এ মিথ্যার আবরণ

প্রশান্ত গুহ মজুমদার
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
এ মিথ্যার আবরণ

…কিছু কিছু বিষয় থেকেই যায়। অমীমাংসিত, অনিরূপিত। সে সব নিয়েই কেবল…

কবিতা কেন পড়ি? কবিতা কেন লিখি?

প্রশ্নটাতো সহজ ছিল, উত্তরও তো জানা।

“কবিতা কেন পড়ি”- এই শব্দ তিনটির পরে বিষ্ময় বা প্রশ্নবোধক, যে কোন চিহ্নই ভাবা যেতে পারে। উদ্দেশ্য বিধেয় জানা তখন জরুরী হয়ে ওঠে।

আপাতত সোজাসুজি নেওয়া যাক। পরিচিত প্রক্রিয়ায় সঙ্গম হোক। সে ক্ষেত্রে উত্তর হচ্ছে, অন্য কিছু নিতে পারি না, তাই কবিতা পড়ি। ভালো লাগে, তাই পড়ি।

তারপর, কবিতা কেন লিখি?

এর জবাবে, যা প্রায় জবাবদিহি, অন্য কিছু পারি না, বুঝি না জন্ম বা মৃত্যুকে সরাসরি, মৃত্যুযন্ত্রনাকে, তাই কবিতার মতো কিছু মাধ্যম করি, খেলা করি অলীকে।

কিন্তু সত্যিই কি তাই?

এত সহজ ছিল এই দীর্ঘ সময়!

যে বিচিত্র বিবিধ রকম বেঁচে থাকা, বোধ, অপ্রতিবিধেয় ঘটনা ছিন্নভিন্ন করে দিলো এ যাবত শ্বাসপ্রশ্বাসের দিনগুলো, রাতগুলো, নিছক সত্যি বলার ছলে, আজ সত্যের নামাবলী শরীরে জড়িয়ে মিটিয়ে দেবো, মুছে দেবো সব কথা! তার থেকে সত্যভাষণের মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেব নিজেকে। সত্যের ছলে মিথ্যাই বলব। আদ্যোপান্ত যে মিথ্যার ভার নিয়ে এতদিন মুখোশ খুলেছি, পরেছি নতুন বারবার, হত্যা করেছি, হত হয়েছি, মৃত্যুকে চেখেছি অথবা মৃত্যুই রহস্যের সাজে বারবার,  সে মিথ্যা একবার অন্তত সাদাকালোয় সত্যির মত কিছু হয়ে উঠুক।

তা হলে শুরু করা যাক। জীবনের কথা যখন, ব্যক্তিগত কথাও কিছু হোক।

ঠিক কী ভাবে রহস্যের, বিপন্নতার, তাচ্ছিল্যের, উপহাসের, বিচ্ছিন্নতার, আতঙ্কের হিসহিসে বাতাস বইতে শুরু হয়েছিল চারপাশে, কবে থেকে সে নির্যাতন? অথচ অসামাজিক, অতি অল্প পাঠ, ধীশক্তি আরো কম, স্মৃতি দুর্বল। আয়ুধ কিছু নেই। এমন পরিসরে রাত্রি যত এসেছে, সময় আমার চারপাশে বুনেছে রহস্য, উপহাস, তাচ্ছিল্যের অশেষ ধূধূ। নানান রহস্য, অবজ্ঞার প্রতুলতার অবিদ্যমানতা ঘটে নি কখনো জীবনে। ক্রমে বোধগম্য হয়, এই জন্ম তো একটাই। সুতরাং ক্রমে কবিতার দিকে। নানান কিসিমের। আক্রান্ত এক মানুষের যাওয়া।

