কাকতাড়ুয়ার কথা

ঋতো আহমেদ
কবিতা
Bengali
কাকতাড়ুয়ার কথা

এসো, হে অগ্নিভেজা দিন

গতকাল রাতে বৃষ্টিরা এসে ভিজিয়ে দিয়েছে আমার অস্বস্তি

ফিরে আসবার কোনো কথাই ছিল না-আমি তা বলিনি। এও বলিনি যে, নেই। আমার আত্মার শরীর থেকে থরথর কেঁপে উঠছিল হুশ। উপচে উঠেছিল আস্বাদ। নামের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম ও ঘোরে ফুঁ হয়ে উঠেছিল মেঘেরাও। একসাথে-কাছাকাছি ঘেঁষে, ভেতরে ভেতরে উদগ্র গর্জনে কখন যে ভেঙে পড়ল জল। আর,-ওদিকে-বুকের বাঁপাশটায়, সন্তর্পণে, জেগে উঠল আগুন; আমার অগ্নি। তারপর-

হয়তো-বা শেষ সময়ের ঠিক পরেই বৃষ্টিরা এসে ভিজিয়ে দিয়েছে আমার সম্পর্ক-অস্বস্তি

কাকতাড়ুয়ার কথা

আমার তো কাকতাড়ুয়া হওয়ার কথা ছিল। অথচ সেই কবে মধ্যগগনে হেলে আছি, তবু কেন কাকের দেখা নেই! আমি কী তাড়াবো? আমার কপাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে সংখ্যারা। রাত নামলেই যাদেরকে তারা হিসেবে দেখতে পাওয়ার কথা অন্তরীক্ষ-েতাদের ধারাপাত আমার সাথে নিত্য হয় নিয়মিত। কখনো কখনো পাশাপাশি বসে, কখনো-বা সারি বাঁধে, আবার কখনো মুচকি হেসে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত হয় নিজেরাই।

আসলে আমার কাকতাড়–য়াই হওয়ার কথা ছিল। কাকতাড়ুয়া সেজে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চেয়েছিলাম তোমার বাগানে। তুমি এসে আমার পোশাকের ডিজাইন করে দিতে। চোখে কাজল লাগিয়ে দিয়ে কপালে বড্ড একটা টীকা এঁকে দিতে। আঁচলে মুখ মুছে দেয়ার ছলে আরও কাছে আসতে। তারপর রক্তকরবী হয়ে দুলে উঠতে বাতাসে। সেই বাতাস-যে বাতাস আমার বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় আজন্ম এই বিরহী অস্তেিত্বর গহিনে,-লালিত মায়ায় শাণিত করে আমার প্রেম। বড়োই অপার্থিব-বেহেস্তী সেই মোহ। কিন্তু,-

কেন যে আমার কাকতাড়ুয়া চোখে আমি কোনো কাকই দেখতে পাই না! বুঝতে পারি না-কেন আমার কপাল বেয়ে শুধু গড়িয়ে নামে সংখ্যারা। রক্তাক্ত-অমূলক সব সংখ্যা।

এসো, তাকাও-চোখ রাখো চোখে

শুনেছি মানুষের চোখে নাকি পথ থাকে। অসংখ্য পথ। আলো ও অন্ধকারের পথ। অসংখ্য সেইসব পথে কোথাও কোথাও সড়ক বসানো আছে। কখনো কাঁচা, কখনো-বা পিচঢালা পাকা। আবার কিছু পথ আছে রাজপথের মতোই রাজনৈতিক। নদীপথ আছে, সমুদ্রপথও আছে।

মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে এখন শুধু খুঁজে নেবার পালা-আমার পথ-আমার একান্ত পথ। আমি কোন্ পথে যাবো। কোন্ পথে পৌঁছাবো আমার ’কাঙ্খতি গন্তব্যে। অথবা, কোনো পথে যাবো কি নিরুদ্দেশে?

