একটি পরকীয়া গল্প

ওয়াহিদার হোসেন
ছোটগল্প
Bengali
একটি পরকীয়া গল্প
আফজল  রাজমিস্ত্রীর কাজ করে।গত দুইদিন ছিলো শনি,রবি। আজকে সোমবার শ্বশুরবাড়িও পাশেই,দশটাকা ভাড়া। এখান থেকে সাইকেল নিয়েও যাওয়া যায়। দুইদিন হ’ল খালাতো শালি মাসুকা এসেছে আফজল  হোসেনের বাড়ি।বউ আসমা রান্নাঘরে কাজ করছে আর মাসুকা উঠোনে বসে আসমা’র ছেলেকে কাপড় বদলে দিচ্ছে।ন’মাস হল হাসানের জন্ম হয়েছে। হাসানকে কাপড় মুড়িয়ে রাখা হয়েছে দোলনায়। বারবার পেচ্ছাপ পায়খানা করে দেয়। তাই কাপড় বদলে দিতে হয়। আসমা রান্নাঘরের উনুনে ভাত বসিয়ে স্কোয়াশের তরকারি কাটছিল। বারবার কাজে অকাজে রান্নাঘর ঘর আর কূয়োতলাতেও যাওয়া আসা করতে হচ্ছিল। কাজ ছাড়া অন্যদিকে তাকানোর ফুরসতটুকুও ছিলনা আসমা’র।
আফজল  হাত বাড়িয়ে বিড়িটা তুলে নিলো টেবিল থেকে। খস করে দেশলাই জ্বালিয়ে বিড়িটা ধরিয়ে আধশোয়া হয়ে সুখটান দেওয়ায় ধোঁয়াগুলো জানালার পর্দায় ধাক্কা খেয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে। আজকেও সে পুরো মুডে আছে।
যেদিন থেকে মাসুকা এসেছে সেদিন থেকে আফজল  কাজকর্ম বন্ধ করে ঢং করে পড়ে আছে। এমনিতে সকাল ছ’টায় কাজে বেরিয়ে যেতে হয়, আজ সোমবার তবুও সে যায় নি।
রবিবার তো ছুটি ছিলই, সে শনিবার থেকে কাজে যাচ্ছে না।
ইচ্ছে করছে মাসুকার মুখটা বারবার দেখে। দেখে শান্তি পায়। মাসুকার গালে একটা তিল আছে, ওই তিলটা দেখলেই শরীরে কেমন পুলক লাগে। কই আসমার শরীর ছুয়েঁও তো এমন অনুভূতি সে টের পায়নি?
বুকের গহীনে রেখে দিয়েছে এই অনুভুতি।
শালিকে ভালোবাসা কি পাপ?
আর সে কীভাবে জানবে?
মুন্সি মাওলানারা জানবে এসব।
মাদ্রাসায় গিয়ে কিছুদিন নামাজ শিখেছিল। কোরান ধরতে চেয়েছিল, কিন্তু সেসব মেয়েরা পড়ে। বিয়ের সময় ছেলেপক্ষ যখন দেখতে আসে, তখন জিজ্ঞেস করে “আপনার মেয়ে কয় প্যারা কোরানে হাফেজ?”
সে ছেলেমানুষ অত শিখে কি করবে?
হাদিস কোরান সে ইউটিউবে দেখে দেখে জেনেছে। ইউটিউবে হুজুর’রা কতসুন্দর করে ওয়াজ করে। সে আর এসব কি বুঝবে?
কিন্তু যদ্দুর মনে আছে একদিন মাদ্রাসায় নামাজ শিখতে গিয়ে ইসমাইল মাওলানা বলছিল
“দুই বোনকে নাকি একসঙ্গে বিয়ে করা যায় না!”
আরও বহুকিছু চিন্তা তাঁর মাথায় ঘোরে।
ধড়ফড় করে বিড়িটা নিয়ে ঝাড়াপিড়া করার জন্য ল্যাট্রিনে যাওয়ার আগে দেখে বারান্দায় তখনো ঢুলানি (দোলনা) ঢুলাচ্ছে মাসুকা।
আহারে মাসুকা!
মাসুকার হাতটা ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দেয় আফজল।। মাসুকা মুখ ফিরিয়ে দুষ্টুমির হাসি হাসে।
আজকে ছিলো কালীপূজা। ভবেনদা গতকালই বলেছে আজকে আর কাজ হবে না। মালিক তিনদিনের জন্য ব্যাঙ্গালোরে না ভেলোর কোথায় বউকে নিয়ে গেছে চিকিৎসার জন্য, তাই ছুটি।
সকাল থেকেই মাসুকা অস্থির। আজ প্রায় চার পাঁচ দিন পার হলো মাসুকার এখানে আসার। আসমা যদিও কিছু টের পায়নি তবু সে’তো মেয়ে মানুষ খালাতো বোনকে সে সন্দেহের নজরে দ্যাখেনা, তবে রাতে ঘুমানোর সময় খুব কাছে এসে আফজল কে  জিগ্যেস করে “মাসুকা’কে  কি তোমার ভাল নাগে?”
আফজল  গম্ভীর মুখে জবাব দিয়েছিল
“কি যে কইস, মুই না তোখে ভালোবাসো। অনেক রাতি হইছে এলা ঘুমা।”
আসমা মুখ ফিরিয়ে ঘুমোনোর ভান করে পড়ে ছিল।
সেকি বুঝতে পারেনা? স্বামী আর নিজের বোনের মধ্যেকার খুনসুটি?
লুকিয়ে লুকিয়ে পরস্পরকে ইঙ্গিত করা?
তার গতরে কি আর অত আকর্ষণ নেই?
