কালা কইতর

অনসূয়া যূথিকা
গল্প
Bengali
কালা কইতর

শাওন মাস, চারদিক ভাসানো বৃষ্টি। এরকম সময়েই চারদিকে ধান রোয়ার ধুম পড়ে। ধান রোয় কৃষকেরা, আর আল্লাহরে ডাকে। যেনো ঘর উপচানো ধান হয়। বাগ্গার চরের এইসব জমিতে বছরে তো একবারই ধান হয়, সারাবছরের খোড়াকি চাল আসে এই চাষেই৷ ধান উঠলে সেই জমিতে করে কৃষ্টি মানে, রবি শষ্য৷ কেউবা আবার আবাদ করে সয়াবিন কারো পছন্দ সূর্যমুখী। কেবল বাগ্গা না পরের পর যত চর আছে সব গ্রামের চাষীদেরই একই অবস্হা৷

মোটামুটি সম্পন্ন গিরি বলেই সকলে জানে জালাল মিঞাকে। আর তাই বালির বাপ বড় একটা চিন্তা বা খোঁজ নেবারও দরকার বলে মনে করে নাই মেয়ে বিয়ে দিতে৷ তাছাড়া চেনা ঘর, মেয়ে জামাই মালো কর্মী পুরুষ। মেয়ে ভালো থাকবে জেনেই চৌদ্দ পেরোনো কচি মেয়েটাকে পাঠালেন শ্বশুর ঘর করতে৷

বালি আজ বাড়িতে একাই আছে তার শ্বাশুরির সাথে। তার আরো দুই জা গেছে বাপের বাড়ি। বিয়ে হয়ে এবাড়িতে এসেছে বেশিদিন হয়নি। জানাশোনা ঘর, পাশের গ্রামের মেয়ে বালি। আর তার শ্বশুরেরাও সেই গ্রামেরই আদি বাসিন্দা৷ সন্ধ্যা সবে মিলিয়েছে, মাগরিবের নামাজ পড়ে উঠতেই পুরুষকণ্ঠের কথা শুনতে পেলো শ্বাশুরির ঘরে। সঙ্গে খলখল শব্দে হাসি, পুরুষের কর্কশ গলায় কীসব যেনো বলে চলেছে! বালির শ্বশুর নাই ঘরে, আছরের নামাজ পড়তে বাজারের মসজিদে চলে যান আজান হলেই৷ গ্রামের প্রায় সব বাড়ির পুরুষদের এটাই নিয়ম এখানে।

প্রথম যখন এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিলো বালি, তখন ভর সন্ধ্যা; এরকম পুরুষকণ্ঠের শব্দে হৃৎপিণ্ড যেনো ছলকে উঠেছিলো গলার কাছে। পরে ধীরে আস্তে জেনেছে সব, এ ও তারে ঠারে ঠোরে বুঝিয়ে দেয় আসল ঘটনা। কুট্টিকালে মোক্তবে অল্পই পড়াশুনা করেছে সে, তখন হুজুরেরা জ্বিনের কথা বলতো। কোরান শরীফে জ্বিনের কথা আছে, একটা গোটা সুরা আছে৷ জ্বিনে বিশ্বাস না করলে ঈমান অসম্পূর্ণ হয়।

বালিদের বাড়িতে দাদির বড় কড়া শাসন ছিলো৷ মাগরিবের আযানের আগে সব মেয়ে ঘরে উঠে যেতো তারা, হাঁস মুরগীর মতো। চান্নি পহরে তো রাতেও বাইরে যেতে দিতো না দাদী। বারিশার দিনের মতো ঘরের ভিতরেই পেশাব করে পালি ঢেলে দিতো। বড় ভয়, বড় ভয় পায় তারা জ্বিনের আছরের। বালি তো রাতে কখনো আয়না ধরতো না মুখের সামনে। আর সেই বালি এসে পড়লো এই বাড়িতে।

