কালাভুনা

অনসূয়া যূথিকা
গল্প
Bengali
কালাভুনা

ঠিক দুপ্পুরবেলা ভুতে মারে ঠেলা, তেমনি এক দুপুরবেলা নিজের জীবনের হিসেব মেলাতে না পারা এলোমেলো অনামিকা খুঁজেপেতে বের করে সব পুরনো আমলের গান শোনে। শোনে আর ভাবে, ভাবে আর শোনে। পায়না তল, পায়না কিনারা তবুও গানই তার শেষ আশ্রয়, গানই তার ভরসা। ফেরই গানই ঈশ্বর সম গানই প্রার্থনা!

আজও তাই তেমনি গান চলছে, চলছে, চলছে! ঠিক ভরদুপুর, চারদিক নিস্তব্ধ শুনশান কিন্তু অনামিকার ঘরে যেনো দক্ষযজ্ঞ চলছে। এরমধ্যেই তবু বিকট জোরে গান বাজছে ক্যাসেট প্লেয়ারে। ঘুরেফিরে একই  রকমের বহু পুরানো হিন্দি গান  হচ্ছে। ঘরে বিরাট আয়োজন, খানাপিনা। মেজবানি গোশত আর কালাভুনার গন্ধে চাপা পড়ে যায় ইত্তর আর রজনীগন্ধার সৌরভ। চট্টগ্রামের নানান রান্নার খুশবুর সঙ্গে, দমে বসানো কয়লার সঙ্গে  পাল্লা দিয়ে বাজছে মেরা দিল ইয়ে পুকারে আজা…..  কেয়া কারু কেয়া কারু….. নিজের দুই ছেলেকে ভাতের গরাস মুখে ঠেসতে ঠেসতে গুনগুন করছে অনামিকা, কেয়া কারু কেয়া কারু! মুখের ভাত সামলে ছোট ছেলে হঠাৎই বলে উঠে, কেয়া কারু মানে কি মা?

সামনে আরো দুটো মেয়ে বসে আছে, অনু  জানে তার প্রতিটা আচরণ তারা মুখস্থ করছে, গোগ্রাসে গিলছে।নতুন বউয়ের বাপের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে এসছে পরীর মতো সুন্দর দুটো মেয়ে । নিজের খুব সখ ছিলএকটা মেয়ের, হলো না। দুই মেয়েকে দেখতে দেখতে পুরানো শোক উথলায় , ছেলেদের ভাত খাওয়ায় আর গানের মানে বোঝায়!

মাথাটা যেন কেমন করে উঠে তার।

সারা ঘর জুড়ে থৈ থৈ লোক, আত্মীয় স্বজনের যেন মেলা। সাব্বিরের নতুন বউ বাড়িতে আনা উপলক্ষে এই সমাগম। কোনখানে নিজেকে একটু লুকোতে পারেনা অনু। হাজার জোড়া চোখের দৃষ্টি যেন এক্সরের মতো বিঁধতে লেগেছে তাকে। দৃষ্টিতে এফোড়ওফোড় হতে থাকে সে, নিস্তার দেয়না কেউ।

নিজের ভিতরে প্রচন্ড তোলপাড় টের পায় অনামিকা  কী যেন ডেলা পাকাচ্ছে গলার কাছটায়। কত কত কথা মনে আসছে উথাল পাথাল কান্নার সঙ্গে। ভাবে সত্যি যদি সে পাগল হতো!! সমস্ত স্মৃতি বিস্মৃতির স্তরে গোপন করতে পারতো। কিন্তু হায়, তার তো বিস্মরণ নাই। ভাবে, কিংবা মরে যেতে পারতো, ফের ভাবে নিজের ছেলেদের তবে কি হতো!

