কপোতাক্ষ

বদরুদ্দোজা শেখু
কবিতা
Bengali
কপোতাক্ষ

ইছামতী 

ইছামতী এখন দু’কূল ভাসাচ্ছে না আর
যখন তখন ‘গ্রাস করবো’ শাসাচ্ছে না আর,
বাড়িঘরদোর জমি-জিরেত হাঁস মুরগী গরু
সব হারাবার ভয়-ভ্রূকুটি ক্যামন্ মিহিন সরু
ফাঁসের মতো দুলতে থাকে বুকের মধ্যে মনে
সারা বছর সেই আতঙ্কের রক্ত- ক্ষরণে
ক্লিষ্ট আমরা হাড়ে চামড়ায় মরার মতো বাঁচি
এত কাল তো তাই বেঁচেছি মর্মে ম’রে আছি,
এখন নদী হাঁটু পারাবার গ্রীষ্মের সংকটে
পেরোতে গেলেই অনুপ্রবেশকারীর তকমা জোটে
কিংবা চোরা পাচারকারি, নিছক জালিয়াত ।
পেটের জ্বালা কেউ বুঝে না, ক্ষিদের লম্বা হাত
কতোটা কঠোর কতোটা পাষাণ, আমরা বুুঝি শুধু
ইছামতী এখন শুষ্ক , জীবিকা-মরুর ধুধু
হুহু বাতাস দুু’কূল জুড়েই –, ভাসান চাই ভাসান
তবেই হবে হা-হুতাশের এই কষ্টের আসান ।
এ বৈশাখে ‘মতীর বাঁকে আমরা চাতক পাখি
আমরা চাইনা চোরের তকমা জালিয়াতের ফাঁকি
আমরা সহজ সরল মানুষ মৎস্যজীবি ধীবর,
ইছামতীই আমাদের সব— স্থাবর অস্থাবর ।

কপোতাক্ষ

কেউ বললেন , কাছেই কপোতাক্ষ নদী ,
একবারটি দেখে যান । কথাটা
মনে ধরলো , পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম
দু’চারটে ফুসের ঘর চালাঘর ছাড়িয়ে
একদম খোদ নদীর তটেই এসে পড়লাম
জমিগুলো সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে নেমে চাক্ষুস
কপোতাক্ষর কোলে । হাঁটুজলে নেমে
চোখেমুখে হিমজল ছোঁয়ালাম , কুল্লি ক’রে
পরিতৃপ্ত , কুলুকুলু কাকচক্ষু জলরাশি
বহমান , শীতের সকাল । পাড়ে উঠে
কিছুক্ষণ দেখলাম ওপারের মাঠ
চ’রে বেড়ানো গরুছাগল, দূরের দৃশ্যপটে গ্রাম ।
ছিমছাম ছবির আবেশ
মনে ছেয়ে গেল ।

বছর কয়েক বাদে আবার ওখানে গেছি
কপোতাক্ষ দেখবো ব’লে , তার ধারেকাছে
পৌঁছবার উপায় হলো না , জমকালো লোহার
কাঁটাতার বেড়া উঠে দাঁড়িয়েছে অনধিগম্য
চৌহদ্দি বরাবর , চকে চকে
সশস্ত্র সীমান্ত বাহিনী পাহারা ।
মন বড়ো দ’মে গেল । মনঃক্ষুণ্ণ
দৈন্যতায় শূণ্যহাতে ফিরলাম ,
অশালীন কেউ যেন প্রিয় পুস্তকের
পড়বার পৃষ্ঠাটা দপ ক’রে উল্টে দিয়ে
গেল মরুঝড়ের দাপটে ।

কাঁটাতারের ফলাগুলো কষ্ট হ’য়ে ঘুরছে
মনের মধ্যে , বিদ্যেবুদ্ধি ধিকিধিকি পুড়ছে
তুষের আগুন, তরুণ-ভূমের করুণ কিংবদন্তী
দাহ্য দারুণ আত্মত্যাগের ইতিহাসের গ্রন্থি ,
ধ্বনি-প্রতিধ্বনির কান্না তোমরা কেউ শুনছো ?
খুন হচ্ছে মানবিকতা , কিম্ভুত প্রপঞ্চ
তৈরী হচ্ছে কূট-কচালির ভাগ-বাঁটোয়ারায় ,
সন্ত্রস্ত বিড়ম্বনার সীমান্তের পাহারায়
কতো নিষ্ঠুর অমানবিক অবিশ্বাসে ক্লিষ্ট !
কপোতাক্ষ, সাগরদাঁড়ি বিদেশ ? হা অদৃষ্ট !
আমরা কিছু বিদগ্ধজন সংস্কৃতির সন্তান
স্পর্ধা ধরি ভাঙতে বেড়ার বিপজ্জনক ব্যবধান । ।

বদরুদ্দোজা শেখু। কবি। জন্ম ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘিতে। অভাব অনটনের মধ্যে তাঁর বেড়ে উঠা। প্রথাগত শিক্ষায় স্নাতকোত্তর। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারী, নেশায় কবিতা লেখালিখি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: অলৌকিক আত্মঘাত, দুঃস্বপ্নের নগরে নিভৃত নগ্ন, শব্দ ভেঙে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

অহমিকা

অহমিকা

অহমিকা আত্মগরিমায় আজ অন্ধ হয়ে আছো, বিবেকের দংশনে মননে নেই বিশ্বাস। কর্মে ব্যস্ততা সময়ের আবর্তে…..