কবিতা হৃদয়ের ছত্রাক

মৌ মধুবন্তী
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
কবিতা হৃদয়ের ছত্রাক

“কবি কবিতা লেখে কারণ কবিতা কবির মস্তিষ্কের ভেতরে অনুরণন তোলে। কবিতা নিজেই লিখিত হয়, কবি উপলক্ষ্য মাত্র, বহিপ্রকাশের মাধ্যম মাত্র, কবির মনস্তাত্বিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কবিতা বেরিয়ে আসে নতুন ভুবনে চেনা কি অচেনা আঙ্গিকে”

–মৌ মধুবন্তী

প্রখ্যাত আমেরিকান কবি মায়া এঞ্জেলু তার প্রথম ও গুরুত্বপুর্ণ অটোবায়োগ্রাফী “I Know Why the Caged Bird Sings“বইতে লিখেছিল, ট্রমা থেকে রিলিফ পেতেই সে কবিতা লেখা শুরু করেছিল।

কবি ইলিয়ট ১৯০৬ সালে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছরের কোর্স শেষ করে ব্যাচেলর ডিগ্রী নিয়েছিল আর্টসে। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক প্রথিতযশা কবিদের কবিতা, দর্শন ও সাহিত্যের সমালোচনা দ্বারা কবি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এই তিন প্রভাবই তার ক্যারিয়ারে কবিতাকে যুক্ত করে দেয়।

আমার ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন এবং একেবারেই ভিন্ন।

একজন মা যেমন গর্ভধারণ করলে তার একটা প্রসব বেদনা থাকে, তেমনি লেখার চিত্রকল্প যখন ডালাপালা মেলে মনো জগতের অভ্যন্তরে তখন সেই লেখা গুলো নিজেই প্রসবিত হয়। কবিতা কেন লিখি এই প্রশ্নের জবাব না দেবার স্বাধীনতা সব কবির আছে, আমারও আছে। কিন্তু যখন একটা বৃহত্তর উদ্দেশ্যে এই প্রশ্ন করা হয় কোন ক্রেডিবল এবং একাডেমিক  আলোচনার জন্য, তখন উত্তর দেয়াটার পক্ষে  কিন্তু সামাজিক একটা দায়বদ্ধতাও তৈরী হয়।

প্রাইমারী স্কুলে থাকতে দেয়াল পত্রিকায় লেখার জন্য গল্পই লিখতাম। সে লেখা চলছিল বেশ প্রাইমারী থেকে হাই স্কুল পেরিয়ে – ইডেন কলেজের হোস্টেলে যাবার আগ পর্যন্ত। আর কবিতা পড়তে খুবই পছন্দ করতাম। নিজের চেনা পরিমণ্ডল ছেড়ে বাবা মা ভাই -বোনকে ছেড়ে হোস্টেলের অনাদরের জীবনে একসময় ছন্দেরা আমাকে ঘিরে ধরে। একেকদিন আবিষ্কার করি যে আমি অন্তমিল দিয়ে কিছু কিছু লাইন লিখছি। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গল্পের চেয়ে ছড়া কবিতা বেশী বাঙময় হয়ে উঠছে। আমার চার জন রুমমেটের মধ্যে সবাই সিনিয়র আর ছাত্র শিবির করত। সবাই ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট,  তাদের কাছ থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে আমি সারাদিন একাকী নির্জন কোণ খুঁজে বেড়াতাম। প্রচণ্ড নিঃসঙ্গতা বোধ আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরে রাখতো। আমি আগের মত গল্পের বই পড়ার কোন সুযোগ পাই না। কেবল মাত্র ক্লাসের বই পড়ে সময় কাটে না। স্কুলে গল্প লিখলেই দেয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। একটা আপন বলয় ছিল। ইডেন কলেজের গণ্ডি অনেক বড়। এখানে খাপ খাওয়ানো কঠিন, কারন শাসনের কড়া চাপে আমার অস্তিত্ব বিপন্ন মনে হতে লাগলো। রুটিনময় দিন শুরু। সাদা ইউনিফর্ম পরা নিয়ম আর তাও সালোয়ার কামিজ। আর এটাই আমার ভেতরে অগ্নি বলয় তৈরী করতে থাকে। আমি অবিরাম চেষ্টা করেছি যেন সালোয়ার কামিজের পরিবর্তে সাদা শার্ট-প্যান্ট পরতে পারি। প্রশাসন ও হাউজ টিউটর কিছুতেই তার অনুমতি দেবে না। একদিন দেখি জিনিয়া , সৌদিতে যার বাবা মা ডাক্তার সে শার্ট প্যান্ট পরে ক্লাস করছে। হোস্টেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার বুকের ভেতরে একদলা প্রতিবাদ দানা বেঁধে ওঠে। আমি সেই কষ্ট আর বৈষম্যকে মেনে নিতে পারছিলাম না। কোন এক বিকালে আমি বই খাতা নিয়ে হোস্টেলের সিঁড়িতে বসে পড়ছি। আর কিছু লেখার জন্য আঁকিবুকি করছি। একসময় দেখি কিছু একটা লেখা হয়েছে, আমার ভেতরের  প্রতিবাদের শব্দে আর দাবির অক্ষরে কিছু লাইন মূর্ত হয়ে উঠেছে। আমি বার বার পড়ছি আর কাঁদছি। দিন তারিখ মনে নেই এখন আর । আমি ডায়েরী কিনে দিতে বললাম আমার বাপীকে। সেই নীল কভারের ডায়েরীতে আমি যা লিখতে মন চায় তাই লিখি কিন্তু সেগুলো আর গল্প হয়ে ওঠে না। অশ্রুসিক্ত কষ্টশব্দের বাষ্পীয় উদগীরনে আমার  নীল কভারের ডায়েরী ভরে ওঠে। বহু যত্নে সে ডায়েরী আমি লকারে তালাবন্ধ করে রাখি, যেন কেউ পড়তে না পারে । কিন্তু মনের ভেতরের শব্দেরা তালাবদ্ধ হয়নি কখনো।

