একজন রোকেয়ার জীবনপ্রবাহ

অনসূয়া যূথিকা
ছোটগল্প
Bengali
একজন রোকেয়ার জীবনপ্রবাহ

ভিটার সামনেই কবর, একা একদম একাকী একটাই কবর। বাঁশের কঞ্চি না, ইট, পাথর, মার্বেল কিচ্ছু না৷ স্রেফ মাটি উঁচু করা কবর একটা, একটাই। কবরের পাশ ঘেঁষে সরু পথ চলে গেছে, বিধবার সিঁথির মতো শাদা, উদাসী। পথের শেষে উঠোন, বাড়িতে দুই বুড়ো বুড়ির বাস। একে অপরের সহায় হয়ে নয়, বরং ছাড়া ছাড়া স্রেফ বাঁচার জন্য বেঁচে থাকা দু’জন বৃদ্ধের সংসার।

এটি রোকেয়ার গল্প। নারী মুক্তির পথিকৃৎ রোকেয়া নন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের গরিবস্য গরীব পরিবারের কন্যা রোকেয়া। নাতিদীর্ঘ শরীর, একদা ফর্সা রঙের মুখে বাদামী মেছতার ছোপ ছোপ দাগ। শরীরজুড়ে আরো বহু বহু বহু দাগ, মনটাও দাগে দাগে জেরবার, যদিও তা দেখা যায় না। দেখানোর মতো কেউ থাকে না, আসেও না রোকেয়াদের মতো নারীদের জীবনে।

গরীবঘরের মেয়ে রোকেয়া, নুন আনতে পান্তা ফুরনোর মতো গরীব ছিল তারা । ভাতের অভাবে উড়ির ধান, সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ি থেকে চেয়ে আনা ভাতের ফ্যানে আকালি, আর নুন খাওয়া গরীব। গরীব বটে অর্থে, বাপের সামর্থে গরীব। তা হলেও তার সোনা গলানো রঙ, এক ঢাল রেশম কালো চুল।  প্রসাধনী কী সে জানে না, রূপচর্চার জ্ঞান নাই৷ সেই সামর্থও নাই, তবুও কেবল এই রূপটুকু সম্বল করে সে এগারো বছরে বউ হয়ে এলো বর্ধিষ্ণু এক গৃহস্থঘরে।

এদেশে এখনো বাল্যবিবাহ হয়, আইন থাকার পরেও গৌরিদান প্রথা চলে নীরবে। হতদরিদ্র বাবা কন্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার দোহাই দিয়ে নাবালিকা কন্যাকে একপ্রকার বিড়াল পার করার মতো করে বিয়ে দিয়ে পার করে স্বামীর ঘরে৷ গরীব মা সকল ঠাকুর দেবতার কাছে গলবস্ত্রে কন্যার সুরক্ষা কামনা করে। আল্লাহর ঘরে মানত করে কন্যার সুখী বিবাহিত জীবনের জন্য।

কন্যার বিয়ে দিয়ে মেয়ে জামাইকে পুত্র জ্ঞান করে নানান তত্ত্ব পাঠায় ধার করে৷ রোকেয়ার বাবাও তাকে একরকম একবস্ত্রেই পার করেছিল পরের বাড়ী।

অধিকাংশ মেয়ের জন্য জীবনে সেই একবারই কিন্তু সখ নামের বিলাসিতা এসে ধরা দেয়। দুটো শাড়ি ব্লাউজ, এক শিশি কমদামি আলতা, সস্তার স্নো কী পমেড, বেলোয়ারি নয় সস্তা কাঁচের চুরি মেলে একটা টিনের স্যুটকেসসহ। একটা মালা শাড়ি, দুটো সস্তার শাড়ি, একটা লাল ব্লাউজের সখপূরণ। বিবাহিত জীবনের স্বপ্নে বিভোর কন্যাটি ভাবে এতোদিন তার কেবলই সখীরা ছিল, এবার একটি সখা পেলো সে। সনাতন বিবাহ রীতিতে যেমন বলে সাত পা হাটলে সখ্য হয়৷ ইসলাম ধর্মমতে বিয়ের খুৎবাতেও তেমন বলে, আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের রীতি বাদ দিয়ে স্ত্রী হিসাবে একজন নারী কতোখানি মর্যাদা পেলো । দেনমোহর নির্ধারণ করে তাকে ঘরে আনা হয়, গণিকা নয় সে। নারী ঘরের মালকিন, হুকুম চালাবে সকলের পরে৷