ওহ অগ্নি…এসো, তাকাও-চোখ রাখো চোখে।

সময়-শতাব্দী-কাল

ঘুম একটা নদী। ঘুমের মধ্যেই ডুবে আছে সময়-শতাব্দী-কাল। আমি সেই জলে সাঁতরে কোথাও যাবো। কিন্তু, কোথায়? কে আমার পাতাল? ওহ-

ও আমার পাতাল…

এই ভোর, এই আলো

ছুঁয়েছো অমোঘ পাপ-

পরব্যিাপ্ত জল, শুয়ে আছো। নদীও লুকোনো। আর, গর্ভে রেখেছ সাত সমুদ্দুর-আসমান। এ পাড় ভেঙেছো। এক মহারাত্রির পর আরও এক পাড়-অপক্ষোয়।

তারপর-এই ভোর, এই যে ভোর, এই আলো, আলো-

অগ্নি-কে

তুমি হয়তো জানো না, বহু আগে যখন এইসব ফুল পাখি বৃক্ষের কোনো সীমানা ছিল না, মাটিও ভেঙে ভেতরে খাদ ও জলের প্রবাহ হয়েছিল কোথাও-তখন, কোনো এক সন্ধ্যার কিছু আগে, মান ভাঙাতে তোমার পেছনে, ভীরু পায়ে ভাঙা সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে গিয়ে, কর্নারের ওই কড়ই গাছটার আড়ালে হঠাৎ তোমাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।

তারপর, ঝড়-ঝঞ্ঝার এক শতাব্দী পর আরো কোনো শতাব্দী পেরিয়ে হয়তো, কাঠ-ফাটা রোদ্দুরে তোমাকে দেখেছিলাম আবারো। এক চিলতে সময়ে দাঁড়িয়ে আছো। ওখানেই-যেখানে কড়ই গাছের আড়াল আমার বিস্ময়। আর তখন, উদাসী হাওয়ায় তোমার গোলাপী-লাল ওড়না আর আমার দ্বিতীয় মৃত্যুর দিন। মনে আছো শুধু এইটুকু। তাই-

তুমি হয়তো জানো না, আজ, এই শতাব্দীর দিন ও রাত্রিতে, আমার আত্ম-অংশকে রেখে এসছি তোমার পাশেই। সে চিরায়ত। বহমান, ব্রহ্মার ছেলে। আমার আশৈশব প্রেম। আমার কৈশোর। আমার প্রথম যৌবনের প্রবল স্রোতের ধারা। সে আমার আমি।

তোমার পাশেই আছে ও। খুব কাছে। কাছাকাছি। তুমি হয়তো জানো না, রাত্রি গভীর হলে যখন একে একে সব আলো নিভে যায়, ও তখন আমাকে সংকেত পাঠায়। আমাকে দৃষ্টি দেয়। আমি দেখতে পাই বেলকনিতে তোমার মুখ। সমগ্র দিনের সমস্ত মেকআপ-মুখগুলো খুলে একদম একা নিষ্পাপ একটি মুখ-একটি বিষণœ ফুল, যে তার একান্ত ভ্রমরের অপেক্ষায় অদ্ভুত সুন্দরভাবে প্রস্ফুটিত। বিশ্বাস করো, সেই মুহূর্তের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ও বাতাসের খেলায় যখন দুলে ওঠে তোমার জুলফি-আলগোছে বাঁ-হাতে সরিয়ে দাও চোখের সামনের চুল-সেই প্রথমবারের মতোই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে আমার-

মনে হয় শরীরের সমস্ত স্রোত নিয়ে দাঁড়াই তোমার সামনে। চোখে চোখ রেখে বলি এই তো আমি-মহাকাল,-তোমার গন্তব্য-তোমার মোহনা। এইখানে এসে বিলীন হও। মাথা রাখো এই কাঁধে। নির্ভার হও। ভালোবাসো। আমাদের অপেক্ষার শেষ এখানেই। ভালোবাসো এবং ভালোবাসো, শুধুই ভালোবাসো।

 

১০৪* ফা.

