কবিতার ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যতের কবিতা

তুষার গায়েন
প্রবন্ধ
Bengali
কবিতার ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যতের কবিতা

মাত্র দু’টি শব্দ দিয়ে নির্মিত একটি বিষয় যাকে বিভক্ত করেছে একটি চিহ্ন (,) আর জাগিয়ে তুলছে কবিতা নিয়ে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা–একই বিষয়ের অন্তর্লীন দু’টি ধারা হিসেবে যা সমান্তরালে প্রবাহিত। ‘কবিতার ভবিষ্যৎ’ শব্দবন্ধের ভিতর কী শুধুই কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের জানার সরল আগ্রহ নিহিত নাকি এর ভিতরে আমাদের উদ্বেগকেও সনাক্ত করা যায়? কারণ আমরা একথা সচরাচর শুনতে পাই যে আজকালকার কবিতা কেউ পড়ে না, এর কোনো ভবিষ্যৎ নাই। আসলে কী তাই? কবিতা কী এবং কবিতার ভবিষ্যৎ কী, এই জিজ্ঞাসার সন্ধান করতে পারলে ‘ভবিষ্যতের কবিতা’ কেমন হবে, তার রূপরেখাও নির্ধারণ করা সম্ভব হবে, আশা করা যায়।

“দৃশ্যমান জগত ও সংবেদনার থেকে উৎসারিত আলো ও তরঙ্গের কোনো চকিত মূহুর্তের অনুভবযোগ্য উচ্চারণ কবিতা। যে পৃথিবীতে আমরা আছি এবং যে সমগ্রতার মধ্যে রয়েছে এই পৃথিবী — তার মধ্যকার জড় ও প্রাণের সম্পর্ক; নিত্যদিনের ক্রিয়া, চিন্তা, গতি ও সংঘর্ষের নানা রূপ ও সংকেত অনবরত মানবিক সংবেদনায় এসে ধরা পড়ছে। কবি এক বিশেষ দশাগ্রস্থ সত্তা যে এই সংবেদনার রূপগ্রাহী ও বার্তাবাহী, ছন্দোময় শব্দবন্ধ ও চিত্রকল্পে যা তিনি প্রকাশ করেন। আর শব্দ যা কী না বিশেষ ধ্বনিপুঞ্জের সমাহার– সেই ধ্বনির আদিতম রুপ ‘ওঁ’(ওঙ্কার ধ্বনি) যার উদ্ভব হয়েছিল মহাবিশ্বের সৃষ্টিকালে, বিগ-ব্যাং বিস্ফোরণের সময় — ক্রমে ক্রমে তা বিশ্লিষ্ট হয়ে বহুধ্বনি এবং বহুধ্বনির সংশ্লেষণে বহু বিচিত্র শব্দের জন্ম দেয় যা ভূগোল, ইতিহাস ও কাল নিরপেক্ষ নয়। তাই বহুজাতি, বহুভাষা ও বহুবিধ কাব্যের সাথে আমাদের পরিচয়। আমরা যে ভূগোলে বাস করি তার প্রকৃতিলগ্ন জীবনের অভিপ্রকাশ যে ভাষা ও সংস্কৃতির জন্ম দেয় তা হাজার বছরের পথ-পরিক্রমায়, স্বপ্ন ও সংগ্রামের উত্তাপে এক বিশেষ রূপ ও চেতনা পরিবাহী। সতত প্রবহমান এই ভাষানদী ও তদ্ভব কাব্যনদী সমগ্র বিশ্বের চিন্তা, ভাব ও দর্শনের অভিঘাত গ্রহন করেও এক অর্ন্তলীন স্বকীয়তায় উজ্জ্বল ও বিকাশোন্মুখ।” [১] তাহলে কবিতার আলোচনায় ‘কাল’ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভূগোল অনিবার্য প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে হাজির হয় এবং বাংলা কবিতার পরিসরেই সেই আলোচনা নিবদ্ধ রাখতে চাই।

