কিশোর জর্জ স্টিনির মৃত্যুদন্ড আমেরিকার ইতিহাসের ভুল অধ্যায়

এইচ বি রিতা
প্রবন্ধ
Bengali
কিশোর জর্জ স্টিনির মৃত্যুদন্ড আমেরিকার ইতিহাসের ভুল অধ্যায়

আমি যা করিনি, তার জন্য কেন তারা আমাকে হত্যা করবে?

 

জিম ক্রো সাউথে ইলেক্ট্রিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঠিক আগ মুহূর্তে এটি ছিল ১৪ বছর বয়সী নিরীহ এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরের প্রশ্ন। জর্জ স্টিনি ১৪ বছর বয়সে গত শতাব্দীতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ আমেরিকানদের একজন, যাকে বন্দী নং ২১৬তে সিল মারার আগেই মৃত্যুর জন্য ইলেক্ট্রিক চেয়ারটিতে বসতে হয়েছিল।

জর্জ স্টিনির মৃত্যুদন্ডের ৭০ বছরেরও বেশি সময় পরে, ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বরে, দক্ষিণ ক্যারোলিনার সার্কিট কোর্টের বিচারক কারমেন মুলেন স্টিনির সাজা মুক্ত করেন। তার হত্যার দণ্ডকে অগ্রহণযোগ্য বলে স্টিনিকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। বিগত শতাব্দির বহু নারকীয় ঘটনার স্বাক্ষীর মধ্যে নিরপরাধ জর্জ স্টিনির মৃত্যুদন্ড ইতিহাসের অন্যতম একটি গল্প।

২০০৪ সালে স্টিনির এলাকার এক ইতিহাসবিদ জর্জ ফ্রেরারসন সেই মামলাটি নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু করেন এবং বিষয়টি আবার আদালতে তোলার জন্য তৎপর হন। অবশেষে, স্টিনির পরিবারের অনুমতিতে মামলাটি পুনরায় শুনানির জন্য আদালতে নেয়া হয়।

১৯২৯ সালের ২১ অক্টোবর সাউথ ক্যারোলাইনার পাইনউড অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করা জর্জ স্টিনি জুনিয়রকে যখন একটি কালো গাড়িতে করে এক দল শ্বেতাঙ্গ পুরুষ তুলে নিয়ে যান, তখন সে তার চার ভাইবোন এবং পিতামাতার সাথে লুমাবার কোম্পানির মালিকানাধীন তিন কক্ষের বাড়িতে বসবাস করতো, যা এক সময় দক্ষিণ ক্যারোলিনার অ্যালকলুতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। স্টিনির বাবা জর্জ স্টিনি সিনিয়র একটি মিলে কাজ করতেন। অ্যালকলু হল দক্ষিণ ক্যারোলিনার ক্লারেনডন কাউন্টির একটি অসংগঠিত সম্প্রদায় এবং আদমশুমারি-নির্ধারিত স্থান। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা একই সাথে মিলে কাজ করলেও শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের পাড়া, স্কুল ও গির্জাগুলি রেলপথের ট্র্যাক দ্বারা পৃথক করা হতো। বাসিন্দাদের মধ্যে এই পৃথকিকরণের কারণে তাদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ছিল সীমিত।

১৯৪৪ সালের ২৩শে মার্চ, পাশেই জঙ্গলে একটি জলাবদ্ধ খাদে দুটি শ্বেতাঙ্গ কিশোরী বেটি জুন বিনিকার (১১) এবং ম্যারি এমা থেমস(৭) এর লাশ পাওয়া যায়। তাদের মাথার খুলি ভাঙা অবস্থায় বিভক্ত সম্প্রদায় কৃষ্ণাঙ্গদের এলাকায় পাওয়া যায়।স্টিনির বাবা তখন লাশ অনুসন্ধানে সাহায্য করেছিলেন। বেটি বিনিকার এবং ম্যারি এমা নিহত হবার একদিন আগে থেকেই তারা নিঁখোজ ছিল। মেয়ে দুটিকে শেষবার তাদের সাইকেলে চড়ে ফুল খুঁজতে দেখেছিল স্টিনি এবং তার বোন এ্যামি।