মানুষের জীবনএক বহতা নদীর মতো। তার জীবনে নতুন বাঁক আসে, গতি বদলানোও সম্ভব৷ কিন্তু কারো জন্য কারো জীবনের গতি থেমে যায় না।কেউ কারো জীবনের জন্য অপরিহার্য এমনও না।যদিও আমরা ভাবি নিজের নিজস্ব আপনার মানুষটি ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব না।

এক যুগের সংসারে দুই ছেলে, সবই গোছানো। তবু সব এলোমেলো হয়ে গেলো।

নতুন বউয়ের ঘর থেকে একবার ঘুরে আসে অনামিকা। দেখে মেয়েটাকে, কিছু দরকার কীনা খোঁজ নেয়। চুপচাপ বসে থাকা কনেবউকে দেখে, তার সাজ দেখে আর অবাক হয়। স্কুলের গন্ডি পেরোয়নি কখনো যে মেয়ে, মাত্র ক্লাস টেনে পড়তো। সেই বাচ্চা মেয়েটাকেই বিয়ে করে এনেছে তার বর, সে আজ তার সতিন। বছর পনেরোর মেয়েটাকে বিয়ে করে এনেছে সাব্বির, তার পরিবারের সম্মতিতেই। অনামিকা মানসিক ভারসাম্যহীন, এই অজুহাতে।

দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীপুরুষের সম্পর্কের রসায়ন বড় জটিল।তা যে কখন কোন দিকে মোড় নেবে তা কেইবা জানে? সেই সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষ দুটিও জানেনা এর পরিনতি।

নিজের রুমে ফেরে অনামিকা, সেখানে থাকা আত্মীয়রা তাকে দেখে ঘর ছেড়ে যায়। এতোটা সময়ধরে চেনা মানুষেরাও আজ যেনো বড় অচেনা।

সারাটা ঘরে চোখ বুলায় অনু। এই ঘর তো বটেই সারা ঘর জুড়ে সমস্ত আসবাবপত্র তার বিয়েয় পাওয়া, স্ত্রী ধন।আলমিরা ভর্তি শাড়ি অলঙ্কার তার বাপ চাচার দেয়া। চট্টগ্রামের রীতি মেনে তার পরিবার তাকে সালঙ্কারা করেই পাঠিয়ে ছিল শ্বশুর ঘর করতে। এই সংসারে সাব্বিরের নিজের টাকায় কেনা কিছুই নেই।কন্যার সুখের কথা ভেবে তার বাপের দেয়া সবই আছে ঘর জুড়ে কেবল সুখ নামের অচিন পাখির সুলুক মিললো না। সে কখন উড়ে গেছে তার অজান্তেই।

ড্রইং রুমের সামনের বারান্দা জুড়ে রাখা নতুন সব আসবাব। নতুন বউয়ের বাপের বাড়ির দেয়া, তার সুখের আশায়।

অনু বহু চেষ্টাতেও নতুন বউয়ের জন্য নিজের ভিতরে কোন রাগ টের পায় না। কেবলমাত্র সারা ঘর ঘুরে ফের নিজের ঘরের আয়নাটার সামনে দাঁড়ায়। দেখে নিজেকে আর ভাবে আত্মীয়দের ফিসফিসিয়ে বলা সেই কথাগুলো।

অনামিকা রাগি বদমেজাজি সন্দেহ আর পরিষ্কার বাতিকগ্রস্ত। বউ হিসেবে সে কখনোই সাব্বিরকে সুখি করতে পারেনি। এতো পড়ালেখা জানা বউ ভালো হয় না। আর মুরুব্বিদের মুখে তারা বরাবরই শুনেছে, যেইল্লা মা এইল্লা ছা, মা দেখে ছা দেখ। অনুর মা চট্টগ্রামের না, বর্মাইয়া মানে বর্মা মুলুকের। সে তো মেয়েকে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, প্রথা সেখাতে পচরে নাই। পারার কথাও না এটা। আর সবাই জানে কক্সবাজারের মানুষের জীবনযাপন চট্টগ্রামের সাথে মিলেও না৷

আর তাই পরিবারের সম্মতিতে আবারো বউ আনতে হলো সাব্বিরকে। পরিবারের লোকেদের খুশি করতে, পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রাখতে।

