কাজের মাসি

সজল কুমার মাইতি
গল্প
Bengali
কাজের মাসি

কলিংবেলের শব্দে সোফা থেকে  উঠে  মনিকা দরজা খুলে বলে উঠল  “দেখ মাসি রোজ রোজ এত বেলায় এলে আমায় কলেজ ছেড়ে দিতে হবে।”  মাসি তখনও দরজার ওপাশে।

 ” কি করব ডাক্তারবাবু আজ তাড়াতাড়ি বেরুবে বলে রিনা একটু সকাল সকাল যেতে বলেছিল।”

” আমি বললে তো আসতে পারো না, কিন্তু রিনা বললে ঠিক যাও।” মাসির উত্তরে মনিকার সংযোজন। কোন  উত্তর না দিয়ে মাসি ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। তার রুটিন কাজে মন দেয়।

মাসি একজন বয়স্ক মহিলা। বাড়ির থালা বাসন ধোয়া, ঘরদোর পরিষ্কার করা ও কাপড় জামা ধোয়া  – এগুলোই মাসির এ বাড়ির কাজ। মাসির একটি ছোট্ট ইতিহাস আছে। মাসির শ্বশুরবাড়ি অন্য অনেক কাজের মেয়ের মতো দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় এক অখ্যাত গ্রামে। স্বামী ছেলেপুলে ননদ জা নিয়ে সুখেই কাটছিল সংসার। এমন সময়ে মাসির স্বামীর জীবনে অন্য এক নারীর আবির্ভাব হল। অল্প সময়ের মধ্যে সেই নারী মাসির সংসারে  প্রবেশ করল। মাসির পক্ষে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। মাসি তিন ছেলেকে নিয়ে অজানা ভবিষ্যতের পথে পাড়ি দিল। ছোট্টটা তখন ও এক বছর পূর্ণ করেনি। বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে ঠিকানা হল সল্টলেক।

সল্টলেক উদীয়মান শহর। বিধান রায়ের স্বপ্নের শহর। চারদিকে নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে। এমন এক জায়গায় কপাল গুনে মাসির একটা কাজ জোগাড় হল। বাড়ি তৈরির জোগাড়ের কাজ। ইট বওয়া ও আনুষঙ্গিক কাজ। পারিশ্রমিকের সাথে থাকার ও একটা ব্যবস্থা ওখানেই হল। বাড়ি তৈরির ইট দিয়েই অস্থায়ী ঠিকানা থাকার। সঙ্গে কূয়োর জল। তিন ছেলে নিয়ে শুরু মাসির নতুন সংসার। সারা দিনের হাড় ভাঙা কাজের সঙ্গে চলে ছেলেদের দেখাশোনা। চলতে থাকে বিভিন্ন শোষণ চক্ষুর থেকে নিজেকে ও ছেলেদের রক্ষা করা। এর মধ্যেই ছেলেরা বড় হয়ে উঠতে থাকে। আর সল্টলেক ও নতুন নতুন বাড়িতে সেজে ওঠে। লোকজন ও ধীরে ধীরে ভরে ওঠে নতুন শহরে। মাসি ও তার পেশায় পরিবর্তন আনে। এখন বাড়িতে বাড়িতে বাসন ধোয়া কাপড় কাচা ঘর পরিষ্কার করার কাজ নেয়। এ যেন আবার নতুন জীবনের শুরু।

