ওগো দুখজাগানিয়া 

শ্বেতা সরকার
ছোটগল্প
Bengali
ওগো দুখজাগানিয়া 

ওগো দুখজাগানিয়া 

“গতকালই তো মাসের বাজার আনলাম, আবার কি দরকার আছে বাজারে যাওয়ার?”

রূক্ষ মেজাজে বললো অনিল।

অনিলের প্রশ্ন গুলোকে যথাসম্ভব পাশ কাটিয়ে কোনরকমে একটা জামা গলিয়ে বাড়ির বাইরে এলো তৃষা। উফ্, সারাক্ষণ ঘরের কাজ আর বাচ্চা সামলাতে সামলাতে হাঁফিয়ে ওঠে সে। তার ওপর অনিলের চড়া মেজাজ। বাইরে বেরিয়ে খোলা হাওয়ায় জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিলো সে।সাধারণ একটা বেণী করে বেরিয়েছে। একটু যে সাজবে তার উপায় নেই। সাজলে তো আবার বাজারে যাবার জন্য এত সাজ কিসের তাই নিয়ে অনিলের গবেষণা শুরু হয়ে যাবে। মিনিট পনেরোর মধ্যেই ক্যাফের সামনে এসে পৌঁছালো তৃষা। ঘড়িতে সাড়ে ছটা। চুপ করে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। ল্যাম্পপোস্টের আলো গুলো জ্বলে উঠেছে।সন্ধ্যার আঁধারে গাড়ির হেডলাইটের দ্রুত চলাচল।কিছুক্ষণ পর ঘড়ি দেখে তৃষা। পনেরো মিনিট লেট।ঋক আসতে দেরী করছে। মন খারাপ হলেও কিছু করার নেই। অফিস থেকে ফিরলেই পুঁচকে ছানা ঋকের কোলে চড়ে বসে থাকে।সেটাই স্বাভাবিক। তাকে সামলিয়ে পাশ কাটিয়ে আসতে ঋকের একটু সময় তো লাগবেই।

“বলুন ম্যাডাম, কি কি অভিযোগ আছে।”

চেয়ারে বসতে বসতে বলে ঋক।

“থাক, এসব বলে কাজ নেই, দেড়মাস পর সময় হল ওনার। কি সেলেব মানুষ রে বাবা। ”

অভিমানী দৃষ্টি হানে তৃষা।

ঋক তার উদাস বৈরাগী ভাবখানা চেহারায় এনে বলে, “যা পাখি উড়িয়ে দিলাম তোকে ”

“আর পাখি যদি উড়িতে না চায়, তাহলে কি করিবেন মহাশয়? ”

কথার পিঠে কথা জোড়ে তৃষা।

“পাখি তো উড়বেই, তাকে কি বাঁধা যায়? ”

আড়চোখে তাকায় ঋক।

“যায় যায়”

চোখ উলটে বলে তৃষা।

“কত পাখি ওড়ে না, বোঝ নাকি সে সব? ”

কপট রাগে বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকে তৃষা।

আহা এমন চাউনি দেখার জন্য দেড়মাস কেন, দেড় বছরও অপেক্ষা করা যায়।

“তাই বুঝি? ”

ঘন হয়ে এসে নিচু গলায় বলে ঋক।

মাত্র বছর দুয়েকের আলাপ দুজনের। সংসার আর পুঁচকে ছানা সামলে অভ্যস্ত দিনযাপনের ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে দুজনকেই। কিছু কমন ফ্রেণ্ডের সূত্র ধরে আলাপ তাদের। আলাপ হওয়ার পর ঋক আর তৃষা ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যেকার কমন বিষয় গুলো বেশ বুঝতে পারে। গান গল্প কবিতা ফটোগ্রাফী আরও নানা বিষয়ে যে একশোর মধ্যে আশি ভাগই মেলে তাদের তা তারা বেশ বুঝতে পারে। ফলে দেখা সাক্ষাত ও বন্ধুত্ব দুইই গভীর হতে থাকে। তারা পরস্পর পরস্পরের কাছে দক্ষিণের খোলা বারান্দা তা অনুভব করে দুজনেই। অভ্যস্ত দিনযাপনের একঘেয়েমি কাটিয়ে চুরি করা কিছু মুহূর্তে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয় তারা। ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের গভীরতা আঙুল ছুঁয়ে শক্ত হাতের বাঁধনে বাঁধা পড়ে। সারাদিন অফিসের ক্লান্তি আর বাড়ি ফিরে পুঁচকে ছানার দুষ্টুমি সামলে প্রায়ই সময় করে উঠতে পারেনা ঋক। দেখা করার দিন পিছোতে থাকে, পিছোতেই থাকে। তৃষার কপট অভিমানী স্বর গাঢ় হতে থাকে। কপট অভিমান কারণ তৃষা জানে অভিমান করে লাভ নেই। সমাজ নিয়ন্ত্রিত গণ্ডী ডিঙোতে গেলে অপেক্ষার ধৈর্য্য ধরতেই হয়।

