এপ্রিলের আলোয় লেখা

জাহানারা পারভীন
প্রবন্ধ
Bengali
এপ্রিলের আলোয় লেখা

১৯১৮ সালের এপ্রিল। এলিয়ট যাকে বলেছেন নিষ্ঠুর মাস। জিবরানের কাছে তা এক মহাকাব্যিক সময়। এপ্রিল এলিয়টকে দিয়েছে বন্ধুর মুত্যুশোক। জিবরানকে ফিরিয়েছে লেখার কাছে। এ এক কঠিন বৈপরীত্য: একই দেশে, কাছাকাছি সময়ে বড় হওয়া দুই কবির জীবনে।

তারুণ্যে যে লেখার পরিকলন্পনা, একটু একটু করে যার বীজ বুনেছেন, ১৯১২ সালে যে লেখার শুরু, সাত বছর পর তৈরি হলো সেই লেখার কাঠামো। এর মাঝে কেটে গেছে সময়। লিখতে না পারার যন্ত্রণার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভাষা খুঁজে না পাওয়ার আক্ষেপ। এর মাঝে চলেছে অন্য সব লেখা। বারবার বিরতি এসেছে এই একটি লেখায়। এত সময় আর কোনও লেখার জন্য নেননি। দীর্ঘদিন পর খুঁজে পেলেন প্রত্যাশিত ভাষা। নবীন অভিযাত্রীর হিমালয় জয়ের মতো এই আবিষ্কার। জিবরান চিরকালই এক নি:সঙ্গ মানুষ। চারপাশের ভিড় বাচিয়ে একলা হেটেছেন।

যখন কারো হৃদয় ছোট পৃথিবীতে রূপান্তরিত হয়, তখন সে সবার কাছ থেকে একা হয়ে যতে চায়।

একা থাকাই যেন নিয়তি তার। যেন তিনি অচেনা অভিযাত্রীদের মাঝে পর্বতের চুড়ার দিকে হেটে যাওয়া নিঃসঙ্গ শেরপা। কাঙ্ক্ষিত ভাষার খোঁজ তাকে পৌছে দেয় নতুন কাব্যিক গন্তব্যে। এ যেন পর্বতের শীর্ষে উড়িয়ে দেওয়া নিজের পতাকা। বরফের ক্যানভাসে স্বাক্ষর করা নাম। বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া সত্ত্বার প্রতিধ্বনি। মহাবিশ্বের পটভূমিতে মৃত্যুর মতো একাকীত্বে এ যেন নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ। যুদ্ধের পর আবিস্কৃত হয় এক পরম ভাষা। যে ভাষা চিরকল্যাণকামী। যেখানে পাওয়া যায় আনন্দময় জগত। অভিজ্ঞানের আলো অন্ধকারে মানুষ খুজে পায় আশা-ভালোবাসার পবিত্র পৃথিবী। এ পৃথিবীর প্রধান বাসিন্দা একজন কবি। অন্যদের কাছে যিনি দূরত্বের দৃষ্টান্ত। অনুকরণীয়জন। তার কাছে ভিড় করে হাজারো মানুষ। অন্ধকার গুহা থেকে যুক্তির আলোয় তারা খোঁজে আত্মার মুক্তি ।

মানুষকে জিবরান খুজতে চেয়েছেন প্রথার বাইরে। মানুষের প্রতি তার অগাধ আস্থা। এখানে তিনি এঁকেছেন ব্যতিক্রম জীবনের মানচিত্র। আলোকিত এপ্রিলে। শহর থেকে দূরের বাগানবাড়িতে। ধনী বন্ধুর আতিথেয়তায় কাটানো দিনে চুড়ান্তভাবে ফেরা সম্ভব হয়েছে অসমাপ্ত লেখার কাছে। সেই দ্বীপের ঈশ্বরের কাছে। ছয় বছর আগে যার কথা প্রথম লিখেছেন। সেই নবীর গল্প। যে নির্বাসিত এক দ্বীপে। দ্বীপের পাশে সমুদ্র, পর্বত। তার মনে হয়েছে প্রফেটের নির্বাসনের জন্য দ্বীপই হবে উপযুক্ত স্থান। কারণ দ্বীপে থাকতে পারে পর্বত, সমুদ্র। মেরিকে বলেছেন।