আমাদের রোকেয়া তেমন, গরীব বাবার তস্য গরীব কন্যা কলমা পড়ে কবুল বলে দেনমোহর নিয়ে স্ত্রী হিসেবে ঘরে এলো আলীর। এগারোর রোকেয়া পঁচিশের আলীর ঘরণী হয়ে যায় সমাজের নিয়মে। সে নিয়মমতে রোকেয়া আলীর বিয়ে করা বউ, তার সঙ্গমের বৈধ সঙ্গী। কন্যার বাপ কখনো ভাবে নি, সে কোন পুরুষের সঙ্গমের সঙ্গী হবার মতো শরীরে-মনে উপযুক্ত হয়েছে কী না৷ এগারোবছর বয়স মানে সে বালেগা, বিয়ে তার হতেই পারে। প্রান্তিক পরিবারের লোকেদের চিন্তায় আর কিছু আসবেনা একদমই। তারা বড়জোর ভাবতে পারে, আলী একটা কচি বউ পেলো। শরীরে কুঁড়ি ধরবার বয়সেই নারীকে ঘরের বউ করবার ঘোষিত নিয়ম সমাজের। যে প্রথার কথা বলে ধর্ম, যে প্রথার গালভরা নাম গৌরীদান।

গৌরী মানে হিমালয় দূহিতা পার্বতী, দেবাদিদেব মহাদেবের স্ত্রী। নয়বছর বয়সে বউ হয়ে শিবের ঘরে এসেছিলেন। এদিকে ইসলামি ইতিহাস থেকে জানা যায়- ছয় বছরের আয়েশার বিয়ে হয়েছিল মহানবী হযরতম মুহাম্মাদের সাথে। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টানের দেশে আবহমানকাল ধরে কন্যার ঋতুস্নানের আগেই বিয়ে দেবার চল ছিল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে এই প্রথা মেনে বাপ তার কন্যাকে বিবাহযোগ্যা মেনে গলবস্ত্রে তাকে পরের ঘরে পাঠানোর জন্য নানানরকম ফিকির খুঁজেছে। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার এই মানসিকতা সম্বল করে একসময় কুলীন ব্রাহ্মণদের শত শত বিবাহের কথা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।

গৌরীদানের সেই যুগে রোকেয়া বউ হয়ে এলো আলীর। মন তো নয়ই, শরীরও কোন পুরুষকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। পর-পর বেশ কিছু সখীদের বিয়ে সে দেখেছে৷ দেখেছে কিছু আত্মীয়ার বিয়ে, দেখেছে তাদের সুখী সুখী গোলা পায়রার মতো চেহারা। এক আধটা সোনার গহণা পরা চেহারার চেকনাই। বিয়ের পরে স্বামীসহ বাপেরবাড়ি এসে তাদের আহ্লাদী ভঙ্গিতে গল্প করা। এর পেছনের কোন গল্প রোকেয়ার জানা বা ধারণার বাইরে।

রাতের পর রাত শরীরে মনে ক্ষতবিক্ষত রোকেয়া, নারীজন্ম সার্থক করে চলে। স্বামীর ডাকে না বলতে নেই, ডাকামাত্র স্বামীর ইচ্ছে পূরণ করতে হবে, নয়তো ফেরেশতারা লানত দিতে থাকবে। স্বামী নামক পুরুষকে ভয় করে করে ফের তার সঙ্গে রাত্রিবাস করতে অভ্যস্ত হতে হয় রোকেয়াকে। প্রতিরাতেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতে স্বামীর চাহিদা মেটাতে হয়। এর অন্যথা হবার না, হওয়া সম্ভবও না। রোজ সন্ধ্যে নামার পরেই খাবার পাট চুকিয়ে, রসুইঘর তুলতে হয়। ফের ভোর হবার আগেই স্নান সেরে হেঁশেল সামলাতে ঢোকা।