ভাষা বিকাশের আদি পর্যায়ে, মানুষের পারস্পারিক যোগাযোগের ভাষা ছিল ছন্দোবদ্ধ — কোনো জন্তুর পিছনে ধাবমান একদল শিকারী মানুষের কণ্ঠ উচ্চারিত ধ্বনিসমষ্টি, আধো-অন্ধকারে গোল হয়ে নৃত্যরত মানুষের আনন্দ প্রকাশের ভাষিক অভিব্যক্তি এবং বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান-সংস্কার-বিশ্বাস পালনের জন্য ব্যবহৃত যে ভাষা, তাতে অনিবার্যভাবে অনুসৃত হত ছন্দ। এভাবেই ধীরে ধীরে মন্ত্র, শ্লোক, কাব্য ও গানের উদ্ভব। তাই প্রারম্ভে কবিতার আবির্ভাব শ্রুতিশিল্প হিসেবে যা কবিরা সুর করে অথবা কণ্ঠস্বরে ওঠা-নামা করে মানুষের সামনে পরিবেশন করতেন এবং সেটাই স্মৃতি পরম্পরায় ছড়িয়ে যেত কালান্তরে। বহু কালের ঐতিহ্য হিসেবে এখনও গ্রাম বাংলায়, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবিয়ালরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবিতা রচনা করে উচ্চতর ভাব-দর্শন প্রকাশ করার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ এবং উপস্থিত আসরের দর্শক-স্রোতাদের মাত করে থাকেন। আদিম অরণ্যচারী, শিকারী এবং কৃষিভিত্তিক মানবসমাজে একজন কবি, কাব্যের রচয়িতা হিসেবে তার গোত্র বা কৌমের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উপস্থিত থাকতেন ; ফলে সেখানে কবিতার এক ধরণের যৌথসত্তা দারুণভাবে সক্রিয় থাকার অবকাশ ছিল যা পারস্পারিক যোগাযোগ ও রসাস্বাদনে কোনো বাধা সৃষ্টি করে নি। পরে পণ্যবাহী সমাজব্যবস্থার আবির্ভাব ও বিকাশের পাশাপাশি, ভাষার লেখ্যরূপের উদ্ভব ও বিবর্তনের পথ ধরে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী কাব্য এবং গদ্যভাষার চর্চা শুরু হয়। আগে মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্ব প্রকাশের ভাষিক মাধ্যম ছিল কবিতা — গল্প, কাহিনী, ইতিহাস, ন্যায়নীতি, দর্শন, পুরান, শাস্ত্রকথাসহ সবকিছু কাব্যাকারে প্রকাশিত হ’ত। প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ন, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি, গিলগামেশ, শাহনামা মূলত বিভিন্ন জাতির বহুকাল-সঞ্চিত জীবনধারার বর্ণনা। গদ্যভাষা বিকাশের সাথে সাথে কবিতার পরিধি সংকুচিত হতে থাকে, কারণ গল্প-কাহিনী-ইতিহাস-ন্যায়নীতি-দর্শন-পুরান-শাস্ত্র-বিজ্ঞানকে প্রাঞ্জলভাবে প্রকাশ করার জন্য গদ্যভাষা কবিতার থেকে বেশি কাযর্কর, সহজ এবং যোগাযোগ সক্ষম ; ফলে গদ্য সেই স্থান দখল করে। অথচ কবিতা তার অন্তরে জগত-সমগ্রকে ধারণ করতে চায় যা সে শত শত বছর ধরে করে এসেছে, ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাকে নতুন পন্থা অবলম্বন করতে হয় — যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভাষার সংক্ষিপ্তকরণ অর্থাৎ অনেক কথাকে অল্প দু’একটি পংক্তিতে প্রকাশ করার সক্ষমতা অর্জন ; সংকেত, ইঙ্গিতময়তা, চিত্রকল্পের ব্যবহার ও প্রকাশের নানাবিধ কৌশল আয়ত্ব করে এক পরাক্রান্ত ভাষা চৈতন্যের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করা যা পূর্বকালের মতো কবিতার যৌথসত্তার সাথে অচ্ছেদ্যবন্ধনে জড়িত নয় ; বরং ব্যক্তি-কবির সৃজনধর্মী-মননবিশ্বের উপর নির্ভরশীল। এভাবেই আধুনিক কাব্যের জন্ম — বিচিত্র, জটিল, অনির্দেশ্য ও বহুবিস্তারী যা বোঝা সব সময় অনায়াসসাধ্য নয়, পাঠকেরও প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। বলা বাহুল্য ভাষার সংক্ষিপ্তকরণ, সংকেত, ইঙ্গিতময়তা ইত্যাদি চিরকালই ক্ষেত্রবিশেষে কবিতায় ব্যবহৃত হয়ে এসেছে ; কিন্তু আধুনিক যুগের কবিতায় এগুলো তার প্রধান ভিত্তি যা উদ্ভাবনা এবং প্রয়োগে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও সংশয়াকুল।

মানব সৃষ্ট যে-কোনো কিছু — বস্তসম্পদ ( যা তার বাহ্যিক জীবনযাপনের সাথে জড়িত : খাদ্যসামগ্রী, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘরবাড়ি, যানবাহন, কাজের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, প্রতিদিনের ব্যবহার্য নানাবিধ উপকরণ, যোগাযোগের মাধ্যম ইত্যাদি) এবং ভাবসম্পদ ( যা তার মনোজগতের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সাথে জড়িত : গান, কবিতা, নৃত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি) বিবর্তনের মাধ্যমে এবং উৎকর্ষের আকাঙ্ক্ষায় পরিবর্তিত হতে থাকে, জটিলরূপ পরিগ্রহণ করে যা পরবর্তীতে সৃষ্টির আদি সারল্যে আর কোনোভাবেই পাওয়া সম্ভব হয় না। এভাবেই মানুষ নিজেকে অতিক্রম করে যায় এবং সৃষ্টির নব নব দিগন্ত উন্মোচিত হয়। বস্তু সম্পদ উপভোগ করার ক্ষেত্রে মানুষের বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না, মানুষের জানার প্রয়োজন পড়ে না কত শত বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন সেখানে যুক্ত হয়েছে ; শুধু তার ব্যবহারিক কৌশলটুকু জানলেই এর পরিষেবা ও আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব হয়। বাঁশ এবং ছন দিয়ে একটা বাড়ি তৈরী করার জন্য যে নির্মান কৌশল জানা প্রয়োজন হয় তা গ্রামীন জনপদের প্রায় সব মানুষই জানেন, হাজার হাজার বছর আগে উদ্ভাবিত সেই জ্ঞান প্রয়োগ করে আজও অনেক মানুষ সেই রকম ঘরে বাস করেন। সেই ঘরের বিবর্তিত রূপ আজকের কসমোপলিটান শহরের একটা অত্যাধুনিক বহুতল ভবন নির্মান করতে যে জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, তার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থেকেও মানুষ পূর্বোক্ত বাড়ি থেকে শতগুন স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও পরিষেবা উপভোগ করে থাকেন। কিন্তু ভাবসম্পদ উপভোগ করার জন্য, একটা স্তর পর্যন্ত, ভোক্তারও মানসিক অনুশীলনের প্রয়োজন হয়।কারণ যে দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার ভিতর দিয়ে একজন চিত্রশিল্পী গুহাগাত্রে অঙ্কিত বাইসনের ছবি থেকে আধুনিক চিত্রকলার জটিল রঙ-রেখা-বিন্যাসের মনোজগতে এসে দাঁড়িয়েছেন; তার কাজ উপভোগ করতে হলে ভোক্তাকে শিল্পীর ভাবপ্রকাশের যে ভাষা তার সাথে যোগাযোগ করার সামর্থ্য অর্জন করতে হয়। এখানেই যে-কোনো শিল্পমাধ্যমের ভবিষ্যত রূপরেখা নির্ভর করে, কবিতা যার অন্তর্ভুক্ত।

কবিতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাব যে প্রাচীন কাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলা কবিতা ভাষা, বিষয় এবং আঙ্গিকের দিক থেকে যেভাবে বিকশিত হয়েছে তার সাথে সংযোগ স্থাপন এবং রসগ্রহণে সর্ব সাধারণের কোনো সমস্যা হয় নি। প্রাচীনতম কাব্য চর্যাপদে বৌদ্ধ সাধক-কবিরা তাঁদের সাধন অভিজ্ঞতাকে বিভিন্ন রূপক, প্রতীক ও শব্দশৈলী সহযোগে যেভাবে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন তা দু’টো স্তরে অর্থ বহন করত : বাহ্যিক স্তরে জীবন ও সমাজ বাস্তবতার চালচিত্র ; অন্তর্গত স্তরে সেটাই আধ্যাত্মিকতার চর্চা — দেহসাধনার (তন্ত্র ও যোগ) মাধ্যমে আত্মানুসন্ধান এবং বিশ্বপ্রকৃতি বা মহাচৈতন্যের রূপানুসন্ধান। উঁচু পর্বতে গুঞ্জার ফুলের মালা গলায় পরে যে শবর বালিকা ঘুরে বেড়ায়, সাধারণভাবে জনজীবনের একটি দৃশ্য — সেটাই অন্তর্জগতে সাধকের আরাধ্য নৈরাত্মা দেবী। প্রাকৃত বাংলাভাষায় লিখিত এইসব গানে নিম্নবর্গ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ এবং বর্ণবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে দ্রোহের প্রকাশ ঘটেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

মধ্যযুগে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব জাত-পাত বিভক্ত সমাজব্যবস্থার মধ্যে প্রেম, ভক্তি ও সাম্যের বাণী আলোড়ন সৃষ্টি করে; উদ্বাহু নিমাইয়ের নগরসংকীর্তন যে প্রেম-ভক্তির প্লাবন বইয়ে দেয় বাঙালি সমাজে, তার থেকে বৈষ্ণব কাব্যের জন্ম যেখানে পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের জন্য চিরবিরহিণী রাধার অনন্ত অভিসার–পরমাত্মার অন্বষণে জীবাত্মার ব্যাকুলতা এক নতুন কাব্যধারার সূচনা করে। বৈষ্ণব কাব্যে অসীমের মধ্যে সীমার সমর্পনের পাশাপাশি শাক্ত কাব্যের জঙ্গমতার মধ্যে বাংলার আরেক রূপ ধরা পড়েছে, যেখানে প্রতিকূল পরিবেশ এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ‘মনসামঙ্গল’-এর সৃষ্টি। দেবতাদের প্ররোচনায়, বিয়ের রাতে সাপের দংশনে মৃত স্বামী লখিন্দরের শবদেহ নিয়ে গাঙুড়ের জলে ভাসমান দেবদ্রোহী বেহুলা যার মধ্য দিয়ে বাংলায় ব্যক্তি ও কৌমসত্তার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। এর ধারাবাহিকতায় ধর্মকাব্যগুলো কালক্রমে ধর্মের প্রভাব মুক্ত হয়ে লৌকিক কাহিনী সৃষ্টির দিকে এগিয়ে যায়–পদ্মাবতী, পূর্ববঙ্গ গীতিকা, ময়মনসিংহ গীতিকা, মহুয়া, চাঁদ বিনোদের পালা, দেওয়ান মদিনা, সোনা বিবির পালা ইত্যাদি সহ অসংখ্য পুঁথি-পাঁচালি, কবিকথা — বাংলার কৃষিজীবি সমাজের অন্তরের সৃষ্টি।

পলাশীর যুদ্ধে ক্ষয়িষ্ণু নবাবী শাসনামলের অবসানে, নতুন বণিকশক্তি ইংরেজ কর্তৃক ভারতের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে সামন্ত অর্থনীতির স্থানে আধুনিক বণিক পুঁজির ক্রীড়া ও লর্ড কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে বাঙালি সমাজে এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে যারা ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে যুক্তিবাদ, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও রেঁনেসার সাথে পরিচিত হন। সমাজ জীবনে এর শক্তি ও গতিশীলতা যে অনিবার্য পরিবর্তন সূচিত করে, তা বাঙালির চিন্তা, মনন ও সৃষ্টিশীলতাকে প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক। “ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিল।/ কিছু দূর গিয়া পুন রওয়ানা হইল।।” — মধ্যযুগের এই সমিল অক্ষরবৃত্ত বা পয়ারে লেখা মন্থরগতির কাব্য যা ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত চালু ছিল, সেটা পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন বাঙালি মনীষা ও তার গতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে একজন মাইকেল মধুসূদন দত্তের আবির্ভাব ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক যিনি এক উল্লম্ফনের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার শত শত বছরের গতিমুখ পরিবর্তন করে দেন।

“সম্মুখ সমরে পড়ি বীর চুড়ামনি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবী, অমৃতভাষিণী
কোন বীরবরে বরি সেনাপতি পদে
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষোকূলনিধি
রাঘবারি।”

