কবির ‘তা’ তরিয়ে পাঠক কবি

রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
কবির ‘তা’ তরিয়ে পাঠক কবি

কবি নামে এক অদ্ভুত জীব এতো বড় আকাশের নীচে বসত করেও একটা নিজস্ব আকাশের খোঁজে তার প্রথম জীবন থেকে লাফ দেয় দ্বিতীয় জীবনে আর এই লাফ দেওয়ার প্রসেসটা লিখে রাখে কিছু লিপির বন্ধনে। পাঠক নামের অদ্ভুততর আর এক জীব কবির দেওয়া এই ‘তা’-কে কবিতা নামে ডেকে ‘তা’ দেওয়া শব্দলিপিতে তরিয়ে যায়। ফলত সম্পাদক নামের অদ্ভুততম জীবটি তখন ওই কবি আর পাঠকের কাছে জানতে চায় কেন তারা কবিতা লেখে, কেন তারা কবিতা পড়ে। আমি তো কবিতা লিখিই না, তাহলে আর প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় রইল না। তবে হ্যাঁ, পড়ি। আমার এই ভেরেণ্ডা ভাজা জীবনের গয়ংগচ্ছতায় আমি কিছু বিস্ময় চাই। কবি নাকি শব্দের বিস্ময় টুকে রাখে তার নির্মাণে। তাই তার লিপিগুলো হাতড়াই। বিজ্ঞানী বলে সমস্ত স্পেসটাইম জুড়ে নাকি পাতা আছে সুপারস্ট্রিং এর ফাঁদ। আর এই বিস্ময় তারই একটা ভাইব্রেশনাল মোড। আমি কবিও নই, বিজ্ঞানীও নই। আমি শুধু লিপির অন্তর খুঁড়ে নৈঃশব্দ্যের ঘাটে এসে পৌঁছলে শব্দের ওই টুং ধ্বনিটা শুনতে পাই। মুখ ফিরিয়ে নিজেকে দেখি। নেই কাজ তো খই ভাজতে ভাজতে ইতিমধ্যেই আমার মাথার ভেতর আমার নিজস্ব পৃথিবীর একটা মডেল তৈরি করা আছে। ফলত আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের তোয়াক্কা না করেই ওই টুং শব্দটা চেতনার অন্তরমহলে গেঁথে তোলে একটা মুহূর্তের সত্য। দোহাই পাঠক, এই ‘সত্য’ শুনে মিথ্যে ধাক্কা খাবেন না প্লিজ। এ চিরসত্য ধ্রুবসত্য ইত্যাদি নৈতিকতার পোঁ ধরে ঘোরানো সিঁড়ির প্যাঁচানো ধাপে হড়কায় না। এ শুধু এক স্পন্দন, একটা মুহূর্তের সেন্সেশন। অনন্ত কণাতরঙ্গের চিরন্তন অনিশ্চয়ে সে দোল খায়। যতই তাকে যুক্তির তন্তুজালে গেঁথে তুলতে চাই, ততই সে বিযুক্তির নিঃশব্দ কান্নায় রহস্যময় হয়ে ওঠে। আর সেই নৈঃশব্দ্যের ভেতর জন্ম নেয় সম্ভাবনার বিপথগামী সংবাদ বিসংবাদ। সম্ভাবনাগুলো ব্যতিক্রম। ক্রমভঙ্গে যেখানে পৌঁছতে চাই সেখানে একটা মুখের আদল। খুব যে পরিপাটি তা নয়। অগোছালো। কিছুটা বেহিসেবি রং এখানে ওখানে। তো সেই সম্ভাবনার সেতু গড়ে আমার এই অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ। ভ্রমণেরও কিছু স্তর থাকে। নিজেরই তরঙ্গে ভাঙে; গড়ে। স্তরের কিনার জুড়ে ঠিকরে ওঠে বর্ণ। ঘনিয়ে ওঠে ভাঁজকরা ভ্রমণের রহস্যসকল। অ্যাক্সানের