মাসির কাজের নতুন ঠিকানা পূর্বাচল, ফাল্গুনী আবাসনের ফ্ল্যাট বাড়ি। এর মধ্যে জিডি ব্লকের এক ডাক্তার পরিবারের কাজের যোগাযোগ ও হল। এই পরিবার বাইরে থাকে। সপ্তাহান্তে একবার করে এ বাড়িতে আসে। কি করা যায় একটা  ব্যবস্থা তারা ঠিক করা করেছেন। মাসির কাছে বাড়ির একটা  চাবি রেখে যান। মাসি তার সুবিধে মতো  সময়ে এসে সবকিছু পরিষ্কার করে যাবে। মাসিকে পুরো বাড়ির দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে ও কারন আছে। মাসির মতো বিশ্বস্ত কাজের লোক পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের। আমরা ‘নীতি আদর্শ মূল্যবোধ’ এসব কথা অহরহ আওড়াই। কিন্তু বাস্তবের আঙিনায় তাদের দেখা খুব একটা পাই না। যাদের পেটের ভাতের অভাব নেই। যাদের ভালো রকমের মাসিক আয়ের ব্যবস্থা আছে। তাদের ক্ষেত্রে হয়তো কখনো কখনো এসব দেখা যেতে পাওয়া যায়। কিন্তু পেটের ভাতের কোন স্থায়ী বন্দোবস্ত নেই বা উপায় ও নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই ‘নীতি আদর্শ মূল্যবোধ’ বাস্তবায়ন যে কি কঠিন তা কল্পনা করে ও শিউরে উঠতে হয়। মাসি সেই ধরনের ব্যতিক্রমী ব্যক্তি। সে কারনেই এই ডাক্তার পরিবার মাসির ওপর পুরো আস্থা রেখে বাড়ির চাবি দিয়ে যান। সময় মতো মাসি নিয়ম করে বাড়ি পরিষ্কার, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা সবই বিশ্বস্ত হস্তে করে থাকে। মালিক অনুপস্থিত বলে কাজে কোন ফাঁকি নেই। এদিকের জিনিস ওদিকে যাওয়ার উপায় নেই। তাই তো এই অগাধ ভরসা। এই ভরসার পূঁজি নিয়ে ডাক্তার দাদার এই বাড়ির দাদার কাছে কিছু টাকা ধার চায়। দাদা ও বিনা বাক্যব্যয়ে ওই টাকা দিয়ে দেন। এই টাকায় সোনারপুরে কিছুটা জমি কিনেছে মাসি। সেই টাকা শোধ করার জন্য অনেকটা রাস্তা হেঁটে নিয়মিত গিয়ে ও  ডাক্তার দাদার কাজ করে যায় । বহু দিনে সেই ঋণ শোধ করে তবেই এতদূরের ওই বাড়ির কাজ ছেড়েছে মাসি।

“দাদা, ডাক্তার এই চিঠিটা দিয়েছে।”  মাসি কৃত্যকের হাতে একটি চিঠি তুলে দেয়। কৃত্যক মনিকার স্বামী। চিঠি পড়ে কৃত্যক টি টেবিলের ওপর রেখে দেয়। ” মাসি, বাড়ির  একটা চাবি তোমাকে দোব। তুমি তোমার সময় মতো এসে  কাজ করে যেও।” কৃত্যক মাসির হাতে রিং সুদ্ধু একখানি চাবি তুলে দেয়। আসলে বহু দিনের বিশ্বস্ত কাজের লোক। কৃত্যকের মেয়ের জন্মের আগে থেকে কাজ করছে। খুচরো পয়সা থেকে প্রতিটি জিনিস যেখানে থাকার ঠিক সেখানেই থাকে। কোন নড়ন চড়ন হয় না। এরকম লোককে বিশ্বাস করে ঘরের চাবি দেওয়া যায় না তো কাকে দেওয়া যায়? একলব্য যদি ‘নীতি আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রতীক হয়’, তবে আজকের দিনে আমাদের কাছে মাসি ও তাই। তাকে বিশ্বাস করে নিজেকে ধন্য মনে করে কৃত্যক। এই বিশ্বাসের মূল্য বহু গুনে ফিরে ফিরে আসে।