তারপর একদিন জানতে পেলাম, গল্প লেখায় সামাজিক অনেক দায়বদ্ধতা থাকে, চাইলেই মনের সব কথা গল্পে লেখা যায় না। কিন্তু কবিতার আকাশ উন্মুক্ত এবং নিজের ভেতরের গভীর অতল থেকে নিংড়ে নেয়া অনুভূতি প্রকাশের জন্য কবিতার ক্যানভাস অসীম। উদার। কবিতাকে বারে বারে পড়া যায়। অনুষ্ঠানে কবিতা পড়া যায়। আবৃত্তি করা যায়। ক্লাসে প্রতিযোগিতায়ও কবিতার স্থান নাচ গানের পরেই আসে। গল্প সেখানে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে সুনির্দিষ্ট কোন পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের জন্য। তখন আমার বয়েসে গল্পের বই হবে সেটা ভাবতেও পারিনি। কিন্তু ইত্তেফাকসহ অনেক নিউজ পেপারের কবিতা পড়তাম আর ভাবতাম কোন একদিন…। কিন্তু কিভাবে? সেই কোন একদিন আর আসেনি আমার বাংলাদেশের যাপিত জীবনে।

আমি লিখেই গেছি।  সবার অগোচরে। একান্তে। মহুয়া বৃন্তে নিজের কবিতার ফুল নিজেই ফুটিয়েছি, ঝরেছি হারিয়েছি, হারিয়ে কেঁদেছি। ইডেন কলেজের দেয়াল পত্রিকায় একটি কবিতা দিয়েছিলাম। আমার রুমমেটরা জানলো আমি কবিতা লিখি। তখন তারা পড়তে চাইলো। আমি তীব্রভাবে অস্বীকৃতি জানালাম। কারণ তারা আমাকে আদরে ভালোবাসায় মুগ্ধ করে শিবিরের দলে নিতে চাইতো। একদিন ওদেরকে বলেছিলাম, আমাকে তোমরা শিবিরেও নিতে পারবে না আর শয়তান ও আমাকে তার দলে নিতে পারবে না। আমি মানুষ, এটাই আমার পথ। আমি তাদের ভালোবাসা কখনোই গ্রহন করতাম না। একাই নীরবে একটি বছর পার করার জন্য দিন গুনতাম। আমার ডায়েরী আমার কাছে আরো নিরাপদ করতে আমি সচেষ্ট থাকলাম। অবশেষে তারা চারজন, পরীক্ষা দিয়ে হোস্টেল  ছেড়ে দিয়েছিল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বন্ধুদের আনাগোনা শুরু হলো আমার রুমে। আড্ডায় গানে ছবি তোলায় আমার সেই নির্জীব কক্ষ ভরে ওঠে। এই সময় পরিচয় হয় অনার্সে পড়ুয়া  কয়েক জন বড় আপুদের সাথে। তারা বাংলা বিভাগের ছাত্রী। শুরু হয় তাদের সাথে কবিতা আর সাহিত্যের আলোচনা। তাদের কাছ থেকে বই পাই । আনন্দ বাড়ে। আমার মুক্ত জীবনের স্বাদ একটু একটু করে পেতে থাকি। আম্মার জন্য কান্না ক্রমশঃ বন্ধ হয়। ইউনিফর্মের যুদ্ধ শেষ হয়নি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আমি হোস্টেলে আমার শার্ট প্যান্টের পোশাকে উৎফুল্ল হতে পেরেছি। টপ্স,  স্কার্ট পরতে পেরেছি। ক্রমশঃ কবিতাও দূরে চলে যায়। আমিও পরীক্ষা দিয়ে যখন বাসায় আসি , তখন ভার্সিটিতে ভর্তির জন্য প্রস্তুতির প্রবল চাপ। কবিতা আমার ডায়েরীতে বাসায় আলমারীতে বন্দী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পর্যায়ে এসে মনে হলো আমি আবৃত্তি শিখবো। ভর্তি হই মুক্তকন্ঠ আবৃত্তি একাডেমীতে। অন্য কবিদের কবিতাই আবৃত্তি করি। নিজের কবিতা যে পড়া যায় তা আর বুঝিনা।  