কালের স্রোতকে বাধা দেওয়া যায় না, ভালো না লাগলে সরে দাঁড়াও

হামিম কামাল
পডকাস্ট, প্রবন্ধ
Bengali
কালের স্রোতকে বাধা দেওয়া যায় না, ভালো না লাগলে সরে দাঁড়াও

শওকত আলী আমাদের স্কুলে পাঠ্য ছিলেন। লেখক পরিচিতিতে পড়া তাঁর একটা বইয়ের নাম আমাকে বেশ টানতো, প্রদোষে প্রাকৃতজন। একদিন মেজো খালার বাসায় বেড়াতে গিয়ে বইয়ের তাকে বইটা দেখে প্রথমে অবাক, পরে অধীর হয়ে উঠলাম।

ওটা আমার চাই।

আমার খালাতো বোন লুনা, ছোটবেলার খেলার সাথী, বলল, ‘লাগলে নিয়ে যাও। ফেরত দিতে হবে না।’

লুনা জানতো আমি পড়তে কেমন ভালোবাসি। পড়তে সেও ভালোবাসত। ওর বদান্যতায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বইটা আর ব্যাগের ভেতরও এমনকি রাখতে সায় দেয়নি আমার মন। বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বাসায় ফিরে এসেছিলাম। বাসা তখন মিরপুর। অনেকটা পথ।

দিন রাত এক করে পড়েছিলাম প্রদোষে প্রাকৃত জন।

প্রবন্ধটি লেখকের স্বকণ্ঠে এখানে শুনুন:

আমার মনের গভীরে কে এক দূরবর্তী পূর্বপুরুষ যেন কথা বলত। অতীতের অচিন রাতদুপুর আমাকে ভীষণ টানত। এখনো অরণ্যের অন্ধকারের মতো কিছু টানে না। প্রেয়সীর সঙ্গে আদিম বিহারের কাছ কাটানো বিকালের চেয়ে আরাধ্য আর কিছু নয়।

যখন বইটা আমার হাতে, তখন গণগণে কৈশোর। ভেতরের ধর্মগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। কিন্তু তাদের দর্শন জানা নেই! সব মিলিয়ে, প্রদোষে প্রাকৃতজন পড়ে একটা ঘোরের রাজ্যে চলে গেলাম। নিজেকে ওই মৃৎশিল্পীর স্থানে অভিষিক্ত করে কী প্রেমকোমল একটা কাল যে আমি কাটিয়েছি!

তার অনেকটা কাল পর, বাঙালির প্রদোষকাল নয়, বাঙালির নিকট অতীতের গল্প দিয়ে আমাকে মোহিত করলেন শওকত আলী। ইতিহাসের প্রদোষকালের মতো এ-ও যেন আমি যাপন করার পর বিস্মৃত হয়েছি। কাল আর কালীরা তো এভাবেই খেলছেন মানুষকে নিয়ে। মানুষ বোকা যে বনছে, তাই শুধু বুঝতে পারছে। আর এটাই যেন তার জানার পক্ষে অনেক।

জামালপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম আমরা। সেখানে সবুজের ফ্রেমে আমাদের খালা খালুর দারুণ একটা বাড়ি। কিন্তু হঠাৎ, বিকট এক অসুখ আমাকে জাপটে ধরল বলে যাওয়াটা হলো না। অসুখটাকে যখন একরকম বাগে এনেছি, তখনই জামালপুরের ডাক আবার সবল হয়ে উঠল। এক সকালে ব্যাগ গুছিয়ে সত্যিই পথ দিলাম। পড়ার জন্যে ব্যাগে নিলাম ‘ওয়ারিশ’।

এই ওয়ারিশ আমার একেকটা শোকবর্ণিল সন্ধ্যায় আলাদা রঙের প্যালেট হয়ে ছিল।

মনে হচ্ছিল, ওয়ারিশের চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা শৈশবের। শৈশবে পারিবারিক পৌরাণিক সব গল্প আর নিঃসঙ্গতা আমাকে এক বিচিত্র সময় উপহার দিয়েছিল। ওই সময় আমার সামনের গোটা জীবনের ওপর একটা রহস্যের মেঘ ছড়িয়ে দিয়েছে। বৃষ্টি কি রোদ, দুটোই ওই মেঘ গলে ভেতরে আসে।

ওয়ারিশের আবহের বিচিত্রতা আমার সেই রহস্যময় চারপাশের সঙ্গে খুব মানিয়ে গেল। ওয়ারিশের ঐতিহাসিকতা যেন আমার পারিবারিকতার ভেতর লীন।

সভ্যতার এক বিশেষ স্তরে এসে আমরা ব্যক্তিতে আলাদা হয়েছি। আমার ধারণা, ইনডিভিজুয়াল এখনবার মতো আর কখনো এতো ব্যক্ত ছিল না। সুতরাং ব্যক্তির ছবি এখন খুব স্পষ্ট। তবে ব্যক্তির চিন্তা সংঘাতে ক্ষয়প্রাপ্ত। এই সংঘাতের সবটাই তার অপর জৈবিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে নয়। এখানে যন্ত্রের ভূমিকার একটা ব্যাপকতাও আছে।

আমার একটা কোমল ভাবনা আছে। সেটা হলো, গোটা পৃথিবীকে এক করে পাওয়া। এক বলতে আক্ষরিক অর্থেই এক। বিজ্ঞান যেভাবে গোটা বিশ্বকে একটামাত্র গাঁয়ে পরিণত করেছে তেমন নয়। আমি জানি, আমি একা নই। আরো অনেকে এ পথে ভাবেন। কিন্তু ব্যক্তি এখন যেভাবে ব্যক্ত, আর সমষ্টি যতখানি চিরায়ত,  তার বিচারে আমাদের এ ভাবনার অলীক কল্পনা। সামনে একটা দেয়াল। পা উঁচিয়েও তার অপর পাশ দেখা যায় না। তাই কল্পনার উঠোনেই সে পড়ে থাকল।

অবশ্য, যা শক্তি, তাই দুর্বলতা। প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য হলো তার সম্ভাব্যতা। শ্রীসম্ভাব্যতাভরসা!