মেয়ে মন্জুলিকার বয়স এক বছর হল। স্বামী স্ত্রী দুজনকেই কাজে বেরুতে হয়। বহু যোগাযোগের পর কাছেই একটি ক্রেশের সন্ধান পাওয়া গেল। সেই হিসেবে এটাকে ক্রেশ বলা যায় না। একজন ভদ্রমহিলা বাড়িতে দু তিনজন বাচ্চাদের রেখে দেখা শোনা করেন। মাতৃ স্নেহে সবাইকে প্রতিপালন করেন। মেয়ে তাকে জেঠিমা বলে ডাকে। জেঠিমার দুই মেয়ে মানা ও টিনা। জেঠিমা মেয়েকে পাপাই বলে আদর করে ডাকেন। কৃত্যক বা মনিকা যে আগে বেরয় সেই পাপাইকে জেঠিমার কাছে দিয়ে আসে। আবার ফেরার সময় যে আগে ফেরে সে পাপাইকে নিয়ে বাড়ি ফেরে। দিনের শেষে মা বাবাকে পেলে মঞ্জুলিকা তখন আর কারুর কাছে যেতে চায় না। একদিন একটি ঘটনা ঘটলো। মনিকার বোনের ভাসুর শ্যামবাজারের কাছে একটি আয়ুর্বেদ কলেজের অধ্যক্ষ। ছোট্ট সংসার। স্বামী স্ত্রী ও এক মেয়ে। ধনী পরিবারের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে প্রেম। তারপর বিয়ে। সুখের সংসার। কিছুদিনের মধ্যে ফুটফুটে এক কন্যা আসে তাদের সংসারে। সুখেই কাটছিল সংসার। মেয়ে বড় হচ্ছে। এখন সে ক্লাস সিক্সে পড়ে। হাসিখুশিতে দিনগুলো ভালই কাটছিল। এমন সময় এই সুখের মধ্যে  বিষাদের সুর বেজে উঠল। কয়েক মাস ধরে অল্প বিস্তর অসুখে ভুগছিলেন সংসারের কত্রী। অধ্যক্ষ মশাইের স্ত্রী। অধ্যক্ষ মশাই আয়ুর্বেদের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও বটে। নিজের চিকিৎসায় এত দিন চলছিল। কিন্তু একদিন এটা ভয়ংকর রূপ নিল। যমে মানুষে টানাটানি। অগত্যা নার্সিংহোমে ভর্তি করাতে হল। চিকিৎসা চলছে কিন্তু উন্নতির কোন লক্ষন নেই। অধ্যক্ষ মশাইকে একহাতে সংসার, মেয়ে, কলেজ সামলাতে হচ্ছে। এই ছোট্ট মেয়ে মায়ের টানে প্রায় সারাদিন মায়ের কাছে বসে নার্সিংহোমে কাটিয়ে দেয়। ভাইয়েরা আত্মীয় স্বজনেরা যে যার মতো সময় করে এসে দেখে যায়। মনিকা ও মাঝেমধ্যে গিয়ে দেখে এসেছে। এতদিন চিকিৎসার খরচ সামলাতে অধ্যক্ষ মশাইের নাজেহাল অবস্থা। সংকোচ দ্বিধা দূরে সরিয়ে একদিন অধ্যক্ষ মশাই মনিকাকে কিছু আর্থিক সাহায্যের কথা বলে বসেন। মনিকা বলে ” দাদা, সামনের রবিবার একবার আমাদের বাসায় চলে আসুন। মেয়েকে নিয়ে চলে আসুন। দুপুরে খাওয়া দাওয়া হবে। আপনি টাকাটা ও নিয়ে আসবেন।”

” আচ্ছা, দেখছি। এখানে কেমন অবস্থা থাকে। সেরকমই ব্যবস্থা করতে হবে।”

” ঠিক আছে। আজ চলি।” এই বলে মনিকা নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

রবিবার মনিকা যথারীতি ভাল মন্দ খাবার দাবার তৈরি করেছে। বোনের ভাসুর অধ্যক্ষ মশাই আজ আসার কথা। একটি খামে হাজার পঞ্চাশ টাকা ভরে যত্ন করে রেখেছে। ভদ্রলোক এলেন। তবে অনেক দেরিতে। খেতে এক্কেবারে নারাজ। কৃত্যক বলে ” তা কখনও হয় দাদা? আপনি না খেয়ে গেলে গৃহস্থের অকল্যাণ হবে।”

” না, তাহলে তো একটু খেতেই হয়। জাস্ট একমুঠো।”

কোন রকমে এক গাল খেয়ে অধ্যক্ষ মশাই যাওয়ার জন্য উঠে বসেন। মনিকা এসে টাকার খামটা ধরিয়ে দেয়। আর বলে ” দাদা, আবার আসবেন।”