ফের মাথাটা কেমন করে ওঠে অনামিকার, ফাঁকা ফাঁকা লাগে। দুনিয়ার এতো মানুষ তবু তার জীবনেই এতো ঝামেলা হতে হলো! বাবা কক্সবাজারের নামি ডাক্তার, মা বার্মিজ। অনামিকার নিজের চেহারাতেও অনেকটা বর্মি ছাপ আছে। গায়ের রঙ ঝকঝকে ফর্সা, এখনকার মতে গ্লাস স্কিন৷ সেই চমক দেখে এবং তার বাপেরবাড়ির টাকার ঠমক দেখে সাব্বিরের পরিবার তাকে ছেলের বউ করে আনে। খোঁজ খবর তারা কম করে নাই কিন্তু অনুর পছন্দ ছিল আরেকজন, সেটা টের পায়নাই। আবার অনু নিজেও জানতো না সেটা প্রেম কীনা। সেটা বোঝার মতো বয়স বা বোধ কোনটাই ছিল না তার।

এক বড়ুয়া মানে বৌদ্ধ ছেলের প্রেমে পড়েছিল অনামিকা। কক্সবাজার থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পরে চট্টগ্রাম কলেজে পড়তে চলে আসে, চাচার বাসায় থেকে। তখনই পরিচয় বাসুর সাথে।

সেও চট্টগ্রামেরই, সাতকানিয়া বাড়ি। কিন্তু চেহারায় কেন যেন একটা সাঁওতালি ভাব ছিল। তেমনি নাক নকসা, তেমনি পেটানো শরীর।

উচ্চ মাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজে ব্যাচমেট ছিল দুজনে। তবে সে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিল এবং যথারীতি উইয়ার্ডও। কলেজের দিনগুলোতে একসাথে সময় কাটানো, ক্লাসের পরে আড্ডা, বেড়ানো বোঝা যেতো পছন্দটা এক পাক্ষিক ছিল না, এটা বোঝা যেতো।

দুজনেরই বয়স বেড়েছে ক্রমে কিন্তু প্রেমটা জমে নাই। অনামিকার চেহারা তার নামে স্পষ্ট করে ধর্মের কোন ছাপ নাই যেমনটা থাকার একটা চল আছে মুসলিম পরিবারে। কিন্তু সে ধরে নিয়েছিল  অনুও অমুসলিম। শুরুতে  সেই ছেলেটি  সহ তার আরো কিছু বন্ধু অনুকে  আদিবাসী কোন ট্রাইবের ভেবেছিল, চেহারায় একটা অবাঙালি ভাব থাকার কারণে। তার  বৌদ্ধ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, বিহারে যাওয়া বা পোশাক দেখে বাসু সোম নামের সেই ছেলেটি বুঝতে পারে নাই অনু ইসলামধর্ম অনুসারী, বৌদ্ধ না। অনুর উচ্চতাও গড় বাঙালি নারীর চাইতে বেশি, পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির বেতসলতার মতো তনুলতায় মানাতো সব রকমের পোশাকই। কেবলমাত্র আর সব মুসলিম মেয়েদের মতো সে বোরকা পরতো না বা মাথায় ওড়না পেঁচাতো না। চট্টগ্রাম কলেজে তখন শিবিরের দৌরাত্ম কিন্তু অনু বা তার বন্ধুরা এই ফাঁদের বাইরে ছিল।

বাসু, অনুসহ তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা বাম রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। চট্টগ্রামে তখন বামধারাও বেশ শক্ত। অনু যুক্ত ছিল গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গেও। তার আচরণে বা কথায়  কখনো তার ধর্মের বিষয় প্রকাশ পেতো না বা কোন বিশেষ ধর্ম মানতো বলে মনেও হতো না। বন্ধু জয়ার বাসার স্বরসতী পুজার ভোগ খেতে বা পুজার ঘরে ঢুকতে তার আপত্তি কেউ কখনো দেখেনি৷ কিন্তু পরে যখন বাসু এবং অন্যরা জানতে পারলো অনামিকা মুসলিম পরিবারের মেয়ে, অমুসলিম না বা আদিবাসীও না এটা তাদের জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিলো। অনেকটা যেনো মনে হলো প্রতারণার মতো। নেহাত অনুর মা বার্মিজ বলে চেহারা বাঙালিদের মতো না, যদিও রক্তে পাহাড়ি বা বহু রকম পার্বত্য রক্তের মিশ্রণ থাকা সম্ভব কিন্তু সরাসরি আর আদীবাসী বলা যাবে না, তখন সে প্রথম অপমানিত হয় এরপরে আস্তে সরে যায়।

