এক মুঠো মাংস

ফারজানা নীলা
গল্প
Bengali
এক মুঠো মাংস

ভেতরে ঢুকানো এটাই আজকের শেষ লাশ। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তাঁকে পুড়িয়ে ফেলবে একদম নির্ভুল ভাবে। শারমিন এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত। সবাই অভ্যস্ত। এখন আর কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদে না। উথাল পাতাল আবেগে কেউ ভেসে যায় না। আগে যখন লাশের সারি থামতই না তখন শারমিন দেখেছে মানুষের আহাজারি।

আহারে কান্না! কি নির্মম, কি বীভৎস, কি নিদারুণ বিদায়! কেউ লাশের পাশে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। সর্বোচ্চ দশ মিনিট। আগাগোড়া প্লাস্টিকে মোড়ানো লাশের পাশে শুধু দশ মিনিট দাঁড়ানোর নিয়ম। ছোঁয়া যাবে না কোন মতেই। হাসপাতালের  গার্ড সদা সতর্ক থাকে যেন কেউ  ছুঁয়ে না ফেলে।

 কেউ কেউ অবশ্য ছুঁয়ে ফেলত। উপচে পড়া কান্না সামলাতে না পেরে। গার্ডরা ব্যারিকেড দিয়েছিল এরপর। যেন কেউ কাছেও যেতে না পারে। এদের স্পর্শ করলেই একমাসের মধ্যেই লক্ষণ দেখা দিবে। এরাও অসুস্থ হবে। কত অনুনয় আসে শারমিনের কাছে।

“একটা বার শুধু কাছ থেকে দেখতে দেন। কসম করে বলছি স্পর্শ করবো না।শুধু চোখের দেখাই দেখবো ভাল করে”

শারমিন অটল থেকে কঠিন স্বরে বলে, “হাসপাতালে জায়গা নেই যে আপনাকেও ভর্তি করাবো”

শারমিন জানে এমন সময়ে নিষ্ঠুর উত্তর না দিলেও হয়। কিন্তু শারমিনের মধ্যে মনে হয় আবেগ ভালোবাসা লোপ পেয়েছে। সে কারো যন্ত্রণায় এখন আর বিচলিত হয় না। তার সামনে হাত পা ছোড়াছুড়ি করলেও সে নির্বিকার চেয়ে থাকে শুধু।

ভোর সাড়ে তিনটা এখন। লাশ পোড়ানো শেষ আজকের মত। কালকে আবার শুরু হবে। সে আগে ওয়ার্ড নার্স ছিল। এখন লাশের তদারকি করা দায়িত্ব পেয়েছে তিন মাস ধরে। প্রথম প্রথম সহ্য করতে পারত না, অনেকবার বলেছে ডিউটি চেঞ্জ করার জন্য কিন্তু সেই তো একই ডিউটি পড়ে।

রোগীর চিৎকার। নিজের হাত পা কামড়িয়ে রক্তাক্ত করা। সেই রক্ত পরিষ্কার করা। সেই রক্ত পরিষ্কার করতে হয় খুব সাবধানে। লাগলেই শেষ। কত নার্স ডাক্তারের প্রাণ গেলো এই করতে। শুধু প্রাণ গেলেই হতো। কিন্তু যাওয়ার আগে নিজেকে নিজে খাওয়ার যে চেষ্টা, যে বিকৃত ক্ষুধা লাগে নিজের মাংস নিজে খাওয়ার সে না দেখলে কেউ বুঝবে না।

কি আশ্চর্য এক রোগ! প্রচণ্ড ক্ষুধায় মানুষ দিশেহারা হয় , যতই খাবার দেওয়া হোক তাঁকে সে কিছুই খেতে পারে না। মাংস মাছ ফল সবজি কিছুই না। এমনকি পানিও না। স্যালাইন দিলেও কোন লাভ হয় না। পিপাসায় ক্ষুধায় মানুষ পিশাচ হয়ে যায়। নিজের মাংস নিজেই খেতে শুরু করে।

