কবিতা পড়া, কবিতা লেখা

উমাপদ কর
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
কবিতা পড়া, কবিতা লেখা

কবিতা কেন পড়ি?

এর তিন রকম উত্তর হতে পারে। অ্যাকাডেমিক, ডিপ্লোমেটিক, পোয়েটিক।

অ্যাকাডেমিকঃ ক্লাসের পড়াশুনা শুরু হওয়ার আগেই মা-ঠাম্মা, মাসি-পিসি, বা দাদা-দিদির মুখে মুখে- বলা ছড়া শেখেনি কোন-সে অতিশিশু শৈশব! তালমিলের ছড়া, ছন্দ-দুলুনির ছড়া, হাত-পা নেড়ে, পারলে নেচে নেচে ছড়া। তৈরি হতো একটা কান। ছন্দের সঙ্গে শিশুমনের এক নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। সঙ্গে গান, সেও তো গীতি-কবিতাই। বয়স ৫-৬ ছাড়ালেই স্কুল, শ্রেণী, পাঠক্রম, ভাষা শিক্ষা (মাতৃভাষা), কিছু পরে অন্য ভাষাও (আমাদের সময়ে সংস্কৃত আর ইংরেজি)। তো ভাষা-শিক্ষার একটা ভাগে ছড়া/কবিতা। পড়তে হতই। বছরে বছরে, নয়া নয়া, গড়ে উঠেছিল এক অভ্যাস। কৈশোরের শেষবেলায় পাঠক্রমে বিভাজন। কেউ কলায়, কেউ বিজ্ঞানে, কেউ বা বানিজ্যে। তো, আমি বিজ্ঞানে। পাঠ্যপুস্তক থেকে হাওয়া হয়ে গেল কবিতা। গেলো তো কী? একটা অভ্যাস, অভ্যাসে টুকরো ভালোবাসা গড়ে উঠেছে যে! তাই পত্র-পত্রিকায়, কলাবিভাগের ভাষাশিক্ষার্থী বন্ধুদের বইয়ে, সহজে মিললে একবার পড়ে ফেলা। আরও পরে কর্মজীবন। বানিজ্যিক ব্যাংক। যা মোলো। কিন্তু, তবুও…। ওই ঘোড়ারোগ আর কি! চলছে।

ডিপ্লোম্যাটিকঃ কবিতা পড়তে ভালো লাগে তাই পড়ি। দাবা খেলি কেন? শুধুই যুদ্ধ জয়ের জন্য? হতে পারে জিগীষা মানবমনের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু তার সঙ্গে মিশে থাকে একটা ভালো লাগাও। মেধা সঞ্চালনে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাও বটে। কবিতা পড়ার সঙ্গে ব্যাপারটা তো যায়। শুধু ডাল-ভাত-শাক-সব্জি খেলেই তো হয়। কত মানুষ তাই খেয়েই চমৎকার বেঁচে থাকে। আমরা কেউ কেউ মাছ-মাংস-ডিম খাই কেন? শুধুই কি প্রোটিন-পুষ্টির জন্য? না, রসনাতে স্বাদ কম দ্যায় না! স্বাদে একটা ভালো লাগার তৃপ্তি মিশে থাকে। কবিতা পড়াটাও তাই একটু ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন ধরনের ভালো লাগার। কবিতা পড়ার অভ্যাসটা বজায় রাখার পেছেনে এসব কাজ করে মনে হয়।

