কবিতার খেলাধূলা

শৌভিক দত্ত
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
কবিতার খেলাধূলা

আত্মহত্যার প্রসঙ্গ উঠে এলে কবিতার কাছে আসতে হয়।এক ভুতগ্রস্ত মানুষের রাতজাগা। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসা জল। মাটি খসে পড়ার শব্দ।সময়ের সাঁতারে বসে থাকার চুপচাপ। যখন চরাচর বিষণ্ণ, ঝরে পড়ছে তালুর মতো নরম, মানুষ দৃশ্যহীন ও একা হতে থাকে।কবিতার শরীর তার উপশম।তার পরিশ্রুত হাস্পাতাল।কবিতা বস্তুত এক চির প্রবহমান স্রোত, সে জানে। অনেক জলধারায় সে স্রোত পুষ্ট।তল অতলে থাকা চোরাবালি তাকে আকর্ষণ করে।সে ভাসতে চায়, ডুবতে চায়। এছাড়া তার কোনও বিকল্প থাকে না।কবিতা তার কাছে নতুন রক্তের মত। কবিতা তার কাছে চুম্বক।

জীবনে চলার পথে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রেক্ষাপট মানুষকে একটা নির্দিষ্ট সিলেবাস অনুসরণ করার অভ্যাস এনে দেয়। তার অনুসারী হতে বাধ্য হয় মানুষ। ব্যক্তি মানুষের বিপন্নতা এইভাবে বেড়ে ওঠে। অঙ্কের ওঠানামায় দুলতে থাকে জীবন। জীবনের যে কোনও পর্যায়ে ব্যক্তি সেই যান্ত্রিকতা থেকে বেড়িয়ে আসার ছক খোঁজে।কিন্ত ততদিনে তার ডানা খসে গিয়েছে। পালকের নির্ভার অবয়ব তার আর মনে পড়ে না। এই বিপন্ন মুহূর্তে কবিতা তাকে দুদণ্ড আশ্রয় দেয়। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তাকে ফিরতে সাহায্য করে নিজের কাছে, নিজস্ব ছায়ার কাছে।

প্রত্যেক মানুষের জীবনে যেমন ভালোলাগার মুহূর্ত থাকে, ঠিক সেভাবেই যন্ত্রণাবিদ্ধ হওয়ার মুহুর্তও কম নয়। একজন পাঠক যখন কবিতার কাছে দাঁড়ায়, তখন কবিতা বা কবির কাছে স্বাভাবিকভাবেই তার প্রত্যাশা থাকে। সে নিজেকে কবিতার সাথে relate করতে পছন্দ করে এবং একজন নিবিষ্ট পাঠক সাধারণত কবিতার কাছে তা পেয়েও থাকে। অনেক সময় এমনও হতে পারে,relate করতে না পারলেও কবিতা পাঠের পর একটা ভালোলাগার রেশ তার মধ্যে থেকেই যায়। চেতনায় এক ব্যাখ্যাতীত অনুভূতির ঘোর লেগে থাকে।

একটু ব্যক্তিগত কথায় আসি। ‘কবিতা কেন পড়ি’ এই বিষয়ে বলতে গেলে প্রথমেই যা মনে আসে তা হল, কবিতা পড়ি কবিতা লিখব বলে। ফলে পাখিদের যেমন তেষ্টা মেটাতে জলের কাছে আসতে হয়, আমিও সেরকম আঁজলা ভরে পান করি কবিতার জল। ব্যক্তিজীবনে যখন খুব ক্লান্ত লাগে, শিরায় শিরায় জমে ওঠে অবসাদ, সেই আবহে কবিতার সান্নিধ্য শান্ত রাখতে সহায়ক হয় মনকে। একসময় ছাত্র ছিলাম যখন, সিলেবাসের অংশ হিসেবে বাধ্যতামুলক কবিতা পড়তে হতো। পরবর্তীতেও ছাত্র হিসেবে নতজানু থাকি কবিতার শিক্ষার্থী হিসেবে পূর্বসূরি ও সমসাময়িক কবিদের কবিতার আলোবাতাসে শ্বাস নিই, নিই বেঁচে থাকার রসদ। আমার পরবর্তী তরুন কবিরা আসাধারন কবিতা লিখছে। সমৃদ্ধ হই, মুগ্ধতা রাখি তাদের লেখায়।