আবার লেখা শুরু হয় যখন আবৃত্তিকার বন্ধুদের সাথে আড্ডা শুরু হয়। গল্পের পথ একদম কানাগলি হয়ে গেছে। মাথায় চিন্তা স্কলারশীপ পেতেই হবে, হায়ার এজুকেশানের জন্য বাইরে যেতে হবে। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে কবিতা মাথার ভেতর গুঁতো মারতো। সেই ডায়েরী সম্বল। মা যেদিন জানতে পারল কবিতা লিখি, খুব রাগ করল। কেন করল তার উত্তর কোনদিন পাইনি। যদিও সেখানে কোন প্রেমের কবিতা ছিল না। সময় পার হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে আমেরিকায় আসি পড়াশুনা করতে। আসার ছয় মাস পরেই আমার বাপী আমাদেরকে ছেড়ে চলে চায়। আমার ডায়েরী রয়ে গেছে বাংলাদেশে আমার আলমারীতে । আমি কবিতার কাছেই নিজেকে সঁপে দিলাম। বুক ভরে যখন কান্নার আগুন উগরে বেরুতো তাকে আমি শব্দের জলে কবিতার নদীতে ভাসিয়ে দিতাম।

চারিপাশ শুন্য। আমি একা। আমার কাছে কিংবা চারপাশে যেন কেউ নেই। প্রেম নেই ভালোবাসা নেই। নেই কপালকুন্ডলা কিংবা চন্দ্রাবতীরা।

কাঁধে সংসারের দায়িত্ব,মা আর ছোট ছোট ভাইবোন। আমার উচ্চ শিক্ষার পথ বন্ধ করে কাজ করি আর কবিতার গায়ে নতুন নতুন চিত্র আঁকি। নিউইয়র্কের বাঙালি পত্রিকার কৌশিক আহমেদ একদিন বললেন, ভাবী , কবিতা লেখেন  আমার পত্রিকার জন্য। আকাশ থেকে পড়লাম। আমি বললাম আপনি কি করে জানলেন আমি লিখি? তিনি বললেন, জানিনা, কিন্তু লিখিয়ে নিতে চাই। আমার বাপীকে নিয়ে লেখা কবিতা , সোনালী রোদ্দুর বাপী এই কবিতাটি দিলাম সেই পত্রিকায় ছাপা হলো। এই দিয়েই বলা যায় আমার কবিতা কবিতা জীবন শুরু। স্বভাবগত কারনেই আমি বেশী বেশী প্রকাশে ব্যস্ত হইনি। কবিতা কেউ লিখিয়ে নিয়েছে আমাকে দিয়ে মুক্ত স্বাধীন চেতনা থেকে, আমার প্রতিবাদী স্বাধীন চেতনাকে দিয়ে। কবিতাই পারে যথার্থ প্রখরভাবে নিঃসংকোচে সময়ের দাবীতে আওয়াজ তুলতে আর মানুষের চেতনায় কঠোরভাবে আঘাত করে অন্যায়ের আগল ভাংগতে। গান আর কবিতা দুটোই সমাজ পরিবর্তনে বিরাট এক হাতিয়ার বলে আমি মনে করি। কবিতার কল্পনাকাশে আমি অবাধে ডানা মেলে উড়তে পারি। রোদ পোহাতে পারি। চাইলেই আমি সমুদ্রের ভেতরে আরেক সমুদ্র বাস করতে পারি। দিগদিগন্তে সুর্যকে উঠাতে পারি , নেভাতে পারি।