দিন কয়েক পরে মনিকা বিকেলে নার্সিংহোমে গেল। সেখানে দেখে রোগীর শেষ অবস্থা। সেই অবস্থায় বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার খারাপ খবরটি দিলেন। অধ্যক্ষ মশাই নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে গেছেন। অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে করতে হবে।  শববাহী গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। ভাইদের খবর দিতে হবে। মৃতদেহ ও বাচ্চা মেয়েটাকে ফেলে বাড়ি ফেরা মনিকার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। এদিকে বাড়িতে ছোট্ট মেয়ে। সারাদিনের শেষে মা বাবাকে পেতে অস্থির হয়ে ওঠে। কৃত্যককে ফোনে বলে “শোন, তুমি একটা ট্যাক্সি ধরে চলে এসো। রাত অনেকটা হয়ে গেছে। আমি এসবের মধ্যে  এদের ফেলে বেরুতে পারছি না।” এরমধ্যে কৃত্যক ফেরার সময় জেঠিমার কাছ থেকে মঞ্জুলিকাকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। সকালে মেয়ে জেঠিমার কাছে যেতে কোন সমস্যা করে না। কিন্তু সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আবার জেঠিমার বাড়ি নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। অনন্যপায় হয়ে কৃত্যক জেঠিমাকে ফোন করে। সব সমস্যার কথা জানায়। বলে ” আপনি যদি একটু এসে মঞ্জুলিকাকে নিয়ে যান। তবেই আমি মনিকাকে আনতে যেতে পারব।” এই শুনে জেঠিমা তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে রাতের বেলায় কৃত্যকের বাড়ি আসেন। যে মেয়ে জেঠিমার এক কথায় সব কিছু করতে রাজী থাকে, সে জেঠিমার বারবার ডাকে ও জেঠিমার কাছে যেতে চাইছে না। বরং কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। জেঠিমার হাজারো কাকুতি মিনতিতে ও ভবি ভোলার নয়। বহু চেষ্টার পর কোনো মতে নিমরাজি হয়। তখন জেঠিমা কোলে নিয়ে নিজের বাড়িতে মঞ্জুলিকাকে নিয়ে যান। এখন কৃত্যক চটজলদি বেরিয়ে পড়ে। রাত তখন অনেকটাই। রাস্তায় গাড়িঘোড়ার দেখা মেলা ভার। বহু কষ্টে একটা ট্যাক্সি যোগাড় করে কোনমতে উল্টোডাঙা পৌঁছয় কৃত্যক। সেখানে আর একটি ট্যাক্সি ধরে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে পৌঁছয়। মোবাইলে মনিকাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। মনিকা পাঁচ মাথার মোড়ে এসে অপেক্ষা করছিল। কৃত্যক ট্যাক্সি থেকে মনিকাকে দেখতে পায়। ট্যাক্সি থামিয়ে নেমে যায় কৃত্যক। মনিকাকে নিয়ে আবার ট্যাক্সিতে ওঠে। ট্যাক্সি নিয়ে প্রথমে জেঠিমার বাড়ি যায়। সেখান থেকে মেয়েকে নিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে পৌঁছয়। দিনের শেষে মা বাবাকে পেয়ে মেয়ের আল্লাদ বাঁধন ছাড়া হয়ে দাঁড়ায়।

বেশ কিছুদিন পর একদিন মাসি কৃত্যকে বলে ” দাদা, আমার ছোট ছেলের ভোটার কার্ড হচ্ছে না। ওর বয়সের কাগজ নেই। ওরা বলছে ওই কাগজ ছাড়া ভোটার কার্ড হবেনা।”

” কে বলল তোমায়?”

“ভোট অফিসের লোক।”

” ঠিক আছে। আমি দেখছি।”

কৃত্যক একদিন মিউনিপ্যালিটি অফিসে যায়। বার্থ সাটিফিকেটের জন্য কি কি দরকার জানার জন্য। মিউনিসিটিপ্যালিটিতে হঠাৎ এফ সি পার্কের রিন্টুর সঙ্গে দেখা। রিন্টু কৃত্যককে দেখে বলে ওঠে ” কাকু, আপনি এখানে?”

” আসলে আমার বাড়ির কাজের মাসির এক ছেলে আছে। খুব ভাল ছেলে, কিন্তু কথা বলায় একটু সমস্যা আছে তার। তার কোন বার্থ সার্টিফিকেট নেই। তার জন্য কি করতে হবে বলতো?”