ফের সেই পুরুষকণ্ঠের খনখনে গলায় কথা বলা শুনে মুহুর্তে কাঠ হয়ে গেল বালি। সে স্পষ্ট বুঝতে পারলো, আবার তার শ্বাশুরির শরীরে সেই জ্বিন ভর করেছে। একবার মহিলা কণ্ঠের খিলখিল হাসি, খুনসুটি আহ্লাদি মাদি বিড়ালের মতো কণ্ঠ শুনছে তো ফের পুরুষের চাপা কণ্ঠ। বালির বিয়ে হয়েছে মাস আষ্টেক, বয়স কম হলেও নারী পুরুষের এরকম শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ না বোঝার কারণ নাই। যদিও এই ঘটনা নিয়ে পরিবারে চাপা কথা হয় সবসময়ই, নানানজনের নানান কিছিমের ঠেসারা শোনা লাগে বালিকে পুকুর ঘাটে গেলেই৷ যদিও বালিকে বলা পর্যন্তই দৌড় সবার, বালির শ্বাশুড়ির কানে কী সামনে এসব বলবার দুঃসাহস কেউই করেনা। শত হলেও সে এই ছোট ভুঁইয়া বাড়ির বড়বি।

একসময় দু’রকম কণ্ঠ যেন বদলে যায় গোঙানি আর অস্ফুট শীৎকারে!!

দুই

ঘণ্টাখানেক পর বালির শ্বাশুরি কইতরী ঘর ছেড়ে উঠোনে নামে, তারপর চেরাগ নিয়ে চলে খালের দিকে। খালপাড়েই বাড়ি, তাই বাড়ির বউঝিরা অনেকেই নাইতে যায় খালে। পুকুর আছে তাদের তবে সেটা এজমালি কিন্তু কইতরী বেগমের খালের পানিতেই আনন্দ। বড় বাড়ির বড় বি সে, কেউ তারে কিছু বলার নাই বটে। তাবলে হাজইন্নার পরে খাল তো দূর, বাড়ির উঠানেও নামার চল নাই এ বাড়িতে। এক কইতরীই ব্যতিক্রম। অবশ্য তার সবকিছুই তো ব্যতিক্রমিই।

বালি মনে মনে ভাবে, মাগির এখনো কী রস, কী শরীর। মাই দুইটা দেকলে যেকোন পুরুষের মাথা ঘুরবো, ঘাটে বসে যখন স্নান সারে বালি দেখেছে একটানে শাড়ি খুলে জলে নেমে পড়ে তার শ্বাশুড়ি। যেমন চেহারার ঢক তেমনি শরিরের চমক। এতো বয়সেও যে কোন যুবকের মাথা ঘুরানোর মতো যৌবনের ঢল তার শরীরে।

বালি মনে মনে একটু যেনো ঈর্ষাও টের পায় শ্বাশুড়ির প্রতি। গজগজায়ও নিজের মনে! এতগণ্ডা পোলাপান, ঘরে তিন তিনটা বেটার বউ তবু নিজের নাইকরে কেমনে নাচায় জারুনির ঝি, বাউরে বাউ! বালির হউর মানুষটা আসলেই ভাল ভাবে বালি। নইলে এই জ্বিনের বউরে কী আর তার নিজের বউ করে রাখে, দেশে কী মেয়ের আকাল! রোজ রোজ জ্বিন ভর করে যে বউয়ের শরীরে! আজ বহুবছর কইতরীর সঙ্গে এক বিছানায় তো দুর একঘরেও থাকতে পারে না কইতরীর স্বামী। মনে মনে আপসোসের শ্বাস চেপে সে রসুইঘরে আসে, জানে শ্বাশুরির এখন বিস্তর ক্ষুধা। স্নান সেরে ফিরেই খেতে চাইবে ভাত। খেতেও পারে বাপরে বাপ! তিন বদলার সমান ভাত।

তাগাড়িতে ভাত আর বাটিতে সালম সাজিয়ে রাখে। নুন আর পুইজ্জা মরিচও রাখে পাশে তসতরিতে। লেবু ধুয়ে কেটে সাজিয়ে দেয় সুন্দর করে। কেবল হাত ধোয়ার পানি দিতে ভুলে যায়।

তিন

ঘরে উঠে রসুইঘরে আসে কইতরী, খেতে বসে হাত ধোয়ার পানি না দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠে একেবারে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়। বালিকে উদ্দেশ্য করে বলে, আত ন ধুই কি ভাত খামু নে, হানি দেছ ন কিয়েরল্লাই? বালি ত্রস্তে গ্লাস এগিয়ে দেয়, বলে-

‘আঁই মন হারি গেসি, খেয়াল করি ন আম্মা। কইতরী তাতে আরো রেগে যায় বলে, নোয়াবের বেডির মন কণ্ডে থায়, খালি আছে আঁর ফুতগার লগে হুইতবার তালে। জারুনির ঝি, হাউয়ার ভিত্রে বিষ ভরি থুইসত নে’।

এরপর কইতরী নানাভাবে বালিকে কথা শুনাতেই থাকে। অশ্লীলতা যেন তাকে পেয়ে বসে, কিছুতেই থামেনা। রসিয়ে রসিয়ে নানানরকমের বাখানা করে করে বালিকে উত্ত্যক্ত করতে থাকে তার দাম্পত্য জীবন নিয়ে।

বালি একসময় আর সইতে না পেরে বলে বসে,

‘এরিগো আন্নে হবে খাল তুন উডি আইলেন, হেই জ্বিনবেডা কী অনতরি আন্নের লগে আছে নি। আন্নে এইচ্ছা করনের কিল্লাই? আঁই কিচ্ছি!’