নারী আমি ,মেয়ে আমি এই সত্যকে মানুষের মত করে প্রকাশ করতে পারি। আমি অক্ষয় অব্যয় হতে পারি। আমি কমলাকান্ত থেকে যেকোন অমৃত হতে পারি। আমি ধর্ষকের শিশ্ন কাটতে পারি,ছিন্ন করতে পারি সমাজের নোংরামীকে, উড়াতে পারি অনেক উঁচুতে সত্যের পতাকাকে। যে কোন পরিস্থিতিতে কবিতার মশাল জ্বালাতে পারি।  আর লেখা তো ইচ্ছে করে বসে বসে লেখা যায় না। লেখার জন্য মন ও মগজ একটি কৃষিভূমি। সেই ভূমিতে অনেক আগাছার মাঝে কিছু কবিতা হয়ে সুগন্ধি ছড়ায়।তার জন্য কখনো কখনো জৈবিক সার ইত্যাদি দিতে হয় ব্যাপক পড়াশোনার মাধ্যমে। যে মা একদিন কবিতা লেখার জন্য বকা দিয়েছিল, সেই মা-ই ২০০৬ সালে একদিন বলেছিল, তুমি তো কবিতা লেখো কবিতার বই বের করো না কেন? আমি আবেগে আপ্লুত এবং কান্নায় ভেংগে পড়ে বলেছিলাম, মা আমি দেশেই আসি না। আমি কাউকেই চিনি না দেশে।কি করে কবিতার বই বের করবো? মা, উত্তর দিয়েছিল খুব ভালোবাসার সুরে, আমি কি হেল্প করতে পারব? মায়ের সহযোগীতায় আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়, রক্ত নদী একা। মা ছাড়া আসলে জীবন কতটা অর্থহীন, আমি সেদিন বুঝেছি। স্বাভাবিকভাবেই মায়ের হাত ধরেই আমি আসি কবি মহলে। এবং পথ চলা শুরু। আমার মাকে সেদিন সব রকম সহযোগীতা করেছিল আশির দশকের দাপুটে কবি বদরুল হায়দার। আজো তার সহযোগীতা অটুট রয়েছে।

ছোটবেলায় কবিতা পড়তাম ক্লাসের পড়া হিসাবে। আলোচনার জন্য। পরীক্ষায় কবিতা লিখতে হতো। দুই লাইন কবিতা তুলে দিয়ে প্রশ্ন করা হতো কোন কবির লেখা, কোন কবিতার লাইন ইত্যাদি। ভালো লাগার দিক ছিল মুখস্ত করলে একটা দোলা দিয়ে যখন তখন আওড়াতে পারতাম।

অতপর বড় হতে হতে বুঝলাম, কবিতার ভেতর দিয়ে সমাজের ভেতরে আরো এক সমাজকে দেখা যায়। প্রতিবাদের মশালে যে আলো জ্বলে তার আলোতে আলোকিত হতে  পারি এবং অনুচ্চারিত ভাবকে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করবার অবাধ স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে পারি। কবিতাকে কন্ঠের আধার হিসাবে ধারণ করতে পারি। কবিতার কৌরব শিখা অন্তরের ভেতরের কালোকে,  কষ্টকে দূর করে। কবিতা হলো পুনঃপৌণিক। কবিতা হলো বেশুমার বেহুলার আভরণ, মহুয়ার গীত আর চন্দ্রাবতী, খণার উজ্জ্বল কীর্তন, রবি ঠাকুর কিংবা জীবনানন্দ ,নজরুলের ভীমনাদ।