রোকেয়ার বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে, সংসারের ভারও বাড়ে।
বারোতে গর্ভ নষ্ট হয়, মৃতবৎসার দুর্নাম ঘুচিয়ে ফের গর্ভধারণ করে।

পুত্র সন্তানের আশায় একে একে পাঁচ সন্তানের জন্ম দিলো। নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে, আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের কথা খুব ঘটা করে বলা হয়। ইসলামে নারীর মর্যাদা কতোটা উঁচু তা বারবার করে বলা হয়। তবু কন্যা সন্তান সেখানে কোনো পরিবারেই ঈপ্সিত না। পাঁচ পাঁচটা কন্যা সন্তান জন্ম দেবার কারণে রোজ সকাল-সন্ধ্যে গঞ্জনা সয়ে বেঁচে থাকার কৌশল আয়ত্ত করতে হয় রোকেয়াকে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে শাসনের নাম করে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স চলে। কখনো বাপ ভাইয়ের চোখ রাঙানি তর্জন, কখনো শ্বাশুড়ির গর্জন সইতে হয়। আর বিবাহিত নারীর জীবনে স্বামীর সোহাগের অপর নাম চড় থাপ্পড় কিল ঘুষি কি লাথি বা লাঠিপেটা। এসবে অভ্যস্ত হয়ে যায় প্রায় সব বিবাহিতা গ্রামীণ নারী। এতোটাই অভ্যস্ত যে, সাত চড়ে সত্যি রা কাড়ে না তারা। কোথাও এতোটুকুও শ্বাস ফেলার জায়গা থাকে না তাদের, থাকতে যে নেই তাও তারা জানে৷ স্বামী ভাত কাপড় দেয়, খোড়াকি দেয় কাজেই সে শাসনের হকদার।

রোকেয়া তাই স্বামীর হাতে মার খাওয়া তার জীবনের অঙ্গ বলে মেনে নেয়, মানিয়ে চলে। বছরের এমাথা ওমাথা গর্ভধারণ করে। কখনো মৃতসন্তান প্রসব করে তো কখনো গর্ভ নষ্ট হয় কিন্তু কখনো এরজন্য স্বামীর আচরণ বা মারধোরকে তার দায়ী বলে মনে হয় না। রোকেয়া তার মাকেও তার বাপের হাতে এরকম মার খেতে দেখেছে। গরীব বাপের মেজাজ নানা কারণে চরম খারাপ থাকতো আর তার জের ধরে চলতো তার মাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি, মারধোর। ফের সেই বাপের সঙ্গে একবাড়িতে থেকে সংসার করে গেছে তার মা। এরজন্য কখনো কারো কাছে কোন নালিশ করতে সে দেখে নাই, বড়জোর চোখ থেকে নোনা জল ঝরা দেখে সে অভ্যস্ত। নারীর চোখের জলের হিসাব কে কবে কখন রেখেছে।

দিন যায় দিনের নিয়মে, ষষ্ঠবারে পৃথিবীর সকল ওলি আউলিয়ার দরবারে মানত মেনে, সবরকমের তাবিজ-কবচ মাদুলি ধারণ করে আর সন্তান জন্ম দেবার সকল কষ্ট সহ্য করে ছয়বারের বার আঁতুর পেরিয়ে পুত্রসন্তান পেলো। তবুও শেষ রক্ষা হলো না রোকেয়ার। গর্ভসহ সন্তানের সাথে গর্ভদ্বারের আকারের পার্থক্য পরিস্থিতি জটিল করে দিলো। সময় যাচ্ছে কিন্তু প্রসবযন্ত্রণা থেকে রেহাই নেই রোকেয়ার।

ঘরের সমস্ত তালা খুলে দেওয়া হলো, জলে ভেজানো হলো মরিয়ম ফুল। সংকুচিত প্রসবদ্বার সম্পূর্ণ খুলতে আর কতো দেরী!! অনেকটা সময় নিয়ে, যন্ত্রণা দিয়ে পুত্র সন্তান এলো বটে পৃথিবীতে, কিন্তু গর্ভপুষ্প না পড়ার কারণে জটিলতা বাড়তে লাগলো। শেষে সেই প্রান্তিক গ্রামের একমাত্র কবিরাজ গর্ভফুল বের করার ওষুধ দিলো৷ এমনই সেই ওষুদের গুণ, ফুলের সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে এলো পুরো জরায়ু। আহা রে নারী, মাতৃত্বের স্বাদ কী ভীষণ কাঙ্ক্ষিত তার!

