কোলেস্টেরল শত্রু নয়, বরং বন্ধু

জুঁই ইয়াসমিন
প্রবন্ধ, বিজ্ঞান
Bengali
কোলেস্টেরল শত্রু নয়, বরং বন্ধু

কোলেস্টেরল ও হৃদরোগ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এখন পুরণো হয়ে গেছে। নতুন গবেষণা বলছে, কোলেস্টেরল হৃদরোগের কারণ নয় বরং একটি লক্ষণমাত্র। এমনকী কারুর কারুর ক্ষেত্রে খারাপ কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন-এর উচ্চমাত্রাও এখন খারাপ কোনো বিষয় নয়, যদি তিনি ফ্যাটসমৃদ্ধ ও কমমাত্রার শর্করাজাতীয় খাবারে অভ্যস্ত হোন। এতদিন যাবত লিপিড, এলডিএল, ভিএলডিএল, এইচডিএল, ভালো কোলেস্টেরল, খারাপ কোলেস্টেরল এবং এদের কাজ সম্পর্কে মেডিকেল ও ফার্মাসিউটিক্যাল স্কুলগুলোতে যা পড়ানো হতো তা সম্ভবত ভুল এবং অবশ্যই অসম্পূর্ণ। ইমফ্লামেশনের কারণে ধমনীর প্রাচীরে ক্ষত সৃষ্টি হয় যা একসময় হৃদরোগের সৃষ্টি করে। কোলেস্টেরল আসলে রিপেয়ার মলিকিউল বা মেরামত অণু যা ক্ষতস্থানে এসে ক্ষত সারানোর চেষ্টা করে। তাই কোলেস্টেরল সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আগে ইমফ্লামেশন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

জানি আমার কথাগুলো খুব কানে বাজছে। কারণ, আমাদের কান এসব কথা শুনে অভ্যস্ত নয়। একথাগুলো আমার নয়। তবে যাঁর তিনি নিজেও একজন মেডিকেল প্রফেশনাল নয়। তিনি একজন সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, নাম ডেভ ফেল্ডম্যান। এই ভদ্রলোকই প্রথম বললেন যে, লিপিড প্রোফাইলকে এতদিন যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা আসলে ঠিক নয়।

ফেল্ড ম্যান তার নাদুস নুদুস শরীরটা থেকে মেদ ঝরাবার জন্য কিটোজেনিক ডায়েট শুরু করেছিলেন। কিটোজেনিক ডায়েট হলো খাবারে কার্বোহাইড্রেট-এর পরিমাণ খুব স্বল্পমাত্রায় রেখে ভালো ফ্যাট-এর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া এবং সেইসাথে মধ্যমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা। দূরারোগ্য মৃগীরোগের চিকিৎসায় এটি একটি সফল খাদ্যব্যবস্থা। এই ডায়েটটি অনুসরণ করে তিনি খুব ভালো অনুভব করেছিলেন, যা তিনি এর আগে কখনই করেন নি। কিছুদিন পর যখন তিনি কোলেস্টেরল স্ট্যাডি করলেন তিনি দেখলেন রক্তে তার কোলেস্টেরল-এর মাত্রা ৩২৯ মিলি মোল/লিটার এবং এলডিএল কোলেস্টেরলের (তথাকথিত খারাপ কোলেস্টেরল) মাত্রা ২৬০ মিলি মোল/লিটার। অথচ সাধারণ গাইডলাইন অনুযায়ী রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ২০০-এর নীচে এবং এলডিএল-এর মাত্রা ১০০-এর নীচে থাকা আবশ্যক। এমন পরিস্থিতিতে যেকোন ডাক্তার তাকে স্টাটিন দেবেন। স্ট্যাটিন মূলত শরীরে কোলেস্টেরল-এর মাত্রা কমাতে ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরে নতুন কোলেস্টেরল তৈরী করতে বাঁধা প্রদান করে। তবে, এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। একজন চিকিৎসক শুধুমাত্র তখন স্টাটিন প্রেসক্রাইব করেন যখন তিনি মনে করেন রোগীটির অদূর ভবিষ্যতে হার্ট এটাকের ঝুঁকি আছে। যাইহোক নিজের লিপিড স্টাডি দেখে ফেল্ডম্যান মোটামুটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। কিটোডায়েট অনুসরণ করে তিনি বেশকিছু ওজন ঝড়িয়েছিলেন। তার অন্যান্য স্বাস্থ্য লক্ষণগুলোও বেশ ভালো ছিলো। আর সবচেয়ে বড় কথা তিনি খুব ভালোবোধ করা শুরু করেছিলেন যা তিনি ইতিপূর্বে কখনও করেননি। অথচ, তার কোলেস্টেরল স্টাডি কেন খারাপ আসলো তা নিয়ে তিনি অনুসন্ধান শুরু করলেন।