বাসু তার নিজের মতের মালিক, সে যখন বুয়েটে পড়তে গেলো তখন তো বটেই তার পরেও যোগাযোগ ছিল অনুর সাথে। তার বিয়ের অনুষ্ঠানে এসছে, অন্য বন্ধুদের সাথে বসে খেয়ে গেছে।

বহু ছবি আজো আছে অনুর কাছে, যদিও সেসব আর বহুদিন খুলে দেখার সময় পায়  না অনু। ওরা কেউই নিজের নিজের কথিত ধর্ম কখনো সেই অর্থে পালন করতো বা ধার্মিক ছিল এমন না৷ বাসু চাইলে হয়তো অনু নিজের পিতৃধর্ম ছেড়ে বুদ্ধের শরণ নিতো। কিন্তু সে তা না করে সরে যাওয়া ঠিক বলে ভাবলো।

আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়ে, একদম দূপুরে চলে গেলো। অনু আরো বহু নারীর মতো একটা ব্যর্থ প্রেম বা প্রেম হতে হতে না হওয়া মেনে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিলো। বিয়ের পরে স্বভাবসুলভ সততার কারণে পুরো বিষয়টি স্বামী সাব্বিরের সাথে আলাপ করেছিল অনু। কিন্তু তার ধারণা ছিল না এরকম নির্দোষ কোন সম্পর্কের কারণে তাকে দুশ্চরিত্রা বা অসতী আখ্যা পেতে হবে। জানতো না এই ঘটনা জানাতে সাব্বিরের পরিবার থেকে শালিস বসানো হবে এবং ডেকে আনা হবে অনামিকার পরিবারকে।

জীবন বড় রহস্যময় খেলা খেলে মানুষের সাথে। আজীবন ন্যায়ের পথে চলা অনামিকার বাবাকে কন্যার এতো বড় দোষ লুকিয়ে বিয়ে দেবার জন্য অপমানিত হতে হয়। শেষে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে বসে সাব্বিরের পরিবার নয়তো তারা অনুকে ফিরিয়ে দেবে তার বাবার সাথে। মেয়ের সুখের জন্য সারা ঘরের সমস্ত আসবাব, ঘর খরচা, বেয়াইভাতি, যতো রকমের প্রথা মানা হয় চট্টগ্রামে পানচিনির পর থেকে বিয়ের পরে পর্যন্ত সবই করেছেন তিনি। এমনকি অনুর সঙ্গে সাব্বিরের মধুচন্দ্রিমা যাপনের সমস্ত খরচও তার। এখন আরো পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি!!

এতেও দমে না সাব্বিরের মা, তিনি বলে বসেন অনামিকার নাম বদলাতে হবে! এটা কোন মুসলমানের নাম না, অনামিকা মানে একটা আঙ্গুলের নাম। সাব্বির আরো পন্ডিত সে বলে, অনামিকা মানে হলো যার কোন নাম নাই। আমার বউয়ের নাম অবশ্যই ইসলামী মতে হতে হবে। তার মতে, অনুর বাবা খরচ দেবেন আর সাব্বির ফের আকিকা করবে অনুর। সেই মতে অনামিকা থেকে নুসরাত হয়ে যায় সে। কিন্তু তাতেও কি শান্তি মেলে!!

