কলম্বাসের চোখ

আবদুস শহীদ
কবিতা
Bengali
কলম্বাসের চোখ

কলম্বাসের চোখ

হৃদয়ে বসন্ত নিয়ে খুঁজে ফেরে কলম্বাস
আকাশ আর সমুদ্রের বিশালতায় হয়েছিল ক্লান্ত,
সাদা মেঘের মেঘালয়ে সপ্তডিঙ্গার ক্লান্তি নিয়ে
থমকে দাঁড়ায়,অনুভূত হয় কোথাও প্রানের স্পন্দন।

হয়তো এখানেই উত্তরণের শেকড়
হয়তো এখানেই উজ্জীবিত বসন্তের স্থবিরতা
এখানেই জন্মেছিল মৃতসঞ্জামনির উদ্ভাবক উদ্ভিদ।
এখানেই বাল্মিকীর লবনাক্ত ঘামের গন্ধ
ঝড়াপাতার মর্মরে একাকার হয়ে আছে
একাকার হয়ে আছে আঙ্গুরবালা সঙ্গীতের মুর্ছনা।

এই তো সেই পাহাড়শৃঙ্গ যেখানে থমকে দাঁড়িয়েছিল
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।
এখানেই মেক্সিম গোর্কির গল্পের নায়ক নিজের
হৃদপিন্ড মশাল জ্বালিয়ে অন্ধকার অরন্যে পথ দেখিয়েছিল
বিপুল সংখ্যক শরণার্থী মানুষেরে।

এখানেই কেন শরণার্থী শিশুরা হবে নির্যাতিত
পরিবারহীন বন্ধাত্বে সভ্যতার মাপকাঠিতে
চরম বর্বরতায় দিগম্বর হবে মানচিত্র
কলম্বাসের চোখে কেন নিপীরনের শীতল বারিধারা।

 

অনিন্দ্য মানুষীরা

অনিন্দ্য একটি ম্যুরাল চিত্র আঁকতে গিয়ে
ক্যানভাসে তোলে দিলাম তুলির আঁচড়
হয়েগেল উজ্জ্বল গ্রীবায় গোলাপী যোগল ঠোঁট
দু পা এগিয়ে গেল পুরুষালী ঘর্মাক্ত শরীর
উষ্ন আবেগে স্থবির হলো দুটি প্রানের ষ্পন্দন।

সূর্যমূখী বুকে নৈঃশব্দ্যে বইছে শ্বাস প্রশ্বাস
হারমোনিয়ামের রীডে স্বরলিপি সারে গামা পা
স্বপ্নের অবসাদে সূর্যমূখী হয়ে ওঠে গোলাপ
কখন যে ভোর জাগে ব্যাকনির কোণে
মেকআপ এর স্ক্রিনশর্ট নিয়ে অপ্সরী সৌন্দর্যের
মধ্যে বিলীন হয়েগেছি।

কোথাও নেই কোন দুঃখবোধ শুধুই উল্লাস
প্রত্যক্ষ শতভিষা
সন্ধ্যানর আবছায়া ভেদ করে খন্ডিত জ্যোৎনায়
চিত্রার্পিতের মতো দেখায় যেন এক অনন্ত কালের মানুষ।

 

দুঃখগুলো ফিরিয়ে নিলাম

তোমায় দিলাম সূর্যোদ্বয়ের নতুন এক সকাল
শিশির ভেজা তেপান্তরের সবুজ অঙ্গিনা
তোমায় দিলাম কাকাডাকা ভোর রঙ্গীন প্রজাপতি
পাহাড় ঘেরা ঝরনার কলতানের সজীব করা সাথী।
আকাশ মাটির বিস্তার্নতা করেছি তোমায় দান
তোমায় দিলাম ভরা জ্যোৎনায়য় হৃদয়ের সম্মান।

দিকদিগন্তে ছড়িয়ে দিলাম ভালবাসার আবেশ
তোমায় দিলাম শ্বশত বাংলার সর্ষে ফুলের রেশ
জল ডাংগায় ডাহুক ডাকা নিশিতে মেঘের ডাক
তোমায় দিলাম জর্জ হ্যারিসনের বাংলাদেশের বাক।
আশৈশব দেখা রঙ্গীন সার্টে জড়ানো তোমার বুক
তোমায় দিলাম রবিশংকরের সেতারের মৃদু সুখ।

কথাগুলো ফিরিয়ে দিলাম সাথে যে সম্মান
তোমায় দিলাম হাডসন আর সুরমার কলতান।
এতকাল একাই আছি সব্সম্মানে উঁচু করে বুক দিলাম সব কটা জানালা খুঁজে নাও সুখ।
বোতাম খোলা হৃদয় দিলাম বুলেট বিদ্ধ ছাতি তোমায় দিলাম পতাকার সবুজ আঁধারে প্রদীপ বাতি।

 

খেয়ালী বসন্তে

ধূসর নগরী ছেড়ে বহতা জলধারায় তাঁকিয়ে দেখি
ফাগুনের রাতে আকাশ আবারও ঝুলে পড়েছে মেঘে
দুধ সফেদ জ্যোৎনায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর
ঝরাপাতার বৃক্ষের ডালে নিস্তব্ধ অপরূপ নিসর্গ।

কেউ জানেনি এভাবে দিন গুলো ভয়ংকর হবে
মাটি আর কংক্রিটের মুখোশ পড়ে ছুটে আসবে
পরিযায়ী পাখীরা হাজির হবে কোলাহলের শহরে।
এরই মধ্যে নেমে এলো সাইবেরিয়ান বালি হাঁসেরা
খেয়ালী বসন্তের ছায়াতলে।

