কেবল মধ্যবর্তিনী

বল্লরী সেন
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
কেবল মধ্যবর্তিনী

ভাগ্যিস্ মস্তিষ্কের ব্যাধিতে হিস্টিরায় আক্রান্ত হলেন তিনি। ভাগ্যিস্ ক্রূর পিতার অত্যাচারে ১৭ বছরে বাধ্য হয়ে প্রথমে ইন্টারল্যাকেন ও পরে জুরিখে এসেছিলেন সাবিনা। নিজের ভেতরে অজান্তে নিজের লিবিডোর গুপ্ত দরজায় ঘা দিয়ে ফেলেছিলেন, প্রেমে পড়েছিলেন বাবার মতো চিকিৎসকের, কিন্তু তারপর?

১৯১১ সাল থেকে স্কিৎজোফ্রেনিয়া সংক্রান্ত মানবীচর্চার মুখ্য ভূমিকায় আমরা পাচ্ছি সাবিনা স্পিয়েলরিনকে। ফ্রয়েডের আমন্ত্রণে ভিয়েনার মনোবিকলন পর্ষদের মহাসভায় তিনি তাঁর নারীকেন্দ্রিক অভিনিবেশ পেশ করলেন এইভাবে-

“Becoming corresponds with sensuous feelings in the reproductive drive and defence emotions like anxiety and disgust, correspond to the destructive component of the sexual instinct.”

এই বয়ানের সাহায্যে সাবিনা প্রতিষ্ঠিত করলেন নারীর মনস্তাত্ত্বিক যৌনতার গূঢ়ার্থ, অভিপ্রায় ও গুপ্ত ভাষ্য; যার প্রভাবে ১৯১৫ সালে কার্ল ইয়ুংকে বারংবার মৃত্যুকে প্রকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে হয়েছে। কিন্তু কোথাও সাবিনার গবেষণাপত্র বা বক্তব্যের কোনও স্বীকৃতি দেখি না। লাল চামড়ায় মুড়িয়ে যে বইটি ‘Liber Novus’ বা নতুন পুস্তক অভিধায় প্রকাশ পেল, যেখানে ১৯১৩- ১৯১৬’র নানা নিরীক্ষার সারমর্ম সংকলিত হল, কোথাও তাঁর চিকিৎসাধীন মেয়েটির নামও উল্লেখ করলেন না তিনি। পাশাপাশি দেরিদা কথিত ‘doubling commentary’ হিসেবে আমরা যদি সাবিনা প্রবর্তিত প্রকরণের সূচিপত্রে একবার চোখ বোলাই, তাহলে হয়ত আজ, এতবছর পরে গবেষকের সূক্ষ্ম বহুকৌণিক অনুভাব- প্রজ্ঞার কথা জানা সম্ভব হবে।

জন কের্, যখন লুপ্ত ইতিহাস তুলে আনলেন তাঁর উপন্যাস ‘A Most Dangerous Method’-এ, আমরা জানলাম যে, ইয়ুং তাঁর বাধ্যতামূলক বিবেকের তাড়নাতে Transformations and Symbols of the Libido, Part 2 অংশে সাবিনার গবেষণার উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তা যে একদিকে তাঁর তত্ত্বের উদ্দীপক, তা সেভাবে স্বীকৃত হয়নি।

“There was indeed a personal, and quite contemporary reason why Jung’s reverie did not escape the overexcited Underworld, ruled by the ‘destructive mother’ . Let us look at that… He descends into an underworld of fantasy and there finds himself confronted by a woman who would hold him fast if she could … a woman who can experience him both as lover and as the son … a woman who tells him that all sexual attraction involves destruction…”

