে না।

সমগ্র জীবনে ঈশ্বরচন্দ্রের বিতর্কিত অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে ইংরেজ সরকারের পক্ষাবস্থান, সিপাহী বিপ্লব বিষয়ে উদাসীনতা এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থন- এ তিনটি বিষয়ই সামনে আসে। তবে, এ সব কয়টি ক্ষেত্রেই ঈশ্বরচন্দ্রের সমাজকল্যাণ-চিন্তাই মুখ্য ছিল। কারণ তিনি ভেবেছিলেন, ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য দর্শনে প্রলুব্ধ করতে না পারলে এ জাতি সংস্কারমুক্ত হতে পারবে না এবং একইসাথে যথার্থ শিক্ষিত হতেও ব্যর্থ হবে। যদিও সারাটা জীবন মানবকল্যাণ-কর্মে ব্যাপৃত থেকে তিনি এ জাতির অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর কর্মসমূহের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে না পরার হতাশা তাঁকে শেষ পর্যন্ত ‘পরাজিত সেনা’র জীবনই উপহার দিয়েছে। তারপরও আজকের সমাজে, আমাদের বঙ্গদেশে, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে সকল ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং অন্ধতার অভিশাপ থেকে আমরা যতটা মুক্তি পেয়েছি, তার মূলে দেড় শতাধিক বছর আগে বর্তমান ঈশ্বরচন্দ্রের হিউম্যানিস্ট কর্মপ্রচেষ্টার ভূমিকাই মুখ্য ছিল- এ কথা বললে বোধ করি খুব বেশি অত্যুক্তি হবে না। আর তাই, ১৮৩৯ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রাপ্ত ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি যে সময়ের আগেই তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন ছিল সে বিষয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশই থাকে না।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