১৪ মাত্রার প্রবহমান স্বাধীনযতি অক্ষরবৃত্তের এই গতিময়তার সাথে প্রাচীন চিন্তারীতিকেও আঘাত করলেন মধুসূদন তাঁর ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যে ; পরনারী অপহরণকারী রাক্ষসরাজা রাবনকে চিত্রিত করলেন দেশপ্রেমিক বীর-নৃপতি হিসেবে আর দেবতা রামকে পররাজ্য আক্রমনকারী কাপুরুষ হিসেবে। বাংলা কাব্যে এই বিদ্রোহ, ভাষা-আঙ্গিক এবং বিষয়ের দিক থেকে এতই অভিনব যার সাথে বাংলার পাঠক পূর্বে পরিচিত ছিল না এবং আধুনিক বাংলা কবিতার শুরু এখান থেকেই। পাশ্চাত্য প্রভাবিত ও নগরাশ্রয়ী মধুসূদনের এই কাব্যমানস বাংলা কাব্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এল ঠিক, কিন্তু তা একইসাথে বহু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা কৃষিজীবি বাঙালি সমাজের অবিভাজ্য কাব্যধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেল। এই প্রথম বাংলা কাব্য দু’টি ধারায় অগ্রসর হতে থাকল — গ্রামীণ জনপদে পূর্বোক্ত ঐতিহ্য মেনে রচিত কাব্য ও সাহিত্যধারা যাকে বলা হল লোকসাহিত্য এবং নগরে আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে রচিত কাব্য ও সাহিত্যধারা যা আধুনিক সাহিত্য নামে অভিহিত হল। লোকসাহিত্য অঞ্চলভেদে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হয়ে এসেছে, কিন্তু আধুনিক সাহিত্য সর্বজন বোধগম্যতার কথা বিবেচনায় এনে প্রমিত বাংলাভাষার উদ্ভাবন করে এবং তাকে কেন্দ্র ক’রে বিকশিত হতে থাকে। এই আধুনিকতাও এক জায়গায় থেমে থাকে নি, দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা কবিতার আধুনিকতার বাতাবরণ পরিবর্তিত হয়েছে। যুক্তি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ইউরোপীয় রেঁনেসা বাহিত আধুনিকতাকে আশাবাদের জায়গা থেকে দেখা হয় যেখানে ব্যক্তি মানুষের সম্ভাবনা অসীম ; ঈশ্বর বা রাজার অনুগ্রহভাজন নয় সে যে সব ধরণের অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে গড়ে তুলবে আলোকিত মানব সমাজ।