পোয়েটিকঃ কবিতা পড়ি, কবিতার নিজস্ব কিছু ধর্মের জন্য, কিছু গুণের জন্য। কবিতা পড়ি আনন্দের জন্য, আরামের জন্য আশ্রয়ের জন্য। আজও যে কবিতা পড়ি, প্রায় প্রতিদিন, তা শুধু মাত্র শৈশবের পাঠ্য-পুস্তক পড়ার অভ্যাসের কারণে নয়, শুধুমাত্র অভ্যাস থেকে ভালোবাসায় চুইয়ে যাওয়া রেশ থেকে নয়, বা পরবর্তীকালের কথিত ভালোলাগা থেকেই শুধুমাত্র নয়। এসব তো রইলই। পড়ি আরও নানা কারণে, নানা চাহিদায়, নানা আশায়, সবগুলো যার হয়তো ব্যাখ্যা করে বলতেও পারব না। প্রথমত যে-কোনো শিল্পকর্মের প্রতি একটা টান অনুভব। সাহিত্য তারমধ্যে একটি। সাহিত্যের প্রতি একটা টান অনুভব। তারই একটা বিশিষ্ট শাখা কবিতার প্রতি একটা টান অনুভব। কারণ, আমি তো শুধু কবিতাই পড়ি না। আঁকা দেখি, ভাস্কর্য দেখি, ফিল্ম দেখি, থিয়েটার (নাটক) দেখি, গান শুনি, সাহিত্যের অঙ্গনে গল্প, উপন্যাস, থ্রিলার, প্রবন্ধ, গদ্য, রম্যরচনা, টেকস্ট পড়ি। আর এর সবকিছুর রসায়নকে মিলিয়ে নিতে কবিতার দারস্থ হই। কবিতার ধর্ম ও গুণের কথা তুলেছিলাম। সংক্ষেপে বলতে হয়— রহস্যময়তা, বিমূর্ততা ও প্রসারিত-বিমূর্ততা,  ভাব-ভাবনার গভীর-উচ্চ-সমান বিচিত্রতা, চিন্তা-চেতনার প্রতিমানয়তা ও বিস্তৃতি, আলো-অনালোর খেলা, ব্যক্ততা-অব্যক্ততার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, প্রকাশ-অপ্রকাশের কষ্ট ও যন্ত্রণা, সময়ের চলমানতা ও সময়হীনতা, পরিসর-পরিসর-পরিসর সৃষ্টি বা অসৃষ্টির দোদুল্যমানতা, শব্দ (ধ্বনি) ও নৈশব্দের গ্রাফ, দেখা না-দেখার আশ্বাস ও হাহাকার, ভেতরের ভেতর আর বাইরের বাইরে দৃষ্টি-অন্তর্দৃষ্টি, আনন্দ-মহানন্দ-ব্যথা-যন্ত্রণা-কষ্ট-বিষাদ একটা ভাবেরই এ-পিঠ ও-পিঠ জ্ঞানানুভব, মজা-আক্ষেপ-চাতুর্য-সরলতা বোধ এক মহাবোধের মধ্যে লীন, দ্রোহ-ক্ষোভ-রাগ-স্নেহ-দয়ামায়া-মমতা একই বরণডালার কুলোয় সাজানো, আড়াল– আড়াল তুললে সুন্দর হারায়, মস্‌লিন- দেখা যায়- যায়ও না, চিত্রময়তা- কল্পচিত্রময়তা, বস্তু-অবস্তু-বস্তুগুণ। ছন্দের দোলনা পেন্ডুলাম- ছন্দ ভেঙে ফেলার অস্থির দোলনা্র সঞ্চালন, কথন-মিতকথন-সংহতকরণ, অলংকার-সাজ-সজ্জা-হায়া,  অলংকারহীন-নাঙ্গা নয়, নয়া-সজ্জায় আটপৌরে, বেহায়া নয়, শব্দ (Word)- শব্দ (Sound)- দৃশ্যতা-শ্রাব্যতা, ভাষা- বিভাষা-কবিতার ভাষা। সবমিলিয়ে এক ভ্রমণ, মানসের, মননের। কেন পড়ব না বলুন তো কবিতা! ছাব্বিশ বছর বয়সেই লিখেছিলাম— “কবিতা যে মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম, অনন্যা”।

কবিতা কেন লিখি?

এর উত্তরও ওই তিন রকমেরই হতে পারে। দেখা যাক।

অ্যাকাডেমিকঃ অনেকটা আগের মতো লাগতে পারে, তাই একটু ঘুরিয়ে বলা যাক। ‘জল পড়ে মাথা নড়ে/ পাগলা হাতির মাথা নড়ে’। শুনলে বা পড়লে নিজের মাথাটাও নড়ে। বিশেষত শৈশবে। ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই/ দীন-দুখিনী মা-যে আমার এর বেশি আর সাধ্য নাই’। শুনলে বা পড়লে, একটা কষ্টবোধে সামিল হয়ে পড়তে হয়। বিশেষত কৈশোর বা কৈশোরোত্তীর্ণ সময়কালে। ‘আমি কি ডরাই সখী ভিখারী রাঘবে?’ বা ‘তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?’ পড়লে বা শুনলে মনের গতিবিধি নানারকম হতে থাকে। বিশেষত প্রাক-যৌবনে। তো, এই তিনটি সময়কালেই পাঠ্যপুস্তকে পড়া এইসব কবিতা, যে দোলা, যে কষ্টবোধ, যে হিরোইজম, যে জিজ্ঞাসা তুলে ধরে মনে, যে ঘাত সৃষ্টি করে, তারই একটা প্রতিফলিত শক্তি সবার মধ্যে কাজ করে। কেউ কেউ সেই শক্তি নিয়ে সতেরয় কবিতার দুয়ারে যায় সভয়ে। যায় অনেকেই, কিন্তু ফিরেও আসে বেশকিছু। লেখে, ছিঁড়ে ফেলে, লুকিয়ে রাখে। বাকি কেউ কেউ হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে। এই প্রতিফলিত উচ্ছাস-আবেগ-প্রকাশেচ্ছাই তাকে কবিতা লেখাতে প্রেরিত করে। এর সঙ্গে অ্যাকাডেমির যোগ আছে। হতে পারে, ব্যক্তি আমির কবিতা লেখার শুরুয়াৎ এভাবেই।