সারা রসইঘরে ছড়ানো ভাত, ডাল, সালম, মসলার ডিব্বা সব গুছায় বালি একা। লবণ, মরিচ, হলুদের গুড়া লেগে গেছে সমস্ত কাপড়ে। প্রচণ্ড আক্রোশে পুরো ঘরটায় সমস্ত কিছু ছড়িয়েছে কইতরী। ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে তাণ্ডব দেখেছে বালি। একসময় কইতরী চিৎকার করতে করতে গিয়ে উঠেছে তার নিজের ঘরে।

অনেকক্ষণ আর শ্বাশুরির কোন শব্দ না পেয়ে ভাবে বুঝি ঘুমিয়েছে। পানির জগ রাখতে শ্বাশুরির ঘরে গিয়ে দেখে দরজা বন্ধ। পানি না রাখলে আবার কী মুসিবতে পড়বে ভেবে কুল কিনারা পায় না বালি। বহুরকমের ঝামেলার কথা মাথায় আসে তার, ছোট মানুষ খুব ভেবে কিছু তো করার মতো পরিপক্কতা আসে নাই তার। ভাবে জানালার কপাট তুলে দিয়ে দেখি আম্মা ঘুম নাকি! যা দেখে তাতে ভয়ে তার নিজের হাতপা যেন পেটের ভিতর ঢুকে যায়।

তার নিজের বিছানায় পড়ে আছে কইতরী, হাত পা বাঁধা তার নিজেরই পরনের শাড়ি ছিড়ে বানানো দড়িতে। বালির গলা দিয়ে শব্দ বেরুয় না, ভয়ে যেনো জমে যাচ্ছে বালির শরীর। সারাবাড়িতে সে একা, কাকে ডাকবে কী করবে জানে না বালি। শ্বাশুড়ির ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, আর হাত পা বাঁধা শ্বাশুড়ি পড়ে আছে বিছানায়। বাড়ির বারান্দায় একা একা চেরাগ জ্বালিয়ে বসে আছে বালি৷ সে ছোট হলেও বোঝে বাড়ির বাইরের কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকা যাবে না এখন৷ অপেক্ষা করতে হবে স্বামী বা শ্বশুরের ফিরে আসার৷

বালিরা তিন জা, তিনরকম পরিবার থেকে এসেছে। তবু তাদের টুকটাক মতের অমিল ছাড়া খুব বড় কোন অশান্তি হয়না। কিন্তু শ্বাশুরি কখন যে কী নিয়ে ক্ষেপে উঠবেন তা তারা বুঝতেই পারেনা। আজ বাড়িতে দশজন বদলা খাবে, সেজন্য দুপুরে রান্না কী হবে তা নিয়ে তিন বউকেই গালাগাল খেতে হয়েছে শ্বাশুরির কাছে। বড় বউ শেষে শ্বাশুরিকে বলেছে, আমরা সবাই ছোটলোকের মেয়ে। আপনি যখন জানেনই কেন আমাদের বউ করে বাড়িতে আনলেন আম্মা? হানজইন্না বেইন্না আন্নের কতার হুলে জ্বলি যাইয়ের আনডা।

বদলাদের খাইয়ে বাড়ির বউরা খেতে বসবে। তাই শ্বাশুরিকে ডাকতে গিয়ে তার ঘরে গিয়ে বউরা তাকে পায়না। পুরো বাড়ি, আঙিনা সব দেখে না পেয়ে পরে বাড়ির পুরুষদের খবর পাঠায়। ছেলেদের সাথে জালাল মিয়া মানে কইতরীর স্বামীও ছুটতে ছুটতে বাড়ি আসে। ছেলেরা সব জায়গায় মাকে খোঁজে, একসময় মসজিদের ইমাম সুলতান হাফেজও হাজির হন তাদের বাড়িতে।