এই দ্বীপে একটা পর্বত বসাতে পারি। পর্বতের ওপরতো আর দ্বীপ বসাতে পারব না। দ্বীপ মানে অনেক সম্ভাবনা। বিশেষ করে দ্বীপ প্রধান জনপদ থেকে কাছে হতে পারে, যেখান থেকে নগর দেখা যাবে।

প্রাথমিক ভাবনাই থেকে যায় সিদ্ধান্তে। মোস্তাফার নির্বাসনের জন্য বেছে নেন শহর থেকে দূরের দ্বীপ। যেখান থেকে পুরো এলাকা দেখা যায়। যার চারপাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। সমুদ্রের আদিগন্ত জলরাশি। ১৯১২ সালের জুন মাসে মেরির জার্নালে প্রথম পাওয়া যায় এই লেখার প্রসঙ্গ।

আজ কে তার নতুন লেখার প্রথম লাইনটি লিখেছে। দ্বীপের ঈশ্বরকে নিয়ে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই নির্বাসন হবে একটা দ্বীপে। প্রথম অধ্যায়ের নাম হবে আরবিতে। নতুন চাঁদের নামে। সাতহাজার বছর শেষে নগরীর কাছাকাছি সমুদ্র তীরে সে তার নৌকা ভিড়িয়েছে। একা। আমরা জানতে পারি কেন সে ঈশ্বরকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। অন্যসব মানুষের মাঝে। এবং শেষ পর্যন্ত  কেন সে সবাইকে ফেলে চলে যাচ্ছে। কারণ সে আগুনকে গ্রহণ করতে সক্ষম। একদিনেই কাজ অনেকটা এগিয়েছে। এই গডের নাম সে রেখেছে আল-মোস্তাফা।

মেরির সঙ্গে আলাপে এই লেখাকে কখনও আমার বই, কখনও আল-মোস্তাফা, কখনও বা কাউনসেল বলে সম্বোধন করেছেন। তার কথায় নানা সময়ে এসেছে সেই ঈশ্বর, তার নির্বাসনের প্রসঙ্গ। ধীরে ধীরে এগিয়েছে কাহিনী। এর মাঝেই লেখা হয়েছে ম্যাডম্যান, ফোররানার। লেখা শেষ হলে মাসের পর মাস ফেলে রেখেছেন। কিছু ছাপতে দিয়েছেন। ফেলে রাখা পাণ্ডুলিপি থেকে কয়েকলাইন উদ্ধৃত করা মানে সেটা ছাপার উপযুক্ত। নানাসময়ে নতুন লেখার অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন মেরিকে। বলেছেন আল-মোস্তাফার কথা।

মেরিকে জানান কীভাবে আল-মোস্তাফা দ্বীপে বারো বছর অপেক্ষা করেছেন। বেগুনী পাল তোলা জাহাজের। কীভাবে নিজের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে শহরের সঙ্গে জুড়ে থাকা পোশাকি বেদনা। আল মোস্তাফা নামের পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে বলেন, লেখার শুরুতে মাত্র একবার ব্যবহার করা হবে আল মোস্তাফা নাম। এরপর পুরো লেখায় তাকে হি বলে বোঝানো হবে। আরবি শব্দ আল মোস্তাফার অর্থ বিশেষ কিছু। এমনকী দা চোজেন ও দা বিলাভেড শব্দের অর্থও আলাদা। ইংরেজিতে এসব বোঝানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শব্দ নেই। সিদ্বান্ত হয় শুরতেই আল মোস্তাফা নামের পর যোগ করবেন দা চোজেন অ্যান্ড বিলাভেড।

মেরি আল মিত্রা নামের অর্থ জানতে চাইলে বলেন, এর মানে স্মৃতির জমিন। বলেন, এখানে যা লেখা হয়েছে সবই মনের বিভিন্ন বিষয়। প্রতিটি বিষয় বৃহত্তর অর্থে জীবনের প্রতীক। বলেন- আমাদের বর্তমান আরও বড় ভবিষ্যতের বিপরীতে আমাদের বহন করে বেড়ায়। মেরির পরামর্শে শেষ পর্যন্ত জাহাজের বর্ণনা থেকে বেগুনী পাল শব্দটি বাদ দেন। মেরিকে জানান,

আরও বছর পাচেক লেখাটা আমার সঙ্গে থাকবে। কাঠামো ঠিকঠাক হয়ে আছে। এর মধ্যে আরও দু’তিনটি বইয়ের কাজ শেষ হয়ে যাবে।