এখানে সাবিনার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত করেই থামেননি কের্, ইয়ুং এর দর্শনের একদিকে সাবিনার গবেষণার প্রভাব, অনুসরণ ও ধ্বংসাক্রান্ত প্রেমের বৃত্তিগত প্রয়োগকে অনুকরণ- এ সমস্ত শনাক্ত করতে ভুল হয় নি তাঁর। আরো একটা প্রশ্ন উঠে আসে, ভীষণ সাযুজ্য পাই কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে নাম চরিত্রের সঙ্গে। নির্জন দ্বীপে কাপালিকের নরবলি দেবার লোভ থেকে বাঁচালেন নবকুমারকে তিনি। নিজে মায়ের খড়্গ চুরি করে সব বাঁধন কেটে উদ্ধার করলেন হবু স্বামীকে। আর সেই দেবীস্বভাবিনী স্বামীর যুক্তিহীন অবিশ্বাসের সামনে আত্মহত্যা করলেন। মৃন্ময়ী হওয়া হল না তাঁর। অথচ পরোপকারের ব্রত নিয়েই, ননদিনীর স্বামীর বশীকরণের শিকড় তুলে আনতে মাঝরাতে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে তাঁর বিদায় হয়ত খুলে দেবে পদ্মাবতীর নতুন সংসারের ফটক, কাজেই আত্মহননকে আহূতি ও বলার সুযোগ রইল। শেষ হয়ে শেষ হল না আখ্যানের নতুন সম্ভাবনা। ‘destructive mother’ এর ভারতীয়তা কোথায় পেলেন কার্ল ইয়ুং? তাই রেড বুক-এ বহু ভারতীয় শাক্ত চিত্র সংযোজিত হল। ছবিগুলি দেখামাত্র চিনতে অসুবিধা হয় না। সৃষ্টি ও ধ্বংসের আদি বা পরাশক্তি হলেন কুলকুণ্ডলিনী, তা আমাদের প্রত্যেকের মূলাধারে নিদ্রিত অবস্থায় আছে। সাবিনার দর্শনের ভিতরের উৎসে, শাক্ত তন্ত্রের চক্র ও ইন্দ্রিয়গোচর বিশ্বের সম্পর্কের ঐতিহ্যকে লক্ষ করা যায়। তবে কি বান্ধবীর অনুকরণে ইয়ুং নিজে ভারতীয় তন্ত্রের কাছে ভিক্ষাপাত্র ধরেছিলেন?

স্ত্রী বর্তমান, জড়িয়ে পড়েছিলেন দশবছরের ছোট সাবিনার সঙ্গে। তাঁর চিকিৎসাধীন মেয়েটি হয়ত টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মস্তিষ্কের ব্যাধিতে নিজেই কিছুটা অসহায়, নিজের পরিবারে মা ও বাবার বিবাদের মধ্যে তার জন্ম। মা তাঁর পছন্দের মানুষকে গ্রহণ না করাতে, অশান্তি ও রুক্ষ স্বভাবের পিতাকে দেখে উদ্বেল কিশোরী সাবিনা, ইয়ুং এর মধ্যে পেলেন পিতৃসত্তার নতুন এক রূপ। মাকে লেখা চিঠিতে লিখেছেন-

“That I love him is as firmly determined as that he loves me. He is for me a father and I am a mother for him, or more precisely the woman who has acted as the first substitute for the mother … I have never seen my father normal…”

মাত্র ২৬ বছরের মেয়েটি যখন গবেষণাপত্রটি ইয়ুং এর হাতে তুলে দিয়েছিল এবং ইয়ুং তার নাম উল্লেখের বহুবিধ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও কোথাও সাবিনার কৃতিত্বের উচ্চারণ করেননি, তখন সাবিনার সংঘাত যে একাদিক্রমে পরিবার, ইয়ুং, ইয়ুংপত্নী, ফ্রয়েড ও বৃহত্তর বিদ্যাচর্চার জগত, তার নিজের অতীতও সেখানে ভাগ বসিয়েছে নতুন ভিন্ন কোণে। বলা যায়, কিশোরীর ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স আসলে তাঁর খুব কাছ থেকে দেখা সাবিনারই। যার মানসিক অবসাদ, হিস্টিরিয়া, পিতা-প্রেম জনিত আশঙ্কা ও ভয় মিলিত হয়েছিল ইয়ুং এর প্রতি এক সম্পর্ক যৌগতে। এহেন কঠিন বিনিময়ের একদিকে থাকতে গিয়ে, নিজের আশঙ্কা ভারাতুর অভিজ্ঞতার দলিল নিয়ে সাবিনা তার গবেষণার ভেতর দিয়ে তৈরি করেছে এমন এক সংস্কৃতির বিপ্লব, এমন এক প্রতিবাদী বিপ্রতীপতা যা কোনো বিশেষ কালের চলতি ধারণার নয়, বরং তার সাহায্য নিয়ে সাহিত্যে নারীর বয়ানকে নতুন স্বরূপে আবিষ্কার করা যায়,যা পুরুষ গঠিত পরিকাঠামোর তাঁবেদার নয়। বলা যায়, এই স্বরান্তরের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাই নারী ও পুরুষের নিহিত নারীত্বের সেই রন্ধ্র, যাকে লুকিয়ে রেখে আমরা প্রতিনিয়ত তাকে নিজের ইচ্ছামতো স্বৈরাচারে লিপ্ত হয়েছি। Tim Parks ‘Globalisation, Literary Activism and the Death of Critical Discourse’ শিরোনামে তাঁর লেখাতে বলছেন-