পাঁচ

পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছে জালালদের বাড়িতে। হাফেজ সাহেবকে দেখে সবাই এক সাথে কথা বলতে চায়। সবাইকে ইশারায় থামতে বলেন। জালালকে বলেন, কী ঘটনা বাড়ির মেয়েরা বলুক। তখন পর্দার আড়াল থেকে বাড়ির বউরা ঘটনা জানায়। পুরোটা শুনে সুলতান হাফেজ বলেন, কইতরীর লগে জ্বিন আছে হিঁয়ান ব্যাকে জানে, নয়া কিসু ন৷ জালাল মিঞা এতো বচ্ছর এই বেডি লই সংসার করন লাইগসে। একটু থেমে ফের বলেন, সবাইকে বলা হয়েছে কেউ যেন তাকে কোনরকম বাজে কথা না বলে। সে যা কিছু করুক, যাই বলুক কেউ কোন উত্তর দিবানা। এতবার বলার পরেও কেন তোমরা এরকম করো? ইমাম সাহেব ফালনামা দেখেন। দোয়া পড়ে পানিতে দম করেন। এদিকে খালেক পাটোয়ারি আসলে সেই দম করা পানি দেখে বলে কইতরী কোথায় আছে কথামতো কইতরীকে পাওয়া যায় দুই গ্রাম উজিয়ে বাগ্গার মরাদোনা মানে বাগ্গার মরা নদির পাড়ের ভুইয়াদের ধানের গোলায়। গলা পর্যন্ত মাটিতে গেঁড়ে বসানো কইতরীকে বহু কষ্টে মাটি খুঁড়ে তুলে আনে ছেলেরা৷

পঞ্চাশ পেরুনো কইতরীর শরীর এখনো ত্রিশের যুবতীর মতো, ভরভরন্ত৷ ভরাযৌবনে সে সুন্দরী ছিল, কিন্তু অন্য নারীদের মতো বয়সের সঙ্গে তার রূপ কমেনাই বরং বেড়েছে। কইতরীর বাপ কলকাতার ঘাটমাঝি ছিলো, বেসুমার টাকা। দুইটা মাত্র মেয়ে, ঘরে মেয়ে বউ রেখে লোকটা পড়ে থাকতো কলকাতায়। কইতরীর বিয়ে ঠিক হয় ডগিনালা বাড়ির এক টেন্ডলের সাথে। তারা জানতো যৌতুক হিসাবে টাকা স্বর্ণ নেহাত কম মিলবে না, সম্পত্তির অংশ মিলবে বাড়তি পাওনা৷ তবু তারা এক মুরুব্বির পরামর্শে নগদ কিছু টাকা চাইলে তা দিতে স্বীকার করেনা কইতরীর বাপ কালাচান ভূইয়া। বিয়ে ভেঙে যায়, কিন্তু সেটা এই পরিবার মানতে পারে না। সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।

বড় ভুঁইয়া বাড়ি কইতরীর বিয়ে হয়, অনেকটা রূপের জোরেই। বড় বাড়ির বড়বিবি কইতরীর রূপে পাগল তার স্বামী জালাল।

সারাদিন উত্তরের পাথারে জালা রোয়ার কাজ সেরে সবে বাড়ি ফিরেছে জালাল। ঘরে নতুন বউ, সবে মাসখানেক হয়েছে এখনো নতুন বউয়ের গাঁয়ে সোথামেথির ঘ্রাণ লেগে আছে যেন! কোনমতে নাকে মুখে দুটো তো আর চেরাগ জ্বালানো যাবেনা, তেল পুড়িয়ে। এরপর চলে লক্কা পায়রার বাকবাকুম, সেই ভোরের আজানতক। ভোরে কাজে বেরোনোর সময় জালালকে বউ মনে করিয়ে দেয় আজ মনির তেলাই। সন্ধায় যেন তাড়াতাড়ি ফেরে, তাকে খাইয়ে বউ সেখানে যাবে। সন্ধায় সেজেগুজে মনির তেলাই, পরদিন বিয়েতেও যায়। বউকে যখন পালকিতে তুলে তখন সেও সেখানে ছিল। বয়স্কা মহিলা কইতরী বারন করেন পালকির সামনে না যেতে। একে সে সুন্দরী তায় নতুন বিয়ে। কিন্তু সে শোনেনা। সেই রাতে বাড়ি ফেরার পর থেকেই তার আচরণ কেমন যেন হয়ে যায়। একসময় আর সামলাতে না পেরে বাড়ির লোকেরা খোনার ডাকে। একেরপরএক চলতে থাকে খোনার পাল্টানো।