মধুসূদনে যে আশাবাদী আধুনিকতার উদ্ভব, রবীন্দ্রনাথে তার পরিপূর্ণ বিকাশ যার সাথে বাঙালি মধ্যবিত্তের উদ্ভব ও বিকাশকে সমান্তরালভাবে দেখা যায়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও কাব্যরীতির প্রতি মধুসূদনের যে মুগ্ধতা ও আনুগত্য, তার থেকে উত্তীর্ণ রবীন্দ্রনাথ তাঁর সর্বপ্লাবী প্রতিভার মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় এবং সারাসেনিক সভ্যতার সংঘর্ষ ও মিথস্ক্রিয়ায় যে নতুন সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তাকে আত্মস্থ করে তার সাথে ইউরোপীয় আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটান এবং বাংলার প্রাণাবেগের সাথে সম্পৃক্ত করেন। এই ত্রিধারা সংস্কৃতির আলোয় বাংলার গীতিকাব্যের ঐতিহ্যকে আধুনিকায়ন করে রবীন্দ্রনাথ তা বিশ্বজনীনতায় উপনীত করেন। রবীন্দ্র কাব্যবলয়ের মধ্যে কাজী নজরুলের আগমন প্রবল ঝড়ের মত , তিনি বাংলার বিদ্রোহী কবি– শ্রেণীচেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের সচেতন রূপকার ; ধর্মীয় কুসংস্কার-সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ-নিপীড়ণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে তাঁর আবির্ভাব। আরবি-ফারসি শব্দ, মুসলিম মিথ ও ঐতিহ্যের সাথে হিন্দু মিথ, ঐতিহ্য ও পুরানের রাখিবন্ধন করে তিনি ভাষায় বৈচিত্র্য ও গতিবেগের সঞ্চার করেন যা দারুণভাবে সমকালীন জনমানসকে স্পর্শ ও প্রভাবিত করে। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল, বাংলাকাব্যে সৃষ্টিগুণে ও জনপ্রিয়তায় শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত — বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে সর্বাধিক মাত্রায় কাব্যে আত্মস্থ ও সঞ্চারিত করে দেয়ার গৌরব অর্জন করেও, নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তকে অতিক্রম করে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠির ভিতর তাঁরা গৃহীত হতে পেরেছেন, এমন দাবী করা যায় না। এটা তাঁদের সৃষ্টির অপূর্ণতা নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে বাংলা কাব্য যে দু’টি ধারায় ( লোকসাহিত্য ও আধুনিক সাহিত্য) বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, তার অনিবার্য ফলাফল। আধুনিক বাংলা কাব্য রবীন্দ্র, নজরুলের পরে আরো বিচিত্র ধারায় অগ্রসর হয়েছে এবং পাঠক বিচ্ছিন্নতাও সেই ধারাবাহিকতায় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দু’টো ঐতিহাসিক ঘটনা মানব সমাজকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছিল : প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং রাশিয়ায় শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সংঘটিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। পাশ্চাত্য সমাজ ও মন বহুকাল ব্যাপী আশাবাদ, সৌন্দর্য বোধ এবং বিশ্বাসের যে ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়েছিল তাকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং এক নেতি-নির্বেদী মনোভূমি জাগ্রত হয় যেখানে ব্যক্তিপ্রতিস্বের হতাশা, অবসাদ, পচন, বিকার, সংশয়, নাস্তি, জীবনের অনির্দেশ্যতা ও অন্ধকার যা-কিছু নেতিবাচক তাকে প্রাধান্য দিয়ে ও মহিমা আরোপ করে জন্ম নেয় হাইমডার্নিস্ট আধুনিকতাবাদ যার প্রকাশ আমরা লক্ষ করি বিমূর্তবাদ, ডাডা, পরাবাস্তববাদ সহ নানাবিধ শিল্পান্দোলনে। ত্রয়োদশ শতকের রেনেসাঁ উদ্ভূত আশাবাদী আধুনিকতার বিপরীতে এই অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদ সময়গুণে প্রভাবসঞ্চারী হয় ও ভূগোল অতিক্রম করে। উত্তররৈবিক কবিকূল (বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ প্রমুখ) রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে এসে দৃষ্টান্তযোগ্যভাবে নিজেদের শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করার জন্য এবং পাশ্চাত্য মননের সাথে সংযোগ হেতু হাইমডানির্স্ট আধুনিকতাকে বাংলার মাটিতে বপন করেন যা স্বদেশের ঐতিহ্য, সমকালীন বাস্তবতা এবং চৈতন্যপ্রবাহ থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ধারার শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ অবক্ষয়ী আধুনিকতার ক্লেদ, অবসাদ ও নৈরাশ্যকে ধারণ করেও তাঁর ইতিহাসবোধ, অন্তর্লীন সমাজমনস্কতা ও ঐতিহ্য চেতনাকে আবহমান বাংলার নিসর্গ, মিথ, পুরান, আর্কিটাইপের সাথে সংযুক্ত করে সমকালীন বিশ্বের প্রেক্ষাপট ও মহাকালের জিজ্ঞাসায় স্থাপন করেন — জন্ম হয় এক পরাক্রান্ত আধুনিকতার। কবিতার গভীর ও সংবেদী পাঠকের কাছে জীবনানন্দ দাশ এক অতি প্রিয়, অনিবার্য নাম। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার যে আশাবাদ জন্ম দেয় তার অনুপ্রেরণায় ভূগোল নির্বিশেষে জন্ম নেয় মার্ক্সবাদী সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্বের অন্য একটি ধারা যা সমাজবাস্তবতাবাদ নামে পরিচিত, হাইমর্ডানিস্ট আধুনিকতাবাদের বিপরীতে সক্রিয় হয়। কিন্তু তিরিশের অবক্ষয়ী আধুনিকতার ধারাই পরবর্তী অর্ধ শতাব্দী কাল ধরে, সামান্য কিছু হেরফেরে, প্রধানতঃ বাংলা আধুনিক কবিতার উপর প্রভাব সঞ্চারী হয়েছিল।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ এবং দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তার মোহে নিজস্ব ভূগোল ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের পরিবর্তে সুদূর আরব-ইরান-তুর্কি ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকিয়ে আত্মপরিচয়ের আলেখ্য নির্মান করতে চেয়েছিল যার কাব্যরূপ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ আলী আশরাফ, তালিম হোসেন প্রমুখের কবিতায়। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন সেটা নাকচ ক’রে বাঙালি মুসলমানকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল সমগ্র বাঙালিত্বের সামনে — ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত পরিচয়ের উর্ধ্বে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও অর্থনীতির নিবিড় বন্ধনে গড়ে ওঠা হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিসত্তার রূপ তার সামনে আত্মোপলব্ধির নতুন দরোজা খুলে দেয় যার পরিণামদর্শী ফলাফল হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির মরণপণ সংগ্রাম, পর্যায়ক্রমিক অসহযোগ আন্দোলন ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান আমলে ইসলামী কাব্যাদর্শের পাশাপাশি, তিরিশের আধুনিকতাবাদী কবিতার একটি ধারা কবি আবুল হোসেন, আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখের মাধ্যমে প্রবহমান ছিল। যদিও আলী আহসান পরবর্তীতে এই ধারা থেকে সরে এসে ইসলামী ভাবাদর্শে অনুরক্ত হন।

তৎকালীন পূর্ব বাংলার পরিবর্তিত রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে আধুনিকতার দ্বৈত ধারা (অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদ ও সমাজবাস্তবতাবাদ) অন্তর্গত বোধ ও মননজাত অগ্রসরতার কারণে বেগবান হয় এবং পশ্চিম পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার উপলব্ধি ও স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাপকে আত্মস্থ করে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত হয় যা বাংলাদেশের কবিতায় আধুনিকতার নিজস্ব ভিত্তি স্থাপন করে। পঞ্চাশ থেকে সত্তর অবধি, আধুনিকতার এই যাত্রায় দু’টো স্রোত লক্ষ্য করা যায়। প্রথমটি হচ্ছে : এলিয়টের পোড়োজমি অথবা বোদলেরীয় বিবমিষার চোখে দেখা নগরসন্দর্ভ — ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্তের স্বপ্ন-কল্পনা-ক্লেদ, পাপ ও অধঃপতনের নাগরিক ভাষ্য যা রূপান্তরিত হয়ে যায় ভাষা আন্দোলনের প্রাণস্পর্শে; ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের প্রসব বেদনার মধ্য দিয়ে অর্জন করে নতুন রূপকল্প, প্রতীক ও ভাষিক ব্যঞ্জনা। কবি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক, হুমায়ুন আজাদ, দাউদ হায়দার প্রমুখের কবিতায় নগরসন্দর্ভের এই রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। তিরিশি আধুনিকতার এই রূপান্তরিত ধারাটির সাথে বোধলগ্ন হয়েও বাংলার নিসর্গ, লোকায়ত জীবন, ঐতিহ্য, যৌথ অবচেতনা এবং শ্রেণী সংগ্রামের প্রত্যয়ে গড়ে ওঠে আধুনিকতার আরেকটি সন্দর্ভ যার রূপকার আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ। পরে অবশ্য আল মাহমুদ লোকায়ত ধর্ম-বিশ্বাসের সরল সৌন্দর্য থেকে অন্ধ বিশ্বাসে সমর্পিত হয়ে কক্ষচ্যুত হন এবং বিতর্কের জন্ম দেন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ অচিরেই কবিদের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে ওঠে :` ক্ষুধা-দারিদ্র্য-দূর্নীতি, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও নৈরাজ্য, স্বাধীনতা বিরোধী দেশ-বিদেশী শক্তির ষড়যন্ত্র, ৭৫-এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও সামরিক ক্যু-র মাধ্যমে ক্ষমতার পট পরিবর্তন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের অভিঘাত কবিতায় ধারণ করতে গিয়ে কবিতা অনেক বেশি বহির্মুখী হয়ে ওঠে। আধুনিকতার নেতি-নির্বেদ-হতাশা-অবক্ষয়ের যে বোধ তা এই সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় প্রাধান্য পায় এবং তার সাথে ক্ষোভ-প্রতিবাদের উত্তাপ যুক্ত হয়ে এক ধরণের অগভীর শ্লোগানধর্মী, বিবৃতিধর্মী কাব্যভাষার জন্ম দেয় যা ৭০-এর দশকে বহু ব্যবহৃত হয়ে কবিতার সম্ভাবনাকে প্রায় নি:শেষ করে ফেলে।