” ও এই কথা। আচ্ছা ওর জন্ম কি 1989 এর আগে?”

” হ্যাঁ।”

” এই একটা ফর্ম দিচ্ছি। এটা পূরন করে আনবেন। সঙ্গে একজন ডাক্তারের সার্টিফিকেট। তার মধ্যে থাকবে জন্ম কবে কোথায় হয়েছে তার উল্লেখ।”

” ঠিক আছে।”

এই বলে কৃত্যক বাড়ি ফেরে। মাসিকে সব কিছু জানায়। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে নিজেই কথা বলে। ডাক্তারবাবু এক কথায় রাজি। বলেন ” বসুন। এখনই আপনার সামনে লিখে দিচ্ছি। ” এই বলে ডাক্তারবাবু লেটার প্যাড বের করেন। তাতে লিখতে শুরু করেন।

” কৃত্যকবাবু, বলুন কি কি লিখতে হবে?”

” হ্যাঁ, আমি বলে দিচ্ছি। আপনি লিখে যান।”

কৃত্যক ডিক্টেট করে গেল আর ডাক্তারবাবু সেইমত প্যাডে লিখে গেলেন। সার্টিফিকেট লেখা কমপ্লিট হলে ডাক্তারবাবু সেটা কৃত্যককের হাতে দিয়ে বলেন ” একটু দেখে নিন। সব ঠিক আছে কিনা।” কৃত্যক সার্টিফিকেটে চোখ বুলিয়ে দেখে নেয়। ” হ্যাঁ। সব ঠিক আছে।”

” এবার আসি ডাক্তারবাবু।”

কৃত্যক সার্টিফিকেট নিয়ে বাড়ি ফেরে। সেখানে মাসিকে পায়। নিজে ফর্মটা ফিলাপ করে। মাসিকে জিজ্ঞেস করে।

“মাসি, তোমার নাম লিখতে পার?”

” না দাদা।”

” তাহলে এইখানে একটা টিপ সই দিয়ে দাও।” মাসিকে দিয়ে টিপ সই করিয়ে ফর্মটা ও ডাক্তারবাবুর সার্টিফিকেট নিয়ে গুছিয়ে রাখে।

পরদিন অফিস যাওয়ার পথে মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে জমা দিয়ে যায়। তার আগে অবশ্যই এক কপি করে জেরক্স করে রেখে দেয়। কাউন্টারের ছেলে জমা নিয়ে রিসিট দেয়। বলে ” তিন সপ্তাহ পরে খোঁজ নেবেন।”

মিউনিসিপ্যালিটি থেকে বেরিয়ে কৃত্যক অফিস চলে যায়। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে মাসিকে রিসিটের একটি কপি দেয় আর একটি কপি নিজের কাছে রাখে।

মাস খানেক পারে মিউনিসিপ্যালিটিতে গিয়ে খোঁজ নেয়। জানতে পারে এখনো রিপোর্ট আসে নি। কাউন্টারের ছেলে বলে ” আপনি ময়ূখ ভবনে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন।” কৃত্যক জিজ্ঞেস করে ” কোন ডিপার্টমেন্টে যাব?”

” এস ডি ও মিউনিসিপ্যাল ডিপার্টমেন্ট।”

কৃত্যক ওখান থেকে সরাসরি ময়ূখ ভবনে চলে যায়। সেখানে খোঁজ নিয়ে এস ডি ও অফিসের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করে। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন ” এ আপনার কে হয়?”

“আমার কাজের মাসির ছেলে। বুঝলেন, ছেলেটা ঠিকভাবে কথা বলতে পারে না।”

” ঠিকানা ঠিক দেওয়া আছে তো? ভেরিফিকেশনের জন্য লোক যাবে। আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

” হ্যাঁ। বলুন।”

” আপনার পরিচয়টা জানতে পারি?”

কৃত্যক নিজের পরিচয় দেয়। জিজ্ঞেস করে ” কবে নাগাদ খোঁজ নিতে আসব?”

