কবিতা প্র্যাকটিস ও সন্ধের ডাক

জয়শীলা গুহ বাগচী
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
কবিতা প্র্যাকটিস ও সন্ধের ডাক

তখন তো কবিতার বোধ হয়নি, দুলে দুলে ছড়া টড়া … এইসব। ক্লাস ফোর কী ফাইভ, এক সন্ধ্যেয় মা দাদাকে পড়াচ্ছিল…

“হাথক দরপণ মাথক ফুল
নয়নক অঞ্জন মুখক তাম্বুল
হৃদয়জ মৃগমদ গীমক হার
দেহক সরবস গেহক সার”

অথবা,

“এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর
ঈ ভরা বাদর                    মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর”

আমি কেমন অবাক হলাম, এগুলো কী? ওই আবৃত্তি, অচেনা শব্দের মায়া, ঝঙ্কার, টুকরো টাকরা ছবি যা নিজের বোধ জগতে একটা অন্যরকম দোলা দিয়ে গেল। আমি কেমন হতবাক হয়ে কবিতা শুনলাম। কী আশ্চর্য এক বর্ষার রাত , অক্লান্ত অঝোর ধারায় ঝরতে লাগল আমার উঠোনে। তখনও কবিতা জানি না, কবিতা বুঝি না। তারপর বড় হতে লাগল ফ্রক, রবীন্দ্রনাথ চেনা অচেনায় ঝাপসা। বাড়িতে দেশ আসে। কবিতার পাতায় অদ্ভুত সব ছবি সহযোগে কবিতা। আবার ধাক্কা খেলাম। এসব কী? অথচ ওরা কেমন কুণ্ডলী পাকিয়ে ঢুকে গেল গলার ভেতর। আস্তে আস্তে থিতিয়ে যেতে লাগল। তৈরি হল এক অমোঘ বিন্যাস। তারপর কত কবিতাদের আসা যাওয়া। জীবন দুমড়ে মুচড়ে গেল, বুঝলাম নিজের মতো করে নিজেকে খুঁজে নিতে হয়, ক্ষয়াটে হাত ধরলেন রবীন্দ্রনাথ। গীতবিতানের প্রত্যেকটি গানকে কবিতা হিসেবে পড়লাম ততদিন ধরে, যতদিন না নিজের পুনরাবিষ্কার ঘটার প্রক্রিয়া শুরু হল। কবিতা তাই অস্তিত্বের বাইরে তো কিছু নয়। একটা ঝিম ধরানো অন্ধকার গাছে জীবনানন্দের কবিতার লাইনগুলিকে দেখেছিলাম বটের ঝুড়ির মতো নেমে আসতে। মরা চাঁদ নিচে নামছিল আরও আরও। পড়তে পড়তে  জানা পৃথিবী অজানা হল। চেনা রাস্তা নতুন মনে হল। সেই বৈষ্ণব পদের মতো,  “ঘর যাইতে পথ মোর হইল অফুরান”।

“রাস্তাটা সেদিকেই যাবে যেদিকে তুমি যেতে চাও
রাস্তার কথাটা আমরা প্রায়
ভুলতেই বসেছিলাম
সেদিন আপাতশান্ত এক সভা থেকে একটা রাস্তা
লাফিয়ে বেরিয়ে পড়ল”

– ভাস্কর চক্রবর্তী

কত কী নতুন শেকড় বাকর… , পাতা…, বাকলের গায়ে কবিতার ছবি , দেখার জগত শুধু দেখার ভেতরে তো নয়, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখব ,যখন আলোক নাহিরে…”

কবিতা খেলাম, মাখলাম সারা অস্তিত্বে । দিনগুলো পাতা উলটে যায় ক্রমাগত। স্বপ্নের ভেতর একটা বাস আসে, আমি উঠে বসি। ও আমাকে একটা যাত্রা দেয় শুধু, আর কিছু নয়। ওকে আমি অনেক অনেক কবিতা শোনাই। ও চুপচাপ হাসে। হাসির কী ধরণ আহা… । আমি জানি তো বাস্তবের আচার বিচার গুলিয়ে যায় বলে ভুল হয় বারবার। সেইসব ভুলের ধরণে কবিতা রাখি । অতঃপর শান্তি নামে। এই যে শ্যামল বাবু ( শ্যামল সিংহ )লিখলেন, আর আমি পড়লাম, আর এক কলস জল খেলাম, জল খেলাম, জল…