আশির দশকে কবিরা চেষ্টা করেন কবিতাকে তার স্বভাবধর্মে ফিরিয়ে আনতে — সংহত, মাত্রাসম্পন্ন, প্রতীক ও ইঙ্গিতধর্মী কবিতার গভীরতা সন্ধানে তারা পূর্বসুরী কবিদের থেকে বহুলাংশে সরে আসেন এবং এক নতুন কাব্যভাষা নির্মানে সচেষ্ট হন যা নব্বইয়ে অনেক বেশি তৎপর ও বিচিত্রগামী হয়ে ওঠে। প্রাসঙ্গিক কারণে এই সময় উত্তর-ঔপনিবেশিক (পোস্ট কলোনিয়াল) ও উত্তরাধুনিক/আধুনিকোত্তর/অধুনান্তিক(পোস্টমডার্ণ) চিন্তাভাবনা বা ডিসকোর্স তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই পোস্টমডার্ণ চিন্তাভাবনাকে তরুণদের একটি অংশ গ্রহন করেছেন জীবনবাদিতা ও মর্মের দিক থেকে ; আরেকটি অংশ গ্রহণ করেছে তার পোষাক বা ভাষা-আঙ্গিকের দিক থেকে। [২] যারা জীবনবাদিতার দিক থেকে গ্রহণ করেছেন তারা আধুনিক কবিতার খণ্ডত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সরে গিয়ে অখণ্ড সমগ্রতার দিকে দৃষ্টি ফেলেছেন এবং বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, দ্রোহ ও সংগ্রামকে যার যার মেধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মস্থ করে নতুন জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও চিন্তার সাথে একালীকরণ করে কবিতা লিখছেন। তাদের অনেকের কবিতা একমুখী ঝোঁক বা একরৈখিকতা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বহুস্তর ও বহুরৈখিকতায় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে যা অন্তর্গতভাবে পোস্টমডার্ণ চিন্তা-পরিধির সাথে সাযুজ্যপূর্ণ এবং তাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখা করা যায়। এই কবিরা কবিতার চারিত্র্য অনুযায়ী ছন্দে, বিবিধ ছন্দ নিরীক্ষায় এবং ছন্দের বাইরে এসে কবিতা লিখছেন।

আর পোস্টমডার্ণ চিন্তাভাবনাকে যারা পোষাক বা ভাষা-আঙ্গিকের দিক থেকে গ্রহন করেছেন, তারা বিশ্বাস করেন যে কবিতার নির্দিষ্টভাবে কোনো অর্থ হয় না, ব্যাখা হয় না — কবিতা হবে কেন্দ্রহীন, পরম্পরাহীন এক ভাষিক বয়ান, এক শব্দের সাথে অন্য শব্দ সম্পর্ক নির্ণয়ে হবে আনুগত্যহীন; এক পঙক্তির সাথে অন্য পঙক্তি ভুগবে ক্রমাগত দাম্পত্য বিরহে। মোটামুটিভাবে এক শাব্দিক নৈরাজ্যের জন্ম দেবেন তারা যার ভিতর থেকে হয়ত কিছু শব্দ ও পঙক্তি ঝলক দিয়ে উঠবে — একটা ইমেজ বা একটা মুড প্রতিফলিত হবে যা নির্দিষ্টভাবে কোনো দেশ-কালের প্রেক্ষিতে প্রতিফলিত নয়, অনেকটাই বিমূর্ত চিত্রকলার মত। এটা পশ্চিমা পোস্টমডার্ণিজমের ধারণার সরাসরি অনুসরণ। এরা কবিতায় সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অবশ্য পরিতাজ্য মনে করেন এবং কবিতায় ছন্দের ব্যবহার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অথবা পশ্চাৎপদ বিবেচনায় পরিহার করে থাকেন। এই সার্বিক নৈরাজ্যময় ভাবনার পিছনে যে বোধ সক্রিয় তা হল, কবিতাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন শিল্পের মর্যাদা দেওয়া যা ইতিহাস, বৃহৎ দর্শন বা চিন্তার দাসত্ব করবে না কারণ তাদের মতে বড় বড় চিন্তা, দর্শন বা রাজনৈতিক মতবাদ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয় যা ব্যক্তির মুক্তির কথা বলে তার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে থাকে। আধুনিকতার দু’টি ধারা (পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা)-র ব্যর্থতা এবং এনলাইটেনমেন্টের কথা বলেও দুটি বিশ্বযুদ্ধের সামনে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয়ার ভয়াবহতার অভিজ্ঞতা এই অনাস্থার কারণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও স্বপ্ন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার ফলে যে আশাভঙ্গ, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং জনবিচ্ছিন্নতা, সেটা এই আঙ্গিকসর্বস্ব পোস্টমডার্ণ ধারাকে উৎসাহিত করেছে সন্দেহ নাই। এর সাথে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক মৌলবাদ যারা আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদী সমাজকে বিনির্মানবাদ বা ডিকন্সট্রাকশনের ছুরিতে ব্যবচ্ছেদ করে ধর্মীয় মৌলবাদের প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় এবং একটা পাল্টা ডিসকোর্স তৈরী করে তরুণ কবি, লেখকদের একটা অংশকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে। অতি সাম্প্রতিক কালে, মৌলবাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক শক্তির আত্মসমর্পণের নানা ঘটনা এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে বলে আশঙ্কা করা যায়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ, উভয় অঞ্চলে নিজস্ব সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সাম্প্রতিক কালে এই পোশাকী পোস্টমডার্নের আধিপত্য দেখতে পাওয়া যায়।

