কে এই রমণী

আদিল মাহমুদ
কবিতা
Bengali
কে এই রমণী

পড়শি

আমাদের বাড়ি পাশে—
সে এসেছিলো নব আষাঢ়ের মেঘ-জলে ভিঁজে
স্নাত হয়ে বৃষ্টিতে
পুষ্পিত মাটিতে চন্দন চুয়ানো দু’টি পায়ে
মনে হলো— ‘সে পৃথিবীর একাই একটা শ্রাবণ
বেহেশত থেকে নেমে এসেছে সবেমাত্র’।

আমার বন্ধুর হৃদয়ের অন্তর গহীনে
তার চৌম্বকীয় আকর্ষণ প্রেমের উত্তাপ ছড়াচ্ছে ক্রমাগত
অতপর অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছি পড়শিকে
আজ ওদের বিয়ে।

 

অসুখী শরীর

এই শহর ঘুমিয়ে পড়লে
নৈঃশব্দে বিন্দু বিন্দু শিশির কণা ঝরে পড়ার সাথে সাথে
আমি শুনতে পাই তোমার নিঃশ্বাসের নিয়মিত ছন্দপতন
অদৃশ্য চোখে দেখি তোমার ছটফট
বিছানার উপর ছড়িয়ে পড়া অতৃপ্ত শরীর
পায়ের নিচে পিষে যাওয়া
লেপ্টে থাকা মৃত মাকড়সার দেহের মতোন।

আমি জানি, তোমার শরীর সুখী নয়
সে মিথ্যেবাদী এবং নিঃসঙ্গ
তোমার শরীর কি তোমাকে জানান দেয় না
তোমার হাতের নিচে আমার রোমশ বুকের আলতো ছোঁয়া কেমন মায়াময়!
কতটা প্রেমময়, উন্মুক্ত ভালোবাসার উত্তাপ
পৃথিবীর অপবিত্রতম সুন্দর
অশ্লীলতম সুন্দর

প্রিয় চারুলতা! তুমি কি জানো না?
তোমার আঙুলের কাছে আমার আঙুলের প্রেম নিবেদন
কতটা বিষাক্তরকম প্রণয়
উষ্ণ যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যম
এক পৃথিবী সুখ

 

পূর্ণিমা

এ রকম একটা ভরা পূর্ণিমায়
ছেলেটা প্রেম চেয়ে ছিল কয়েক অমাবশ্যার পর
আজ আবার তার সাথে দেখা হাতিরঝিলে
ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজের কাছে
একা। কেউ নেই পাশে …

বাতাসে জোৎস্নার ঘ্রাণ। স্নিগ্ধতার মায়াজাল
বয়ে চলছে অজস্র ঢেউ পরস্পরে কথা বলে
প্রেম ডুবে যাচ্ছে লেকের নোংরা জলে
পূণ্য-পাপ মিলে মিশে একাকার হয়ে—
নবজন্ম হচ্ছে তীরে ঘাঁসে

প্রেমিক হলেই মানুষ পূর্ণিমা হয়ে যায়
জোৎস্না হয় পূর্ণতা

 

কলঙ্ক

কমলাপুর রেল স্টেশনের পাশে
এক পৃথিবী ক্ষুধা নিয়ে
আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে এক কিশোরী জননী
কোলে দু’এক বছর বয়সী পোড়াকাঠ একটা শিশু
কোন করম এক্সেরে রিপোর্ট ছাড়াই দেখে বুঝা যাচ্ছে
হাড় জিরজিরে অসুস্থ অন্ধকার শিশুর ভবিষ্যৎ …

কিশোরী জননী অসহায়, অভুক্ত
স্তন শুকিয়ে দুপাশে দুটি ফোড়াত মত হয়ে আছে
বৃষ্টির মত চোখ থেকে কপল বেয়ে অশ্রু নামছে
বুক বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল
কোলের বুভুক্ষ শিশুটা আর্তনাদ করেই চলছে
গাল নাড়ছে, জিভ চাটছে

এদিকে একবিংশ শতাব্দীর গায়ে কলঙ্ক লাগছে

 

মানুষ

প্রত্যেকটা মানুষ একেকটি গল্প
কেউ কেউ এক-একটি ছেঁড়া ছেঁড়া গল্প
আবার কেউ উপন্যাস
কেউ অসমাপ্ত কাব্য
কেউ আবার খাঁ খাঁ জমি, ধু ধু মাঠ
কেউ কেউ অবিরাম বৃষ্টিতে ভেজা তীর্থের কাক

মানুষ কেমন উদাসীন
নির্দিষ্ট গন্তব্য বুঝি কারো নেই!