তিনি তার পরবর্তী কয়েকবছর কোলেস্টেরল সিস্টেম নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলেন এবং লো-কার্ব ডায়েট কীভাবে তার কোলেস্টেরল স্টাডিতে ভূমিকা রাখছে সেবিষয়ে ব্যক্তিগত ডেটা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকলেন। সেইসাথে তিনি তার ডেটাগুলো নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা শুরু করলেন। তিনি দেখলেন একে একে পঞ্চাশজন মানুষ তাদের নিজ নিজ ডেটাগুলো ফেল্ডম্যানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সেসব ডেটা থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, কোলেস্টেরল নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝি আছে। বিশেষ করে যারা লো-কার্ব ও হাই-ফ্যাট খাবার খান তাদের ক্ষেত্রে কোলেস্টেরল স্টাডি একদম অন্যরকম। তার ওয়েবসাইটে পাওয়া ডেটাগুলো বিশ্লেষণ করে ফেল্ডম্যান উপসংহার টানলেন যে, কালেস্টেরল নয় বরং ইনফ্লামেশনকে আমাদের দোষ দেওয়া উচিত। আর এভাবেই তিনি কোলেস্টেরল সম্পর্কিত পুরো প্যারাডাইমকে শিফ্ট করে ফেললেন।

আমাদের খাদ্যতালিকা যখন শর্করাপ্রধান হয় তখন আমাদের শরীর অধিকাংশ শক্তি গ্লুকোজ থেকে গ্রহণ করে। আমরা শর্করা খাই, এগুলো পাকস্থলী ও অন্ত্রে পাচিত হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়। তারপর, অন্ত্রের প্রাচীর দ্বারা শোষিত হয়ে গ্লুকোজ রক্তস্রোতে মিশে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন ক্ষুধার্ত কোষে চলে যায়। তবে কোষে প্রবেশের জন্য সাধারণত এদের ইনসুলিনের সাহায্য প্রয়োজন হয়। আমাদের রক্ত মূলত জলীয়। চিনির এই জলীয় অংশের সাথে মিশে যেতে কোনো সমস্যাই হয় না। ঠিক যেমন একগ্লাস পানিতে একচামচ গ্লুকোজ অনায়াসে মিশে যায়।

কিন্তু আমাদের খাদ্যতালিকা যখন চর্বিপ্রধান হয়, তখন আমাদের শরীর অধিকাংশ শক্তি চর্বি থেকে নেবে। এক্ষেত্রে চর্বিজাতীয় খাবার পরিপাকতন্ত্রে পাচিত হয়ে ফ্যাটি এসিড তৈরী করে। সমস্যা হচ্ছে এই ফ্যাটি এসিড সরাসরি রক্তশ্রোতে মিশে যেতে পারে না। কারণ, চর্বিজাতীয় পদার্থ জলীয় দ্রাবকে মিশে যেতে পারে না। একগ্লাস পানিতে একফোঁটা তেল দিলে যা হবে ঠিক তেমনটাই ঘটবে এখানে, অর্থাৎ ওই তেল রক্তস্রোতে প্রবাহিত না হয়ে বরং রক্তনালীর প্রাচীরের সাথে আটকে থাকবে। কিন্তু, শক্তির একটি অন্যতম উৎস এই ফ্যাটকে সামলাবার মতো বুদ্ধিমত্তা মানবদেহের আছে। ফ্যাটকে কোষে কোষে পৌঁছে দেবার জন্য আমাদের শরীর দুটি কাজ করে।

প্রথমতঃ এটি তিনটি করে ফ্যাটিএসিড নিয়ে একটি বান্ডিল তৈরী করে, যাকে ট্রাইগ্লিসারাইড বলা হয় এবং যা ফ্যাটিএসিড অপেক্ষা সহজভাবে পরিবহণ করা যায়।