কবিতার টাইম মেশিনে চড়ে বাংলা কবিতার হাজার বছরের ইতিহাসকে দ্রুত দেখে নেয়ার কারণ বাংলা কবিতা এখন কোন দশায় অবস্থান করছে তা সনাক্ত করা। বর্তমানে কবিতা বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অনুসন্ধান ও সৃষ্টিশীলতার পথ অতিক্রম করছে। উত্তর-আধুনিক ধারার জীবনবাদী কবিরা বাঙালি সমগ্রতার ভিতরে অবগাহন করে অবক্ষয়ী আধুনিকতার সমস্ত বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করার সাধ্যমত চেষ্টা করছেন, কিন্তু কাব্যভাষা বিকাশের যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তাকে নগরাশ্রয়ী একটা নির্দিষ্ট পাঠকশ্রেণীর বাইরে আরো বিস্তৃত পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রায় দু:সাধ্য হয়ে উঠেছে। পোষাকী উত্তর-আধুনিক ধারার কবিদের ক্ষেত্রে এই বিচ্ছিন্নতা আরো প্রকট নি:সন্দেহে বলা যায়। এমনকি বাংলাদেশের আধুনিক কবিতা জন্মলগ্নে সমাজ-রাজনীতির ঐতিহাসিক সংযোগের কারণে যেভাবে উপরোক্ত পাঠকশ্রেণীর কাছে আদৃত হয়েছিল, সেটাও এখন পরিবর্তিত বাস্তবতায় সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। কিন্তু সাধারণভাবে কবিতা এখনও বাঙালির কাছে জনপ্রিয় ; যোগাযোগ এবং প্রকাশনা মাধ্যমের প্রসারের ফলে পূর্বের যে-কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক কবিরা কবিতা লিখছেন এবং সৃষ্টিগুণে অনেক উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছে যা এখনও পাঠক সমাজের সনিষ্ঠ মনোযোগের অপেক্ষায় আছে।

যে-কোনো শিল্প বা প্রকাশ-মাধ্যম সৃষ্টিশীলতার প্রশ্নে স্বভাবতঃই নতুন ও অভিনব হতে চায়, কবি/লেখক/ শিল্পীর আত্মতৃপ্তি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ, যদিও প্রকৃত শিল্পী তৃপ্ত হবার পরিবর্তে অন্বষণেই ব্যাপৃত থাকেন। এ সময়ের একজন কবি উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তার আলোকে, শেকড় সন্ধানের আকাঙ্ক্ষায় লোকায়ত দর্শন-ইতিহাস-ঐতিহ্য, লালন-হাছন-বৈষ্ণব-মঙ্গলকাব্যের অন্তঃসলিলায় অবগাহন করে তার মর্মশ্বাসকে গ্রহণ করবেন ঠিকই, কিন্তু ঐ ভাষাভঙ্গি বা আঙ্গিকের অনুসরণে নিজের কবিতা লিখবেন না অর্থাৎ সমকালের একজন বাউল শাহ আব্দুল করিমের অনন্যতা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েও তার প্রকাশভঙ্গিতে নিজের পথসন্ধান করবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ এখনও প্রাক-মধুসূদন পর্বের কাব্য-সংস্কৃতির সাথে অনায়াস ও স্বচ্ছন্দ। বাংলায় সামাজিক-অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত বৈষম্যের কারণেই এমন বিস্তর ফারাক থাকা সম্ভব যা অতিক্ৰম করার দায় শুধু কবির বা কবিতার নয়। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, পৃথিবীর সমস্ত উন্নত দেশেই লোক সাহিত্য ও নগর সাহিত্যের দু’টো ধারা রয়েছে যারা পাশাপাশি অবস্থান করলেও, তার রসাস্বাদনে আমাদের দেশের পাঠক সম্প্রদায়ের মত কোনো স্পষ্ট বিভাজন রেখা সেখানে দেখা যায় না। তার কারণ সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমন একটা সামঞ্জস্য আছে যা সর্বস্তরে মানুষের বৌদ্ধিক মান নির্মাণের প্রশ্নে বড় রকমের ব্যবধান তৈরী করে রাখে নি। পার্থক্য যা আছে, তা প্রধানত ব্যক্তির মেধা, আগ্রহ এবং অর্জন সাপেক্ষ।