“কোথাও পাগল খুঁজে না পেলে
মাঠের পর মাঠ ল্যাংটো হয়ে তুমি
ছুটতে থাকো
ছুটতে ছুটতেই তুমি পৌঁছে যাবে
সমুদ্রের কাছে…
রেখে-ঢেকে সমুদ্র কথা বলে
‘এসো, এসো, আমার ঘরে এসো’
তারপর রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়
তুমি বাড়ি ফিরে এসে দ্যাখো

তোমার আগেই সমুদ্র ঢুকে পড়েছে ঘরে”

কবিতার সব আছে, একটা আস্ত মানুষ সে। তার শূন্য থেকে সম পর্যন্ত পড়তে থাকি। দেখতে থাকি। একেক সময় এমন মনে হত, সে হাততালি না দিলে আমার অভিনয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমি তার তত্ত্ব স্টাইল ছুঁড়ে ফেলি। বাড়তি শব্দের কাড়া নাকাড়া মুছে মুছে একটি মাতৃ গর্ভ খুঁজি। আরো বেশি রক্ত মাংসের কাছে, চামড়ার পদাবলীর কাছে, নিবিড় মেধা অনুভবে যেসব অলৌকিক পংক্তি জীবনের গন্ধ শুঁকে শুঁকে দ্রাব্য হয়ে আছে, তার কাছে বসে থাকি। বাইরে ঝড় আসে খুব, বাইরেটা দূর হতে থাকে। আমি ফিরি সেই  নিভৃত গোপন মিটমিটে প্রদীপ আর শু্কনো কাপড়ের গন্ধের কাছে। এইসব জমা হতে থাকে গভীর কুয়োর ভেতর যেখানে প্রাচীন তারাদের ছায়া পড়ে আছে কবে থেকে…।

আত্মজীবনী লিখতে চাইনি কোনোদিন। আমার কোনো তথাকথিত জীবনই নেই। যতবার ভেবেছি এই তো কত অভিজ্ঞতা হল, এসব লেখা যাক। লিখতে গিয়ে দেখেছি একটি বিশুদ্ধ আত্মা জেগে থাকে। ঘটনা নয় অভিজ্ঞতা নয়, থিতিয়ে পড়া অভিজ্ঞতা জনীত বোধ শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হয়। ছোটবেলায় একটা মৃত্যু পুরীর স্বপ্ন দেখেছিলাম। বদ্ধ ঘরের মতো সে জায়গাতে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে, পড়েই যাচ্ছে। সেই থেকে ওই বদ্ধভূমি আমার একান্তই নিজের। চেতনা থেকে থিতিয়ে পড়ে যে আমির ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া তা থেকে জন্ম নেয় যে অচেতন, তার অনুবাদ করতে শুরু করলাম কবিতায়। প্রথমদিকে সেইসব হঠাৎ পাওয়া স্বর সোজাসুজিই লেখা হতো। ২০০৪ সালে ছড়া আর চারপাশের প্রকৃতি থেকে নিষ্ক্রমণ ঘটেছিল প্রথম নিজস্ব স্বরের কবিতায়। সেটি এইরকম,

“ মস্তিষ্ক চেঁছে ঝুলকালি তুলেছি
সেকথা বলা হল না আজও
জিভে বিঁধে আছে তীর …”