বছর শেষে মেরি জার্নালে লেখেন, এই লেখার নতুন নাম রাখা হয়েছে কমনওয়েলথ। ১৯১৩ সালের এপ্রিল নাগাদ তিনটি অধ্যায় শেষ শেষ হয়েছে। ১৯১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মেরি জার্নালে লিখেছেন,

সারারাত সে কমনওয়েলথ নিয়ে পড়ে ছিল।একটুও ঘুমায়নি। টানা লিখে গেছে। জন্ম, শিক্ষা, জীবন, বিয়ে মৃত্যু নিয়ে বিস্তারিত ভাবনা।

এসব ভাবনার পেছনে কোনও ব্যক্তিত্ব বা কাছ থেকে দেখা চরিত্র প্রভাব ফেলেছে কীনা জানতে চাইলে নাবাচক উত্তর দেন। বলেন এই লেখার ফর্ম প্রফেটিক। একটা বড় ফর্ম। শক্তি নিয়ে যা বলেছেন তা খুব সহজ। তারা সম্মত হয়েছে যে স্টেনফোর্ড হাইটের খুনী হোইকে দুই মিলিয়ন ডলার দিতে হবে স্টেনফোর্ডের পরিবারকে। সেই কৃষককে খুন করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধ সেই পরিবারের যতটা ধ্বংস করেছে, যত ক্ষতি হয়েছে তাদের তা পূরণ করতে বাধ্য করতে হবে। সেই কৃষক বেচে থাকলে যতটা অর্থ উপার্জন করত তত টাকা দিতে হবে তার পরিবারকে। এটা খুব সহজ সমাধান। জিবরান আরও বলেন, জীবনের অন্য অর্থও ভেবে দেখেছেন। শেষপর্যন্ত বেছে নিয়েছেন সহজ বাস্তবতা। সহজ, স্বতন্ত্র এবং প্রকৃত অবস্থা বলতে পাগলামী বোঝায়। তাই সহজ বাস্তবতাকেই বলা যায় মেডনেস বা পাগলামী।

মেরি প্রশ্ন করেন, তোমার কমনওয়েলথ তাহলে পাগলদের রাজ্য?

ঠিক ধরেছ, বলেন জিবরান

মেরি জানতে চান, তুমি কি শুধু বাহ্যিক সম্পর্কের কথা বোঝাতে চাইছ? নাকি এ সবই অন্তর্গত সম্পর্কের সংকেত?

জিবরান বলেন, এসব নিয়েও ভেবেছি। আমার মনে হয় এসব বিষয়ের মধ্যে সংযোগ ছাড়া এগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এসব নিয়ে একটু বিস্তারিত বলেছি। যদিও সবকিছু হবে সংক্ষিপ্ত। আমার বিবেচনায় প্রকৃত বই হবে ছোট। কাজ নিয়ে অধ্যায়টা কত ছোট, দেখ!

বারবার লেখার অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন মেরিকে। তার মতামত চেয়েছেন। ১৯১৪ সালের ১৪ নভেম্বর জানান- যতটা এঁকেছেন, তারচেয়ে বেশী লিখেছেন। আঁকার চেয়ে লেখার সংখ্যা বেশী। কিছু লিখেছেন যুদ্ধের সময়। কিছু কমনওয়েলথ এ। বাকীগুলো আলাদা। মেরি জানেতে চান বিয়ে সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কমনওয়েলথ এ আছে কিনা। জিবরান জানান, কমনওয়েলথ-এ বিয়ে বিষয়ক অধ্যায়টাই বিয়ে সম্পর্কে তার ভাবনা। সাধারণ, আটপৌরে অথচ বড় বিয়য়গুলো নিয়েই কথা বলেছেন এখানে। মনে হয় এটা তার জীবনের সেরা কাজ। মোস্তাফার লেখাটার মতো। মনে হয় এই দুটো লেখাই সেরা কাজ, সব লেখার প্রতিনিধি। ১৯১৫ সালের এপ্রিলে একটা জার্নালে কমনওয়েলথ ও আল মোস্তাফা ছাপা হয়। এ দুটোকে মিলিয়ে একটা লেখায় পারিণত করার কথা ভাবেন।

