এক কাপ চা

পুলক বড়ুয়া
কবিতা
Bengali
এক কাপ চা

কবর

তোমরা আমার কথার কবর রচনা করলে
নিস্তব্ধ কবরে শুয়ে আছে—আমার
কণ্ঠ
গলা
চোখ
কান
মস্তিষ্ক
ওষ্ঠ
জিহ্বা
হৃদপিন্ড
ফুসফুস
পাকস্থলী
যকৃত
অগ্ন্যাশয়
বৃক্ক
রক্ত
মাংস
অস্থি
মজ্জা
মেরুদণ্ড
যারা আমার কথারা উৎপাদন করত
যারা আমার কথার নির্মাণ-সামগ্রী, কলাপ্রকৌশল

যাকে তোমরা কথা বলতে দিলে না …
আমার হাওয়ার কী দোষ বলো
যাকে তোমরা চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেলে
আলোগুলো পড়ে রইলো
আমার বইয়ের মতো পেছনে,
আমার সমুখে অদৃশ্য অন্ধকার
আমাকে বয়ে নিয়ে চলেছে
আমার পড়ার টেবিল থেকে
চেনা-অচেনা আলো-আঁধারি
অপাঙ্ক্তেয় কেদারা
উপদ্রুত আমার লিপি
অকস্মাৎ অবরুদ্ধ আমার উচ্চারণগুলি

আমার অ আ ক খ গুলো
পাখির মতো হত্যা করলে
আমি তোতা পাখির মতো
তাদের মুখস্থ লালন করেছিলাম
আমি তোমাদেরই মতো মাতৃস্বর-মাতৃব্যঞ্জনকে
আজন্ম-আজীবন-আমৃত্যু ভালবাসি

আমিও কি মাতৃভাষায়
বিরচিত কথা বলতে শুরু করিনি
আমিও তো স্বকন্ঠে
স্বরচিত কথা বলতে শিখেছিলাম
স্বাধীনতার মতো আমার বুকের বুলি গুলির মতো
ফুটতে শুরু করেছিল
তোমরা আমার বুকের বর্ণমালাকে
কেন পিষ্ট করলে
তোমরা আমার হৃদয়কে
কেন দুমড়ে মুচড়ে দিলে
এমন করে পেটালে

গারদের মতো আমাকে ঘেরাও করে—

শেকল ভাঙা পাখির মতো
আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া
আমি গেয়ে উঠেছিলাম
আমি জেগেউঠেছিলাম
প্রহরান্তে, অন্ধকারে রাতের
পাখি যেমন ডেকে ওঠে পরিখার মতো
গাছের পাতার ফোকর থেকে
তোমরা সেই প্রহরের হন্তারক
আমার দুচোখের বাতিকে আছড়ে মেরেছিলে
আমার জিভ থেকে শব্দের সুতো কেটে দিয়েছিলে
মসলিনের মিহিন বুনন থেকে
আমার আঙুল চিরতরে সরিয়ে দিয়েছিলে

আমার সৃষ্টিশীল-অধ্যবসায়ী অক্ষরগুলো
আমার স্বনির্বাচিত-নিহত অক্ষরগুলো
এখন আমার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি
এখন অনেক আমি
এখন প্রচুর আমি
আঙিনা থেকে রাজপথে আমার আমি
আমার স্বপ্নিল আগামীর কাফেলা আমি
স্বনির্মিত আমি, আমার স্বনির্মাণ

ভীতু নই
কাপুরুষ নই
পরাজিত নই
আমি এক অপরাজেয় বাংলা

এই আমার দেহ নয়
আমার দিলের ভেতর
অনুপ্রবেশকারী আঘাতগুলোই
অনুপ্রবিষ্ট অভিঘাতগুলোকে, অভিজ্ঞানকে
আমি সঙ্গে নিয়ে চলেছি
আমি কবরে নিয়ে চলেছি
আমি ঘর নয়, গোরের পথ দেখাচ্ছি

তোমাদের বর্ণপরিচয়, স্বপরিচয়
তোমাদের মতো জীবিতের পরিস্কার-আত্মপরিচয়
মৃতের ময়না তদন্তের চেয়ে পষ্ট, শক্তিশালী!

অবশেষ

তুমি আমার মতো নও, আমি তোমার মতো নই
সে আমাদের মতো নয়—
আমরা কেউ কারো মতো নই:
আসলে, কেউ কারো মতো হয় না। হতে পারে না।
আমরা মূলত যে যার মতো,
আমরা আমাদের মতো:
রূপে ও স্বরূপে।
আমাদের বাহিরে মিল
আমাদের ভেতরে মিল
অন্তর্গত অর্থে আমরা এক নই,
একীভূত নই।
আমাদের সত্তা বিবিধ
বিভিন্ন আত্মা আমরা।

এমন কি, আমাদের ক্লোন আমাদের মতো;
কিন্তু, আমরা নই!
কী চমৎকার, আমরা আমাদের অবশিষ্ট হতে হতে
অবশেষে আর কী বাকী থাকে? বলো,
কিছু কি থাকে?
কী
থাকে!