কিছুদিন কইতরীর মনমেজাজ চরম খারাপ হয়ে যায়, ফের বেশ অনেকদিন যাবৎ অসুস্থ থাকে। তারপর আবার কিছুদিন পরপর নানানকাণ্ড করে। এরপরে আবার কিছুদিন বেশ ভালো থাকে, সংসার করে মন দিয়ে। এসবের মাঝেই দুটো সন্তানও জন্মে। এরপর আবারো নানানরকম ঝামেলা শুরু হতে থাকে। রাত রাত করে কইতরী ঘর ছেড়ে বের হয়ে যেতো। বিছানায় তাকে না পেয়ে জালাল শুরুতে ভাবতো বোধহয় টাট্টির দিকে গেছে। একদিন ভোরে উঠোনে বেরিয়ে আসে জালাল, দেখে কী যেনো পুড়েছে উঠোনে৷ বাড়ির সকলে জেগে দেখে কইতরীর একটা শাড়ি, পোড়ানো হয়েছে উঠানে। স্নান সেরে এলে দেখা যায় কইতরীর হাঁটু ছোঁয়া চুল আর নাই৷ প্রায় হাতখানেক কেটে নেয়া হয়েছে। ভয়ের একটা আবহ তৈরি হয় সারা বাড়ি জুড়ে৷ কথা চাপা থাকে না, বড় দ্রুত ছড়ায়। খোনার বইদ্য ছাড়া এই অঞ্চলে কারো কোন কথা চলে না। তারা বিধান দেন কইকরীর রুহ কবজ করে বন্দী করা হয়েছে এক কালো কবুতরের মধ্যে। গভীর রাতে মগাতান্ত্রিক এক হাতে ডাব নিয়ে বাড়ির সামনে এসে নাম ধরে ডাকে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে রূহ বা আত্মা এসে জমা হয় ডাবের খোলে। পরে তা চালান করে কবুতরের মধ্যে। কইতরীর গায়ের কাপড়ও পুড়িয়েছে তান্ত্রিক। কইতরীর মৃত্যু এখন সময়ের ব্যপার, তার আত্মা পেয়ে, বদল হয়ে বেঁচে উঠবে আরেক নারী। ফের সেই যে পুরুষটি, যার সঙ্গে বিয়ে হবার কথা ছিল কইতরীর সে এক পুরুষ জ্বিন চালান দিয়েছে কইতরীর সাথে।

রাতের পর রাত জালাল তার বউয়ের সাথে একঘরে বাস করতে পারে না। মনে হয় কে যেন তার গলা টিপে ধরছে৷ কইতরীর জন্য আলাদা একার ঘরে তারে রেখে ছেলেদের সাথে থাকে জালাল। সংসার দেখতে আরেকটা বিয়েও করে সে, সন্তানের জন্ম দেয়। কিন্তু কইতরীর চীৎকার রাতের পর রাত শুনেও সে চুপ করে সহ্য করেছে। একেকদিন কইতরী দিনেরবেলা বড় সহজ করে জালালের কাছে আসতো। জানাতো কী ভীষণ রকম কষ্টের ঘটনা রোজ ঘটছে তার সাথে।

কইতরী দেখে সে শুয়ে থাকে, টের পায় এক অশরীরি পুরুষ উঠে আসছে তার পা থেকে ওপরের দিকে। টের পায় তার শরীর নিসূতা করে সেই অশরীরী ছায়া। জালাল তার স্বামী, কিন্তু কইতরী সঙ্গমে লিপ্ত হয় হররোজ অপরের সাথে। নারী পুরুষের সাধারণ সঙ্গম না, এক নারীর সাথে এক ভিন জাতের সঙ্গম। কইতরী না শরীরে না মনে, আর মানতে পারে না। প্রতিবার সঙ্গমে রক্তাক্ত হয়, প্রতিবার প্রচণ্ড ভয়, কষ্ট, আর্তনাদে কাটে সময় তবু নিস্তার নেই।

জালাল তাকে বাঁচাক, কিছু একটা করুক। কিন্তু এই দুর্গম চরে, জালালের সমস্যার সুরাহা করতে কে কোথায় আছে! সকলের কেবলই এক কথা, কইতরীকে তিন তালাক দিক জালাল।