দ্বিতীয়তঃ শরীর এই ট্রাইগ্লিসারাইড বহনের জন্য কিছু নৌকা তৈরী করে, যাদের আমরা লিপোপ্রোটিন বলি। লিপোপ্রোটিন লিপিড ও প্রোটিন সহযোগে তৈরী বলে এটি লিপিড অংশ দিয়ে ফ্যাটিএসিডকে ধরে রাখে এবং প্রোটিন অংশ দিয়ে সহজেই জলীয় রক্তে ভ্রমণ করতে পারে।

এখন এই লিপোপ্রোটিন যখন পরিপূর্ণভাবে ট্রাইগ্লিসারাইড বহন করে তখন এদের ভেরি লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন বা ভিএলডিএল বলে। আর এই ভিএলডিএল যখন কিছু ট্রাইগ্লিসারাইড কোনো কাজে ফেলে দেয় তখন এদের লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন বা এলডিএল বলে।

হ্যাঁ আপনি ঠিকই পড়ছেন, এলডিএল যাকে সাধারণত আমরা খারাপ কোলেস্টেরল বলি, আসলে এটি কোলেস্টেরল নয় বরং এটি প্রোটিনের তৈরী একটি বাহন, যেখানে অন্যান্য প্রয়োজনীয় চর্বি জাতীয় পদার্থের সাথে কোলেস্টেরল একটি যাত্রীমাত্র।

কোলেস্টেরলও শরীরের প্রয়োজনে এলডিএল নামক নৌকায় যাত্রা করে। আর প্রয়োজন না হলে এটি নৌকা থেকে নামে না। যখন শরীরে ইমার্জেন্সি অবস্থার সৃষ্টি হয় শুধুমাত্র তখন কোলেস্টেরল যকৃত দ্বারা উৎপাদিত হয়ে এলডিএল নৌকায় ইমার্জেন্সি স্পট অভিমুখে যাত্রা করে। কারণ, কোলেস্টেরল-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে কোষের মেরামত করা।

আর এলডিএল-এর মূল কাজ হলো কোষে চর্বিজাতীয় শক্তি উৎপাদনকারী পদার্থ সরবরাহ করা। তাই যখন কেউ চর্বিপ্রধান খাবার খাবে তখন তার শরীরে এলডিএল-এর মাত্রা বেড়ে যাবেই, এতে অবাক হবার কিছু নেই। বরং এসবক্ষেত্রে এলডিএল ভালো বলেই গণ্য হওয়া উচিত। কারণ অনেক ফ্যাটিএসিড অপেক্ষা করছে আর এদের কোষে বহন করে নিয়ে যেতে এলডিএল প্রয়োজন। আর যদি আপনি সুস্থ হন, কোথাও কোনো কোষে মেরামতের প্রয়োজন না পরে তবে এলডিএল কর্তৃক বহনকৃত কোলেস্টেরল হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এইচডিএল)-এর মধ্যে বোঝাই হয়ে যকৃতে ফিরে আসে এবং সেক্স হরমোন বা বাইলসল্ট তৈরির কাজে বা অন্যকোনো কাজে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে চর্বিসমৃদ্ধ খাবার টেস্টেস্টরন-এর মাত্রা বৃদ্ধি করে।

এতেই আমরা বুঝতে পারছি আমাদের শরীর কতটা ধীশক্তিসম্পন্ন। শরীর সমস্ত চর্বিজাতীয় পদার্থের জন্য কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছে এবং যেগুলো কাজে লাগছে না বা উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে তাদের আবার সে রিসাইকেল করছে। তাই যখন শরীর শর্করাপ্রধান খাবার না খেয়ে বরং চর্বিপ্রধান খাবার গ্রহণ করছে, তখন তার শরীরে কোলেস্টেরলসহ অন্যান্য চর্বিজাতীয় পদার্থেও আনাগোনাও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে, কোলেস্টেরল টেস্টে বেশিমাত্রার ফলাফল আসছে। এখন, শরীরে যদি কোথাও কোনো কোষীয় ক্ষত না থাকে অর্থাৎ কোনো মেরামতের প্রয়োজন না পড়ে, তবে মেরামতের জন্য সিমেন্টসদৃশ কোলেস্টেরল ব্যবহৃত না হয়ে বরং তা অন্যকোনো জরুরি কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়।

