ক্যাপিটলিজমের ঘুঙুর নাচ

হারুন-অর-রশীদ
কবিতা
Bengali
ক্যাপিটলিজমের ঘুঙুর নাচ

ক্যাপিটলিজমের ঘুঙুর নাচ

চালের শরীরে ষড়যন্ত্রের লাল চোখ
ভাতের থালায় ধবধবে অন্ধকার
গুদাম ভর্তি রাষ্ট্রের শোক,
মদের পেয়ালায় ঘুমন্ত মন্ত্রনালয়
টাস্কফোর্সের চোখে ডিসপ্রিনের অবসাদ
আমরা দেখছি ক্যাপিটলিজমের ঘুঙুর নাচ।

এপাশে নীল আলো ওপাশে অন্ধকার
অন্ধকারে ঝুলে আছে ক্ষুধার মগজ
প্রতিটা ধানক্ষেত নিরন্নের হাহাকার
দীর্ঘশ্বাস আটকে দেয় সিন্ডিকেটের বোতাম

প্রিয়তমা! বোতাম খুলে দাও, নয়তো
দম আটকে মরবে তোমার সন্তান।

ক্ষয়

আমার বাবা যিনি ছিলেন ফেরিওয়ালা
ক্ষেতে-খামারে, রাস্তায়; অলিতে-গলিতে
কখনও রেল লাইনের ক্লান্ত রোদে-নয়তো
রেগে ওঠা নদীর বুকে তাকে দেখা যেত।

আমি রোজ বাবাকে দেখতাম; অন্যরাও দেখতো-
যেখানে সেখানে ঝুঁড়ি ভর্তি দূর্দশা মাথায় নিয়ে
ফেরি করতেন গ্রামে, শহরে, পার্কে, উদ্যানে।

প্রপিতামহের মতো জটাধরা বটগাছটার নিচে
সে দুঃখের ঝুড়ি কখনও কখনও নামিয়ে রেখে
নিঃশ্বাসের শিষি খুলে দিতো, আর চারপাশে
গজিয়ে উঠতো শেকড় সমেত দীর্ঘশ্বাস।

পরে জেনেছিলাম ওই দীর্ঘশ্বাসের আগাছা থেকে
এক পরগাছার জন্ম হয়েছিলো, যেটা ছিলাম আমি
আমি যেন বাবার বুকে গজিয়ে ওঠা আগাছাকে
ছাপিয়ে দীর্ঘশ্বাসও আটকে দিয়েছিলাম।

বাবা রোজ দুঃখ ফেরি করতে গেলে মা আমার
হতাশার রুমাল উড়িয়ে প্রতিক্ষার গাছে পানি ঢালতেন
আর ধিরে ধিরে গাছটাও বেড়ে উঠতো।

ক্ষুধা বিক্রি করে বাবা যখন গঞ্জে যেতেন
লোকেরা চোখ থেকে ধোয়া উড়তে দেখতো
আর কাঁধে হামাগুড়ি দিতো কালো কালো রাত।

বাবা যখন বাড়ি ফিরতো
রাস্তার পাশের গাছগুলো হা করে চেয়ে থাকতো
না, তাদের কোন সাস্তনার বাক্য ছিলো না
প্রতিটি গাছে নাকি ঈশ্বর ঘুমিয়ে থাকে-বাবা বলতেন।

বাবা এখন আর ফেরি করেন না, বড্ড হাভাতে
সারাদিন শুয়ে শুয়ে ঝুড়ি ভর্তি দুঃখ গেলেন
আর দুঃখ গুলো তার শরীর বিষিয়ে তোলে, কেবল ব্যাথা।

সেদিন ডাক্তার বাললেন- বাবার হাড় ক্ষয়ে গেছে
কোমর, ঘাড়, হাটু, মেরুদন্ডের হাড় খেয়ে ফেলেছে
ভাবলাম বাবার হাড়ের অন্ধকারে উঁইপোকার বাস।

কিন্তু না! সেদিন হাড়ে কান পেতে শুনলাম
পুঁজিবাদ, রাজনীতির গোপন কিট, বৈশ্বিক মাতাল
আর যুদ্ধবাজ ছারপোকার দানবীয় দাতাল কোলাহল
তারা দূর্দশায় পোড়া হাড় খেয়ে বেশ তরতাজা হয়ে উঠেছে।

লাশের কাবাব

হলুদ বৃষ্টি শেষে এই ঘনঘোর দুঃসময়ে
এই মিথ্যার মিথস্ক্রিয়ার দেশে
আমাদের শোকগুলো আটপৌরে দারুন।

লাশের কাবাব হাতে জুঁই ফুল রোদে
ধর্ম উপসী নারী, বুকে পুষে গোপন আগুন
কলবে কলবে ঢালে আগামীর বিভ্রম।

লাশের কিতাব খুলে হরিনাম জয়গানে
লজ্জার বোতাম আটে বেগানা বাতাস
লাশের গন্ধে হাসে মাতাল সময়।

বাতাসের পাঠ শেষে নদীও ভাটির গানে
বুকের গহীনে রাখে নিস্তেজ ঢেউ
পাহাড়ের অশ্রু তবু একরোখা ঢঙ্গি মেয়ে
কেড়ে নেয় বসতি-বাগান।

কোমরে দাঁত পুষে রাজনীতির ফানুস ওড়ে
মায়ের আকাশ জুড়ে শোকের পান্তা কাঁদে।

মৃত্যু; জন্ম-জন্মান্তরের দোসর

যে তোমার মাঝে রোজ প্রবেশ করে তাকে তুমি ভয় পাও?
একবার নয়
দুইবার নয়, এমন—
লক্ষ-কোটিবার, কিংবা- তারও অধিক
নিঃশ্বাসের শব্দের মত শান্ত, অথচ-
কতনা কঠোর তার পদচারনা।

যখন তুমি জেগে, নয়তো-ঘুমন্ত দেহে
শ্বাশত প্রেমিকার মতো তার অস্তিত্ব
তোমার হৃদয়কে অবগুন্ঠন করে আছে,আর তুমি–
কাপুরুষ প্রেমিক,
তার ছায়া বুকে করে পালিয়ে বেড়াচ্ছো!