রোকেয়া তবুও মরলো না। কিন্তু বছরখানেকের পুত্র রেখে মরে গেলো তার স্বামী আলী। সঙ্গে গেলো সমস্ত জমাপুঁজি, চাষের জমি তার চিকিৎসার খরচ টানতে। গ্রামের সব ডাক্তার নামের কোয়াক, কবিরাজ, হেকিম, চাঁদসীর চিকিৎসক মায় ফকির দরবেশ সকলেই একযোগে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে গেলো। বাদ গেলো না কামাক্ষ্যাক্ষেত্র ফেরৎ মায়াঙতান্ত্রিক, কিংবা সর্পরাজ নামের বৈদ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন পাহাড় থেকে আসা মগবৈদ্য, গাছি বা ফকিরের ওষুধও চললো৷ এদের একেকজনের একেকরকম ফরমায়েশ, একেকরকমের অণুপান। কিন্তু রোগটা কী সেটা নিশ্চিত করে আর কেউ বললো না। অগত্যা আলী মরলো, বাকীদেরও মেরে রেখে গেলো একরকম।

ছয় ছয়টা মুখের সঙ্গে নিজের পেটের চিন্তায় উদভ্রান্ত রোকেয়া, একা একদম একা। পুত্রশোকে কাতর আলীর মা বাপ, ভাইয়ের শোকে কাতর আলীর ভাই-বোন, সকলের শোক একসময় ফুরোয়। রোকেয়ার ঘর ভিন্ন হয়, চুলা ভিন্ন হয়, সে আরো একা থেকে একা হয়। বিয়ের পরে বাপের বাড়ির চৌকাঠ উঁচু হয় বড়, রোকেয়াদের তাই বাপের বাড়ি থাকে না৷ কেউ তত্ত্ব তালাশ করে না। স্বামীর হাতে রোজ রোজ মার খাওয়া রোকেয়াদের তাই নিয়তি, কান্না হজম করা তাই স্বভাব৷ তবুও তো একটা আশ্রয় থাকে, স্বামী হলো নারীর জন্য সাইনবোর্ড।

স্বামী নামের একটা লোক থাকে বলেই নারী সধবা! ফের সে থাকে না বলে স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা বিধবার লেবেল পড়ে যায়। সমাজ একজন নারীকে মূল্যায়ন করে তার স্বামী দিয়ে, কার স্বামী আছে, আর কার স্বামী নাই৷ স্বামী নামের লোকটা মরে গেলো বলে রোকেয়া বিধবা, রোকেয়ার বাচ্চারা এতিম। রোকেয়া আরো দশটা পুরুষের আকাঙ্ক্ষার বস্তু, এ ও ঠারেঠোরে দেখে। ওমুক ক্ষমতাশালী তমুক আত্মীয় ইশারায় নানান কথা বলে। উঠতি তিনটি কন্যাকে সামলাবে না নিজের জন্য ভাববে রোকেয়া!

রোজ রোজ নানান উপদ্রবের মাঝেও জীবন চলে, রোজ বয়স বাড়ে। রোকেয়া বড় হয়, তার কন্যারাও বড় হয়। রোকেয়া ধারদেনা করে, চেয়ে চিন্তে দুই মেয়ের বিয়ে দিলো৷ আরো তিনটি গলায় ঝুলে আছে গলার কাঁটা হয়ে। কন্যাদের বিয়ে উপলক্ষে নানান আত্মীয়দের আনাগোনা, নানান রকম কথা। সেজ মেয়ের বিয়ের কথা ওঠে, বাদ যায় না রোকেয়ার বিয়ের আলাপও। বিধবা নারীরও বিয়ে হয়, হতে পারে। এ সমাজে নারী শরীর ততোক্ষণই কাঙ্ক্ষিত যতোক্ষণ তার শরীর সচল।