কবিতা কেন লিখি

‘কবিতা কেন লিখি’ এই বিষয়টার উত্তর এক কথায় বলা মুশকিল। অনেক কার্যকারণের উপর তা নির্ভর করে। কলেজ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অপ্রত্যাশিতভাবেই লিখতে শুরু করি, তেমন কোনও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই। সত্যি বলতে কি সে সময় এ নিয়ে ভাবিই নি। লিখে ওঠার আনন্দ লিখিয়ে নিত আমায় দিয়ে। তবে এখন ভাবতে বসলে মনে হয়, আমার চেতন ও অবচেতন জুড়ে নিরন্তর যে শব্দপিয়নের চলাছল, চেতনার অংশীভূত যে সব দৃশ্য ও ছায়ারা আমার ঘরের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ে, চিঠি ফেলে যায়, বিপন্ন করে, আমায় বাধ্য করে দরজা খুলে দিতে, কবিতার মাধ্যমে তাদের প্রকাশ করা ছাড়া মনে হয়, অন্য উপায় ছিল না আমার।

কবিতা সত্যিই লিখে ওঠা যায় কিনা, এ বিষয়ে সন্দেহ আছে আমার। শ্রদ্ধেয় কবি বারীন ঘোষাল আমাদের সবার প্রিয় বারীনদা বলতেন, আমরা যা লিখি, তা আসলে কবিতা নয় কবিতালিপি। কবিতার জন্ম হয় চেতনার গভীরে। জন্মমুহুর্তে সে নিরাকার। যে মুহুর্তে সে কলমে শব্দ হয়ে আকার নিচ্ছে, সেই দুই মুহুর্ত এক নয়। ফলে লেখা কেবলমাত্র কবিতার আংশিক প্রতিফলন হয়ে থেকে যায়।

আমার নিজের মনে হয়, কবিতা একটা খেলা। খেলা থেকে লেখা হয়ে ওঠা তার কাজ। এই খেলাটা খেলতে ভালোবাসি খুব। ফুটবলে যেমন কোচ, নিজেকে সেই কোচের ভূমিকায় রাখতে ভালোবাসি। ফুটবলে যেমন কোচ নির্দিষ্ট করেন তাঁর দল কোন ছকে খেলবে। খেলোয়াড়দের পজিশন কি হবে, কতোটা দৌড়বে, উঠবে, আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী নামবে, তা ঠিক করেন কোচই। ঠিক সেরকম একজন কবিকেও লেখার সময় সেই পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। শব্দেরা তাঁর প্লেয়ার। বিভিন্ন ফর্মেশনে তাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলানোর চেষ্টা করেন। আবার ফুটবলে যেমন খেলা চলাকালীন প্রয়োজনে ফর্মেশন বদলে ফেলেন কোচ, কবিও তেমনি লেখার প্রয়োজনে আঙ্গিকে বদল আনেন। তবে লেখার মজা এটাই যে খেলার মতো তার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। কবি সৃষ্টির আনন্দে ডুবে যান।

আমার কবিতা লেখার চেষ্টা মূলত এই সৃষ্টির আনন্দের এক ক্ষুদ্রতম অংশ হওয়ার তাগিদে। যখন মা তাঁর গর্ভস্থ শিশুর জন্ম দেন, সেই অলৌকিক ও অপার আনন্দের রহস্যময়তার এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের অনুভূতি খোঁজার চেষ্টা করি লিখে ওঠার পরবর্তী সময়ে। মনে হয় আনন্দের এই বিপুল আয়োজনে আমারও হয়তো কিছু সামান্য অবদান থেকে গেল।

শৌভিক দত্ত। কবি ও ব্যাঙ্কার। জন্ম ১ মে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ, ভারতের আসামের শিলচরে; বর্তমান নিবাস কলকাতা। বাবার বদলী চাকরির সুত্রে দীর্ঘদিন মেঘালয়ের শিলং-এ বসবাস। পড়াশোনাও সেখানেই। নর্থ ইস্ট হিল ইউনিভার্সিটি থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতক করেছেন। বর্তমানে কলকাতায় ইউনিয়ন ব্যাঙ্কে কর্মরত। লেখালেখির...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