 

কবর

ভাটিদিহি মসজিদের পাশের কবরস্থান থেকে
আমাকে কেউ ডাকে
জন্ম থেকেই প্রতিদিন গভীর রাতে ডাকে
একটু বড় হয়ে জানলাম
অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকেই ওখান থেকে কেউ ডাকে
কিন্তু কেউ জানেন না, কে ডাকে? কেন ডাকে?
হয়তো সে অশরীরী, কিংবা অভুক্ষ কোন নিস্তব্ধতা
আত্মা ক্ষুধার টানে আমাদের কাছে ডাকে
অথবা শুনতে চায় মানব জীবনের ধূসর সংলাপ

যে রাতে বিবস্ত্র শশধর সম্মুখে দাড়িয়ে
খুলে দিয়েছিল তার সব আবরণ, উদোম শরীর
সে রাতেও গাঁয়ের মসজিদের পাশের কবরস্থান থেকে
আমাকে কেউ ক্ষুদ্ধ সরে ডেকে ছিল
স্বার্থের জুয়াখেলায় মত্ত এই বিচিত্র পৃথিবীর মায়া
আমি তার ডাকে শুনেও না শুনার ভান করেছি
মগ্ন হয়ে ছিলাম শশীর মায়াবী জোৎস্নার জীবন্ত উল্লাসে
আজও গভীর রাতে আমাকে কেউ ডাকে
আচ্ছা বলতো জীবন— ‘ডাক শুনলেই কি যাওয়া যায়?’

একদিন সুবহে সাদিকে ইস্তেগফার করে
রমজানের প্রথম দশক কিংবা শেষ দশকের শুক্রবারে
জীবনকে পূর্ণতার চুম্বন দিয়ে
ধরণীকে বিদায় জানিয়ে তার ডাকে সাড়া দিবো
ইনশাআল্লাহ্

 

কে এই রমণী?

পৃথিবীর বুকে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ চোখের সামনে ফুটিয়া উঠিলো এক ষোড়শি রমণীর অবয়ব
বিস্মিত আমি!
কে এই রমণী?

‘রবি ঠাকুরের নলিনী?
নজরুলের নার্গিস?
জীবনানন্দের বনলতা সেন?
মজনুর লাইলী?
শাহজাহানের মমতাজ?
শেলির হ্যারিয়েট?
নাকি রোমিওর জুলিয়েট?’

সেই যে যৌবনের পদার্পণে—
নিত্য আড্ডা মুকুল দাদুর চা’য়ের দোকানে
দাদুর দোকানে এক ব্যান্ডের ফিলিপস রেডিওতে
বিশ্ব বিচিত্রায় ইংরেজি গান বাজে
মুকুল দাদুও দেখি দুচোখ বুজিয়ে গানের তালে তালে মাথা দোলায়

ও দাদু! কিছু কি বোঝো?
ফোকলা দাঁতে হাসি দিয়ে দাদু বলে— ‘বুঝি গো বুঝি’
ঐ তো একই কথা, ভালোবাসাবাসি।

কেউ কি ছিলো দাদু তোমার?
মুকুল দাদু উদাস নয়নে শূন্যে তাকায়
অজান্তেই অস্পষ্ট কন্ঠে বলে ‘কমলা’
দাদু কমলা তে হারিয়ে যায়।
আমিও সেই রমণী আদলে হারাই
পৃথিবী তন্ন তন্ন করে এখনো খুঁজিয়া বেড়াই
কে এই রমণী?
কোথায় তার বসতবাড়ি?

আদিল মাহমুদ। কবি। জন্ম বাংলাদেশের ঢাকায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