ব্যাপারটা জম্বি সিনেমার মত। কিন্তু অন্যকে আক্রমণ করে না এই শুধু পার্থক্য।

আক্রমণ না করলেও রক্ষা নেই। কোন না কোন ভাবে রক্তের ছিটেফোঁটাও যদি  অন্যের গায়ে লাগে তবে সেখানেই শেষ। শেষ যে হয়ে গেছে সেটাও বুঝা যায় এক মাস পড়ে। প্রথমে অল্প অল্প খেতে পারবে। আস্তে আস্তে মাছ মাংসের গন্ধে বমি আসবে। পানি তিতা লাগবে। কিন্তু ক্ষুধা থাকবে প্রচণ্ড। শেষমেশ নিজের মাংসই তাঁর খাবার।

এক আশ্চর্য কারণে মানুষ নিজের মাংসতেই তৃপ্তি পায়। অবিশ্বাস হলেও সত্য যে যখন সে নিজের মাংস ছিঁড়ে তখন সে যন্ত্রণার কোন বোধই অনুভব করে না।

ধীরে ধীরে শরীরে পচন  ধরতে শুরু করে। সেই পচনে আবার কামড়াকামড়ি শুরু হয়। ডাক্তাররা ধরে বেঁধে রেখে পচন ঠেকাতে চেষ্টা করে। কিন্তু শরীরে যেহেতু কোনও খাবারই প্রবেশ করতে পারে না, তাই স্যালাইন দিয়ে বেশি দিন বাঁচিয়ে রাখা যায় না।

মরার সময় চেহারাও ঠিক মত চেনা যায় না। কঙ্কালের উপর যেন একটা চামড়া। ক্ষত বিক্ষত এবড়ো থেবড়ো শরীর!

শারমিনের প্রথম প্রথম প্রচণ্ড ভয় হত। দেখলেই চিৎকার দিতো। এখন আর তেমন ভয় লাগে না। ভয় কমতে কমতে আস্তে আস্তে শহরে মানুষ কমতে লাগলো। গ্রামে হানা দিলো সবাই। সেখান থেকে আবার শহরে। বাঁচার কোনও উপায় খুঁজে পেলো না।

ডিউটি শেষে শারমিন হাসপাতালের গাড়িতে বাড়ি পৌঁছায়। তার একমাত্র মেয়েকে সে নানীর কাছে রেখে এসেছে গ্রামে। গ্রামও নিরাপদ না তবু যেহেতু সে নার্স তাই যেকোনো সময় তাকেও এই রোগে ধরতে পারে। তাঁকে ধরলে মেয়েকেও ধরবে। অনেক নার্স ডাক্তার চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। সরকার প্রথমে অনেক ভয় ভীতি দেখিয়েছে চাকরি ছাড়লে এই হবে সেই হবে। কিন্তু কে যাবে স্বেচ্ছায় মৃত্যু ডেকে আনতে। যেখানে এই রোগের কোনও চিকিৎসা নেই। শারমিনের মত কিছু পাগল মানুষ এখনো পড়ে আছে হাসপাতালে।

শারমিন এখন একা থাকে। তাঁর সাথে আরও একজন নার্স থাকত, রুমা। দুজন মিলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত। রুমা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তার পাশে থেকে শারমিন দেখেছে কি বীভৎস হতে পারে মানুষের মৃত্যু যন্ত্রণা।

শারমিন নিজে রুমার হাত পা বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল হাসপাতালে। নিজেই করেছে তাঁর পরিচর্যা যতদিন বেঁচে ছিল। কতবার সে রুমাকে জোর করে খাবার মুখে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। থু মেরে ফেলে দিত বার বার।

যেদিন প্রথম রুমা নিজেকে খাওয়া শুরু করে সেদিন রাতে শারমিন ডিউটিতে ছিল। এত রোগীর ভিড়। তবু সে অনেক বলে কয়ে একটা আলাদা রুমের ব্যবস্থা করেছিল রুমার জন্য।

রুমার  রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ শুনে গোঙানোর আওয়াজ। আওয়াজ শুনে থমকে দাঁড়ায় শারমিন। ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠে। আস্তে করে দরজা খুলে প্রথমে চোখ পড়ে বিছানায়। শারমিন  সেখানেই ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। রোগীদের এমন কান্ড দেখতে দেখতে সে এতদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রথম কোনও বন্ধুর এমন হাল দেখে তাঁর সেখানেই  জ্ঞান হারাবার উপক্রম হয়।