আর বোঝার জন্য তো কবিতা পড়ি নি কোন দিন। একজন আর্ত মানুষ। সে ভাবেই কবিতায় যাই। কবিতা না পড়লে, নতুনের আনন্দ থেকে দূরে থাকলে, প্রতিবন্ধী হয়ে যাব, অন্ধ হয়ে যাব, এই শঙ্কা ক্রমে ভিতরে চাড়িয়ে যায়। ভাল কবিতা, খারাপ কবিতা বুঝি না আমি। উচ্চারণসমূহ অনুসরণ করি। বাক্‌রীতিকে অনুসরণ করি। নতুবা স্বাদ গন্ধ রূপ, সব কিছুই যে অধরা থেকে যাবে! শরীর, ধী, যেটুকু এখনো রয়েছে, শূন্য হয়ে যাবে। থাকা না-থাকা সমান তখন। জেনেছি, সাবজেক্ট আর অবজেক্ট একটু দূরত্বে থাকলে খোলতাই হয়। জানা হত, লেখার মধ্যে থাকতে গেলে প্রবল ভালোবাসায় আর্ত মানুষের মত জড়িয়ে থাকতে হয়? তো আমি আর পারি না। তার কাঁধেই মাথা রাখি। কোথায়, কখন, কি ভাবে, কাকে, সে সম্মত করুক আমার ব্যায়াম, আমার পাঠ। এমন সমর্পন না হলে কী জানা হত, মুক্তির সামনে দাঁড়াতে পারলেই সুন্দর প্রত্যক্ষ হয়? জানা হতো, দুটো ডানা আমার কত প্রয়োজন? স্বাধীনতা কী, জানা হত? সাধারণ যাপনে তো প্রতি পলে শৃঙ্খল, নিয়ত পরাধীন। সেখানে বহিরঙ্গের জীবন বিমৃশ্যকার সহ্য করবে না। কিন্তু কবিতায় সে বিমূর্ত স্বাধীনতার আলো দেখতে চাই। সে সুন্দর। এই দুরবগাহ সুন্দরের অপেক্ষাতেই তো আছি এতদিন। যদিও আজো তার ঘুঙুরের শব্দ শুনেই শ্বাস ফেলি। জানালাদরজা খুলে দিই। যদি সে আসে!

তাহলে এই প্রায় সাতষট্টির শেষে এসে সমাধানটা কী হল! সহজে বলতে গেলে, উপহাস, তাচ্ছিল্য, করুণা প্লাস নানাবিধ বই প্লাস রহস্য প্লাস অশ্রু-তে আমার চারপাশে ক্রমে এক বিচিত্র বলয় এবং এরা-ই আমাকে প্ররোচিত করেছিল কিছু শব্দ নির্মানের দিকে। কবিতা নামীয় কিছু রচনার দিকে।

লোকধর্মপ্রসূত তাচ্ছিল্য, অপমানকথা, নানাবিধ গরিবীপনার কথা, মানুষের ভেঙে যাওয়ার শব্দ, সামাজিক ভূগোলের ছায়াগুলো আমাকে আর আড়াল দিতে পারে না। শব্দে শব্দে, কাব্যরীতির মধ্যে, নানান বাক্‌রীতির মধ্যে, নানান ঘটে যাওয়া কাব্য আন্দোলনের তুলকালামের মধ্যে তাবৎ তুচ্ছতাকে সরিয়ে এক পলায়নপর অস্তিত্ত্ব নিয়ে নিজস্ব অন্ধকারে, নতুনতর রহস্যে প্রবেশ তখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এক নিজস্ব বেলুনের মধ্যে, বহু সময় অতিক্রান্ত হলে, অতএব আমি আশ্রয় পাই। জন্মান্তর ঘটে।

