কামিনীরা কেন এত ভালোবাসে

সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী
কবিতা
Bengali
কামিনীরা কেন এত ভালোবাসে

বসন্তের আঁচে ছাই

নিরস রেনেসাঁসের যুগ পার হয়ে বহু সন্তর্পনে
এসেছি সবুজে সবুজে ঘেরা আদিগন্ত এই চা বাগানে ।
কথা তো দেওয়াই ছিল , না এসে উপায় কী ?
এবার অবশ্যই ফিরে যাবো বৈকি ।

যাওয়ার সময় হলো , অভিমানী দোর খোলো ।
একটাও দোয়েল কিংবা তিতির আর বাধা দেবেনা কখনও ।
রাস্তা মাপা আছে , পা দুটো এগিয়েছে ।
সাথে আছে পুঁটলিতে ভরা চিড়ে খই আর গুড় ।
লালসা চেয়েছে আমার চিনেবাদাম তার সাথে ঝাল চানাচুর ।

সাত বন্ধনে লেগে আছে পিছুটান ।
আমদের কবিগান ছিল মাচা বেঁধে , সারারাত গলা সেধে , আরও নতুন নতুন রাত আনতাম ডেকে ।

আজ রাতে বাগান পাহারা দিই ,
ফল চুরি যেতে পারে , সেই ভয়ে ।
ওদিকে মাছ ধরার জন্য বসে আছে অশরীরী প্রেত ,
ভেড়ির জলে ভাসতে থাকা এক শ্যাওলাধরা নায়ে ।

মারপ্যাঁচ নেই , একেবারেই পঞ্চভূতে ।
আমাদের দালান-কোঠাতে দাবা খেলা হয় ।
ব্যাবসাতে লোকসান জমে জমে , অহংবোধে এসেছে মহাক্ষয় ।

ঝরনা দেখতে আসতো হরিণী এ বুকে , নিস্তব্ধ গভীর রাতে ।
সে অনেক আগের কথা ।
কোলবালিশটা আজও পড়ে আছে একধারে , তুলো বেরিয়ে ফাটাফাটা ।

তবু কেন আবার এলোমেলো উঠোন গোছাতে যাই ।
পলাশ ছড়ানো বাগানটাও কেমন উশকোখুশকো ।
উনোনে জ্বলছে আগুন এখনও , বসন্তের আঁচে ছাই ।

একটু এগোলেই চোরাবালি

আমার লাইটহাউসে এত অন্ধকার,
সেই সুযোগে
কালো হরিণী-চোখ দিয়ে তুমি বাণ মেরেছো এতকাল অবিরত।

আমি ক্ষত বিক্ষত,
আজও তোমাকে দেখতে পেলাম না।
ভেড়ার পশমে আবৃত থেকো , বাতাসে শীতের নেশা কনকন।

তপোভূমিতে আজ ধ্যানভগ্ন হয়েছে মুনীঋষির ,
সমুদ্র শোষণ করবে সে , এই ছিল তাঁর পণ ।
তুমি দাঁড়িয়ে অদূরেই , সুন্নত শঙ্খস্তন ।

আচ্ছা বলো দেখি , তুমি কী বাচ্চাদের হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে নেওয়া দুরন্ত কোনো চিল?
অথবা ,
হাতে মামলা না আসা কোনো বটবৃক্ষের উকিল ।

ওগো আম্রপালি , আমি ঐ গোধূলীতেই খেলি ।
মাছ কখনও কখনও মাছের শত্রু হয় ।
আমি মন-ভোমরা ভেবে ঘরে এনেছি এক অলি ।
আমার দিব্যদৃষ্টি হয়ে গেছে নয়-ছয় ।

কালের ঘরে আজ মেঘ মনোময় ।

চোরের থেকেও গোলাপ চতুর ,
চুরি যাওয়ার ভয়ে , কাল সে নিজেই ফোটেনি বাগানে ,
বুঝেছো কী তুমি মালী ?
সাবধানে থেকো , নিজেকে গুছিয়ে ,
আর একটু এগোলেই চোরাবালি ।

কামিনীরা কেন এত ভালোবাসে

সূর্যমুখীর দুগ্ধপোষ্য , ছাপোষা মধ্যবিত্ত ,
নাসিকা পতিত , গন্ধ চিনতে পুরো বছর কাটিয়ে দিল !