তার স্পর্শে তোমার ভয়, অথচ–
তোমাকে রোজ ছুঁয়ে যায় অদৃশ্য সে হাত
তার মিলনে তোমার কন্ঠ স্তব্ধ হয়, অথচ–
রোজ কতনা অবলিলায় তোমার হৃদয় ছোঁয়
বেরিয়েও আসে
এক কৌশলী জাদুকরের ইশারার পথ বেয়ে।

জন্মান্ধ তুমি!
তাকে প্রতি পলকে দেখো, অথচ-
তার অবয়ব তোমার দৃষ্টিসীমার বাইরে
প্রজাপতির ডানার বাতাসের মতো ক্ষীণ তার কন্ঠস্বর
যদিও ছদ্মবেশী নারীর মতো ভয়ংকর তার থাবা।

তুমি যতই পালাও
সে তোমাকে ঘিরে রাখে, দূর্বোধ্য দেয়াল
তার হাত পৃথিবী ব্যাপী বিস্তৃত
এমনকি শূন্য থেকে মহাশূন্যব্যাপী তাকে দেখেছি আমি
বাতাসের পালঙ্কে; শান্ত-সৌম্য-দীপ্তিময় অন্ধকার।

সমুদ্রের গভীর তলদেশে, এমনকি–
নিঃসঙ্গ কোন নির্জন দ্বীপে, ধূ ধূ বালুকার হাহাকার বুকে
পাহাড়ে, পর্বতে, নদীতে, সমুদ্রে কিংবা
বন্ধ্যা মাটির গর্ভের বাতাসে সবর্ত্র
সেই শ্বাসত দোসর আমার।

কাকে ভয় পাও তুমি?
যে তোমার জন্ম-জন্মান্তরের দোসর!!

বলিষ্ঠ কবিতার জন্য..

প্রসব বেদনায় কাতর পৃথিবী
তীব্র ব্যাথায় কেঁপে উঠেছে মাটি ও মসনদ
দাঁতে দাঁত পিষে প্রতিক্ষায় আজারবাইজান থেকে ইথিওপিয়া
পুষ্টিহীন কবিতা চায়না আর—

একটি বলিষ্ঠ কবিতার জন্য মায়ের জরায়ুতে আত্মাহুতি দিচ্ছে ইরাক, সিরিয়া, আফগান
ফিলিস্তিনী পাপড়ীগুলো ঝরিয়ে দিচ্ছে নিষ্ঠুর ক্ষরার চাবুক
ইয়েমেন থেকে তুরস্ক, মিশর থেকে নীলনদ
একটা ঢেউ, একটা ছন্দ, একটা প্রবল বিমূর্ত স্লোগানের জন্য
পাখির পালকের মতো নির্ভার কবিতার জন্য
বোমারু বিমানের মতো ঝাঁক বাঁধা শব্দের শা শা ধ্বনীর জন্য
জন্মজন্মান্তরের রক্তে ভরিয়ে তুলছে পা-ুলিপির শরীর।

একটা কবিতা চাই কেবল
যার শব্দগুলো, মিসাইল রোদ হয়ে ছুটে যাবে
পারমানবিক বোমার চেয়ে অধিক তীব্রতায় হবে বিস্ফোরিত
পশ্চিমা শুয়োরের খোয়াড়ে প্রকম্পিত হবে যার বাতাস
যার বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হবে মুখোশের অবতার
জেগে উঠবে জাতিসংঘের ঘুমন্ত শরীর।

বর্ণগুলো মিছিলের আগুন কাঁধে হেটে যাবে
প্রলয় নৃত্য ছন্দে দুলে উঠবে যার পরাবস্তব ক্রোধ
সমুদ্রের ঢেউ বুকে এগিয়ে আসবে আবৃত্তির ঝংকার
ছত্রে ছত্রে আগুনের প্রলয় শিখায় খসে যাবে পাহাড়ের গর্দান।

একটা কবিতা কেবল অগনিত কবিতা হয়ে
গেরিলা যোদ্ধার মতো ক্রোলিং করে উপড়ে দেবে বৈশ্বিক কাঁটাতার।

একটা কবিতা কেবল অগণিত কবিতার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত
শপথের তীর্যক ধ্বনীতে বিধ্বস্ত হবে বেলফোস্টের দেয়াল।

একটা কবিতা কেবল অগণিত কবিতা হয়ে
পথে, প্রান্তরে, মোড়ে, ময়দানে এমনকি-
সাগরে নদীতে, বাতাসের কলবের জিকিরে
ঠাঁই দাড়িয়ে যাবে অভেদ্য ঢাল।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..