আমাদের একটা সাধারণ ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, ধমনীর ভেতরের প্রাচীরে কোলেস্টেরল জমা হয়ে ধমনীতে ব্লক সৃষ্টি করে অনেকটা গ্রিজের কারণে যেমন পানির পাইপে ব্লক তৈরী হয়। কিন্তু, বিষয়টি আসলে এতটা সরল নয়। এখানে অনেক সূক্ষ্ণ জিনিস আছে, যা ভেবে দেখা আবশ্যক।

আমরা আগেই জেনেছি যে, কোলেস্টেরল আসলে একটি মেরামত অণু যা ক্ষতিগ্রস্ত কোষে গিয়ে জমা হয়, তাকে সারিয়ে তোলার অভিপ্রায়ে। অর্থাৎ কোলেস্টেরল যায় ক্ষত সারাতে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যে এলডিএল পার্টিকেলগুলো কোলেস্টেরল বহন করে, তারা এত বড় যে সহজেই ধমনীর প্রাচীরের ছিঁড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানে আটকে যায়। আর এখানথেকেই প্লেক তৈরি হওয়া শুরু হয়।

তাই, প্লেককে প্রতিরোধ করার জন্য যদি এলডিএল কোলেস্টেরল কমিয়ে দিই, তবে শরীর মেরামত অণু থেকে বঞ্চিত হবে; কিন্তু কাজেরকাজ কিছুই হবে না। বরং যারা রক্তনালীর ভেতরের প্রাচীরে ক্ষত সৃষ্টির জন্য দায়ী, তাদের দেহের ভেতরে প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ এলডিএল একটি অজানা সমস্যার লক্ষণ, কোনোভাবেই কারণ নয়। তাহলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায় যে, কী সেই কারণ যে রক্তনালীতে ক্ষত সৃষ্টি করছে।

ধারণা করা হচ্ছে যে মূলত ইনফ্লামেশন রক্তনালীতে ক্ষত সৃষ্টির জন্য দায়ী। বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে। ধূমপানের কারণে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ে যেগুলো রক্তনালীর এন্ডোথেলিয়াল সেলে ক্ষত সৃষ্টি করে। এই ক্ষতিগ্রস্ত সেলগুলো তখন শরীরের জন্য একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। শরীর তখন এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ক্ষতস্থানে মেরামত কর্ম চালায়। আর তা করতেই গিয়ে সেখানে কোলেস্টেরল, ফ্যাট, বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কোষ, ক্যালসিয়ামসহ আরো কিছু পদার্থ ক্ষতস্থানে জমা হয়ে প্লেকের সৃষ্টি হয়। রক্তনালীর প্রাচীরে গর্ত থাকা অপেক্ষা ওখানে একদলা কাদার মতো পদার্থ আটকিয়ে রাখাকে শরীর অপেক্ষাকৃত শ্রেয় মনে করে।

সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি, কোলেস্টেরল-এর দেহাভিমুখী গমন একটি বড় সমস্যার ইঙ্গিত। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে কোলেস্টেরলই সেই সমস্যার কারণ।

এখন পর্যন্ত হার্ট ডিজিজের রিস্কফ্যাক্টর খোঁজার ওপর যে গবেষণাগুলো হয়েছে তার মধ্যে ফ্রামিংহাম হার্ট স্টাডি উল্লেখযোগ্য। এই স্টাডিটি শুরু হয়েছিলো ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে, যেখানে কয়েকপ্রজন্ম ধরে হৃদরোগের বিভিন্ন ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এই স্টাডি থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে হৃদরোগের প্রধান রিস্কফ্যাক্টরগুলো হলো-

