কৌস্তুভ শ্রীর কবিতাগুচ্ছ

কৌস্তুভ শ্রী
কবিতা
Bengali
কৌস্তুভ শ্রীর কবিতাগুচ্ছ

সকাল হলো

ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী করে আলো আসছে ঘরে।
জানালার ফ্রেম ছিঁড়ে একটা সকালের পাখি বেরিয়ে গেল।
মদের বোতলের মতো সুশ্রী রাত ঢুকে পড়ছে রোমন্থনের ট্রাংকে৷
একটা ঘুমন্ত প্রিয়মুখ কষ্ট হয়ে ঝুলে থাকবে অনেক বছর।
আমি। তীব্র চলে যাওয়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

 

জীবন থেকে মৃত্যুর গন্ধ আসে

বইয়ের খাঁজে রেখে দেয়া ফুলের মতো
ছবিতে ভাঁজ করে রেখে দিয়ে এসেছি নিজেকে।
আমার কোন গন্ধ নেই আর কোথাও।
ধরে রাখা সময় থেকে ঝরে যাওয়া গন্ধ আসে।
জীবন থেকে গন্ধ আসে মৃত্যুর।
আর আমার গায়ে মেখে থাকে
জঠরের জলের গন্ধ।
আমি ভাবি, আমার জন্য জরুরি কী ছিল?
শহরের পেট্রোল পাম্পের মতো
রাত জেগে জেগে ফুরিয়ে গেছে জীবন।
যাপনের ছবি থেকে নিজেকে তুলে নিয়ে
আমিও ফিরে গেছি। আমার জন্য তবে জরুরি কী ছিল?
আমার জন্য জরুরি ছিল জানা
যে, আমার জন্য জরুরি কিছুই ছিল না।।

 

আমার মা আমার অবাক শিশু

আমার মা কে আমি বলি অবাক শিশু। ‘সোফির জগত’ এর জ্ঞানী বড়দের মতো নয় সে, যারা পৃথিবীটাকে একটা অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছে। আমার মা এক অবাক শিশু। পৃথিবীর সবকিছুতে তার অপার বিস্ময়।
ফল কাটতে গিয়ে তার রঙ, ঠিক তখন মরিচ খেতে আসা টিয়াপাখির ঠোঁট, আর একটা খোঁড়া কাকের জীবনযুদ্ধ, সব কিছু সে শিশুর চোখ নিয়ে দেখে অবাক হয়ে৷ আমার তখন নিজেকে তার মা মনে হয়। কারণ আমার চোখ এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কবে! অথচ আমার ৫৫ বছর বয়সী মা, এখনো পৃথিবীকে প্রথমবারের মতো দেখে!
মেঘ থেকে বৃষ্টি, আর আকাশ থেকে আলো, মাটি থেকে গাছ, আর পানি থেকে রাজহাঁস, সবকিছুকে তার অবিশ্বাস্য লাগে। আর আমি, হেসে ফেলি। ভাবি, আমার চোখ এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কবে! অথচ আমার মা এখনো পৃথিবীকে প্রথমবারের মতো দেখে।
মটরশুঁটির খোলস থেকে টপটপ করে দানা বেরিয়ে আসে, শুকনো চায়ের পাতা থেকে রঙ ছড়ায়, সারারাত ধরে ফুল ফোটে, নাইট কুইন। আমার মা আমাকে দেখায়। আর আমি, পৃথিবীতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি কবে! আমার মা এখনো দেখে, এখনো শোনে, এখনো ছোঁয়। পৃথিবীকে। প্রথমবারের মতো।
আমি শুধু তাকেই দেখি। এক রাত পানি না পাওয়া গাছেদের অভিযোগ শোনে সে। পাখিদের জন্য ভাত বসিয়ে যখন আমার কাছে আসে, আমি শুধু তাকেই শুনি। খেলার মতো আমাদের চারপাশের দেয়াল ঠেলে যখন ছুঁতে চায়, আমি শুধু তাকেই ছুঁই, প্রথমবারের মতো। নাম দেই তার, আমার মা আমার অবাক শিশু।

 

চা

শুধু মায়ের সাথে চা খেতেই আমার ভাল লাগতো। সকালে দুপুরে বিকালে আর সন্ধ্যায়। আর রাতেও। থেকে থেকে।
অস্থিরতায় পানি কেমন ফুটতে থাকে। নিঃশেষ হতে শুরু করার মুখে মুঠো ভরে চায়ের পাতা ছুঁড়ে দিলে রঙ ছড়ায়। পেয়ালায় নিয়ে পান করা যায় সুস্বাদু৷
আমার মিথ্যে অসুখের স্কুল ফাঁকি, অফিস কামাই, সবকিছু এই চায়ের জন্য। মায়ের সাথে। ছিল।
যাপন থেকে উদযাপনের এই ছোট্ট ভ্রমণ। বেলায় বেলায় সোনালী অথবা কমলা আলোয় সেই ভ্রমণকে রূপালী দেখায়।
যাপনকে আমরা ঠিক সেইভাবে পান করেছি। নিঃশেষ হবার মুখে, মুঠোতে রঙ নিয়ে যারা আসে, সেইসব মানুষে তৈরি সুস্বাদু যাপন। উদযাপন।

কৌস্তুভ শ্রী। কবি, স্থপতি। জন্মঃ ১৯৯১, রাজশাহী। স্থাপত্যে পড়ালেখা শেষ করে ঢাকায় কর্মরত। প্রকাশিত বইঃ মহাপ্রয়াণ সড়ক (চৈতন্য প্রকাশন)

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