” তিন সপ্তাহ পরে একবার খোঁজ নিয়ে যাবেন।”

কৃত্যক এরপর বার দুয়েক এই অফিসে ঘুরে গেছে। কোন ডেভেলপমেন্ট হয় নি। এইবার রীতিমতো বিরক্তির সঙ্গে কৃত্যক এবার ফয়সালার করার ভঙ্গিতে ওই ভদ্রলোকের কাছে যায়। জিজ্ঞেস করে ” কি খবর বলুন তো? ভেরিফিকেশন রিপোর্ট কি এসে গেছে?”

” না। এখানে স্পট ভেরিফিকেশনের লোকের অভাব। আপনি বারবার ঘুরে যাচ্ছেন। এক কাজ করুন। আপনি যদি দয়া করে ওই ছেলেকে সঙ্গে করে এখানে আনেন। তাহলে ভেরিফিকেশনের কাজ এখানে হয়ে যাবে।” এস ডি ও অফিসের ভদ্রলোকের এই প্রস্তাবে কৃত্যক রাজী হয়ে যায়। পরের দিনই একটা ট্যাক্সিতে মাসিও তার ছেলেকে নিয়ে এস ডি ও অফিসে হাজির হয়। অফিসের ওই ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে কৃত্যক বলে ” যাদের আনতে বলেছিলেন তাদের নিয়ে এসেছি। আপনি ওদের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারেন।”

” বসুন। আমি আসছি।”

কৃত্যক বাইরে গিয়ে বসে। মিনিট দশেক পরে ভদ্রলোক আসেন। কৃত্যক মাসি ও মাসির ছেলেকে দেখিয়ে দেয়। জিজ্ঞেস করে ” ওদের কিছু করার আছে এখানে? কোন কাগজে সই সাবুদ করার দরকার হলে করিয়ে নিন।”

” হ্যাঁ। একটু অপেক্ষা করুন। আমি কাগজপত্র নিয়ে আসছি। এস ডি ও স্যার ও আজ আছেন। আশা করি সব কাজ হয়ে যাবে।” এই বলে ভদ্রলোক চলে যান। একটু পরে একটা ফাইল নিয়ে ফিরে আসেন। ওদের দিয়ে কয়েক জায়গায় টিপ সই করিয়ে নেন। তারপর কৃত্যকের উদ্দেশ্যে বলেন ” সামনের সপ্তাহে একদিন এসে বার্থ সার্টিফিকেটটা নিয়ে যাবেন।”

” আমি এলেই হবে? ওদের আর আসার দরকার নেই?”

” আপনি তো সবটাই করলেন। তাহলে আপনার হাতে দিতে বাধা কোথায়?”

” অনেক ধন্যবাদ।” এই বলে কৃত্যক মাসিদের নিয়ে ফিরে আসে।

নেক্সট উইকের বুধবার কৃত্যকের ছুটি। ব্রেকফাস্ট করে সে বেরিয়ে যায় এস ডিও অফিসের ওই ভদ্রলোকের কাছে।  অফিসে গিয়ে কৃত্যক দেখে ভদ্রলোক টেবিলে আছেন। কৃত্যককে দেখে ভদ্রলোক বলে ওঠেন ” আসুন আসুন। বসুন। আপনার ওই সার্টিফিকেট রেডি। ওই দিনই স্যার সই করে গেছেন।” কৃত্যককে সই করিয়ে মাসির ছেলের বার্থ সার্টিফিকেট দিয়ে দেন ভদ্রলোক। নমস্কার জানিয়ে কৃত্যক বাড়ির পথ ধরে।

ফেরার পথে কৃত্যক মনে মনে  ভাবে মাসির হাতে সরাসরি বার্থ সার্টিফিকেটটা দিয়ে দিলে মাসি খুব খুশী হবে। এখন তো মাসি রিনাদের ফ্ল্যাটে থাকার কথা। কৃত্যক সরাসরি  রিনাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে বেল বাজায়। একটু পরে রিনা দরজা খুলে দেয়। রিনার পরনে হালকা নাইটি। সেই নাইটি হাঁটুর নিচে অল্প নেমে থমকে গেছে। দুপুরের স্নান হয়নি বোঝা যাচ্ছে। হয়তো স্নান করতেই যাচ্ছিল। সেই জন্য এত স্বল্প বাস। কৃত্যককে এ সময়ে দেখে রিনা বলে ওঠে ” কাকু, কিছু বলবে?”