ওদের সোনালী ডানা থেকে সদ্য তৈরিকরা
আশ্রয় শিশির গুলির ওপর ঝরে পরতে থাকলো
শুকনো কৃষ্ণচুড়া ফুল,শর্ষের বাসন্তী পাপড়ি।
শূন্য পাকস্থলীটা ঝাপটে ধরে বলে
তুমি জলখাবারের জন্য ক্ষুধার্ত,সুরের মুর্ছনায়
ওরা ধীরে ধীরে ভরে দেবে অঞ্জলি,বলবে তুমি না চাইলেও
ফাগুন তো আসবেই।

সংক্রমিত রক্তের গন্ধে জেগে ওঠে শহরে
এক আধমরা গুজব
সুখ ছুঁয়ে যায় কালোগোলাপের পাপড়িতে
কুঁড়ি ঝরে পড়েছে নান্দনিক বাগানে
তবুও নিজেদের বিরুদ্ধে কেউ কেউ দাঁড়ায়
নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার মূহুর্তগুলোতে কথা বলতে
থাকে অদৃশ্য পাথুরে কণ্ঠস্বরে।

 

চেতনায় প্রতিচ্ছায়া

আহত হৃদপিন্ডের আড়ালে ব্যথাতুর দুঃখ নিয়ে
তপ্ত কংক্রিটের আস্তরণ গায়ে মেখেছিলে সেদিন
পাতা ঝরার নির্মমতায় বৃক্ষের আকুতি শুননি বলে
ধূসর বর্ণের হৃদকমলে ছুঁয়ে যায় কত যাপিত সকাল।

যদি পারো স্মৃতির আলপনা এঁকেদিও বাতায়নে
আমি এখানও একা,একাই দৌড়াচ্ছি নীল পথ ধরে।
আমিতো বলিনি মরিচিকা হয়ে বিচরণ করছি
জনাকীর্ণ জঙ্গলের পথ ধরে।

আমি কখনো একমাত্র তারা হয়ে দৌড়াচ্ছি
আকাশের নিলিমায়,যদি পারো ভেজানো খিড়কিতে
খটখটানি শব্দ তুলে তোমার উপস্থিতি জানান দিও
আমি অকৃতিম দৃষ্টান্তে বাড়িয়ে দেব যুগলবন্দি হাত।

সময়ের ব্যবধানে গোধূলির উজ্জ্বলতা ম্লান হলে
সন্ধ্যার রিষ্টি কোলাহলে আঁধার মুখ লুকাবে আলোর পেছনে।
উত্তর দিলনা কেউ,কোথায় আলো আর কোথায় আঁধার।
এলোমেলো ছন্দের পংতি গুলো চলতেই থাকে নিরন্তর।

 

একজন সুহৃদের কথা

আবছা আলোয় জ্বলজ্বল করছে ভবিতব্য
আমরা ছিলাম এমনই দু জন যাদের কোন দল নেই
ছিলনা কোন ইযম
প্রোগ্রেসিভ বললে ও বেমানান রিআ্যকশনারি বললেও
হবেনা বলে।

অবাক হয়ে মানুষ গুলো তাকাচ্ছে আমাদের দিকে
মাথাটা নামিয়ে নেবার ছলে দ্রুত ছুটে চলা
ফোঁটা ফোঁটা বাতিজ্বলা শহর।
গন্ধরাজ গাঁদা ফুলের নিবিড় ছায়াতলে
আমাদের চারচালা ঘরের বারান্দা
এখানেই শেকড়।

আজ আমি লিখবনা আটলান্টিকের সূর্যাস্তের কথা
আমি তো লিখবনা নিউইয়র্কে র তুষারপাতের কথা।
লিখবনা লাল চুলওয়ালা রোমের কোন রমনীর কথা
লিখলাম শুধু একজন অন্রঙ্গ মানুষের কথা
যাকে ঘিরে দু জোড়া চোখ আন্দোলিত হতো সদাসর্বদা।

 

বৃষ্টি যেখানে একা

সম্ভাবনার দিনগুলো আমাকে ইশারায় ডাকুক
সার্বজনীন উৎসবে মৃত্তিকালোকে সাড়া দেব
সার্থান্বেষি মালিকানা থেকে অব্যাহতি নেব।

কাকনের রিনিঝিনির মুর্ছনায় সাড়া দেব
আটপৌরে শাড়ির বর্নিল আহবানে সাড়া দেব
বহতা নদীর জলে পূর্ণিমার ঝিলিকে সাড়া দেব।

স্বপ্নের বিভৎসতায় আড়মোড়া ভেঙ্গে সাড়া দেব
কারো শূন্যতা ভরা আঙ্গিনায় নির্দিধায় সাড়া দেব
রঙ্গীন ব্যালকনিতে স্মৃতির পদচারণায় ভরে দেব।

শিল্পীর কারুকৃত্যে রঙ্গীন আলপনা এঁকে যাব
রাতের নির্জনতার নেশা নিয়ে আলোর ঝলক দেখে
খসেপরা নক্ষত্রের হিসেব নির্ণয়ে সাড়া দেব।

বৈচিত্র্যের বাহনে চড়ে মৃত্তিকার গহবরে যাদের আবাস
তাদের শেষকৃত্তের আহবানে সাড়া দেব
নতুন সূর্যোদ্বয়ে নির্মল বায়ুর আহবানে সাড়া দেব।

আবদুস শহীদ। লেখক। জন্ম বাংলাদেশে, বর্তমান নিবাস যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক। লেখালিখিতে যুক্ত আছেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সঙ্গে। প্রকাশিত বই: 'আশ্বিনের শিশির কণা' (কাব্যগ্রন্থ) এবং ‘ভেজা রোদের বসন্তে’ (গল্পগ্রন্থ)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