এই শেষ না, একেকদিন কইতরীর সাথে বউদের আর সেই জ্বিনের ঝামেলা চরমে ওঠে। জ্বিন তখন বাড়ির বউদের সাথে কথা বলে। কিছুতেই তাকে দমানো যায়না। উল্টো সে কইতরীকে উঠিয়ে নিয়ে খালের পানিতে চুবিয়ে আনে। কত কত ঝারফুক, খোনার কী বৈদ্য, গাছি মায় মইগগা ওঝা কতজনকে আনা হয় কিন্তু কিছুতে রফা হয় না। বালির বাচ্চা হবে, সে ভয়ে ভয়ে থাকে। কেজানে সেই জ্বিন আবার তার বাচ্চার কোন ক্ষতি করে কীনা। শেষে এক সন্ধ্যায় সে সেই জ্বিনকেই মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করে বসে। সে চুয়া মানে জ্বিনও উত্তর দেয়, আমি শুধু কইতরীর সাথে থাকি। তার সাথেই আমাকে রাখা হয়েছে, সে আমার স্ত্রী। আর কারোর ক্ষতি বা ভালো কোন কিছুই আমি করতে পারিনা। কইতরী দোষ করে আমি না, তবু তাকে কিছু বলা মানে আমাকে বলা। সেজন্য তার এসব কাণ্ড দেখে তারে শাস্তি দিই। তোমরা কইতরীর সাথে ঝগড়া করবা না, সংসারের কাজে তারে ডাকবাও না।

বালি একমনে তবু ভাবে কী করা যায়, মনে মনে স্মরণ করে আগের সব ঘটনা। তার এক দাদীশ্বাশুড়ি তারে লুকিয়ে সব বলেওছিলেন। তার শ্বশুর চেষ্টা কম করেন নাই। একের পর এক জমি বিক্রি করেছেন, নানান লোকের কথা মেনে চলতে থাকে খোনার পাল্টানো। তারপর তারা বহুদুরের শিবচরে এক কামাখ্যাফেরৎ মায়াং তান্ত্রিকের সন্ধান পান। তিনি সিদ্ধ পুরুষ, আগমপন্থী তান্ত্রিক। এক আত্মীয়ের কাছে খোঁজ পেয়ে তার কাছে যায় জালাল। তিনি কইতরীকে ভাল করতে পারবেন বলেন, কিন্তু বিনিময়ে যে টাকা চান তা অনেক।

জালাল নিজের পরিবার আর শ্বশুরকে জানায় বিষয়টি। টাকার কথা বলে, অনেক টাকার ধাক্কা বটে!

তবু তারা রাজি হন। কারণ টাকার পরিমাণ বেশি হলেও তা দিতে হবে কইতরী ভাল হলে। চিকিৎসার সমস্ত উপকরণ একসঙ্গে কাজ করার সময়ে তান্ত্রিক নিজে জোটাবেন৷ রোগীর রোগ ভালো হলে সে সুস্থ হলে তবেই টাকার প্রশ্ন, নচেৎ নয়।

ঠিক হয় কইতরীর বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি ভাগ করে টাকাটা দেবে তান্ত্রিককে। সেই তান্ত্রিক এরপর জালালদের বাড়ি আসে।

বাড়িতে একা কইতরীকে রেখে আর সবাইকে বের করে দেন। একটা দণ্ডির ভেতর কইতরীকে রেখে সারারাত চলে পুজো। ভোরে যখন বাড়ির লোকেরা ফিরে আসে তখন সে সুস্থ। কিন্তু এর সপ্তাহখানেক পর থেকেই শুরু হয় আরেক উৎপাত। কইতরীর মা কথানুযায়ী সেই তান্ত্রিকের টাকা মিটিয়ে দিলেও শ্বাশুরি দেন না। বরং তান্ত্রিকের সাথে লিপ্ত হন তুমুল বিতণ্ডায়। একসময় তান্ত্রিক এই বলে বিদায় নেয় যে, সে যেমন ভুত ছাড়াতে পারে তেমনি লাগাতেও পারে। কইতরীর মা মেয়ের এহেন হাল সইতে না পেরে নিজের গায়ের গয়না খুলে জামাইকে দেন। তবু শেষ রক্ষা হয়না। এরপর জালাল অনেক খুঁজেছে, কইতরীর বাপ ভাইয়েরাও; কিন্তু সেই তান্ত্রিককে কোথাও পাওয়া যায় নি। এরপর থেকে সেই জ্বিন কইতরীর শরীরকে আশ্রয় করে বাস করে।

 

সম্পাদনা: শাহানাজ ইয়াসমিন

অনসূয়া যূথিকা। লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। জন্ম ও নিবাস বাংলাদেশের ঢাকায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..