There are only two ways in which people relate to each other, remarked the anthropologist Louis Dumont provocatively: hierarchy and competition. By hierarchy, Dumont did not mean a simple top-down power relationship, but the kind of complex social structures which assigned to each sex, class and caste some special role, so that each had a position that was specifically his or hers and that could not be taken away. (Pg 168/ literary activism, Ed Amit Chaudhuri)

পৃথিবীর সেরা গবেষণার শিরোপা চাননি তিনি। কিন্তু তিনিই প্রথম যাঁর দর্শনে নারীবিশ্বের গুপ্ত সিন্দুক ঝন্ ঝনিয়ে উঠল। মেয়েমানুষের যৌনসুখ, মেয়েমানুষের যৌন উল্লাসের শারীরবৃত্তীয় বিভাব অনুভাব ও সঞ্চারী ভাবের প্রথম দলিল লেখা হল তাঁর গবেষণায়। পুরুষের স্বরূপে নারী ও নারীর স্বরূপে নারীর আত্মহননবৃত্তির উপলব্ধি তাঁর লেখায় চিহ্নায়িত হল বহুকৌণিক পরিসরে। মনে পড়বে দর্পণের প্রতিবিম্ব দেখে কৃষ্ণ কী বলেছিলেন? তাঁর সেই তিন অপূর্ণ বাসনার পরিপূরণের জন্যই চৈতন্যজন্ম,অন্তরে কৃষ্ণ ও বহিরঙ্গে রাধা হয়ে। রাধা তাঁকে কী চোখে দেখেন, কতখানি গভীরভাবে ভালবাসেন- এই জিজ্ঞাসা থেকে, অর্থাৎ প্রিয়তমার মনে নিজের অস্তিত্বের বোধ কীরকম,এই হল কৃষ্ণের প্রধান কৌতূহল। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত আদিলীলা ৪র্থ ও মধ্যলীলা ৮ম পরিচ্ছেদ জুড়ে এই ঈপ্সাকেন্দ্রীয়তা। কিন্তু পুরুষের অণুবেদনে নারীত্বের সংবেদন নিয়ে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস তো আরো আগে গীত রচনা করেছেন।

এ তো নতুন নয়। প্রেমের প্রগাঢ়তা প্রাপ্ত আস্বাদন মুহূর্তে, কে নারী কে বা পুরুষ! কিন্তু এই সমান্তরাল বিপ্রতীপতাকে ব্যক্তি তার সংকটের মধ্যে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা ও ভয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে যখন শনাক্ত করলো, তখন সে তার মেয়ে-মননে উদ্ভাবন করে ফেলেছে প্রথম বিদ্রোহমন্ত্র। কবিতা সিংহ যেমন বলেছিলেন,”আমি ই প্রথম বিদ্রোহিণী”। আর সাবিনাকে দিনের-পর-দিন পুরুষ তার স্নেহ পরশের পুতুল করে বেশ চলছিল। হঠাৎ চোর ধরে ফেলে ইয়ুং- পত্নী Emma বেনামে চিঠি লিখলেন সাবিনার মা ইভাকে। চিঠি পেয়ে Eva হুমকি দেন যে অচিরে তিনি Eugen Bleuler কে সমস্ত জানাবেন। এর ফলে ইয়ুং এর চাকরিও যেতে পারে কারণ তিনি একটি মনোরোগীর চিকিৎসক হিসেবে হাসপাতালে যুক্ত। সাবিনার চিঠিপত্র ও ডায়েরি থেকে এরকম বিবরণ পাচ্ছি:

Poetry again, and as usual, will I ever in my life forgive him what he concocted with me; he did not sleep that night, became exhausted, cannot fight it any longer… The question for me is whether to surrender with all my being to this violent vortex of life and to be happy while the sun is shining or, when the gloom descends, to let the feeling become transferred to a child and science?