প্রতি বছর রোযার বাজার, ঈদের বাজার, ওমুকের নাতির খৎনা, তমুকের ভাতিজির বিয়ে, এর বউভাত তার আকিকার খরচ যোগাতে হয় অনুর পরিবারকে। নয়তো সাব্বিরের মান থাকে না। মধুভাতের দাওয়াত, দুরুস কুরার দাওয়াত, মৌসুমি ফল, পিঠা, ইফতার…  এক যুগের বেশি সময় ধরে সকল হুজ্জতি প্রথার নামে মেনে চলেছে অনুর পরিবার। প্রথমে মা পরে বাবা গত হয়েছেন। এখন ভাইরা পাঠায়, বোনের বাড়িতে সকল তত্ব। তবু কি নিস্তার আছে!!! ওমুকের বউ আর তমুকের শ্বশুরবাড়ি থেকে কি কি এলো, কি কি কখন কেন খাওয়ালো এই চলছে বছরভর। এরমধ্যেই দুই সন্তানের জন্ম, ওরাও বড় হচ্ছে। অনু ভাবে, তার সন্তানেরাও কি তার স্বামীর মতো হবে!  বড় হতে হতে পুরুষ হয়ে বসবে।???

বাংলাদেশের আইন নারীকে সুরক্ষা দিতে সচেষ্ট। কিন্তু একজন শিক্ষিত নারী হয়েও যে নির্যাতন যে নিগ্রহ সহ্য করছে অনু তার শেষ কই! পনেরোর মেয়ে বিয়ে করে আনলো সাব্বিরের মতো একজন শিক্ষিত মানুষ। কোথায় দেশের আইন! বিয়ে তো রেজিস্ট্রিও হলো, বয়সের জন্য আটকালো না কোথাও।

অনু তো সম্মতি দেয় নাই দ্বিতীয় বিয়ের, তবু তো বিয়ে হলো! অনু পাগল, মানসিকভাবে অসুস্হ এই সার্টিফিকেট কে দিলো! কোন ডাক্তার? তার ডিগ্রি কি!! কেইবা এসব জানতে চায়! নতুন বউয়ের বাবাও একজন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা মাত্র। নিজের কন্যার জন্য সঠিক জামাই বাছতে একজন দোজবরকেই তার ঠিক মনে হলো, কী আজব এই দুনিয়া!

সেদিন এক নামী মৌলানার ওয়াজ শুনছিলো মাইকে। যে পুরুষের এক বউ তার ইমান পাক্কা না। এটা নাকি সহিহ হাদিস, বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি সব হাদিসের বইতে এর উদ্ধৃতিও আছে। ফের অনু তো সৈয়দ বংশের মেয়ে, বাবা সৈয়দ মানে সে সৈয়দজাদি। হিসেব মতো সৈয়দা সে, তার স্বামী তো একাধিক নিকাহ করবেই।

ফের মাথাটা কেমন করে ওঠে নুসরাতের, ফাঁকা ফাঁকা লাগে। নিজের বিয়ের বেনারসি বের করে অনু। খুব সখ ছিল বিয়ের শাড়িটা টকটকে সিঁদুর লাল হবে, হয় নাই। সাব্বিরের পরিবার থেকে বলা হয়েছিল মুসলমানের বিয়েতে লাল রঙের শাড়ি হয় না। তাই সবুজ রঙের কাতান জুটেছিল কপালে। সেই শাড়িটারই আঁতিপাঁতি খোঁজে, সবুজের মাঝে কালো সুতা আছে কীনা। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, দৃষ্টি চলে না আর।

নিজেকে নিজেই ব্যবচ্ছেদ করে চলে অবিরত, কীদোষে তার কপালে এই দূর্গতি!!

হয়তো আরো কিছুক্ষণ চলতো এরকম, অন্তহীন নিজেকে ক্ষয় করা কিন্তু সময় পায় না। ছোটছেলেটা খবর দেয় অনুর ভাইরা এসছে। নিজের চেহারা ঠিক করে ত্রস্তে বেরোয় ঘর থেকে। অনুর ভাইরা তার মান রাখতে সদাই প্রস্তুত, সঙ্গে নিজেদের সম্মানও তো রাখতে হবে বেরাদরিতে। এক লরি ভর্তি নানান রকমের উপহার সামগ্রী বোঝাই করে এনেছে তারা। তিন ভাইয়ের বউ বাচ্চারা ঝলমলে সাজে সেজে এসছে অনুর বাড়িতে, উৎসবে শরীক হতে। নতুন বউয়ের গলায় পরিয়ে দেয়া হয় অনুর মায়ের গলার সাতনরি হার!