রুমা তাঁর বাঁধা বাম হাতের কবজির উপরের মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে। সে যে তাঁর নিজের মাংস নিজেই ছিঁড়ছে এর ব্যথা পর্যন্ত সে অনুভব করতে পারছে না। তাঁর চোখে মুখে কি পরম তৃপ্তি।

অনেক অনেক দিন অভুক্ত থাকার পর মানুষ যেমন মুরগির রানে কামড় বসায় গোগ্রাসে ঠিক তেমন করেই রুমা  খাচ্ছে তাঁর কবজির মাংস।

হাত থেকে যে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে সে রক্তও রুমা খাচ্ছে আইসক্রিমের মত চেটে চেটে। খাচ্ছে আর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে।

কীভাবে সম্ভব! কীভাবে! বিড়বিড় করে বলতে বলতে শারমিন সেখানে জ্ঞান হারায়।

এর দুইদিন পরেই রুমা মারা যায়।

শারমিনের ডিউটি শুরু হয় সকাল ১১ থেকে। আজ ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়। রাতে ঘুমও তেমন হয় না।কিন্তু কাল রাতে বেশ আরামেই ঘুমিয়েছে সে। বিছানায় বসে বসে শূন্য ঘরের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, এভাবে আর কতদিন!

মোবাইল বের করে মেয়ের ছবি দেখে। দেখে আর মনে মনে বলে আমার যদি কিছু হয়ও বা তুই যেন ঠিক থাকিস। চোখের কোণে জল চিকচিক করে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেডি হয় হাসপাতালের জন্য। গাড়ি আসে। তাঁর মত অন্য নার্সরাও যে যার বাসা থেকে উঠে। যেহেতু এখন কোনও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই কোথাও।

গাড়ি ছুটছে। শারমিন জানালা দিয়ে দেখে শহরকে। নির্জন নির্জীব নিথর শহর। অথচ কিছুদিন আগেও এই শহরে মানুষ গমগম করত । হইচইয়ে কান পেতে পাশে বসা মানুষেরও আওয়াজ শোনা যেত না।

আর আজ সবই থেমে গেছে। পিনপতন নীরবতা ভেঙ্গে গাড়ি ছুটে চলছে হাসপাতালের দিকে। যেখানে এককালে মানুষ বলে পরিচয় দেওয়া কিছু অদ্ভুত প্রাণী এখন বাঁচার জন্য অথবা মরার জন্য ছটফট করছে।

হাসপাতালের কাছাকাছি আসতে শারমিন দেখে একদল কুকুর খুব আরাম করে কিছু মাংস চিবচ্ছে। এখন এদের খাবারের কোন সমস্যা হয় না। হাড়জিরজিরে কুকুরগুলোও এখন বেশ তরতাজা। যেখানে সেখানে খাবার ,মাংস পড়ে থাকে। বাজার গুলো তছনছ , কেউ নেই যে বাজার করবে বা বাজারে বিক্রি করবে। সব যেভাবে আছে সেভাবে রেখেই পালাচ্ছে মানুষ। কোথায় যে পালাচ্ছে জানে না, কিন্তু পালাচ্ছে। শহর জুড়ে যে কয়জন এখনও সুস্থ তাদের আর কতই খাবার লাগে। চারিদিকে পচার দুর্গন্ধ, মানুষ পচার গন্ধ, মাংস পচার গন্ধ ,সবজি পচার গন্ধ। এই রাস্তার কুকুর বিড়ালদের জন্য এখন সময়টা রমরমা। তারা ইচ্ছে মত বাজারে বাজারে ঘুরছে। সারাজীবন পেট ভরে খেতে না পারা প্রাণগুলো এখন ইচ্ছে মত খাচ্ছে।