এমনি করে চলতে চলতে আজ এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি যে নানাদিক থেকে নানারকম কবিতাপত্রিকা থেকে ডাক আসে, নানাবিধ বিষয় ভিত্তিক কবিতা দিতে। আরো গভীর এক পরাবাস্তব, বাস্তব, ট্রাজিক, ছান্দিক, এবং নানাবিধ কবিতার কর্মকারদের সাথে ঘটে পরিচয়। এখন কবিতাই পথে করে দেয় কোথায় গিয়ে বসতে হবে, কোথায় কেমন করে কার সাথে কথা বলতে হবে, বিশ্বের তাবৎ আনন্দযজ্ঞের ভেতরে কবিতা আমাকে টেনে নিয়ে যায় তার উদ্দীপ্ত আহবানে। ভূগোলের ছাত্রী বলে আমি যেমন পৃথিবীর উপরিভাগের স্থান এবং কার্যকারণকে বুঝতে পেরেছি, তেমনি কবিতার প্রেমিকা হয়ে বুঝতে পেরেছি ভুগর্ভে

ভূগর্ভস্থ সকল রাগ অনুরাগ ও ঘটনাদি। কিন্তু একজীবনে কবিতার সব সুধারস নিংড়ে নেয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয় বলেই আমি মনে করি। এক জীবনের সময় কবিতার পৃথিবী ভ্রমণ করবার জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই এক লাইনের কবিতা থেকে পাতার পর পাতার কবিতায় নিমগ্ন হবার সময় আমাদের খুব কম। তবুও আমরা আজকাল ইন্টারনেটের বদৌলতে অনেক কিছুই পেয়ে যাই হাতের কাছে, নখের পাশে, ঠোঁটের উপর, চোখের মণিকায়। তাই কবিতা পড়া হয়ে উঠেছে রক্তের ভেতরে লৌহকণিকা। বাঁচতে শেখায় কবিতায়। কবিতা অক্সিজেন দেয় প্রাণে। মন খারাপের প্রিয় বন্ধু কবিতা। এই যে করোনার ব্যাপক মহামারী, চারিদিকে মড়ক, তবুও আমরা কবিতা পড়েই নিজেদের মনকে স্বচ্ছ রাখি। এটাকে বলে মেন্টাল ক্লেঞ্জিং, ডি-টক্সিফিকেশান। তাই ভেসে যাই কবিতার স্রোতে আনন্দে, মহানন্দে ও গভীর আবেশে। আমি একজন বাচিক শিল্পী বলে কবিতা পাঠের সাথে সাথে কবিতার প্রতিটি শব্দ আমার কাছে অবচেতনেই এক সুন্দর শিল্পের প্রদর্শনী করে। আমি  কবিতার পরতে পরতে হাঁটি, খেলি, গান গাই ও নতুন নতুন নকশা আঁকি। আবার গীতিকবিতা রচনা করি বলে সুরের দোলায় আমি আন্দোলিত হই অনায়াসে। এক জীবনে সব পাওয়া যায় না বলে সুরের উপর দখল নেই। তাই গেয়ে শোনাতে পারিনা কিন্তু সুর আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কবিতার ঘরে বাস করি বলেই মৃত্যু আমার কাছে ভয়াবহ নয়। কবিতার মত সরল পথ মৃত্যু।

আর কবিতার জন্যই পৃথিবীর পথে প্রান্তরে ছুটে বেড়ানো। নতুন নতুন মানুষ। নতুন উন্মেষ।  কবিতায় তাদের মোড়ানো। নিজের দেশ নিজের কৃষ্টি এবং সর্বোপরি নিজের অস্তিত্বের প্রকাশ এ সব কিছুই কবিতার আয়নায় অতি সাবলীল ভাবে দেখা কেবল এ অদৃশ্য জগতেই সম্ভব।

মৌ মধুবন্তী। কবি ও উদ্যোক্তা। পঁচিশ বছরের বেশী দেশ ছেড়ে উত্তর আমেরিকায় বাস। আবৃত্তি ধারণ করেন অন্তরের অন্তঃস্থলে। কবিতা লিখেন বাংলা ও ইংরেজি দুই মাধ্যমেই। তিনি মনে করেন, কাব্য ছাড়া কবির কোন পরিচয় থাকেনা। তাই আত্ম সমালোচনায় প্রত্যয়ী। কবিতাকে ভালোবেসেই...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..