” মাসি আছে গো?”

” না গো। আজ এখনো মাসি আসে নি। জানি না  কি হল।”

” মাসিকে একটা জিনিস দেওয়ার ছিল।”

” কাকু, তুমি ভেতরে এসো।”

কৃত্যক রিনাদের ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢোকে। ” কাকু, তুমি বোস। আমি কফি বানিয়ে আনি।” রিনা কফি বানাতে রান্না ঘরের দিকে রওনা হয়। কৃত্যক চেঁচিয়ে বলতে থাকে ” আরে দরকার নেই। এক্ষুণি বাড়ি গিয়ে স্নান করে লাঞ্চ করব। এখন আর কফি খাব না। রিনা, তোমায় কফি বানাতে হবে না।”

” তুমি একটু বোস। আমার কফি হয়ে গেছে।” রান্নাঘর থেকে রিনার উত্তর।

কৃত্যক সোফায় বসেছে। রিনা প্লেটে কফি কাপ নিয়ে রান্না ঘর থেকে বসার ঘরে ঢোকে। কৃত্যকের সামনে টি টেবিলে কফি কাপ সুদ্ধু প্লেট রাখে। জিজ্ঞেস করে ” কাকু বিস্কুট দিই?”

” না না। তোমার কফি কই?”

” আমি এক্ষুণি স্নানে যাচ্ছিলাম। তুমি এলে তাই যাওয়া হল না।”

” আচ্ছা রিনা, বাড়ি একদম ফাঁকা লাগছে। আর কেউ নেই?”

” না। ভাইরা সব রামপুরহাট গেছে। আর ডাক্তার মুর্শিদাবাদ গেছে। আজ ফিরবে।” কথা বলতে বলতে রিনা কৃত্যকের সামনের সোফায় এসে বসে। কফি খেতে খেতে কৃত্যক রিনার সঙ্গে গল্প করতে থাকে। বলে ” রিনা, তোমাদের তো অনেক দিন হল। এবার একজন ভাল ডাক্তার দেখাও। আর দেরি করা উচিত হবে না।”

” হ্যাঁ। একবার ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কয়েকটা টেস্ট করা ও হয়েছে।”

“কি বলছে ডাক্তার?”

” আরও কয়েকটা টেস্ট করাতে হবে। বললেন ভ্যাজাইনাতে নাকি সোয়েট হয়ে যাচ্ছে।”

” দেখ রিনা, সত্যি কথা বলতে কি তোমার মধ্যে আমি কোন আর্জ দেখিনা।”

” না কাকু। এটা একদম ঠিক না।”

এর মধ্যে কৃত্যকের কফি খাওয়া শেষ। কৃত্যক সোফা থেকে উঠে প্লেট সুদ্ধু কফি কাপ নিয়ে রান্না ঘরে রাখতে যেই যাবে ওমনি রিনা উঠে কৃত্যকের হাত থেকে কফি কাপ নিতে যায়। ” কাকু আমাকে দাও। আমি  রেখে আসছি।” রিনার হাত কৃত্যকের হাত জাপটে ধরে আছে। কৃত্যক রিনার হাতের প্রচন্ড উত্তাপ অনুভব কর। কৃত্যকের মনে হচ্ছিল প্রচন্ড জ্বরে রিনার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। সে জিজ্ঞেস করে ” রিনা, তোমার কি জ্বর?”

” না তো কাকু।”