বছর আটত্রিশের রোকেয়া, বহু ফসল তোলা জমি যেনো। যেদেশে মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি সেখানে আটত্রিশ মানে অনেক অনেক বয়স। কিন্তু রোকেয়া সুন্দরী, বাঙালি হিসেবে দীর্ঘাঙ্গী। ছয় সন্তানের মা, কিন্তু তার শরীর ধমকায় চেহারা চমকায় আজও। এহেন রোকেয়ার পাণিপ্রার্থী কিন্তু কম না, কিন্তু রোকেয়া কাকে পছন্দ করে! রোকেয়া মুড়ি ভাজে, এ বাড়ি ওবাড়ি বাড়াবান্ধে, ধানভানে। এবাড়ি ও বাড়ির পুরুষেরা তাকে দেখে, লুকিয়ে চুরিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হলেও কমবেশি দেখে। পুরুষের কামুক চোখ তাকে মাপতে থাকে, তার শরীরের ভাঁজ মাপে। কার সাথে কতোতে রফা হতে পারে তা হিসাব করে, হিসাব করে করে মাপে রোকেয়াকে। রোকেয়া কি বোঝে না? নাকি বুঝেও না বোঝার মতো করে ভান করে? রোকেয়াদের এতো কিছু বুঝলে চলে না, শরীর নিয়ে এতোরকমের শুচিবাই থাকলে চলে না। গরজ বড় বালাই!

রোকেয়ার সেজো মেয়ে বিউটি। মেয়েটার বিয়ে হয়েছিল, এতিম মেয়ের সঙ্গে সংসার করতে রাজি হয়েছিল এক বর্ধিষ্ণু গৃহস্থের পুত্র। কিন্তু তার বিধিবাম! স্বামী সংসার করা হলো না। বিউটি বিউটিফুল বলে ক্ষেপানো স্বামী তারে একবারে তিনতালাক দিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। বিয়েতে পাওয়া দু’চারখানা শাড়ি কাপড়ের মতো তার দুই মাসের দুধের বাচ্চাটাকেও ওরা রেখে দিয়েছে। হাটভরা লোকের মাঝে শালিশ ডেকে সারাএলাকার লোক জানিয়ে বিউটিকে তালাক দিয়েছে লোকটা। বিউটি পরকীয়া করে নি, অন্য পুরুষের সঙ্গে পিরিত করার মতো বোধ তার হয় নাই এখনো৷ দুই মাসের বাচ্চা নিয়ে, সংসার সামলাতে ব্যস্ত ছিল চৌদ্দ বছরের মেয়ে। কিন্তু তার সংসার টিকলো না, ভাঙলো। সারা দুনিয়ার সামনে ভাঙলো, আর ভাঙলো তার মায়ের কারণে৷ নাহ, যৌতুক দিতে পারে নি বলে তালাক হয় নাই। সংসার সামলাতে পারেনা বলেও তালাক হলো না। তালাক হলো না বিউটির স্বামী আরেক নারীকে ঘরে আনতে চায় বলে। তালাক হলো বিউটির মা রোকেয়া বিউটির জা হলো বলে। অদ্ভূত না? জীবনটাই তো বড় বিচিত্র, বড় বেশী করে অদ্ভুত খেলা খেলে কারো কারো সাথে।