শারমিনের বুকটা ধক করে উঠে হঠাৎ। সে কুকুর একদম সহ্য করতে পারত না। তাঁর বাসার সামনে দুটা কুকুর থাকত।এদের দেখলেই তাঁর মাথা অহেতুক খারাপ হয়ে যেত। এরা সারাদিন এদিক ওদিক ছুটে খাবারের সন্ধানে। শারমিনের এসব কুকুরদের খাবার খোঁজার দৃশ্য দেখলে বিরক্ত লাগে। কতবার সে লাঠি দিয়ে এদের পিটিয়েছে। কুকুরগুলো কিছুই করত না তাকে।বরং ভয় পেয়ে দূরে চলে যেত।

একদিন শারমিন ফিরছিল রাতে, গেইটের সামনে একটা সাদা মা কুকুর শুয়ে ছিল। শারমিনের অহেতুক মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। পাশে থাকা লোহার রড দিয়ে শারমিন ইচ্ছেমত পেটাল কুকুরটিকে। কুকুরটির গগনবিদারী আর্তনাদ শারমিনের মনে এতটুকু মমতা জাগাতে পারে নি। কুকুরটি যখন কোনোমতে জান নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল শারমিন দেখল কুকুরটির পেছন থেকে রক্ত বের হচ্ছে। কুকুরটি গর্ভবতী ছিল।

হাসপাতালের গেইটে নেমেই শারমিনরা চেঞ্জিংরুমে ঢুকে। পিপিই পরে তারপর কাজ শুরু করে। শারমিন খেয়াল করল সে রাতে কিছু খায় নি। সকালেও কিছু খেয়ে আসে নি। তাঁর কিছু খাওয়া দরকার। সে ক্যান্টিনে গেলো। খাবার দেখেও তাঁর ক্ষুধা লাগল না। কিছুক্ষণ খাবারের দিকে তাকিয়ে একটা ঢোঁক গিলে সে কাজে চলে গেলো।

কাজ সেরে বাড়ি যাওয়ার সময় শারমিনের আবার মনে হলো, সে আজ সারাদিন পানিও খায় নি। কাজের প্রেশারে মনে পড়েনি। এখন মনে হতেই ভেতরটা হিম হয়ে গেলো। সে তড়িঘড়ি করে ক্যান্টিনে ছুটল। সামনে যাই পেলো নিয়ে নিলো খেতে। মাংস আর রুটি। মাংসের গন্ধ নাকে যেতেই শারমিনের গা গুলিয়ে উঠলো। শারমিন নাক বন্ধ করে খেতে শুরু করলো। খেতে খেতে বমি করে দিলো।

শারমিনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। তাঁকে পরীক্ষা করে এখনো বুঝা যাচ্ছে না তাঁর মধ্যে সিম্পটম আছে কিনা।

 শারমিন বুঝতে পারছে কি হতে যাচ্ছে। তবু নিজেকে সে বোঝাল, কিছুই হয় নি। সারাদিনে কাজের প্রেশারে সে বিধ্বস্ত।

রুমে একজন ডাক্তার ঢুকে। শারমিনের জ্বর আছে কিনা দেখে।

-স্যার আমার হয় নি। কাজের প্রেশারে শরীর খারাপ হয়েছে। দেখুন এখন ঠিকই ক্ষুধা লাগছে।ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। শারমিন ভয়ে ভয়ে বলে।

– তাহলে ক্যান্টিনে বমি করলেন যে। ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে বললেন।

একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে শারমিন বলল,

– স্যার এখন ভাত এনে দেন দেখেন খেতে পারি কিনা।

ডাক্তার কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

– আচ্ছা ঠিক আছে, আপনার জ্বরও নেই। বাসায় যান রেস্ট নেন।

এরপরের এক সপ্তাহ শারমিন  হাসপাতালে যায় নি। মেইলে তাঁর রিজাইন লেটার পাঠিয়ে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে সে বাড়ি চলে যাচ্ছে। কিন্তু শারমিন বাড়ি যায় নি। যাওয়া সম্ভব না। তাঁর মেয়ে সুস্থ আছে। তাঁকে সুস্থ রাখতে হবে।