একথার মানে সোজা , পায়েতে মোজা , খোলো । বিবেক মনুষ্যত্ব , আর যা যা আছে এই মর্মর দেহে ,
তুমি সব , সব খুলে ফেলো ।
এই তো সুযোগ ! মাছ ধরতে গিয়েছে আজ ভেলো ।

রক্তপ্রবালের গা থেকে শুষে নেওয়া রজনীদগ্ধ কাম , বাসবে ভালো অনন্য শৃঙ্গারে ।
সেই রসে , কুটকুটে কী যেন একটা আছে ,
কামড়েছে মোর অঙ্গে ।
ওহ বুঝেছি , ভাবতরঙ্গে জোয়ার আনা এক মাতালী সোহাগ-রতি ।
আর দেখিওনা তুমি জ্যোতি ।

সব হবে শেষ , এই অনিমেষ , কে ছিঁড়েছে কামিনীফুল ?
মোর ঘরে প্রিয়া , অনন্ত হিয়া , রাত-সঙ্গমী মৌমাছি এসে আদরে বেঁধায় হূল ।

এইটুকু বলো , শরীরবাগানে কত কাকাতুয়া আসে ?
তবু নিশিদিশি সূর্য ও শশী , প্রমোদবিহারে হাসে ।

অগাধ অতশী , দেখিওনা মোরে ।
ঐ মোহতাজে জেনো আমিও খেলেছি ,
মল্লিকাহ্রদের অশ্লীল চরে ,
লতায় পাতায় সুগন্ধীবাহারে , এ শরীরকে রেখেঢেকে ।

তুমি নন্দিনী ধ্যানসমাধিতে ,
আমি বল্লভ , চিরতরু রব , রমনস্থলে আজ ।
সাতপাক ঘুরে লুকিয়ে ছুঁয়েছি অবাধ্য শকুন্ত-লাজ ।

 

অপ্রাপ্তির সন্ধ্যাতে

রাতের দু’পায়ে লেগে আছে আজ কৃষ্ণচূড়ার কথা ।

নৌকোজঠরে পরমপ্রাপ্তি , শুধু ভেসে যাওয়া হিমানীর স্রোতে , আগুনে শুকনো পাতা ।

তুমি ভুল করে তাকে জল ভেবে বসো , আমি ভাবি তাকে রক্ত ।
বেদনা ডাকছে হাতছানি দিয়ে , ইচ্ছেমৃত্যু ছুঁয়ে এসো একবার ওগো দীপ্ত ।

হাহাকারে , তুমি বন্যা ও খরা , এই দুটো রূপ পাবে ।
সাতরঙ মিলে সাদা আলো দেবে ,
মনলোভা এক ধবধবে সাদা ।
কালোরঙে যত মেশাও কায়দা , সময়ের ঘরে দ্যাখো আছে পড়ে অসংখ্য ফাঁদ পাতা ।

মেয়েদের ঠোঁটে ঘন কুয়াশার ছ্যাঁকা ,
তুমি ঐদিকে জানি ছুটে যাবে কাল , আজকে যতই হও ন্যাকা-ন্যাকা ।

বান ভেসে আসা মাছেদের ঝাঁক
বোঝেনি তোমাকে , আমিও বেবাক ।

অম্লান রবীপ্রাতে চোখের কালোবৃত্ত নিশিপ্রহরের অন্বেষণে রত ।
আপনার লাগি সামান্য বিদ্রুপ অসহ্যকর , যদি প্রেমিক হয়ে ওঠো ।

মিস্টি হাসিতে রক্তিমা দেখি আমি সূর্যের হাতে ।
নিঃস্ব হয়ে সে ঘরে যায় ফিরে , অপ্রাপ্তির সন্ধ্যাতে ।

 

চিঠি হারিয়েছে তার দিঠি

ম্লান দেহমূলে , মোহ বানিয়েছে রাজপ্রাসাদ ।
চষা জমির আলে ,
বৃষ্টি এসে পায়ে পায়ে , ফেলে গেছে ভুল করে আমার প্যানপেনে এক চিঠি , সন্ধ্যের দাবানলে ।