রোকেয়া বিধবা হয়েছিলো, বহু বহু রকমের চাপ তার ছিল। ছিল বহু রকমের ফাঁদ, ছিল বহু প্রলোভন। কিন্তু ফাঁদ, প্রলোভন, লোভ এড়িয়ে সে বিয়ে করলো। বিয়ে করলো তার নিজেরই কন্যার ভাসুরকে। কন্যার শ্বশুরবাড়ি হলো তারও শ্বশুর বাড়ি। একটাই উঠোন, মাঝে রেখে মুখোমুখি বাড়ির দুই বউ, মা মেয়ে। রোকেয়ার নতুন খসম, তারই কন্যা বিউটির বরের চাচাতো ভাই। মেয়েজামাইয়ের ভাই হলো তার দেবর, সম্পর্কে বদলে শ্বাশুড়ির বদলে সে হলো ভাবি। বদলে গেলো সম্মান, সম্পর্কের মর্যাদাও। শরিয়তের নিয়মে এই বিয়ে আটকায় না, সমস্যাও হয় না যদিও, কিন্তু ওদের সমস্যা হলো। মা আর মেয়ে একই বাড়ির বউ হতে পারে না, সমাজের তো বটেই সমাজপতিদেরও চোখে টাটায়। রোকেয়া বিধবা হয়ে থাকলেই বরং ছিল ভালো, বহু লোকের তাতে সুবিধা হতো একটু বেশী। অবলা নারী, ক্রন্দনমুখী নারীর জন্য প্রাণ কাঁদতো বহুজনেরই। কিন্তু নিজের মেয়ের সংসার নষ্ট করা মায়ের জন্য কারো হৃদয় জ্বলে না আর।

শ্বশুরবাড়িতে রোকেয়ার আর থাকা হলো না। নতুন করে নতুনভাবে জীবন শুরু করা, জীবনকে দেখা বা উপভোগ করা হলো না। ফের ফিরে আসতে হলো পুরানো ভিটায়, সাবেক স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতে। যেখানে কিছুদিন আগেই ফিরেছে তার মেয়ে। এবার মুখোমুখি দুই নারী, দুই সাবেক জা দুই তালাকপ্রাপ্তা নারী। মা মেয়ের সম্পর্ক বাদ দিয়ে, দুই অসমবয়সী প্রতিদ্বন্দ্বী যেনো। একই পরিবার থেকে বিতাড়িত দুই বউ, এক পরিবারের দুই ভাইয়ের তালাক পেয়ে ইদ্দতকালীন খোরপোশ পেয়ে বেঁচে থাকা দুই নারী। এ ওর ছোঁয়া খায় না, সে তার ছায়া মাড়ায় না।

মায়ের মনে কন্যার জন্য মমতা আছে না নাই বোঝা যায় না, চিন্তা বোঝা যায় না। কিন্তু মেয়ের কর্কশ শব্দ শোনা যায়। কানে লাগে, যে শোনে লাগলে তার কলিজাতেও লাগে। রোকেয়ার মেয়ে একদমই চায় না সে এই বাড়িতে তার সাথে একসঙ্গে বাস করে।

কেবল মেয়ে না, রোকেয়ার ছয় সন্তানের কেউই চায় না সে এই বাড়িতে থাকুক। জন্মদাত্রী বটে সে কিন্তু মা আর না সে। সম্পর্ক বদলে গেছে একদমই তাদের মধ্যে। রোকেয়া এখন তাদের বোনের সাবেক স্বামীর ভাইয়ের বউ, তাদের মা আর সে না।

কী ভীষণ রকম অদ্ভুত লাগে সবকিছু! নাড়িছেঁড়া ধন, রক্তের বাঁধন, নিজেরই গর্ভজাত সন্তান কখন সব পর পর হয়ে যায়!

রোকেয়া এখন সৌদি থাকে, কাজ করে। লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করা রোকেয়া, ধান ভানা রোকেয়া, লোকের ফুটফরমাজ খাটা রোকেয়া বিদেশ থাকে, রোজগার করে। অশিক্ষিত রোকেয়া, বিগতযৌবনা রোকেয়া সেখানে কী কাজ করে! রোকেয়া বিদেশে থাকতে গেছে, দূরসম্পর্কের এক মামা তাকে এনেছেন৷ মামার পরিবার এখানে থাকে, রোকেয়া সেখানে কাজ করে। রোকেয়া একবারের বিধবা, রোকেয়া ছয়জন বাচ্চার মা, রোকেয়া তালাকী, রোকেয়া কেবল স্বামী পরিত্যক্তা না রোকেয়া পরিবার বিচ্ছিন্না। রোকেয়ার বাপ ভাই নাই, রোকেয়ার সন্তান থেকেও নাই, কিন্তু তাদের চাহিদা আছে। রোকেয়ার বাড়ি নাই, কোথাও ফিরবার জায়গা নাই কিন্তু টাকা পাঠানোর দায় আছে।

