একটি কবিতা লেখার জন্য

ভজন দত্ত
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
একটি কবিতা লেখার জন্য

সুসজ্জিত কোনও মঞ্চে, কোনো একখণ্ড উত্তরীয়বস্ত্র পাবো বলে আমি কবিতা লিখতে আসিনি, জীবনেও কোনো পুরস্কার পাবো বলে কবিতা লিখি না এবং আমি জানি, খুব ভালো করে জানি, দুটো কবিতা লিখে এক পুটুং জর্দা পান বা এক প্যাকেট সিগারেট বা এক পেগ মদ এমনকী এক কেজি আলুও হয় না।

পাতি বলতে কী, কোনো প্রত্যাশা নিয়ে আমি কবিতা লিখতে আসিনি। আর যারা জানে তারা জানে, তার বাইরে, মাইরি বলছি, আমি যে কবিতার নামে আলবাল কিছু লিখি তা কাউকে বলিও না।

হ্যাঁ, ফেসবুকে পোস্টানোর কিছু থাকে না বলেই শুধু নয়। আসলে ‘গদা’-বাংলায় প্রতিদিন আমার এত এতকিছু নিয়ে পোস্ট দিতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু সেসব বললে বা পোস্টালে পুরো হুড়কো খাওয়ার ভয় আছে। তাই গুরু সেফ গেম খেলি। একটা, দুটো কবিতা পোস্টাই, ওই সবাই যেমন পোস্টায় আমিও তাই আর কী! নাহলে আবার সম্পাদকের মুখ এট্টু ভারি হয়। তা নাহলে, এই বাজারে বাংলা কবিতা পোস্টে বা লিখে কী লাভ বলুন? শুধু হিংসা, অসূয়া ও দ্বেষ ছাড়া কবিতা লিখে বা পোস্টে আর কিইবা পেতে পারেন!

সুন্দরী গার্লফ্রেন্ড বা পাড়াতুতো শালি, কোনো সেলিব্রিটি কিংবা আর কাউকে না পেলে হাতের পাঁচ বউকেই পটিয়ে-টটিয়ে একটা ছবি পোস্টাতে পারলে লাইক কমেন্টের হড়পা বাণ এসে যাবে।

হ্যাঁ, আলফাল বা বালছাল যাই বলুন না কেন, লিখি, কবিতা লিখি। এবং কবিতা লেখার অন্তত একশোটা সহজ কারণ লিখে ফেলা যেতেই পারে। আসুন, আপাতত সংক্ষিপ্ত পরিসরে কয়েকটি কারণ পড়ে জেনে নিন, তারপর যত খুশি গাল দিন।

প্রথমতঃ কবিতার কোনো সংজ্ঞা নেই। কোনটি কবিতা আর কোনটি কবিতা নয় সেটি মাপার কোনো স্কেল বা যন্ত্র কিংবা মানদণ্ড নেই। এটা কবিতা লেখার একটা বিরাট সুবিধা। বুঝলেন না, যা হোক কিছু লিখে কবিতা বলে চালিয়ে দিলেই চলে যায়। তো, সুযোগটা আর কে ছাড়ে! লিখি।

দ্বিতীয়তঃ কবিতা এমন একটি সৃজন বা ভাবনা, যা মোটামুটি যেকোনো সময়েই সেটিকে সচল রাখা যায়। ধরুন, ছেলেমেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গেছি মিনিট দশেক আগেই। সেই মিনিট দশেই কবির একটা কবিতা ভাবনা আসতে পারে এবং তা লেখাও হয়ে যেতে পারে। ব্যাঙ্কে, রেশনের দোকানে বা ভিড় কোনো ট্রেন-বাসের টিকিট কাউন্টারে বা ব্লা ব্লা কোনো লাইনে দাঁড়িয়েও ভাবা যায় কবিতার কথা। এমনকী লঞ্চে, ট্রেনে, বাসে বা প্লেনে কয়েকঘণ্টার জার্নিতেও কবিতা প্রসব করা যায়। সত্যি বলতে কি, এখন স্মার্টফোনের কিপ্যাড কাজটা আরো ইজি করে দিয়েছে এবং নোটবুকে গুগল সেভ অপশন সেই কাজকে আরো আরে স্মুথ করেছে। কাউকে কাউকে দেখি ভিড়ে দাড়িয়েই দিব্যি নামাতে পারেন! এরা যদি সিট পায়, তবে তো কথাই নেই। একই কথা আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এভাবেই কবিতা নামক প্রোডাক্টটি কমপ্লিট হলে সেটি সেখান থেকেই ছাপার জন্য কোনো পত্রিকায় বা ওয়েব ম্যাগাজিন বা ব্লগজিনেও মেলে পাঠিয় দিয়ে, ‘চ্যান কি নিদ’-এ নোবেলের স্বপ্ন দেখা যায়।