ডিপ্লোম্যাটিকঃ খুব সহজ উত্তর। ক) কবিতা লিখতে পারি তাই কবিতা লিখি। খ) জীবনে কিছু কিছু জিনিস সামান্যই করতে পারি, তার মধ্যে কবিতা একটা। গ) জীবনে অনেক কিছু আছে, যা মোটেও করতে পারি না, এটা একটু-আধটু পারি বলে মনে করি, তাই লিখি। ঘ) না-লিখলে বেদ অশুদ্ধ হতো না বা বিশ্ব-সাহিত্যের কিচ্ছু যেতো-আসতো না। কিন্তু ওই যে, যদি একটু ক্যালি মারা যায়, একটু ঘ্যাম, একটু নাম জানাজানি। এই আর কি!

পোয়েটিকঃ এর উত্তর দেওয়া বা ব্যাখ্যা করা শুধু কঠিনই না, না-মুমকিন। বিশেষত এই ছোট্ট পরিসরে আর আমার মতন এক ছোট্টো কবিতাকারির। তবু সংক্ষেপে কিছু ইশারা-ইঙ্গিত। ওপরের বিষয়গুলো তো রইলই, তার সঙ্গে হয়তো এইসব। প্যাশান, একটা অবলম্বন, ব্যক্তি-জীবনের অনেক অপূর্ণ সাধ-আহ্লাদের মধ্যে একটা আশ্রয় খোঁজা, একটু নিরাময় খোঁজা; প্রতিমুহূর্তে জড়-জীবের সঙ্গে ঘর্ষণে-বিঘর্ষণে-মিথস্ক্রিয়ায়-জারণে-বিজারণে উদ্ভুত মানস ও মননের প্রতিভাস, আলো-অনালোর ঝলক, অনুভব-অভিজ্ঞতা-জ্ঞান-চিন্তা-চেতনার ঘাত-প্রতিঘাত ভাবে-ভাষায় প্রকাশেচ্ছা, শেয়ার করার প্রবণতা; সমাজ-সময়-মানুষ, তার ওপর নিসর্গ-প্রকৃতির প্রভাব, তার আনন্দ-দুঃখ-বিষাদ-ক্ষোভ-দ্রোহ-জিজ্ঞাসা-ভয়-ভালোবাসা-মহানন্দ-মুক্তি-মহামুক্তি; মানবমনের দশ-দশার ‘উন্মাদ’ বা ঘোড়ারোগ বা যশ-খ্যাতি লোভ; জীবনে এত বিচিত্রতা ভেদ, কিন্তু যাত্রা অভেদে; জীবনে এত ভ্রমণ নানা স্থান আর পরিসরে, তার সঙ্গে অদ্বিতীয় মানসভ্রমণ হয়তো মুক্তিপিয়াসি; এই সমস্ত কিছুর কাছ থেকে আত্মার আরাম চাই, স্ব ও মানুষের অন্তহীন জিজ্ঞাসার উত্তর চাই, পরতের পর পরত রহস্যে ঘেরা ব্রহ্মাণ্ড-সৌরলোক-পৃথিবী-প্রকৃতি— উন্মোচন চাই; সবই অন্তহীন, বিশাল-ব্যাপক, তার মধ্যে অতি-ক্ষুদ্র নিজেকে দেখা ভেতর-বাইরে, ফালাফালা করা, একটা সংবেদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাই হয়তো আমাকে কবিতা লিখতে বাধ্য করে বা আমার কোনো গত্যন্তর থাকে না। তাছাড়া প্রিয়সঙ্গ-ভ্রমণ-চর্চা-নিরন্তর চর্চা-কবিতাযাপন-আনন্দানুভব ইত্যাদিও বোধহয় কিছুটা উস্‌কে দেয় লেখার দিকে। “নিজের জন্য কবিতা লিখি” – এই বহুল কথিত আপ্তবাক্যে আমার বিশ্বাস নেই তেমন। লিখি যখন হ্যাংলামি না-করে পাঠকের দরবারে পৌঁছুতেও চাই।

উমাপদ কর। জন্ম ১৯৫৫, স্থান বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ। বর্তমানে কলকাতাবাসী। পদার্থবিদ্যায় স্নাতক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মচারী ছিলেন। যৌথ সম্পাদনা: ‘শ্রাবস্তী’, কর্মী: ‘রৌরব’ ইত্যাদি লিটিল ম্যাগাজিন। অল্পদিনের জন্য হলেও একসময় পারফর্মিং আর্টের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। নাটক, থিয়েটার, আবৃত্তি, ভাবনাট্য, নৃত্যনাট্য। অংশগ্রহণ করতেন বিতর্ক,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..