হয়ত কমনওয়েলথ আলাদা করে ছাপব না। মোস্তাফার মুখ দিয়ে এসব কথা বলিয়ে নেব। আমি কোনও চিন্তাবিদ নই। আমি একজন শ্রষ্ঠা। কমনওয়েলথ এর ভাষা আমার ভাষা নয়। এই ভাষায় বলেছি, কারণ যা বলতে চাই তা অন্য মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এই ভাষা ধরতে পারবে। তবে এই লেখার জন্য একটা সার্বজনীন ভাষা দরকার। সেই কাঙ্ক্ষিত ভাষার খোঁজ করছি। একদিন অবশ্যই খুঁজে পাব সেই পরম ভাষা। যা আমার জন্য উপযুক্ত। আপাতত অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। আগে কখনও এভাবে ভাষা খুঁজে খুঁজে হয়রান হইনি।

অবেশেষে শেষ হয় অপেক্ষা, ছুটির অবসরে খুঁজে পেলেন সেই পরম ভাষা। যে ভাষায় লেখা হয় তার শ্রেষ্ঠ লেখা।

 

দুই

১৯১৮ সালের গ্রীষ্ম। এপ্রিলের নরম রোদে উড়ে যায় বহুদিন ফেলে রাখা অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির ধুলো। দীর্ঘদিন ধরে যে লোখা বয়ে বেড়াচ্ছেন, দুবছর ধরে যা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সেই আল মোস্তাফা, দ্বীপের নির্বাসিত ঈশ্বরে আচ্ছন্ন হয় মন। এখানে দুপুর, বিকেলগুলো অপূর্ব। দিনের পুরোটাসময় নিজের দখলে। হাতের মুঠোয় জীবনের নির্যাস বোঝার যোগ্য সময়ে মেসাচুসেটসের ফার্মহাউস থেকে মেরিকে জানান, এই লেখাটা তার সত্ত্বাকে গ্রাস করে রেখেছে।

নিজের সবটুকু দিয়ে এই লেখার পরিচর্যা করতে চাই। এর আগে তুমি আর আমি মিলে যতটা যত্ন করেছি; তারচেয়ে বেশী যত্ন দিতে চাই এই লেখাকে। এটি হবে ইংরেজিতে। তোমার সাহায্য ছাড়া আমার ইংরেজিতে লেখা কীভাবে সম্ভব?

প্রফেট তার ইংরেজিতে লেখা তৃতীয় গ্রন্থ। এর আগে প্রকাশিত হয়েছে মেডম্যান ও ফোররানার। তৃতীয় গ্রন্থে এসেও কাটেনি সংকোচ। মুক্তি মেলেনি ভিন্নভাষায় লেখার মানসিক চাপ থেকে। প্রফেট লেখার সময়ও সতর্ক থেকেছেন যে একটি বিদেশী ভাষায় লিখছেন। জিবরানের মাতৃভাষা আরবি। প্রথমদিকের বইগুলোও লেখা হয়েছে আরবিতে। আমেরিকায় এসে বারো বছর বয়সে ভর্তি হয়েছেন স্কুলে। সেখানে প্রথম শিখেছেন ইংরেজি বর্ণমালা। অভিবাসীদের স্কুলে চার বছরের পড়াশোনাই তাঁর ইংরেজি শেখার ভিত তৈরি করেছে। পরের চারবছর লেবাননের পড়াশুনো মূলত আরবি ভাষায়। বোস্টনে আসার প্রথম চারবছরেই মূলত শিখেছেন ইংরেজি ভাষা। ইংরেজিকে কখনও নিজের ভাষা মনে হয় নি। ইংরেজিতে লেখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই এই ভাষা নিয়ে অস্বস্তি, ভয় ছিল মনে।

ক’বছর আগে মেরি তাকে পড়তে দেন এরিস্টিক পেটরিডের কবিতার বই। লাইটস অব ডন। পড়তে গিয়ে মনে প্রশ্ন ওঠে- কোনও কবির পক্ষে কি সফলভাবে দ্বিতীয় ভাষায় লেখা সম্ভব? জিবরানের মনে হয় ইংরেজিতে ভালো কবিতা লিখতে পারবেন না। যদিও চেষ্টা চলছে। প্রফেট লেখার সময়েও কাটেনি ভয় ও সংকোচ। আমেরিকান বন্ধু মেরির কাছে জানতে চান-

আমার ইংরেজি কি আধুনিক? নাকি পুরোনো আমলের? ইংরেজি এখনও আমার কাছে বিদেশী ভাষf। এখনও আমি শুধু আরবিতেই চিন্তা করি। আমি ইংরেজি শিখেছি শেক্সপিয়ার, বাইবেল আর তোমার কাছে।