 

আবৃত্তি

আমি আমার অনতিদূর ওই পাখিটির মতোন
দূর ওই তারাটির মতোন চাঁদ ও জোছনার মতোন
তখন একাকী জেগে—

মনপবনের নাওয়ে ভেসে
হাওয়ায় উড়ে গেছি …

হঠাৎ মহাশূন্যের পাতাল ফুঁড়ে
আমাকে আবৃত্তি করল একটি আকাশ …
কে যেন বাতাসের স্বরে
কথা কয়
ঘুরে
ফিরে
অনুদিত হয়

যেন হাঁটি-হাঁটি-পা-পা-বোলে
আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল একটি আদিম বিন্দু
যেন দ্বিধাহীন এগিয়ে এল সদ্য-কুসুমিত এক পৃথিবী

তার চারপাশে তাকে ঘিরে জেগে উঠেছে
অবাধ্য আদিম নগ্নতা
জড়িয়ে ধরেছে উপচে পড়া
টইটম্বুর অসভ্য শূন্যতা
প্রাগৈতিহাসিক অবুঝ সবুজ

আমি কি তার রহস্যভেদ করতে
পারবো, কোনোদিন?

কেন এই সরল-সুন্দর
নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে বলে আমি এই দিকে!

এক কাপ চা

এখন এক কাপ চা-হলে মন্দ হত না
এখন এক কাপ চা-পেলে মন্দ হত না:
খালি এক কাপ চা
শুধু এক কাপ চা
সেরকম এক কাপ চা!

ওহ্, ওষ্ঠ জিভ কন্ঠ পুড়ে যাচ্ছে:
চোখের সামনে মুগ্ধ চায়ের ধোঁয়া
চোখের সামনে মুগ্ধ চায়ের হাতছানি
নিমেষে সবকিছু ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে …
তরল হয়ে অন্তরে নেমে যাচ্ছে
ওহ্, এক পলক তাকিয়ে এমন-যে মন মজে যায়!
ওহ্, প্লিজ,জাস্ট অ্যা কাপ অব টি,
প্লিজ, গিভ মি অ্যা কাপ অব টি!

ও-য়া-ও!

আমি ওষ্ঠ ছোঁয়াব
আমি জিভে ঢালব
গলা ভেজাব
আঙুলে আঙুল, পরশে পরশ
আমি জমিয়ে এক কাপ চা-এ ডুববো

কার হাতযশ—আমার আড়ষ্ট-অবশ শরীর
চাঙা করে দেবে
কার হাতযশ—আমারই আড়ষ্ট-অবশ শরীর
রাঙা করে যাবে

শূন্য, শুধু শূন্য, এক কাপ শূন্য—
শূন্য, শুধু শূন্য, এক কাপ পূর্ণ
শূন্যতা শুধু পূর্ণতা হয়ে উঠুক
অপূর্ণতা-শূন্যতা ভরে যাক
শুধু শূন্য এক কাপ শূন্য পূর্ণ হয়ে উঠুক :
সতৃষ্ণ ধোঁয়া হয়ে উঠুক,
আমি সুগন্ধ উষ্ণতা ছোঁব,
তৃষিত হাওয়া বুকে চেখে নেব!
হৃদয় উষ্ণ হয়ে উঠবে আমার।

আহ্, জম্পেশ, এক কাপ চা
ওহো, জমাটি, এক কাপ চা
আহা, মজে যাব, সুনন্দ স্বাদে!

ওগো দাও মধুময় এক কাপ চা
আহা দাও মিষ্টি এক কাপ চা
সুরম্য এক কাপ চা :
ওঠো, পান করি
এসো, পান করি
সুখোষ্ণ হয়ে উঠি :
অশেষ তলানি তার, শেষবিন্দুটুকু …

কমণীয় আঙুল-ছুঁয়ে গড়ে ওঠা
বিকশিত এই শোভা
সর্বশেষ শুভেচ্ছা:

চলো, স্বাগত জানাই, বুঁদ হয়ে যাই
সুপ্রাচীন চৈনিক বাহারে …
চলো, আলিঙ্গন করি, আদিবাসী মন-ছুঁয়ে
উঠে আসা অকৃত্রিম আহ্বানকে …
চলো, জড়াই, বাগানময় চায়ের
আন্তরিক আশ্চর্য পরমোষ্ণতাকে …
ম ম এক কাপ প্রিয় পানীয়কে
ম ম এক কাপ তরলকে
ম ম এক কাপ অমৃত-গরল নির্যাসকে
মোহময়ী মানবিক আবেদনকে

চলো মুখোমুখি বসি কাপ ও পিরিচের
টইটম্বুর-আমন্ত্রণের
চলো মুখোমুখি বসি মন্ত্রমুগ্ধ-আমন্ত্রণের!

পুলক বড়ুয়া। কবি। জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘ওই পূর্বে রাঙা সূর্যে’, এবং ‘পাঠেরা খেলছে মাঠে’।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

বেশরম

বেশরম

বেশরম কি কঠিন ছিলো, ডুব সাঁতারের রুদ্ধ দম তোমাকে ভুলেছি ঠিক এক বেশরম- আবার পড়েছি…..

তোমার জন্য

তোমার জন্য

পাষাণের প্রেম বিকট স্তব্ধতায় সুনিপুণ সীমানা প্রাচীর তুলেছ, বেসামাল ভালোবাসার জাগতিক জায়নামাজে। প্রার্থনার গতিরোধ করো…..