 

সেদিনটা ছিল ১৯৪৪ সালের মার্চ মাস। অ্যালকলু গ্রামের এক স্নিগ্ধ সকালে জর্জ স্টিনি এবং অ্যামি রাফনার দুই কৃষ্ণাঙ্গ ভাই-বোন মিলে তাদের গরুগুলোকে ঘাস খাওয়াচ্ছিল। এমন সময় ওদের সামনে এসে উদয় হল দুটি শ্বেতাঙ্গ মেয়ে। মেয়ে দুটো যখন তাদের বাড়ির সামনে অতিক্রম করছিল, তখন তারা স্টিনি এবং এ্যামিকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘ম্যাপপস্’ কোথায় পাওয়া যাবে। ম্যাপপস্ এর লোকাল নাম ছিল তখন প্যাসনফ্লাওয়ার। দুই ভাই বোনই ফুলের সন্ধান জানেনা বলে জানায়। তারপর শ্বেতাঙ্গ মেয়ে দুটো চলে যায়, এবং দুই ভাইবোন মিলে আবারো ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের গরুগুলোকে নিয়ে।

নির্জন তৃণভূমিতে চারজন শিশু-কিশোর কিশোরীর সাক্ষাৎ ও কথা বিনিময়ের ঘটনাটিকে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, ১৯৯৪ সালের পটভূমিতে দৃশ্যটি মোটেও স্বাভাবিক ছিলনা। কারণ তখন অ্যালকলু গ্রামে শ্বেতাঙ্গদের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত এবং ছিল শ্রেণি বিভাজন।

 

শ্বেতাঙ্গ মেয়ে দুটির লাশ পাওয়ার পর পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে স্টিনিই তাদের শেষবার দেখেছিল- এরপর তাদের আর কেউ দেখেনি। আর সেটাই স্টিনির জীবনের কাল হয়ে ওঠে। সে সময় বর্ণবৈষম্য-পৃথকীকরণ ছিল প্রকট। শাসন ব্যবস্থায় থাকা শ্বেতাঙ্গরা যে কোন অপরাধে কৃষ্ণাঙ্গদেরই দোষী বলে ধরে নিতেন। তারউপর, লাশ দুটিও আবার পাওয়া গিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের এলাকাতেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই জোড়া খুনের সন্দেহ গিয়ে পড়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর জর্জ স্টিনির উপর।

 

গ্রেফতারের পর থেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় জর্জ স্টিনিকে। সম্পূর্ণ পুলিশি হেফাজতে একাই তাকে কৌশলী সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। পুলিশের কথা শুনলে ছেড়ে দেয়া হবে-এমন প্ররোচনায়ও তাকে ফেলা হয়। ভয়ানক আতঙ্কে থাকা কিশোর জর্জ স্টিনি তখন পুলিশের সব কথায় হ্যাঁ-বোধক জবাব দিয়ে যায়। এবং এভাবেই দুটি শ্বেতাঙ্গ মেয়েকে ‘ধর্ষণ ও হত্যা’র অভিযোগে স্বীকারোক্তি নিয়ে ভয়ংকর মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করা হয় কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরের জন্য।

 

আজ স্টিনির যে বোনটি জীবিত আছেন এ্যামি, তার মতে, পুলিশ যে সময়টাকে মেয়ে দুটির হত্যার জন্য দাবী করেছিল, সে সময় সে স্টিনির সাথে ছিল। সেদিন বিকেলে স্টিনিকে তার বাড়ি থেকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ছোট অ্যামি ভয়ে পরিবারের মুরগির খামারে লুকিয়ে ছিল। কিছু বলার সুযোগ ও সাহস আ্যামির ছিল না। জর্জ স্টিনিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় আ্যমি চিৎকার করে বলেছিল ‘জর্জ! তুমি কি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছ?” এটাই ছিল তার ভাইকে শেষ কথা বলা।