পোটেনশিয়াল গাঢ় হয়ে ওঠে রিঅ্যাক্সানের সংশয়ে। তো কোনো ঢিসুম ঢাসুম ছাড়াই এসব অ্যাক্সান ট্যাক্সান চলতে থাকে নিঃশব্দে আর আমি বসে বসে নৈঃশব্দ্যের শব্দ শুনি। শুনতে শুনতে ছবি আঁকার কৌশলে দুটো চোখ। ভ্রূমধ্যে চাঁদ হারানো বিন্দি। নাহ্‌, নিটোল বিন্দির কথা ভাবিনি কখনো। পল পল বিষাদেরা হুকুমজারি করলে, একটু রঙের কথা ভাবি। ভাবনাঘরের জানলারা তো পর্দানশীন নয়। সেখানে বিন্দির হ্যাঁ বা না নিয়ে কোনো বিসংবাদ নেই। বিন্দির ঠিক নীচেই ঢালু পথ; গড়িয়ে গড়িয়ে ঠোঁট পর্যন্ত। দুটো রেখা টেনে হাসির কথা ভাবলেই কার্টুন হয়ে যায়। তাই বিষণ্ণ রং খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতে ধূসরেই হাত ঠেকে যায়। কিন্তু ধূসর দিয়ে সমস্ত বিষণ্ণতায় রং ধরে না। আবার রেখাতেই ফিরি। ফিরতিপথে ঠোঁটের সম্ভাব্য রেখার বালুতে একটা পাখি নামাই। তার বাঁকা ঠোঁটে বিজনরহস্য। আমি কোনো পারাপার দেখতে পাইনা। শুধু আমার নাপারাগুলো থিতু হয় অনুভবের পারায়। মেপে নিই নিত্যদিনের বহমান জীবনের নির্যাস। হয়তোবা আপন সত্তারই নির্যাস। ভিন্ন মাপের। ভিন্ন আকারের। ওয়েভপার্টিক্‌ল ডুয়েলিটির শর্ত যেনবা। কখনো প্রকাশিত হয় আলোর মতো। হাসি কান্নার তরঙ্গে। কখনোবা ঠিকরে ওঠে রেণু রেণু বিষাদকণার তুমুল গতিতে। আর পাখিটা শিস দিয়ে উঠলেই দুএকটা শব্দ গড়িয়ে পড়ে আমার মনখারাপের বুকপকেটে। আমি আদরে তুলে নিই আর জমিয়ে তুলি নীল ডায়েরির ভাঁজে। পাঠক্রিয়ার বহির্দ্বারে, পাঠপ্রতিক্রিয়ার অন্তরমহলে। তো সেই মুহূর্তের গায়ে বসানো শব্দেরা যখন সাদা পাতায় কালো কালো অক্ষরে সেজে ওঠে, তখন বন্ধুজন তাকে আমার কবিতা বলে। এতে আমার কোনো বাহাদুরি নেই, আছে কেবল বন্ধুজনের বদান্যতা। আমি কবি নই, তাই প্রতীক টতীক, অলংকার ফলংকার চেতনার অব- অতি- কোনো ফাঁদেই ডরাই না। শুধু মনের কথা বলি মনকে আর তোমার আর আমার মাঝে চলমান ওই পথকে। কারণ আমি পথিক মাত্র। পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিপথগামী জীবনভোর। গড়িয়ে যাই জড়িয়ে যাই অচিন শব্দের উৎসবে; বোধের জানলা খুললেই কাছে ডাকে ইশারায়- আয় আয়। তো সম্পাদক মশাই, আপনি যদি এইসব ছাই ভস্মকে কবিতা টবিতা ভাবতে চান আর আমার এই গপ্পটার ভেতর তার হয়ে ওঠার কারণসুধা খুঁজে পান, তবে তো আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েই গেলেন। তো আমি তবে অলমিতি জানিয়ে আলবিদা কহিলাম।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