রোকেয়ার পুত্রের ব্যয় মেটানোর জন্য তাকে সৌদিআরবে খাদ্দামার কাজ করতে হয়, দেশে টাকা পাঠাতে হয়। রোকেয়া তার মেয়ের সংসার ভেঙেছে, তাই তার জন্য টাকা দিতে হয়। আরো দুই মেয়ের বিয়ে দিতে হবে তাই তাকে খাদ্দামা হিসেবে কাজ করতে হবে। রোকেয়ার প্রাক্তন শ্বশুর শাশুড়ির জন্য টাকা দিতে হবে, দেবর ননদের বাড়ির অনুষ্ঠানে টাকা দিতে হবে। বিবাহিতা কন্যাদের জন্য টাকা দিতে হবে। রোকেয়া বিদেশ থাকে, ভালো আছে; অনেক টাকা তার। তাই কখনো তার এতোটুকুও খোঁজ না নেয়া বাপ মা ভাই বেরাদর, এখন খোঁজ করে করে তার ফোনে মিসডকল দেয়।

রোকেয়ার দেশে ফেরার কথা ছিল, জমি জায়গার বিলি ব্যবস্হা করার কথা ছিল। পুত্রকন্যাদের সবরকম দায় দাবি মেটানোর কথা ছিল। আর কখনো ফিরবে না, থাকবে না যে বাড়িতে তা ছেলেমেয়েদের নামে করে দেবার কথা ছিল। জানা কথা, এদেশে নারীদের কোন বাড়ি থাকে না। স্বামীর বাড়ি কখনো নিজের বাড়ি হয় না, সেরকম নিয়ম তো নাই। রোকেয়ার সন্তানদের বাবা মৃত, রোকেয়া আরেক স্বামী ধরেছিল। তাই এই বাড়িতে তার আর কোন অধিকার নাই, থাকতে পারবে না। এই বাড়ি তাই তার আত্মজদের, আর তাদের আত্মীয় কুটুমের রোকেয়া সেখানে ব্রাত্য। বুড়ো বুড়ি তাই বুঝিয়েছে, সঙ্গে জোর যুক্তি আছে চাচা ফুপুদেরও।

কবে কোনদিন সৌদি থেকে ফিরবে রোকেয়া, সেটা সবার জানা ছিল, কিন্তু সে ফিরলো না। সৌদি আরবের সেই মামা যে কীনা আদতে একজন দালাল সে জানালো রোকেয়া বিমানে চড়েছে। বারবার মিসডকল পেয়ে সেই দালাল মামা ফোন দিলো বন্ধ করে। বহুকাণ্ড করে অবশেষে কোন খবর মিললো না। আদতে খবর দরকার ছিল টাকা পয়সার, রোকেয়ার খবরে কার কীইবা দরকার। সে যাক যে চুলায় খুশি, একটা থোক অংকের টাকা দিয়ে যাক ছেলেমেয়েদের জন্য। এখনতো তার অঢেল টাকা, গোনা যায় না এমন।

রোকেয়ার বর্তমান ঠিকানা কেউ জানে না। সে জীবিত না মৃত সেই খবর জানতে চাইবে কে! রোকেয়াদের ঠিকানা থাকে না, থাকতে হয় না। জিন্দালাশ হয়ে চলতে ফিরতে থাকা এরকম রোকেয়ারা চারপাশে থাকে। কখনো মা, কখনো বোন, কখনো কন্যা কখনো আর কোন নারীর ননদ বা জা হয়ে নারীজন্ম পার করে, কেউ জানতে পারে না। বা হয়তো জেনেও না জানার ভান করে সবাই। নারীদিবসের সভা সেমিনারে কিংবা বেগম রোকেয়া স্মরণে নারী অগ্রগতি নিয়ে গালভরা বুলি কপচায় সবাই। কিন্তু রোজ রোজ প্রতিক্ষণে প্রতি মুহূর্তে মরতে থাকা রোকেয়াদের দিকে কেউ ভ্রূক্ষেপ করে না।

অনসূয়া যূথিকা। লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। জন্ম ও নিবাস বাংলাদেশের ঢাকায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..