আমি চেয়েছি একটু ক্লান্তির শ্বাস নিতে ।
পতঙ্গ পা বাড়িয়ে রেখেছে সুন্দরী সব ফুলে ,
অগত্যা আমি বিছানা পেতেছি খসে যাওয়া বল্কলে ।

বুঝতে পেরেছি আমি আজ , বাকী রয়ে গেছে সন্ধান ।
একি ভয়াবহ , বলো তো আতরজান ।

যুদ্ধ এখন শান্তিতে চলে , ঠান্ডা ঘরের ভেতর ।
হেমন্তরাণী , শস্য কাটার কাস্তেতে দেয় শান ।

এই শরীরের সিঁড়ি নেমে গেছে বিবেকের যমালয়ে ,
আমার চিঠি উড়ছে বোধহয় , আগুনপাখি হয়ে ।

ঘুমিয়েছে অলি কত তপোবনে ,
তবু এই মন
ঝরনাকে ছুঁয়ে কবরী ভিজিয়ে সারঙ্গ ডেকে আনে ।

শব্দমোতি শূন্যসাথী , অন্তর্জাত ঘ্রাণ বয়ে ,
অশরীরী আত্মকথার প্রকাশ খুলে রাখে ।

দুহিতা ঝুলিয়ে পিঠের আঁচলে , ওগো আতরজান
তুমি হারিয়েছো কোন বাঁকে ।

এ নিশীথে আর কথা নেই ঠোঁটে ,
রূপোলি আলোর ঝলকানি রেখা দেখছি মাছের আঁশে ।
অশ্রুমুখ রেখেছি বিঁধিয়ে আমার মনমরা ক্যাকটাসে ।

সাগরের নুন পাহাড় মেখেছে , ভালোবাসা পিঠোপিঠি ।

উড়তে উড়তে , সঠিক ও ভুলেতে ,
সেই চিঠি আজ পাহাড় চূড়ায় ,
মন জোছনায় খেলতে গিয়ে হারিয়েছে তার দিঠি ।

 

জীবন বলে কিছুই নেই

অন্তত আজ একটা মৃত্যু হোক ।
গন্ধ ছড়িয়ে দিক চন্দনকাঠের লোকদেখানো শোক ।

অপ্রিয় অনেককিছুই বলে দিয়েছে আজ ,
ইতর-উল্লাস , সমৃদ্ধ-অমনিবাস অথবা আল্লাদ-প্রবাস ।

ঝরে পড়ুক জীবন্ত নক্ষত্র ভূ-মধ্যসাগরে ,
অনার্য আমার সাতহাজার বছরের মৃত্যুকবরে ।
সেখানের লুকোনো সুড়ঙ্গ থেকে খোদিত ইতিহাস
জেগে উঠেছে ফুলশয্যার বাসরে ।

তোমার দু’হাতের কাঁকনের আওয়াজে ,
মাদুরে ঘুমিয়ে থাকা ছন্নছাড়া মন্দকথারা উঠেছে জেগে ।

অন্তত আজ একটা মৃত্যু হোক ।
ইঁটকাঠ শহরের পাঁজরে গড়ে উঠুক কল্পলোক ।

আমার হাসনুহানার কলি মরেছে এক বর্ষার রাতে ।
আমি তার মৃতদেহে পেয়েছি আমাকে
সেই কাকভোরেরই প্রাতে ।

হত্যার বিদিশা তবু অন্তহীন অজুহাতে প্রাণটুকু নিতে জানে ।
অর্থ না থাকা আমার শব্দেরা , বারান্দার রোদে খেলায় ব্যস্ত অর্কিডে অহেতুক এক পেয়ালা মেঘ ডেকে আনে ।

মৃত্যুমুখের মিষ্টি খেয়াল , মুহূর্তক্ষণে লোভাতুর করে তোলে ।
এত আলোর মাঝে , তন্নতন্ন জীবনের খোঁজে
কতশত অগুনতি লোক ।
অন্তত আজ একটা মৃত্যু হোক ।

সত্যি বলতে কী , জীবন বলে কিছুই নেই ।

 

এ পৃথিবীতে সবাই বন্দী

হে অনাদি-অতীত ,
আমি মন্ত্রমুগ্ধবৎ তোমার জঠরের জলে প্লাবিত
হবো । শেষ কিংবদন্তি হয়েছিল যেভাবে ।