এমন প্রাপ্তির শুরু মোটামুটি ১৯৭১-৭২য়। ভাঙাচোরা, অসম্পূর্ণ, ক্যাওটিক, নোনাধরা। ফলত ক্লান্তি আর লজ্জ্বা। আদ্যন্ত পরাজয়ের শেষে যেমন অনুভূতি হয়। এই যে জায়মান আবহে নানাবিধ হিংস্রতা, লোভ, পতন, আগ্রাসন, রাষ্ট্রীয় তঞ্চকতা, ব্যক্তি বা গণহত্যা, এ সবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সামান্যতম প্রতিরোধ তুলতে পারি নি তো! কোন প্রকরণেই বলতে পারি নি তো, বন্ধ করো পতনের এই ভয়াবহ সিঁড়ি! কেবল এক খোঁড়া মানসিক প্রতিবন্ধী মানুষের মত শব্দে শব্দে, গদ্যে কবিতায় এক অলীক স্বাধীনতার, এক অন্য খেলার সাধনা করি। ভিন্ন রঙের। অন্য খেলার। নিস্পৃহ, জয় অথবা পরাজয় নিরপেক্ষ। এগিয়ে, পিছিয়ে, লাফ দিয়ে, অবশ্যই মুখোশ পরে, পাল্টে, লম্বা করে অথবা সময় নিয়ে। ছায়াও তদ্রুপ। চাল দেওয়ার অন্তরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই, এ সব কি কেবল আবেগসঞ্জাত? মস্তিষ্ক আর জায়মান সময় প্রসূত? স্মৃতি কন্ডুয়ন? জানি না। তাবৎ বর্গকেই প্রশ্ন করি, আশ্রয় হবে? তোমার তো সত্য বলার দায় নেই। আমি তো এখানে আমার মত করে আশ্রয় নির্মান করে নিতে পারি! চূড়ান্ত একাকীত্ববোধে জারিত আমি, এ খেলা তোমার কাছে হতেই পারে আশ্রয়, অন্তত আমার তো তেমনই প্রতীতি হয়েছে।

এবং ইতিহাস, সমাজচেতনা, প্রকৃতি, অভিজ্ঞতা, এ যাবত পাঠ -কোনটাই সে খেলায় নেই, এ অসত্য। সবই রয়েছে, এও অংশত মিথ্যা। অবচেতনের? তাও তো নয় সম্পূর্নত! ঋণ যদি কিছু থেকে থাকে, তা এই বিপন্ন যাপনের কাছে, জন্মের কাছে, এ যাবত দেখাশোনা ভাষা, ইতিহাস, সামাজিক ভুল, বর্ণময় প্রকৃতি, মানুষের কাছে। কতভাবেই না আমার সে গোপনযাত্রায় পুষ্টি যুগিয়েছে এরা, আলো জ্বেলেছে অন্ধকারের! হ্যাঁ, অন্ধকারের আলোই জ্বেলেছে তাঁরা প্রতিটি স্খলনের পূর্বমুহূর্তে, মৃত্যুর ভাবন ধরিয়ে। যৌনতাকে আশ্রয় করেছি। নানান প্রকরণে। প্রাপ্তি অনেক। ক্ষত, ভন্ডামি, একাকীত্বের অন্য আরো এক অন্ধকার।

আর রহস্যময়তা রয়েছে আদ্যোপান্ত শব্দের মধ্যে, নির্মাণে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে। স্বাভাবিক যাপনে যখন কোন পরিত্রাণ নেই, এই রহস্য আশ্রয় দিল। বহিরঙ্গের বেঁচে থাকায় বহু ঘটনা আমূল নাড়িয়ে দিয়েছে আমাকে, অথচ তার প্রভাব তাৎক্ষণিক আসে নি আমার খেলায়। যেহেতু সে ভয়াবহ ঘটনাসব ইত্যাদিতে রহস্য ছিল না। আমি দেখেছি। বহু পরে সে সব স্মৃতি আমাকে নিয়েছে প্রগাঢ় রহস্য অভিমুখে। এক বিচিত্র বাস্তবতায়। এতে সমাজ, রাষ্ট্রের কোন উপকার হয় নি। হয় না। কিন্তু সুতোর অন্তর্লীন অসত্যের, সুতোর সন্ধান সে আমাকে দিয়েছে। আমিও সে নির্মানে অনেক ভাঁজ রেখেছি। চিলের কান্না। ফাঁক। ভাবি নি প্রিয় পাঠকের কথা, তবু ভালোবাসার পাঠক কবিতার সেই সব শূন্যতায় হয়ত খুঁজে পেয়ে যান অনেক কিছু। নিজের মতো। ঐ টুকুই। আর কি-ই বা আছে বলার আমার এই মিথ্যে মিথ্যে খেলার মধ্যে, কবিতা লেখার হেতু নিয়ে!

শুধু মনে আসে,

“When I count, there are only you and I together
But when I look ahead…
There is always another one walking beside you,”

প্রশান্ত গুহ মজুমদার। কবি। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতা। প্রকাশিত বই:

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..