বুকের মধ্যে পারদ। তোমার স্পর্শে উঠে যাচ্ছে আসমান পর্যন্ত। আর, অন্যদিকে ঈশ্বর ভদ্রলোক অপেক্ষায় আছেন। সপ্তম অধ্যায়টুকু পেরুলেই চোখ খুলবেন তিনি। লিখবেন একটি গাঢ় মহাকাল কী করে কবিতা হয়ে ওঠে;-ঝড় ও ঝঞ্ঝায় কী করে কেঁপে ওঠে এই দৈহিক পৃথিবী! তারপর, জলোচ্ছ্বাস এবং যথারীতি জলের প্রপাত যখন আমাকে শান্ত করতে উদ্যত হবে,-যথাসম্ভব আমার পারদ- প্রবাহকে নামিয়ে আনতে উদ্বুদ্ধ হবে,-আমি বলবো অগ্নি, ও আমার অন্ধ আলো, এসো, এই উচ্ছ্বসিত জলে তুমিও জ্বলো।

 

গ্রহণ

আমকে ভালোবাসো। বহুদিন-
আমাকে ঘিরে তোমার আবর্তন শাশ্বত হয়ে আছে।
অথচ আজ গ্রহণের কাল। আশ্চর্য এক গ্রহণ-রাত্তির সমাগত হচ্ছে আমার দুয়ারে। আমার পশ্চাৎদেশে-আমার পিঠ বরাবর যখন আঘাত করবে ওই জর্জরিত আলোসমূহ-ওহ অগ্নি!-তুমি হয়তো জানো না, আমার ছায়া তখন প্রলম্বিত হবে। পরিপূর্ণ পূর্ণিমায় যেমন কেউ হাউন্ড হয়ে ওঠে হঠাৎ, ঠিক তেমনি, হঠাৎই শুরু হবে আমার কড়াল গ্রাস-তোমার প্রতি। ধীরে ধীরে অন্ধ-আলোয় লুফে নেব। নিশ্চিত নিশ্চিহ্ন করে ফেলবো তোমাকে। ভাবতেই পারবে না ভালোবাসা কখনো কখনো-

এমনও হয়।

 

প্রতিদিন ভোর হলে

প্রতিদিন ভোর হলেই মনে হয় এই শতাব্দীটা আমার।
প্রতিদিন ভোর হলেই মনে হয় নিঃসীম সময়ে খুলে যাচ্ছে চোখ-
সহস্র বছরের পর এই দ্বীপময় শতাব্দী আমার-এই ভোর-এই আলো-টপটপে রক্তের মতো গাড়িয়ে নামা এইসব তরল রোদ-আমার,-

আমাকে ভালোবাসো। হে অনন্ত অগ্নি। হে আমার বোধ। বুকের তোলপাড়। মিলিয়ে যেও না। দৃশ্যমান হও আরও। শরীরের সাথে লেগে আছে দ্যাখো, বিগত জন্মের ভাঁজ। অবরুদ্ধ। উন্মাদ। উন্মাতাল ঘ্রাণের গন্ধের সেইসব মোহন মুহূর্তের মন- পোড়াও। ছারখার করে লিখে ফ্যালো আজ আরো এককাপ প্রেম-উষ্ণ ও নরম ওমের মতোই প্রাতঃচুম্বনে, চুম্বনে চুম্বনে নিষ্পত্তি করে ফেলা আরো এককাপ প্রেমে। হে আমার অগ্নি-

হে অনন্ত অগ্নি-

প্রত্যেকটি দিন এইভাবে-এভাবেই ভোর হয়, খুলে যায় চোখ-আর, ফিরে আসে তোমার মুখ। তুমিও টপটপে রক্তের মতো নামো। বেগবান হও। নিষিক্ত শতাব্দীর ওই প্রথম ও শেষ চিহ্নটি পর্যন্ত…

নামো। প্রতিদিন ভোর হলে…

ঋতো আহমেদ। কবি ও প্রকৌশলী। পৈতৃক বাড়ি মুর্শিদাবাদ। জন্ম ময়মনসিংহ শহরের কালিবাড়ি বাইলেন, কর্মসূত্রে ঢাকায় বসবাস। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট থেকে শিল্প প্রকৌশলে স্নাতক। বর্তমানে একটি টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: 'শতাব্দীর অপার প্রান্তরে', 'ভাঙনের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