অনুর সম্পন্ন ভাইয়েরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, নামি মানুষ। বোনের বাড়িতে তাদের অনাদর হয় না, যথেষ্ট খাতির পায় তারা। নতুন নওশার সাজে পুরানো বোন জামাই আর তার নতুন বউয়ের সাথে নানান ভঙ্গিতে ফটোসেশান চলে তাদের। বাদ যায় না এর তার সাথে সেলফি। একফাঁকে সাব্বির দেখে অনুর ভাইঝির হাতে আইফোনের নতুন মডেল। এক সময় আর থাকতে না পেরে বড় শ্যালককে বলে বসে, ইবে কি নতুন মডেল না ওয়া? মাইয়ার লাই আইন্ন বালা খদা, আঁত্তে ইয়ান এক্কান লাইবো! হা হা শব্দে হেসে জবাব দেন, শ্যালক হালিয়া ফাটাই দিউম ওয়া।

বিদায় নেবার সময় অনামিকার ঘরে এসে জমায়েত হন সবাই। অনামিকার ভাই ভাবি বাচ্চারা, সকলে খুব খুশি উৎসবের জাঁকজমক দেখে। অনুকে তার বড় ভাই বলেন, বউত ঐয়ে, এত্তিরি আর ফওলামি ন গরিস। আরারতেও বয়স ঐয়ে, মানইজ্জত লই বাঁইচতাম ছাইদি আঁরা। তোর ব্যবহারের জন্য সাব্বির যদি এখন তোকে তালাক দেয় তখন কি হবে?  মেঝ ভাবি বলে উঠেন, আল্লাহ মাফ গরি দ। আমাদের মেয়েরা বড় হচ্ছে এখন, ওদের বিয়ে দিতে হবে। অনু প্লিজ, এখন আর মাথা গরম করো না। ছোট ভাইটা সঙ্গে যোগ করে, তোমারও তো বয়স হইসে আপা। ছেলেরা বড় হইসে এবার একটু সংসারি হও।

অনু ভাবতে চায় কিন্তু পারে না আর কতো শান্ত হবে কতো সংসারি হবে কতো স্হির হতে হবে তাকে?

স্বামী সংসারের অজুহাতে ছেড়েছে চাকরি, আইএনজিওর বড় চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর সংসারী হয়েছে। ছেড়েছে কেরিয়ার, কেবলমাত্র গৃহিণী হয়ে থেকেও সংসারি হতে পারলো না? সখের পেইন্টার হওয়া হলো না, ছেড়েছে আঁকা, ছাড়তে হয়েছে গান, নাটক। নানান রকম অযুহাতে শাড়ি ছাড়া পরতে দেয়া হয় না আর কোন পোশাক। বাইরে বেরোতে বোরকা জড়ায়, তবু তো সুখ ধরা দিলনা তার আঁচলে। সুখ তবে কি!

একসময় কাজের বাড়ির কাজ থামে, ওয়ালিমার দাওয়াত খেয়ে লোকে তৃপ্ত হয়ে ফেরে ঘরে। বহু রকমের সুখাদ্যের সাথে কালাভুনার স্মৃতি আর স্বাদ স্মরণ করতে করতে। বাড়ির বাগানে রয়ে যায় উনান বানানোর চিহ্ন, পোড়া কয়লা, ছাই। জীবনটা অথেনটিক কালাভুনার মতো মসলাদার সুস্বাদু হলো না বলে আপসোস তো রইলোই অনুর। কিন্তু রাত গড়াতে বিসমিল্লাহ খাঁর সানাইয়ের সুরে সকলে যখন মোহিত তখন অনু নামলো পথে।

আকাশে চাঁদ নাই, অমাবস্যার রাতে কোন কোন যোগী ঘর ছেড়েছিলেন জানা নাই অনুর। সে কেবল এটুকু জানে, সামনে একটা পথ আছে যা তাকে তার গন্তব্যে নেবে। আকাশে চাঁদ দরকার নাই কিছু পথ কেবলমাত্র তারাদের জন্য নির্দিষ্ট।

অনসূয়া যূথিকা। লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী। জন্ম ও নিবাস বাংলাদেশের ঢাকায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..