কবিতার ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত কথা যখন বলা হচ্ছে তখন গুরুত্বপূর্ণভাবে আরো একটি প্রসঙ্গ চলে আসে সেটা হল কোন ভবিষ্যৎ? কত কাল পরের ভবিষ্যৎ … পঞ্চাশ বর্ষ, শত বর্ষ নাকি তার অধিক কোনো কালের ভবিষ্যৎ? সেই অনাগত ভবিষ্যতে, জাগতিক পরিণতির প্রশ্নে আঞ্চলিকভাবে বাংলা এবং বিশ্ব কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তার উপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। আলোচনার প্রথমভাগে বলেছিলাম আদিতে কবিতার উপর ন্যস্ত ছিল জীবনের বিস্তৃত ক্ষেত্ৰ প্রকাশের ভার যা গদ্যের আবির্ভাবে সংকুচিত হয়ে আসে এবং গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটকসহ গদ্যের বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষ তার যাপিত জগতকে বিশদভাবে প্ৰকাশ ও যোগাযোগের উপায় খুঁজে বের করে। সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের আত্মপ্রকাশ ও যোগাযোগের আরো বিভিন্ন মাধ্যম আবিস্কৃত হয় যার মধ্যে শক্তিশালী দৃশ্যমাধ্যম যেমন সিনেমা, টিভি, ভিডিও যা শুধুমাত্র কবিতাই নয়, সাহিত্যের উপর মানুষের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে সাথে পৃথিবী যত বেশি বস্তুজাগতিক উন্নতির দিকে ধাবমান হবে, নতুন নতুন শিল্প ও প্রকাশ মাধ্যমের উদ্ভব হবে, কবিতা সৃষ্টির প্রবাহ তত সঙ্কুচিত হবে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু সেটা কবিতার প্রয়োজন সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে পারবে না, কারণ কবিতা হচ্ছে মানুষের আত্ম-সংবেদনার উৎস হতে জাত বিশুদ্ধ বোধ ও অনুভূতির প্রকাশ — আনন্দ, বেদনা, দু:খ-সুখ, বিস্ময় ও উপলব্ধির চকিত উদ্ভাসনে যা ব্যক্ত হতে চায়। ক্রমাগতভাবে যান্ত্রিক ও দ্রুতগতিপ্রাপ্ত মানুষের সমাজে, কবিতার ভাষা ক্রমাগতভাবে হয়ে উঠবে আরো সংক্ষিপ্ত, ইঙ্গিতময়, প্রতীকী অথচ অধিক অর্থব্যঞ্জক ও মাত্রাসম্পন্ন যার মর্ম উদ্ধারে পাঠককে হতে হবে অনেক বেশি অগ্রসর এবং সংবেদনশীল। প্রাচীন ও মধ্যযুগে কবিরা আত্মস্বরূপ ও জগতের সাথে সম্পর্ক নির্ণয়ে নির্ভর করেছেন ধর্ম এবং অধিবিদ্যার উপর, আধুনিক যুগে যুক্তি, বিজ্ঞান ও নাস্তিক্যবাদী মনীষায় এবং ভাবীকালে প্রকাশিত হবেন যুক্তি, বিজ্ঞান ও অধিবিদ্যার মিলিত সংবেদনায় যা একালের উল্লেখযোগ্য কিছু কবির কবিতায় ইতোমধ্যে প্ৰকাশিত।

এখনও পর্যন্ত মানুষকেন্দ্রিক জগদ্দর্শনের যে আলেখ্য তা ভবিষ্যতের কবিতায় দেখা দেবে সর্বপ্রাণের সাথে সংযোগ ও প্রকাশের বহুমাত্রিকতায়, নিসর্গ ও পরিবেশের সাথে একাত্মতায়। ভার্চুয়াল যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে গমনাগমনের সহজলভ্যতা এক মিশ্র সংস্কৃতির ক্ষেত্র তৈরী করবে যার প্রতিফলন কবিতায় জন্ম দেবে বহু পরিসরের, স্বদেশলগ্ন থেকে বিশ্ব পরিক্রমার অভিজ্ঞান বিস্তৃত করবে কবিতার বহুতল মনোভূমি। বহুরৈখিক ভাষা ব্যবহারের কুশলতায়, সামাজিক-রাজনৈতিক ও প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ কবিতায় প্রকাশের পাশাপাশি, জীবন-জগতের ভিন্ন এলাকাকে সমান্তরালে প্রকাশের সামর্থ্য অর্জন করবে কাব্যভাষা। ভাষার ডাইনামিক চারিত্র্য অনুভব ও উপলব্ধি প্রকাশকে বিচিত্র জটিলতায় উন্মুক্ত করেও পাঠকের জন্য তার রসাস্বাদনে হবে সহজ ও ঘনিষ্ঠ। এমন আরো অনেক কিছুই হয়ত ভবিষ্যতের কবিতাকে নিয়ে বলা যায় যদি আমরা সমগ্র কাব্য ইতিহাসকে খণ্ড খণ্ড ভাবে বিভক্ত করে না দেখে, এক অখণ্ড সত্তায় দেখতে অনুভব করতে সক্ষম হই।

তথ্যসূত্র:
[১] তুষার গায়েন, কবিতা ও কবিতাভাবনা, ইত্তেফাক সাহিত্য সাময়িকী, অক্টোবর ২০১১, ঢাকা
[২] তুষার গায়েন, বাংলা কবিতা : অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান, ২০১৭, ঢাকা

তুষার গায়েন । কবি, লেখক। গত শতাব্দীর শেষ দশকে বাংলা কাব্যজগতে কবি তুষার গায়েনের আত্মপ্রকাশ। এটা এমন এক সন্ধিকাল যখন বাংলা কবিতা বাক ফিরছে নতুন ভাব, ভাষা, আঙ্গিক ও প্রকরণের সন্ধানে ─ আধুনিকতাবাদী কাব্যধারার ক্ষয়িষ্ণু জলস্রোত থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিকোত্তর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