কেন এ নিয়ে এতো বাক্য করছি? কারণ আমাকে করতে হচ্ছে তা। ওয়ারিশে যে বাস্তবতা আঁকা হয়েছে তা নতুন কাঁটাতার ওঠার বাস্তবতা। তখন মহাউৎসাহে হিন্দু মুসলমান মিলে উঠোনের মধ্যখানে দেয়াল তুলতে লেগে গেছে। যারা দেয়াল তুলতে চাইলো না, তাদের পরিণতি হচ্ছে বানের সামনে পড়া তুচ্ছ খড়কুটোর মতো।

উপন্যাসের মেয়েটি এক প্রসঙ্গে বলল ছেলেটিকে, কালের স্রোতকে বাধা দেওয়া যায় না। ভালো না লাগলে সরে দাঁড়াও

শ্রীমান আহমাদ মোস্তফা কামাল আমায় বলেছিলেন,

‘একটা ভালো বই পড়ার আগে আর পরে তুমি একই মানুষ থাকো না।’

কথাটা কামাল ভাই তখন বই বিষয়ে আলাপ হচ্ছিল তাই ওভাবে বলেছিলেন। আসলে এ কথা তো কেবল বইয়ের জন্যে প্রযোজ্য নয়। শিল্পের সমস্ত মাধ্যমের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। এবং একজন বড় মানুষের সঙ্গে আলাপকেও এর সঙ্গে তুলনা করা যায় যে আলাপের আগে ও পরে আমরা একই মানুষ থাকি না।

ওয়ারিশ পরার আগে আর পরের আমি এক থাকলাম না। ভালো কিছুর সংসর্গ আসলে আমাদের নতুন কোনো তথ্য দেয় বলে আমরা উৎরে যাই, তা কিন্তু নয়। সে সবচেয়ে বড় যে কাজটা করে তা হলো, যা আছে তার সজ্জাটাকেই আরো উত্তম সজ্জায় বদলে দেয়।

আর পৃথিবীর সমস্ত আয়োজন, একটা নতুন আর উত্তম সজ্জার আয়োজন।

আমার ভেতরটা কয়েক ভাগ হয়ে নড়ে উঠল। একটা ভাগের কথাই আমি বলব শুধু। বইয়ের পাতায় পাতায় আমার যে অনুভব পশে গেছে তার কথা কিছুটা বলেছি, আর বাড়াতে চাই না। পাঠক থেকে পাঠকের মনে, বোঝাপড়ার বিচিত্রতা তার ধারা রক্ষা করুক। আমি বরং বলব আমার অন্য এক অপরাধী সত্ত্বার কথা।

ওয়ারিশ পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে আছি। ফোনটা হাতে নিয়ে বন্ধু মাহবুব ময়ূখ রিশাদকে নম্বরটা বের করে বার্তা পাঠালাম।

খুব খারাপ লাগছে। আমাদের লেখা শুরুর পর এতোদিন শওকত আলী বেঁচে ছিলেন, একটা দিন গিয়ে তাঁর সঙ্গে কাটালাম না। অন্তরে কত রতন নিয়ে তিনি একা চলে গেলেন।  এখন বইয়ের পাতা চষে যা পাই তার ওপর ভরসা করতে হবে। কিন্তু আমাদের তো সুযোগ ছিল!

রিশাদের উত্তরও এলো।

আমি ঠিকই গিয়ে দেখা করে এসেছি। অবশ্য তখনও কাকে দেখছি, মানুষটা ঠিক কতখানি বড়, তা জানতাম না। বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম। তখনো বেশ অসুস্থ তিনি। বারবার কথা ভুলে যাচ্ছিলেন। অনেক কিছু বলতে চাইতেন। বলার মানুষ পেতেন না।

জামালপুরে জংলায় ঘেরা দালানে জানালার পাশে একটা বালিশে হেলান দিয়ে আমি বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে থাকলাম। আমার কাছে সব অর্থহীন মনে হতে থাকল। এতো অহংকার দিয়ে কী করবে তুমি হামিম কামাল?

রিশাদকে বললাম, আর একজনকেও আমরা মিস করব না। এমন আক্ষেপে আর ভুগতে চাই না। রিজিয়া রহমানের সঙ্গে দ্রুত দেখা করা দরকার।

আমার মুগ্ধতা সংক্রমিত হলো। রিশাদ নাড়াইয়ের পাতা খুলে বসে ঢাকা গরম তুলল। কদিন ডুবে থাকল টানা। প্রথম খণ্ড শেষ করে আমাকে বার্তা পাঠাল।

অসাধারণ!

ওয়ারিশ থেকে আমি শওকত আলীর ওয়ারিশান হলাম। এসমস্ত মনোগত ব্যাপার স্যাপার ঠিক ভাষায় বুঝিয়ে বলতে নেই। তাতে ভাবের অপচয় ঘটে। ভাবের কতটাই বা আপনি ভাষায় ধরতে পারেন?

হামিম কামাল। লেখক। জন্ম- ১৯৮৭ সালের ৯ অগাস্ট, ঢাকায়। আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক। প্রকাশিত গ্রন্থ- 'জঠর' (২০১৬), 'কারখানার বাঁশি' (২০১৮)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