সাতদিন ধরে সে কিছুই খায় নি। তীব্র জ্বরে প্রায় অচেতন থাকে। পেটের ভেতর প্রচণ্ড ব্যথা আর ক্ষুধা। ফ্রিজের সব খাবার সে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। একটা খাবারও মুখে দিতে পারছে না। প্রথম দিন হাসপাতাল থেকে এসেই সে ফ্রিজের সব ভাত তরকারি বের করে খেতে বসেছিল। খাবারের গন্ধে বার বার বমি আসছিল।তবুও মনকে শক্ত করে সে খেতে বসে। নাক ধরে পরপর কয়েক গ্রাস খেয়েও ফেলে। এরপর হাল ছেড়ে দেয়। আর ভেতরে কোন খাবার ঢুকাতে পারে না।

এভাবে দিন যাচ্ছে। শুয়ে অচেতনে চেতনে।

আজ সপ্তম দিন। ক্ষুধায় সে রীতিমত চোখও মেলে রাখতে পারছে না। দেয়াল ধরে ধরে বাথরুমে এসে আয়নায় দেখে নিজেকে। চোখ গর্ত হয়ে গেছে। গাল ঢুকে হাড় বুঝা যাচ্ছে। গলার হাড় ঠেলে উপরে উঠে গেছে।

এক কুৎসিত রমণীকে সে দেখতে পায় আয়নায়।

আজ তাঁর খুব অস্থির লাগছে। তাঁকে খেতেই হবে । খাবার চাই তাঁর। খাবার।

দেয়াল ধরে ধরে আবার সে বিছানায় গিয়ে বসে। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে।খুব মিষ্টি শীতল বাতাস। তবে বাতাসে কীসের যেন গন্ধ। কীসের গন্ধ শারমিন বুঝতে পারছে না। বাতাস আস্তে আস্তে বাড়ছে। হঠাৎ করে বাতাস এত জোরে বইছে কেন?

শারমিনের হাতপা চুলকচ্ছে। সে আর থাকতে পারছে না। কিন্তু এও জানে একবার কামড় বসালেই সব শেষ। শেষবারের মত তাঁর মেয়ের সাথে কথা বলতে চায় সে। কম্পিত হাতে মোবাইল নেয়। ডায়াল লগ বের করতেই অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ঘাম ছুটে যায় । মনে মনে বলে, শেষবারের মত আমার মেয়ের কণ্ঠ শুনতে দাও প্রভু। শেষবারের মত।

নাম্বার ডায়াল হয়।

বাতাস বাড়তে থাকে। শারমিনের চোখ যায় জানালা দিয়ে বাইরে।

ধোঁয়াশা চোখে শারমিন দেখে সেই সাদা কুকুরটিকে। যাকে গর্ভবতী অবস্থায় লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছিল সে।

কুকুরটিকে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। শারমিন থরথর করে কাঁপে। চোখ ফেরাতে পারে না। নিথর চোখে সে কুকুরটির দিকে তাকিয়েই থাকে। এবং ওপার থেকে কুকুরটিও তাঁর দিকে স্থির তাকিয়ে থাকে।

কুকুরটি মরে নি? এতদিন তো দেখে নি কুকুরটিকে। আজ কোত্থেকে এলো? শারমিন বিড়বিড় করে বলে। সে কি ক্ষমা চাইবে কুকুরটির কাছে?

বাতাস বাড়তে থাকে। শারমিনের অস্থিরতা বাড়তে থাকে। শ্বাস দ্রুত পড়তে থাকে। সে আর পারছে না। ধীরে ধীরে সে বাম হাত মুখের কাছে  নিয়ে যায়। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।

সে আর কিছু ভাবতে পারে না। গভীর একটা তীব্র কামড় বসিয়ে দেয় হাতে। কামড়িয়ে কবজির নিচ থেকে মাংস টেনে ছিঁড়ে খেতে শুরু করে। আহ কি শান্তি!

শারমিন চোখ বুজে পরম তৃপ্তিতে নিজের মাংস খেতে শুরু করে।

শারমিনের অপর হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার সময় সে খেয়াল করে নি ওপাশ থেকে তাঁর মেয়ে ফোনটি রিসিভ করেছিল। “হ্যালো মা?”

ফারজানা নীলা। গল্পকার, নারী ও প্রাণি সংরক্ষণ অধিকারকর্মী।  

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..