সংকোচ সারানোর চেষ্টা করেন মেরি। বন্ধুর ইংরেজির পাশে দাঁড়ান। বলেন, তার ইংরেজি সাবলীল। সহজ কাঠামো। ছোট ছোট বাক্য। বাইবেলের স্টাইলের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাইবেলের মুগ্ধ পাঠক জিবরান মেরির প্রশংসায় আস্বস্ত হন। মেরি  বলেন, আরবির মতো ইংরেজিও এক সৃষ্টিশীল ভাষা। মেরির মতে এটা তারও ভাষা। মেডম্যান ও ফোররানারের ধারাবাহিতকায় প্রফেটও লেখা হয় ইংরেজিতে। এই একমাস কোনও ছবি আঁকেননি। অন্য কোনও লেখায় হাত দেননি। শুধু থেকেছেন আল মোস্তফাকে নিয়ে। এখানে দিনরাত নির্বিঘ্নে লেখালেখির সুযোগকে কাজে লাগান। এখানেই শেষ করেন দুই তৃতীয়াংশ লেখা। মেসাচুসেটস এ মিসেস মেরি ট্যুডর গারলন্ডের ফার্ম হাউসের নির্জন কটেজে বসেই লেখেন সেই বড় ভাবনার লেখা, পরে যার নাম রাখা হয় প্রফেট।

 ফার্ম হাউস থেকে লেখা নিয়ে চলতে থাকে মেরির সঙ্গে পত্রালাপ।

প্রফেটে আল মোস্তাফার মাধ্যমে সবকিছু বলেছি। এখানে কবিতা লেখার চেষ্টা করছি না। চেষ্টা করছি ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে। শব্দের সুরটা সঠিক হওয়া চাই। যেন তারা নজর এড়িয়ে না যায়। যেন তারা ডুবে যায়। পানি যেমন কাপড়ের সঙ্গে মিশে যায়। ভাবনাও তেমনই। নিবন্ধিত হওয়া জরুরী। শব্দের আদালতে।

বড় সৃষ্টির জন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশ। ফার্ম হাউসে কাটানো চব্বিশদিনের অবসরে শেষ করেন প্রফেটের প্রথম পর্বের খসড়া। এই একমাস কেটেছে ছুটির আমেজে। মিসেস গারল্যান্ডের কটেজগুলো শিল্পী ও লেখক বন্ধুদের জন্য উন্মুক্ত। অবসরে তারা এখানে আসেন, ছবি আকেন লেখেন। এমন পরিবেশে কিছুদিন কাটানো এক দারুণ অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা তুলনা করা যায় ইতালির আন্দিয়াতিক সমুদ্রের উপকূলে বন্ধু রাজকুমারী মেরি ভন থার্ন হোয়েরলোহির পরিত্যক্ত প্রাসাদ ডুয়িনো দুর্গে বসে লেখা ডুয়িনো এলজির সঙ্গে। কিংবা সুইজারল্যান্ডে ধনী বন্ধুর পাথুরে বাড়িতে বসে ডুয়িনো এলজি শেষ করার সঙ্গে। আয়ারল্যান্ডের প্রত্যন্ত গ্রামে বেলিলি দূর্গে বসে ইয়েটসের লেখালেখির পরিবেশের কথাও আসতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে অবসর কাটানো অবকাশে সমুদ্রতীরের নির্জন বাড়িতে বসে এলিয়টের ওয়্যাস্টল্যান্ড শেষ করার কথাও মনে পড়ে যায়।

এই কটেজে জিবরান যেন রিলকের মতোই এক রাজকীয় অতিথি। রিলকে যেমন ইতালির ডুয়িনো দূর্গে শুরু করা দশটি এলিজি শেষ করেছেন সুইজারল্যান্ডের গ্রামে, শত দ্য মুজৎ নামের বাড়িতে; জিবরানও নিউইয়র্কে শুরু করা প্রফেটের অধিকাংশ শেষ করেছেন এখানে। ধনী, শিল্পবোদ্ধা নারীর আতিথেয়তায়। মন চাইলে লিখেছেন, ইচ্ছে হলে ঘোড়ায় চড়েছেন, গাড়ি চালিয়ে চলে গেছেন দূরে। বোন মারিয়ানাকে অতিথিশালার পরিবেশের খবর জানিয়ে লিখেন দুই পাউন্ড হালভাহ আর দু’শ সিগারেট পাঠাতে। মেরিকে লেখেন এই পরিবেশকে দারুণ উপভোগ করছেন।