সুন্দর যদি অহংকে ভূমিতলে স্বাধীনতা দেয় , নভঃতল হয় অসম সাহসী ।

আমার গবেষণাপত্র , অঙ্গুরীমাল প্রাণীর টুকরো টুকরো দেহাংশে প্রাগৈতিহাসিক গতিহীনতার প্রমাণ হিসেবে গচ্ছিত আছে ।
শিহরণের শিকড় খুঁজে চলেছি আমিও ;
দুর্দমনীয় রচনার আঁচে ।

ঠিকানা শুধুমাত্র একাধিক প্রান্তিক গন্তব্যের মিলন ঘটায় ।
দু’পায়ের ছাপ জলেস্রোতে মিলিয়ে যায় ।
মুচকি হাসিটা মরচে পড়ে একঘেয়ে হয়ে ওঠে ।

তবু আমি দাঁড়িয়ে থাকি ভয়ে ভয়ে , বজ্র হয়তো মাথায় পড়বে যখন তখন ।

অনেক দূরে পাহাড়ি মেয়েটা ভেড়ার পাল তাড়িয়ে ফেরে ।
যুদ্ধের ঘোষণা হয়েছে গতকাল রাতে ।
আগেরবার তার আঙুরের বাগান গিয়েছিল পুড়ে ।

এবার সে নিজেই পুড়বে ।
যাকে মুক্তি দেয় যুদ্ধ তার জীবন থেকে ,
সেই যুদ্ধকে সে পরমপূজনীয় মনে করে , মৃত্যুর পরে ।

পতঙ্গের মতো আবদ্ধ সব অনুভূতি ,
ক্যাটাসট্রফির পাতা থেকে ক্ল্যাইম্যাক্সে পৌঁছায় প্রতি অভিনয়ে অবলীলায় ।

এ পৃথিবীতে সবাই বন্দী , বন্ধুত্ব আড়চোখে মেকি ।
পশুপক্ষী থেকে মাছ ও মানুষ ।

পেটকাটা আর মুখপোড়া দুটো ঘুড়ি , সারা আকাশ জুড়ে নির্লজ্জ কাটাকাটি খেলা খেলছে উড়তে উড়তে ।
জলকাদায় দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছেলে , মাঞ্জাসূতো টানতে টানতে হাতগুলো তাদের ফালা ফালা , রক্তাক্ত ।

 

খ-এর আনন্দরথে

মহাকাশের ছটা এড়িয়ে অনেকগুলো সূর্যশিকারের অশ্বনাভী পালিয়ে এসেছে ।
ব্যাবিলনের কোনো তন্দ্রালসা এক হিমেল রাতে তার শরীরের ওম ঢেলে দিয়েছে ।

আমার হৃদয় দূরের সাহসী হয় সেই মানুষীর কারণে ।
কাছের কুহক থেকে নষ্টামি-আহ্লাদ নিম্নগামী ।
বলাকার ক্ষমা পাবো আমি জানি , অভিসম্পাতে কৌরবকাহিনি ।

এ এক অপার স্বাধীনতার রেশ । গহীন থেকে গহীনের রত্ন যেভাবে উঠে আসে হাতের কুঞ্চিত রেখার গভীরে ।

আমার ধৃষ্টতা মার্জনা করবে মহাকাল , অন্তর্লীন মনোবীণাতে সুর কেঁদে কেঁদে বলেছে ,
ডুবুরীর অনেকদিনের আলজিভে জমে থাকা ব্যথার কথা।

পরিব্যাপ্ত সময় একই চক্রে আবর্তিত।
তনুমন সমর্পিত সারথীর নিদ্রা , খ-এর আনন্দরথে । যুদ্ধবলয়ের তীরন্দাজ রক্তস্নাত, আহত অশ্বপৃষ্ঠে।

সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী। কবি। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার দক্ষিণ বিধাননগরে। পড়াশুনো করেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলাবিভাগে প্রথমশ্রেণিতে স্নাতকোত্তর। তাঁর লেখার বিষয় বরাবরই সামাজিক অসাম্যতার বিরুদ্ধে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..