‘পোয়েট্রি’ শব্দটি তাঁর লেখায় বহু ব্যবহৃত। শব্দটি যে কোড্ হিসেবে কোনো বিশেষ যৌথক্রিয়ার নির্দেশক, তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। আর তাতে সম্পূর্ণ সায় ছিল তাঁর। বরং এর ফলেই, নারীর দৈহিক সংবেদনের অভিনব এক মানচিত্র তৈরি করতে পারলেন তিনি, তাঁর প্রেম- দ্বন্দ্ব- যন্ত্রণার মধ্যে থেকে উঠে এল যূথবদ্ধ নারীমননের নতুন পার্সপেক্টিভ- ফ্রয়েড যাকে স্পর্শ করতে পারেননি। রোলাঁ বার্তের পূর্বসূরী হিসেবে এই মহিলার গবেষণাটি আমাদের কাছে বহু যুগ আগে নারীর অবদমনের বয়ান নির্মাণ করেছিল। আমরা গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলাম। ইয়ুং নিজেও উপেক্ষা করেছিলেন প্রথমযুগে। আর ফ্রয়েড তাঁর কন্যার মৃত্যুর পরে ১৯২০ সালে সাবিনার তত্ত্ব থেকে গড়ে তুললেন ‘Beyond the Pleasure Principle’। স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত সোফির আকস্মিক চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ফ্রয়েড নতুন সংযোজন করলেন মানুষের মৃত্যু- সঙ্কল্প বা ‘death drive’ যাকে গ্রিক দেবতার নামে নামাঙ্কিত করলেন,’Thanatos’। এর আগে ১৯১১ সালে ভিয়েনায় মনোসমীক্ষার মহাসভায় তাঁর গবেষণাপত্র পাঠের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ফ্রয়েডের উদ্যোগে। John Launer জানিয়েছেন,

“In ‘Destruction’ Spielrein’s approach to biology and sexuality was from the view of a young woman filled with both desire and fear. She often spoke from her own experience in confessional tones.“

প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে পারি, ১৯৮১ তে ফরাসী লেখিকা এলেন সিক্সু লিখেছেন, ‘Castration or Decapitation’ যেখানে নারীর প্রথাগত পুরুষ দৃষ্টিভঙ্গির বদল হওয়া দরকার বলছেন তিনি। আর একক অবস্থান থেকে সারাজীবন যিনি সংঘাতের মধ্যে দিয়ে নারীবীক্ষণের অন্য মহাদেশ গঠন করেছেন, ১৯১১ সালে তাঁর গবেষণার মাধ্যমে কি নারীবাদ প্রতিষ্ঠার সিলমোহর পাইনি আমরা? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিন বছর আগেই সাবিনার মূল থিওরি বহির্বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করেছে, তাই প্রচলিত ধারণার স্কিমে ফেলে, সমকালীন পুরুষত্ব বা শিভালরি দিয়ে এর ধার ভোঁতা করা অসম্ভব। এর গভীর টঙ্কার ছুঁতোয় থাকে জয়া মিত্রের ‘জলের নাভি’ কবিতাটি-

অশ্বমেধেও মন ওঠে না তোর?
বিশ্বজিৎ ও তুচ্ছ মনে হয়?
টুকরো করে এই নে তবে দিলাম
এই নে শরীর এই নে মেধা, জ্বাল।

চিতার আলোর ছায়ায় মেলে পা
চুল বেঁধে নে,টিপ দে কপাল ভরে
আরশিকে ফের চিতায় ছুঁড়ে দিয়ে
কান্না হাসি শার্সি ভাঙা ছাই

প্রতিবাদের নীরব দাহ নিয়ে সাবিনার গুম্ ঘরে শুয়ে থাকার বয়সও অনেক। আর কতদিন আমরা সাহিত্যে, সমালোচনায় এভাবে মেয়ে বলে অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে চলবো, কে জানে!

 

সম্পাদনা: জোবায়েন সন্ধি

বল্লরী সেন। গবেষক, কবি। প্রকাশিত বই বাংলায় ৫ টি ইংরেজি ২ টি। 'বিহান রাতের বন্দিশ' কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০১০ এ কৃত্তিবাস পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১২ থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা ভাষার নানা গবেষণায় যুক্ত। 'নারী বীক্ষায় পুরুষের কবিতা' তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণা গ্রন্থ।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