বিয়ের পরে প্রথমদিনই আসমাকে জড়িয়ে আফজল  চুমু খেয়েছিল গলায় আর গালে। আসমার মাথায় হাত রেখে সে বলেছিল কোনো মেয়েকেই নাকি কোনোদিন সে স্পর্শ করে নি। আসমাই প্রথম। অনুচ্চারিত ছিলো,
আসমাই শেষ!
“আজ কোথাকার পানি কোথায় চলে গেছে!” এই দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভাবতে থাকে আসমা। প্রথম প্রথম ভালোবাসার সে দিনগুলো কত আনন্দ কত কষ্টে ভরা, কত কত স্মৃতি। দুজনে মিলে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, পুজোয় মেলায় দরবেশের ওরশে একসঙ্গে তারা দোয়া করেছিল যেন চিরদিন তারা একসঙ্গে থাকতে পারে। এতকিছু করেও সে আর ধরে রাখতে পারলো না আফজলকে, তারই খালাতো বোন চুরি করে নিয়ে গেল হাজারো রাত জেগে দেখা ভালোবাসার সেই স্বপ্নগুলো।
এইসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে আসমানি সুলতানা।
বাড়ি থেকেই ঢাকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। কালিপুজার বিশাল মেলা। ধূপগুড়ির বিখ্যাত মেলা। বাইরে থেকে প্রচুর মানুষজন আসে মেলা দেখতে। আজই এক চূড়ান্ত সুযোগ। আজকের দিনটা চলে গেলে সারাজীবন ধরে পস্তাতে হবে। বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি ছিলোই। আসমা শুকনো মুখে বেশ কয়েকবার আফজলের মুখের দিকে  তাকিয়ে ছিল অপলক। আফজল একবারও সাহস পায়নি ওর সামনে দাড়াঁবার।
মেলার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল আফজল  মাসুকা। ছেলেটাকে ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আসমার মুখটা বারবার মনে পড়ছিল কিন্তু উপায় কি?
মাসুকা’কে নিয়ে সোজা আফজল  উঠে পড়ে শিলিগুড়ির বাসে। এখান থেকে কলকাতা। তারপর কেরালা। তিরুবনন্তপুরম আর কে ধরে?
ব্যাপারটা এরকম, গত পরশু মাসুকা বুকে এসেছিল আফজলের। বাড়িতে ফিরলেই মাসুকাকে না-কি বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে, এমন খবরও পেয়েছিল আফজল।
মাসুকাকে ছাড়া একমুহূর্ত বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
আফজলের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে মাসুকা বলেছিল,
“দুলাভাই তোমাক ছাড়া মুই বাঁচিম না, মোক ধরি চলো, যেত্তি যাবেন, খালি এইঠে থাকি দূরত।”
কলকাতার টিকিট কাটার সময় বারবার যেন মাইকে কি এনাউন্সমেন্ট হচ্ছিল। টেনশনের মধ্যে তবুও আফজল  স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল কে যেন বারবার আকুল হয়ে বলছে,
“তাড়াতাড়ি আইসবেন মেলাবাড়ি থাকি,
মুই পথ চায়া থাকিম”

ওয়াহিদার হোসেন। কবি। জন্ম ১৯৮৬, ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের আলিপুরদুয়ার জেলার দক্ষিণ খয়েরবাড়ি রাঙ্গালিবাজনায়। লেখাপড়া করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে। পেশাগত জীবনে তিনি একজন শিক্ষক। চাকরি করছেন ডুয়ার্সের এক প্রত্যন্ত চা বাগানের প্রাথমিক স্কুলে। প্রকাশিত বই: 'মধ্যরাতের দোজখ যাপন' (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৩) এবং 'পরিন্দা' (কাব্যগ্রন্থ,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রাণপাখির খাঁচা ও মধুর মুক্তি

প্রাণপাখির খাঁচা ও মধুর মুক্তি

  চান্ডুলি গ্রামের মধু লরির ড্রাইভার।মধু বলছে মালিকের মাল লরি করে চলে যায় ত্রিপুরা,ঝাড়খন্ড,বিহার,উত্তরপ্রদেশ,পাঞ্জাব পর্যন্ত।…..