এখানে একেবারে থেকে যেতে চাই। এখানে আমি পুরোপুরি স্বাধীন। এখানে থাকলে আরও ভালো কিছু লিখতে পারব। আঠারো মাস ধরে এই লেখাটা মাথায় ঘুরছে। যতবার লেখার চেষ্টা করেছি, মনে হয়েছে, এত বড় লেখার যোগ্য হয়ে উঠনি। গত ক’মাস ধরে লেখাটা বেড়ে উঠেছে মাথায়। এখনও পর্যন্ত ২৪টি অধ্যায় লেখা হয়েছে। আপাতত এটুকুই অর্জন।

একই চিঠিতে লেখার সারমর্ম বর্ণনা করেন।

সমতলভূমি আর সমুদ্রের মাঝে একটা শহর। সেখানে জাহাজের আসা যাওয়া। শহরের পেছনে সবুজ মাঠ। ঝাকে ঝাকে পশু চড়ে বেড়ায়। সেখানে থাকেন এক কবি ও নবী। এই জনপদ ও মানুষের জন্য যার মন মমতা ও উদ্বেগ। সে তাদের ভালোবাসে। তবুও এক একাকীত্ব। একটা দেয়াল, দূরত্ব। মানুষেরা তার কথা শুনতে ভালোবাসে। তাদের মনে তাকে নিয়ে মুগ্ধতা। তবুও তার কাছে আসার চেষ্টা নেই কারো। এমনকী সেই তরুণী, যে তার ভদ্রতা, ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট। সেও প্রেমে পড়েনি তার। ভালোবাসার চেষ্টা করেনি। একযুগ পর যখন সবাই তার শহরে থাকাটা মেনে নিয়েছে, যখন সে তাদের সন্তানদের সঙ্গে মাঠে কথা বলেছে।তখনও একটা সচতেনতা, মনে হয়েছে সবই সাময়িক।

একদিন নীল দিগন্ত থেকে এক জাহাজ এসে ভিড় করে তীরে। নির্জনবাসী সন্ন্যাসী কবির জন্য। এখন তার প্রস্থানের সময়। তাকে হারানোর অনুভূতি থেকে নগরবাসীর মনে হয়, সে তাদেরই একজন। দলবেধে সবাই নেমে আসে তীরে। তাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। একজন বলেন, আমাদের শিশু সম্পর্কে বলেন। বন্ধুত্ব সম্পর্কে বলেন। তিনি এসব নিয়ে বলতে থাকেন। সে তাদের যা বলে, আমি তাই লিখেছি। কথা শেষ হলে সে জাহাজে ওঠে। জাহাজ একসময় শূন্যে মিলিয়ে যায়।

১৯১৯ সালের ৯ নভেম্বর মিশরিয় কবিবন্ধু মে জিয়াদেকে লেখেন,

প্রফেট এমন একটি বই যা এক হাজার বছর ধরে লেখার কথা ভাবছি। কিন্তু গত বছরের আগ পর্যন্ত কাগজে কলমে কোনও অধ্যায় পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারিনি। প্রফেট নিয়ে কিইবা বলতে পারি তোমাকে? এটা আমার পুনর্জন্ম, আমার প্রথম বেপটিজম। এটা একমাত্র চিন্তা যা আমাকে রোদের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে। আমি লেখার আগেই প্রফেট আমাকে লিখেছে। আমি সৃষ্টি করার আগেই এই লেখা আমাকে সৃষ্টি করেছে।

১৯১৯ সালের নভেম্বরে পাণ্ডুলিপির নাম রাখেন ‘দি প্রফেট‘। বন্ধু মিখাইল নাইমির বিবেচনায় এই নামকরণ এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তার মনে হয়েছে প্রফেট নামটিতে একটা মর্যাদা আছে। একজন সাধারণ মানুষের মুখ দিয়ে এসব কথা বলানোর চেয়ে প্রফেটের উচ্চতায় থাকা একজন মানুষের কাছ থেকে আসার ফলে এসব কথার ওজন ও গুরুত্ব বেড়েছে। এভাবে প্রফেটের শ্রষ্ঠা জিবরান নবীত্বের মহত্বকেও বাড়িয়ে তুলেছেন। এখানে কবি হিসেবে এমন কিছু কথা বলেছেন যা আগে বলেননি।