স্টিনির গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে তার বাবাকে মিলের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তার পরিবার তখন ভয়ংকর জনতার সামনে শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।

 

স্টিনির বাবা, জর্জ স্টিনি সিনিয়র একজন বিশেষ সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও স্টিনির মামলা শুনতে তাকে বিশেষ গ্র্যান্ড জুরির সদস্য হিসাবে আহ্বান করা হয়। কিন্তু স্টিনির পরিবার বিচারে অংশ নিতে ভয় পেয়েছিলেন। তাই জর্জ স্টিনিকে একাই তার অভিযুক্তদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অ্যামি, যিনি তার ভাইকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে পারতেন, তাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়নি। তিন ঘণ্টার বিচার শেষে, শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের একটি জুরি স্টিনিকে দোষী সাব্যস্ত করতে মাত্র ১০ মিনিট সময় নিয়েছিল। আদালত তাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টকরণের দ্বারা মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করেন। তার আদালত-নিযুক্ত আইনজীবীও আপিল করার দরকার মনে করেননি। এবং এই মামলার জুরি সদস্যদের মাঝে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ লোক ছিলেন না। বারোজন শ্বেতাঙ্গ ছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ছিলেন তিনজন, – যিনি মেয়ে দুটির লাশ পেয়েছিলেন এবং দুই জন চিকিৎসক, যারা লাশ দুটির ময়নাতদন্তে কাজ করেছেন।

রায়ের পর জর্জ স্টিনিকে কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার কেন্দ্রের কারাগারে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৮৮ দিন বন্দী রাখা হয়। এর মাঝে তার পরিবার কেবল একবার তার সাথে দেখা করার সুযোগ পায়।

 

১৯৪৪ সালের ১৬ই জুন। ৫ ফুট ১ ইঞ্চি/ ৯৫ পাউন্ড ওজনের জর্জ স্টিনি গুটিগুটি পায়ে হেঁটে আসে অন্ধকার ঘরটির দিকে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি একটি ইলেক্ট্রিক চেয়ারে মোটা টেলিফোন ডিরেক্টরি বইয়ের উপর বসানো হয় তাকে যেন, তার মাথা হেডপিস পর্যন্ত পৌঁছায়। বুক থেকে বাইবেলের বইটি সরিয়ে নেয়া হয়। সেই সাথে চেয়ারের হাতল এবং পায়ার সাথে তার হাত এবং পা বেল্টের মাধ্যমে বেঁধে দেয়া হয়। সেখানে ছিল বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা, আইনজীবী ও চিকিৎসক।

 

হতবাক স্টিনির চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তাকে বেল্ট দিয়ে মুখ বেঁধে দেয়া হয়, সাথে একরঙা কাপড়ে তার চেহারাও ঢেকে দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য মাথার সাথে সংযোগ করা হয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের। এর কিছুক্ষণ পরেই ২,৪০০ ভোল্টের প্রথম ধাক্কাটি তার ছোট্ট শরীরে বিস্ফোরিত হয়। প্রাপ্তবয়স্ক মৃত্যুর মুখোশটি ছিল তার জন্য খুব বড়, বিস্ফোরণের সাথে মুখেশটি তার মুখ থেকে পড়ে যায়। বিদ্যুতের আরও দুটি চার্জের পরে, নির্দোষ কিশোর জর্জ স্টিনিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

 

মৃত্যুদন্ডের আগে স্টিনি তার বন্দি প্রতিবেশীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমি যা করিনি, তার জন্য কেন তারা আমাকে হত্যা করবে? ”

আজ জর্জ স্টিনির একই প্রশ্ন তার বোন আ্যমি সহ বিশ্ববাসীর বিবেকবোধকে নাড়া দিয়ে যায়; কেন নিরপরাধ কিশোর জর্জ স্টিনিকে হত্যা করা হল?

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজীর আখ্যান কাব্য আধুনিক সাহিত্যেও প্রবহমান

  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে যিনি রক্ত মাংসের মানুষের আশা, আকাঙ্খা, সুখ,…..