তৃতীয়তঃ কবিতায় অত যুক্তি-টুক্তি বা ফুটনোটের কারবার নেই, নিজের প্রকাশিত কবিতা ছাড়া আর কিছু পড়ার দরকার নেই। সুতরাং খুব সহজেই এখানে গোঁজামিল চলতেই পারে। কেউ কিছু বলবে না। পাঠক কিছু বললে, পাল্টা প্রশ্ন মেরে দেওয়া যাবে, ‘আপনি কবিতা বলতে কি বোঝেন’ বা ‘ভালো কবিতা মন্দ কবিতার সংজ্ঞাটা কী’ কিংবা ‘যান, আগে দীক্ষিত পাঠক হোন’! কবির কবিতা নিয়ে প্রশ্ন করলে হেব্বি খিল্লি করে কিন্তু কবিরা! যাহোক একটা লিখলেই হলো। লিখো, ব্যাস।

তো, কে ছাড়ে বলুন! এমন সহজ সুযোগ! কত সহজেই দিনে তারা দেখা যায়, কত সহজেই চাঁদে হামি মেরে আসা যায়, বলুন!

চতুর্থতঃ কবিতা লেখার এখন আরেকটি সুবিধা হলো কোনো সম্পাদককে তেল মারার কোনো কেস নেই। আমার এক লেখক বন্ধু ইতিহাসের ওপর গবেষণা করে প্রায় ছ’শো পাতার (ছাপলে হবে) একটি গ্রন্থ লিখেছেন বেশ কয়েক বছর অমানুষিক পরিশ্রমের পর। তারপর সেই বই প্রকাশ নিয়ে যা টালবাহানা চলছে তাও দেখছি গত একবছর ধরে। বলুন, তার থেকে কি কবিতা লেখা ভালো নয়? বলুন, আপনারাই বলুন। লিখুন। এক লাইন, দুলাইন, দশ লাইন বা দীর্ঘ কোনো কবিতা। কোনো সম্পাদক ছাপলে, ছাপবে। না ছাপলে, এখন ফেসবুক জিন্দাবাদ।

পঞ্চমতঃ এখন একফর্মার বাজার, মোটামুটি হাজার-দেড় থেকে দুই মত ফেললেই কবি হিসেবে কবি পরিচিতিতে যোগ হয়ে গেল আরেকটি কাব্যগ্রন্থের নাম। পঞ্চাশ কপি ছেপে দু-দশ কপি এখানে-সেখানে বিলি করে, মাল বা টাকা খাইয়ে দু-পাঁচটা ঝক্কাস মত রিভিউ করাতে পারলে এবং কোনো গুরু-কবিকে দিয়ে কিছু লেখাতে বা বলাতে পারলে এবং আরো কিছু মাল খসিয়ে উক্ত কাব্যগ্রন্থের জন্য কোনো একটি পুরস্কার আপনি বা আমি পেলেই তো, পুরো কবি! তারপর নিজের ঢাক নিজে পেটানোর ফেসবুক তো আছেই! তাবড় তাবড় কবি যেখানেই কবিতা প্রকাশিত হোক ফেসবুকেই তো জানান! তো, আমি বা আপনিও জানাই। এতে ফেসবুক অশুদ্ধ হয় না।

তবে বলুন, কবিতা লিখে এত সহজে সেলিব্রিটি হওয়ার সুযোগ কেউ ছাড়ে? তাই আর কি,  হ্যাঁ, হ্যাঁ (প্রকাণ্ড জিহ্বা ঝুলছে) আমি কবিতা লিখি।

তবে, একদম সত্যি বলছি, পরিচিতজনরা যখন কবি বলে সম্বোধন করেন (আসলে, ওটা তো প্যাঁক, খিল্লি), তখন বলি, দাদা বা দিদি, ভাই বা বোন, কাকা বা কাকি, দাদু বা দিদা এরকম গাল কি না দিলেই নয়!

আমি তো কবিতা লিখি না। হ্যাঁ, সত্যি বলছি, আমি আজও একটি কবিতা লিখিনি। যা লিখেছি সবই আসলে একটি কবিতা লেখার জন্যই। এখনো কবিতাই আমাকে লেখে, আমাকে নেশায় মাতাল করে। আমি শোক ভুলে যাই আর প্রতিদিন নেশায় চুর হয়ে চুপিচুপি কবিতার বুকে মাথা রেখে জীবনকে অনিবার্য মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাই।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..