সন্ধ্যার রঙ মেখে মায়াবী আলো জ্বলে ওঠে ক্যাফের ভিতরে। ঋকের হাতের মুঠোয় তৃষার হাত। কত কথা জমা থাকে ওদের। নতুন কোন বই পড়লো, কোন গান শুনলো, কখন মন খারাপ হয়েছিল, কখন কান্না পেয়েছিলো, কখন প্রেম পেয়েছিলো, আরও কতো কথা তার কোন শেষ নেই। কিভাবে যে ঘণ্টা খানেক সময় কেটে যায় তা বোঝাই যায়না।

“চলো তোমার তো সময় শেষ ”

ঘড়ি দেখে বলে ওঠে ঋক।

“সময়ের মধ্যে ঘরে না ঢুকলে তোমার বর তো আবার থানায় খবর দেবে। ”

“দিকগে, যা হবার হবে ”

মাথা নিচু করে বলে তৃষা।

“ধুর পাগলী, এই তো মাস খানেকের মধ্যে আবার সময় হয়ে যাবে, ওঠো, এখন এরম জেদ করেনা ”

ক্যাফে থেকে বেরোনোর হাত দুয়েক লম্বা একটা সরু প্যাসেজ। সেখানে এসে তৃষা নিজের মনে বকতে থাকে।

“মাসখানেক না ছাই, কত্তো কাজ তোমার, সেলেব বাবুর সময় কই ”

“কি বললে? ”

জানতে চায় ঋক।

তৃষা ঘুরে বলে, “বললাম, তুমি সেলি…. উমমমম…”

বাকি কথা থেমে যায় ঋকের ঠোঁটের ছোঁয়ায়। তৃষার মুখের লবঙ্গের গন্ধটায় প্রানভরে শ্বাস নেয় ঋক। প্যাসেজ পার হয়ে রাস্তায় নামে তারা। গোলাপী আলোর জাদু খেলা করছে তৃষার চোখে মুখে।

“সাবধানে যাবেন ম্যাডাম ”

বাইকে বসে বলে ওঠে ঋক।

“বুঝতে পারছি, আপনি আজ ভীষণ খুশি, আসলে আপনাকে নিয়ে কোন চিন্তা নেই আমার। ওই বেচারা বাসগুলোর যাতে ধাক্কা না লাগে তাই বললাম, একটু দেখে রাস্তা পার হবেন। ”

তৃষা মোটা বলে প্রায়ই টোন কাটে ঋক। তাই বলে বেচারা বাসগুলোর ধাক্কা লাগবে! মোক্ষম একখানা চিমটি পড়লো ঋকের কোমরে। গোলাপী আভায় মিশলো লালের ছোঁয়া।

“আহারে থাক থাক ? ”

চোখ পাকিয়ে বললো তৃষা।

রাস্তা পার হয়ে দ্রুত গলিতে ঢুকে গেলো তৃষা। হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁটের ওপর জিভ বোলালো সে। মনে হলো রাস্তায় নয়। ডানা মেলে বাতাসে ভেসে চলছে সে। এমন খোলা আকাশে বহুদিন ওড়েনি সে। উড়তে উড়তে প্রাণভরে ঠাণ্ডা বাতাস মেখে নিচ্ছিলো তৃষা। এমন তাজা বাতাসে বহুদিন শ্বাস নেয়নি সে।

তৃষা গলিতে ঢুকে যাবার পর ঋক বাড়ির রাস্তা ধরলো। তৃষার মোক্ষম চিমটি বেশ ব্যাথা করছে। কিন্তু হাত দিয়ে ঘসে ব্যাথাটা কমাতে ইচ্ছে করছেনা তার। কিছু ব্যাথা ভারী ভালো লাগে। গাড়ীর ভিড় কাটিয়ে ফাঁকা রাস্তায় এসে গুনগুন করে গান ধরলো ঋক, “তোমায় গান শোনাবো, ওগো দুখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাবো… “

শ্বেতা সরকার। জন্ম ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি। স্থান, বাবার কর্মস্থল টিকিয়াপাড়া রেল কোয়াটার, হাওড়া,বাংলা, ভারত। পাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে হাওড়া নরসিংহ কলেজ থেকে বায়ো-সায়েন্সে স্নাতক। ছোট বেলা থেকেই নাচ,গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফিতে ছিল শখ। বিবাহসূত্রে খড়্গপুরের বাসিন্দা। আঞ্চলিক...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..