১.অধিক কোলেস্টেরল এবং রক্তনালী ব্লক

২.স্মোকিং

৩.স্থূলতা

৪.শারীরিক পরিশ্রম না করা

৫.উচ্চ রক্তচাপ

৬.মানসিক চাপ।

মজার বিষয় হচ্ছে (কোলেস্টেরল ছাড়া) ওপরের সবগুলো ফ্যাক্টরই ইনফ্লামেশনের জন্য দায়ী। এরা ইনফ্লামেশন সৃষ্টি করে আর ইনফ্লামেশনের কারণে রক্তনালীর প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্লেক হলো ইনফ্লামেটরি জীবনযাপনের ফলাফল। অর্থাৎ যে ধরনের জীবন-যাপন শরীরে ইনফ্লামেশন সৃষ্টি করে তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে ইনফ্লামেশন রক্তনালীর প্রাচীরকে ছিঁড়ে ফেলে। কোলেস্টেরল তখন সেখানে যেয়ে সেই ছেঁড়া মেরামত করে এবং ছেঁড়াস্থানে স্তুপ হয়ে থেকে রক্তপ্রবাহে বাঁধার সৃষ্টি করে। তখন যাকিছু ঘটে গিন্নি বলে কোলেস্টেরল ব্যাটাই দায়ী। কারণ, সে রাস্তা রোধ করে বেআক্কেলের মতো জমা হয়ে আছে।

তবে, ইনফ্লামেশনই যে, প্রধান আসামী তা এখন অনেকেই অনুধাবন করছেন। গবেষকরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন যে, কোনগুলো আসলে রোগের কারণ আর কোনগুলো লক্ষণ। সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ডেভ ফেল্ডম্যান এখন কোলেস্টেরল মাস্টার হিসেবে অনেকের কাছেই সমাদৃত।

ইনফ্লামেশন কমানোর উপায়

ইনফ্লামেশনের আদ্যোপান্ত বের করতে এখনো অনেক কাজ বাকি। তথাপি অস্বাস্থ্যকর খাবার, স্থূলতা, স্মোকিং, শারীরিক শ্রম না করা এবং মানসিক চাপ যে ইনফ্লামেশন সৃষ্টি করে তাতে আর সন্দেহের অবকাশ নেই। নিচের পাঁচটি উপায়ে আমরা ইনফ্লামেশন কমাতে পারি এবং আমাদের হার্টকে রক্ষা করতে পারি।

চিনি বর্জন এবং কম শর্করা গ্রহণ:

সবার আগে চিনি বাদ দিতে হবে আর সেই সাথে অতিরিক্ত শর্করা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সেই জায়গায় স্বাস্থকর খাবার যেমন-আনঅক্সিডাইজ্ড ফ্যাট, ভালো প্রোটিন এবং প্রচুর সবুজ শাকসবজি খেতে হবে।

পলিফেলন খেতে হবে:

বিভিন্ন রঙিন ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে। এসবে আছে পলিফেলন যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কাজ করে। ফলে ইনফ্লামেশনকে প্রতিরোধ করা যায়। কারণ এরা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়। তাই প্রতিদিন রংধনু খাবার গ্রহণ করতে হবে।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম:

শারীরিক পরিশ্রমে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দূর হয় বলে ইনফ্লামেশন সৃষ্টির সুযোগ পায় না।

মেডিটেশন করা:

মেডিটেশন বা ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রার্থনা মানসিক চাপ কমায় যার ফলে অক্সিডেটিভ ড্যামেজ ও ইনফ্লামেশন কমে।

স্ট্রেস কমানো:

যে ঘটনাগুলো আমাদের মধ্যে স্ট্রেস তৈরী করে তা হয়তো আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না তবে সেই ঘটনাগুলোর বিপরীতে আমাদের প্রতিক্রিয়াকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারি। ইয়োগা, হালকা শারীরীক পরিশ্রম, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, প্রার্থনা প্রভৃতি স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

ঘুম:

একটি গভীর ঘুম এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

অন্ত্রের অণুজীব:

আমাদের অন্ত্রে বসবাসকারী অণুজীব যাতে আমাদের অনুকূলে কাজ করে সে বিষয়ে সচেষ্ট হওয়া।

জুঁই ইয়াসমিন। লেখক ও গবেষক। পড়াশুনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে। পরবর্তীতে ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামের আওতায় 'ফুড সায়েন্স, টেকনোলজি ও নিউট্রিশন' স্নাতকোত্তর। বর্তমানে স্বাধীন স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। স্বাস্থ্য ও মেডিসিন বিষয়ে নিয়মিত লেখালিখি করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