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে মেরিকে দেখান প্রাথমিক পাণ্ডুলিপি। মেরি তার জার্নালে প্রফেটের যে বর্ণনা দেন তা মূল পাণ্ডুলিপির কাছাকাছি। প্রফেট গোছাতে প্রায় এগারোবছর লেগেছে। তবু মনে হয় খুব তাড়াহুড়া হয়ে গেছে। ১৯২০ সালে লেখা শেষ করার পর ভাবেন এবছরই ছাপা হবে বই। আরও এক বছর কেটে যায়। ১৯২১ সালের আগস্টে মেরিকে শোনান আল মোস্তাফার বিদায়ের পর্ব। এখন মনে হয় লেখাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। অস্বস্তি থেকে যোগ করেন আরওকিছু বিষয়। ১৯২২ সালের শুরুতে যোগ করেন আনন্দ অধ্যায়। এরপর যোগ হয় শিশুদের ওপর একটি অধ্যায়। মেরিকে জানান,

আরও একটি বিষয় যোগ করার কথা ভাবছি। এবার লিখব গ্রহণ নিয়ে। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বিষয় দেওয়ার থাকে। যা কেউ নিতে চাইবে না। আমার একটা বাড়ি থাকতে পারে। মানুষকে আমন্ত্রণ জানাতে পারি। মানুষ সেখানে আসবে, থাকবে, খাবে। তারা আমার চিন্তাকেও গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু আমাকে ভালোবাসবে না। ভালোবাসা হচ্ছে সেই ধন, যা অধিকাংশ মানুষ দিতে চায় অন্যকে। মানুষ প্রায়ই বলে যে নারীরা ভালোবাসা চায়। তারা আসলে আরও বেশীকিছু চায়। অনেক নারী সন্তান নিতে চায়। সন্তান লালন পালন করতে চায়। পুরুষকে তারা সন্তানের কাছে পৌঁছার চাবি মনে করে। সে তার জীবনেও নতুন মাত্রা যোগ করে।

এরকম ছোটখাট কিছু সংযোগের পর ১৯২৩ সালের এপ্রিলে মেরিকে পাঠান চুড়ান্ত পাণ্ডুলিপি। বেশকিছু জায়গায় সংশোধন করেন; বেশ কিছু পরামর্শ দেন মেরি। নোট লিখে পাঠান পাণ্ডুলিপির একপাশে। মেরির সম্পাদনায় সন্তুষ্ট কবি তাকে বলেন,

তোমার আশির্বাদের স্পর্শে প্রফেটের প্রতিটি পৃষ্ঠা প্রিয় মনে হচ্ছে। যতিচিহ্ন, যোগ হওয়া শব্দ, কিছু জায়গায় শব্দের পরিবর্তন অনেক অনুভূতিকেই বদলে দিয়েছে। এসব পরিবর্তন ও সম্পাদনা যথার্থ। যেসব বিষয় নিয়ে খুব ভেবেছি অথচ সমাধানে আসতে পারিনি তার নিস্পত্তি হয়েছে তোমার হাতে। যেমন ভালোবাসা, শিশু, দান, কাপড় অধ্যায়গুলোর পূনঃনির্মাণ। চেষ্টা করেছি নতুনভাবে, নতুন করে পড়তে। কখনও কখনও পড়তে গিয়ে আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকেছে।

প্রফেটের পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করা মেরির জীবনের অনন্য অভিজ্ঞতা যে বইটি পরে নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিক্রী হয়েছে; পৃথিবীর তৃতীয় সেরা বই হিসেবে বিক্রী হয়েছে সেই প্রফেটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যুক্ত থেকেছেন। এই লেখার কাঠামো নির্মাণ থেকে নানা সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তনের একমাত্র সাক্ষী মেরি। প্রফেটে কাঁচি চালাতে গিয়ে যে মমতা, সংবেদনশীলতা দেখিয়েছেন, সম্পাদনায় যতটা সতর্ক থেকেছেন তা তিনি ভাগ করে নিয়েছেন পাঠকের সঙ্গে। জিবরানের ওপর আস্থা ছিল তার, বিশ্বাস ছিল এই বই হবে সাহিত্যের ইতিহাসের মাইলফলক, এক কালজয়ী সৃষ্টি। প্রফেট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাকেও উপভোগ করেছেন।

পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসার পর আমরা প্রথমে বাক্যগুলোকে সংক্ষিপ্ত করেছি। বিষয়গুলো জোড়া লাগাতে চেষ্টা করেছি। কখনও কখনও আরও বিকাশের জন্য কিছু বিষয় রেখে দিয়েছি। পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমাদের খুব সুন্দর সময় কেটেছে। কহলীলের সঙ্গে যোকোনও বিষয় নিয়ে কথা বলা যায়। লেখা নিয়ে তার কোনও অহংকার নেই। সে শুধু লিখতে পছন্দ করে। লিখে যায় যতক্ষণ পর্যন্ত না তার কথাটা সে বলে শেষ করতে পারে। এর আগে কোনও ইংরেজি বইয়ের ওপর সে এত ধারাবাহিকভাবে, নিয়ন্ত্রিতভাবে কাজ করেনি। এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমরা আলাদাভাবে কাজ করেছি। সাধারণত কোনও লেখা শেষ করার পর সে আমাকে পড়তে দেয়। কিন্তু প্রফেটের প্রথম অংশ লেখার পরই পড়তে দিয়েছে। লেখার কাঠামো দাড় করাতে, সংশোধনে যত সময় লেগেছে তারচেয়ে দ্রুততম সময়ে সে শেষ অংশটুকু লিখতে পেরেছে। আমাদের কাজ করার পদ্ধতিটা এমন যে, কহলীল জোরে জোরে পড়ে শুনিয়েছে। এরপর আমরা দুজনে একসঙ্গে লেখাটা দেখেছি। এরপর যদি কোনও প্রশ্ন উঠেছে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত থামিনি। সে আমাদের যে কারো চেয়ে ভালো ইংরেজি জানে। সে এই ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে। এই ভাষার কাঠামো সম্পর্কে সে সচেতন। সে নতুন ইংরেজি তৈরী করতে জানে। এই ভাষার কাঠামো নিয়ে এই সচেতনতা মৌলিক।

অনেক প্রস্তুতি, পরিমার্জনের পর ১৯২৩ সালে ছাপাখানায় যায় পাণ্ডুলিপি। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ছাপা হয় প্রফেট। ছাপাখানা থেকে আসা কালো প্রচ্ছদের বইয়ের প্রথম কপি পাঠান মেরিকে। মেরি বুঝতে পারেন এটা হবে সার্বজনীন এক বই। জিবরানের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখন একটা পরিণতিতে পৌঁছেছে যা আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রফেট নিয়ে যে ভবিষ্যৎবাণী করেন মেরি, পরে তাই সত্য হয়। প্রকাশের পরে যারা বইটি পড়ে প্রভাবিত হয়েছেন, সেই লক্ষাধিক পাঠকের আবেগের নিখুঁত পূর্বাভাস দুই অক্টোবর লেখা মেরির উচ্ছসিত চিঠি।

ভালোবাসার কহলীল, প্রফেট হাতে পেয়েছি আজ। যতটা ভেবেছি, তার চেয়ে বেশী প্রত্যাশা পুরণ করেছে এই বই। আমার মনে নতুন আশা ও স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, সারা পৃথিবীতে সারা ফেলবে প্রফেট। বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দু থেকে পড়েছি আবার। বাক্যের ধারনা এবং প্রবাহ চমৎকার। চিত্রকল্পগুলো আমার চোখে নতুন দৃশ্য নির্মাণ করেছে। সবকিছু যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তোমার বর্ণনা  খুব সুন্দর। স্টাইলসহ এই বইয়ের সবকিছু পছন্দ হয়েছে আমার। সবচেয়ে সুন্দর এর ভাষা। জীবনের কাছাকাছি। একদিন এই বই ইংরেজি সাহিত্যের সম্পদ বলে বিবেচিত হবে। আমাদের অন্ধকারে আমরা এর মাঝে আবারো খুঁজে পাব আমাদের। খুঁজে পাব স্বর্গ এবং পৃথিবী, আমাদের মাঝেই। এটা হবে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভালোবাসার বই। কারণ তুমি হচ্ছ শ্রেষ্ঠ প্রেমিক। যার কলম থেকে এই বইয়ের সৃষ্টি। প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠক এই বইয়ে তাই খুঁজে পাবে যা তারা পেতে চায়।  মানুষ যত পরিণত হবে ততই এই বইকে ভালোবাসবে।

 

সম্পাদনা: শাহানাজ ইয়াসমিন

জাহানারা পারভীন। কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম ৩০ মে ১৯৭৫, বাংলাদেশ। পেশাগত জীবনে তিনি একজন সাংবাদিক, লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রথমসারির অসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত বই: 'নোঙরের গল্প বাচাচ্ছি' (২০০২...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