নতুন কবিতা, বারীন ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী, কৌরব, স্বপন রায়, রঞ্জন মৈত্র, আর্যনীল মুখার্জী এসব জানি না তখন। জলপাইগুড়ির অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবীর রায়ের হাত ধরে এদের চেনা হল, এদের জানা হল। ধীরে ধীরে অতিচেতনাকে চিহ্নিত করতে শিখলাম। শব্দকে নতুনভাবে ব্যবহার কী করে করতে হয় তা জানা গেল। এও জানা গেল কবিতা শুধু আবেগের পরিশীলিত উচ্চারণ নয়। এ হল গবেষণা লব্ধ এক অব্যর্থ উচ্চারণ। জানা থেকে লেখা হয় না। এইসব প্রক্রিয়া একটা চিন্তার জন্ম দেয়, যেখান থেকে কোথাও কিছু ভাঙচুর ঘটে কবিতার শরীরে। ভাষা ব্যবহারের বোধে। এইটুকুই, তাতে সেই প্রদীপের কিছুমাত্র বদল ঘটেনি বোধহয়। আজও সেই রক্ত চোয়ানো বদ্ধভূমি আমাকে এগিয়ে দেয় একটি গাছের বাকলের বিমূর্ত চিত্রে বা একটি  অন্ধকার টানেলের নিজস্ব রেখায়। স্তোত্রের মত সেইসব অনুদিত লাইন শিল্পিত ভাবেই উচ্চারিত হয়। যে সংস্কার আমি বহন করে চলেছি সেই বেদের যুগ থেকে। “আত্মানং বিদ্ধি- আত্মাকে জানো। উপলব্ধি করাই তাহারা মানুষের চরম সিদ্ধি বলিয়া গণ্য করিয়াছে”। (রবীন্দ্রনাথ)

“When we cast the self free from all outward events, strange and great. It is the miracle of self knowledge, atma-jana.”

(Radhakrishnan)

কবিতা কেন লিখি? একথা বলার চেয়ে সেই যাত্রাপথটা বলা বোধহয় সোজা। কেন লিখির উত্তর এভাবেই থেকে যায়। একদিন বুঝি জিভে বেঁধা তীরটা একটা রাস্তার মতো অনির্দিষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই অনির্দেশে বার বার ফিরতে হয়। সারাদিন রুজিরুটি, ঘরে ফিরে অন্যান্য তারপর ক্লান্তিকে টেনে হিঁচড়ে সাদা খাতার সামনে এনে বসাই। কেন লিখি? ওই যে শান্ত রাতে নিস্তব্ধ প্রদীপটা যে জ্বলে ওঠে, আর আমি পেরিয়ে যেতে থাকি দেহ ছাড়িয়ে ব্রহ্মাণ্ড ছাড়িয়ে অনির্দেশে। যেখানে আমার দেহ নেই, ঘর নেই, সমাজ নেই, দেশ নেই। আমার পরিচয় শুধু আমি। অন্ধকারে সেই রাস্তা আরো আবছা হয়ে আসে। শুধু অক্ষর পড়তে থাকে। অবিন্যস্ত, ভাঙা চোরা দরজা জানালা যেন, পুরনো সাত মহলা বাড়ি, কী এক রহস্য সাজিয়ে কেবল বাতাস পাঠাচ্ছে। আমি বাতাস কুড়োচ্ছি,  কলমে ভরে দিচ্ছি রহস্যকে। শূন্যের ভেতর অক্ষর লিখছি, আমার অপরাধ লিখছি, বিষাক্ত বেঁচে থাকা লিখে রাখছি ঝড়ের মুখে। সেইসব ঝড় তুমি দেখেছো তো, আমিও দেখেছি। তুমি শুধু দেখোনি ঝড় সামলে একটা চারাগাছ বেড়ে উঠছে আমার চোখের কোটরে। ওই ঝড়টাও কবিতা, ওই চারা গাছটাও। ওর পাতায় আমার ফ্রক আটকে আছে। আমার ফ্রকবেলার গন্ধ লেগে আছে। সন্ধে হল, মা ডাকছে, আয় ঘরে আয়… ওই ডাকের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা মৃত্যুর রঙ আমি লিখি। কবিতা কেন লিখি জানি না, আজও জানি না।

জয়শীলা গুহ বাগচী। কবি। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতা। প্রকাশিত বই:

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..