কৃত্যক রিনার কপালে গালে গলায় হাত রাখে। দেখে প্রচণ্ড উত্তাপে রিনার শরীর কাঁপছে। কৃত্যক রিনাকে ধরে বেডরুমে নিয়ে যায়। যেতে যেতে রিনা বলে ” কাকু আমার কিচ্ছু হয় নি।” কৃত্যক জোর করে রিনাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। রিনাকে বিছানায় শুইয়ে কৃত্যক যেই ফিরে আসছে ওমনি কৃত্যকের বাঁ হাতে প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আচমকা টান। সেই টানে কৃত্যক হুমড়ি খেয়ে সটান পড়ে  রিনার শরীরের ওপর। বাইরে রোদ্দুরের প্রচণ্ড উত্তাপের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আগেই বেডরুমের সব জানালা রিনা বন্ধ করে রেখেছিল। কৃত্যক বেশ কিছুক্ষণ রিনার শরীরের ওপর আবিষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। রিনার শরীরের উত্তাপ কৃত্যকের শরীরে সঞ্চারিত হয়। কৃত্যক আত্ম নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। চশমা খুলে একদিকে রাখে। রিনার কপালে চুম্বন স্মৃতি এঁকে দেয়। ধীরে ধীরে দুই গাল নাক চুম্বনে ভরিয়ে দেয়। রিনার এক হাত কৃত্যকের মাথার চুলে বিলি কাটতে থাকে। অন্য হাত কৃত্যকের পিঠে আকুলিবিকুলি করতে থাকে। রিনার ঠোঁটে চুম্বন করতে করতে কৃত্যক রিনার নিচের ঠোঁট নিজের মুখের মধ্যে নেয় আর উত্তপ্ত নিশ্বাস রিনার উপর ছাড়তে থাকে। এই উত্তেজনায় কৃত্যকের হাত রিনার বুকে নেমে আসে। দূই হাত প্রানপনে নাইটির ফাঁক ফোকর খোঁজে ভেতরে ঢোকার জন্য। ব্যর্থ হয়ে অগত্যা কৃত্যক রিনার শরীরকে নাইটি মুক্ত করে । রিনা শরীর আলগা করে এই কাজে কৃত্যককে পূর্ণ সহযোগিতা করে। রিনার নাইটির নিচে কোন অন্তর্বাস নেই। রিনার ডালিম্ব সম দুই স্তন কৃত্যক আদরে আদরে ভরিয়ে দেয়। এই সুযোগে রিনা কৃত্যককে তার অঙ্গাবরন থেকে মুক্ত করে। কৃত্যক এখন রিনার শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রিনার শরীর উত্তেজনায় উথাল পাথাল করতে থাকে। তৃপ্তি সুখের মৃদু গোঁয়ানির শব্দ ভেসে আসে  রিনার মুখ গহ্বর থেকে। ধীরে ধীরে দুই শরীর শান্ত হয়। কৃত্যক উঠে  বাথরুমে যায়। পরিষ্কার হয়ে এসে জামা কাপড় পরে নেয়। তখনও রিনা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। কৃত্যক রিনার নগ্ন শরীর দেখতে দেখতে বলে ” রিনা ওঠ। আমায় যেতে হবে।” রিনা উঠে নাইটি নিয়ে বাথরুমে যায়।

এই সময় হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। রিনা বাথরুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। দেখে মাসি দাঁড়িয়ে আছে। রিনা বলে ওঠে ” ও মাসি তুমি? আজ এত দেরি কেন?”

দরজার বাইরে থেকে মাসি বলে ” ছোট ছেলেটার শরীর খারাপ। তাই আজ আসব না ভেবেছিলাম। তুমি একা আছ বলে চলে এলাম।”

” ভাল করেছ। আগে বাসনগুলো মেজে দাও।”

ঘরের মধ্যে ঢুকে মাসি কৃত্যককে দেখে। বলে ” দাদা, তুমি এখানে? বউদিকে বলে দিও আজ যেতে দেরি হবে।”

” হ্যাঁ সে ঠিক আছে। তোমার জন্য আমি বসে আছি। বহু কষ্টে আজ তোমার ছেলের বার্থ সার্টিফিকেটটা পেয়েছি। এই নাও। গুছিয়ে রেখো। এক কপি জেরক্স ও করে এনেছি।” এই বলে কৃত্যক মাসির হাতে কাগজগুলো তুলে দেয়।

” দাদা তুমি বলেই এ কাজ হল।”

” হ্যাঁ। বহু কষ্টে হল।  আচ্ছা, এবার  আমি তবে  আসি!”

রিনা ও মাসি বিষণ্ণ নয়নে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কৃত্যকের চলে যাওয়া দেখতে থাকে।

সজল কুমার মাইতি, পিএইচডি। লেখক ও অধ্যাপক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়। তিনি মূলত গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। লেখালিখি শখের হলেও পেশাগত জীবনে তিনি ভারতের সরকারি কলেজ 'হুগলী মহসীন কলেজ'--এর বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..