ক্যামন মরদ

রাণা চ্যাটার্জী
কবিতা
Bengali
ক্যামন মরদ

টর্নেডো

আজব দুনিয়া আজব উন্নত মানুষ আমরা,
অভিমান কেনা বেচার পাকা সওদাগর!
সম্পর্কে কখনো শৈত্য প্রবাহ কখনো সাবলীলতা,
অনেকটা পাখার রেগুলেটরের মতো বাড়ে কমে,
সম্পর্কের গতি প্রকৃতির মতো ঘরের গরম বুঝে।

এই তোমার মুখের হাসি ,গদ গদ ভাব মুহূর্তেই পাল্টে লু বয়াতে পারে ,গরমের হল্কায় ঝলসাতে
পিছুপা হয়না সম্পর্কের মধুরতা ।
ছোট বেলায় শুকনো গাছের পাতা জড়ো করে আগুনের ভেতরে আলু দিয়ে মজা পেতাম।
ধিকি ধিকি আগুনে সেদ্ধ আলু পোড়া খাবার
আনন্দে বিভোর হয়ে নিবে গেছে বলে
পোড়াপাতায় ছ্যাঁকাও খেয়েছি বহু বার ।

ঠিক বাইরের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বল বিশ্বস্ত হাসি দেখে যখনই আপ্লুত হয়ে কাছে গেছি পেয়েছি শব্দ বানের জ্বলন্ত অঙ্গার, বিষাক্ত সাপের ছোবল । আড়ালে তৃপ্ততা এনে দেওয়া তোমার উল্লসিত হাসি,”আহ্ যা বলেছি না,!ভেবে বড়ো গা সওয়া।
চওড়া হয় তোমার বক্র মুখের হাসি আবার শকুন চোখে মৌনতায় খুঁজে বেড়াও অন্যের ফাঁক ফোকর,
ফোঁটা ফোঁটা জমতে থাকা হিংসা টর্নেডো হয়ে আছড়ে পরে বিরামহীন উগড়ে দেওয়া ঘৃণ্যতায়।
বছরের পর বছর নিজেকে না শুধরানো পাঁক কাদামাটি মেখে অন্যদের প্রতি তর্জনী হেলন
শিউরে ওঠায় ব্যবহৃত বাক্যবাণের ক্ষীপ্রতায় ।
নিজের ভালো থাকা ছাড়া সবকিছু বড়ো ফিকে, আপন সৃস্ট ঘৃণার পাহাড় বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকো পরের জনকে কখন কথা শোনাবে সে হিংস্র অপেক্ষা।
বড়ো সাবলীল আপনজনদের এই ঘৃণ্য আচরণবিধি। অবাক হয়ো না , এর মধ্যেই নিহিত আছে দুর্বলের মাথা উঁচু করে বাঁচার রসদ ।
আঘাত পেতে পেতে দুর্বলের সবল হয়ে ওঠার সুদিনে আয়নাও তোমায় মুখ দেখাতে লজ্জা পাবে।

ক্যামন মরদ

কিমন বাপের বিটা রে তুই ক্যামন তুরা বাপ্-বিটায় !
মেইয়া টোকে বিহা কইরা এমন কইরা কেহ পিটায়!

মেইয়ে আমর কালো বটেক ডাগ্গর পানা চোখ ,
কক্ষুনো মুয়ে রা কাটেক ল্যই, যা কেনে শুধ্য।

শহর থিকেন বাবু সাইজ্যা পিরিতে মজাইলি ,
বছর না ঘোরার আগেই দূইর কইরা দিলি !

লে তুর পাওডার,সোনো,শ্যাম্পু লিয়ে যা তুর সব সাইজ
মেইয়া টো কে তড়াইয়া দিতে কুরলো না ত্যুর লাইজ !

আবার কিনা ফট ফটিতে , বাবু সাইজ্যা ঘুরোস,
নতুন মেইয়া ফাঁসানোর লাইগ্যা, ট্যকা-পয়স্যা উড়োস !

মাথার উপড় ঠাকুর আইছ্যে,দেখে টো লিস হারামি ,
রোগে ভুগ্যে মরবি জইল্যা,অভাগা তুই সোয়ামি।

ফুলা ফুলা কথায় আমি,মজ্যেছিলাম বটে,
মেয়েটোকে ভাস্যইছিলাম,তুই কুলাঙ্গার টার সাথে

এমন দুখ ,কুথায় থুই ,বুক ফাটা মোর কাইন্যা টো,
দেখলে তুকে রাগে দুখে,লাগে খুউব ঘেইন্যা টো ।

মেয়ে আমার ভালো আইছে গা গতরে খাইট্যে,
বাঁইচ্যা গেছে তুহর মইত্য ফান্টুস মরদ হইতে ।

পৃথিবী কাঁদছে

কান পেতে শোনো কাঁদছে পৃথিবী
অহিংস মন্ত্র প্রচারক বুদ্ধের চোখে জল.
খানিকআগে আততায়ীর গুলি,লুটিয়ে পড়েছে মা
রক্ত মাখা হাত ছাপ লুকানোর প্রচেষ্টায় জেসাস
মূর্তি আড়ালে আগামীর স্বপ্ন সন্ধানী দুই শিশু,
মায়ের হাত ধরে ইস্টার ডে তে এসেছিল প্রার্থনায়!

অতর্কিতে সিরিয়া কাঁপলো বিধ্বংসী হামলায়,
থমথমে কাশ্মীর উপত্যকা,জওয়ানদের ভারী বুটের চেনা আওয়াজে ছন্দে ফিরছে পুলওয়ামা।

জাত ধর্ম হানাহানির অক্টোপাশে জর্জরিত প্যালেস্টাইন, ইজরায়েলে কত মায়ের বিনিদ্র রাত,
মানুষের সামান্য অসতর্কতায় ঝলসে ওঠা বিধ্বংসী আগুনের ভ্রূকুটি লেলিহানে বাংলাদেশ ,
তোলপাড় করা দৃশ্য সমুদ্র তীরে ভাসমান লাল
জামায় ছোট্ট শিশুর নিথর দেহ সরিয়ে
আবার ছন্দে ফেরা গা সওয়া আধুনিক মনন ।

ভোরের আজানে মেশে জেহাদীর মিশন সংকল্প।
কে মোছাবে চোখের জল,
তেত্রিশ বছর পার করে আজও তেজস্ক্রিয়তা আতঙ্ক চেরনাবিল,আক্রান্ত চুরাশি লাখ বেশির
নিঃশ্বাসে ভারী দুনিয়া..
জল শুকানোর মধ্যেই হাজারো কাঁপন ভিত নড়িয়েছে ,ভূপাল,ফুকুশিমা,নাগাসাকি আরো কত,
মনে সংশয়,আরো কত ভয় ,নগরায়ন ঝড়
গাছ জঙ্গল সব কেটে ফাঁক,কেবল অবক্ষয়!

শক্তি প্রমানে জাহির দুনিয়া,কে আজ সেরা,বড়ো।
কার আছে অস্ত্র মজুত,তাক লাগাবে দুনিয়া যেন।
এরই মাঝে দুর্নীতি বীজ,আতংকবাদী,কূটনীতি
সওয়া পৃথিবী মা চোখের জলেই দিন গুজরান।

গাছ কেটে চলি,মুখে কত বুলি,সবুজের জন্য বাঁচি
ভড়ং করে জড়িয়ে মা কে,বলি কত্ত ভালো বাসি।

কি করে যে ভোলাই পৃথিবী মা কে,
কৃত্রিমতায় জমছে পাহাড়,স্নেহ মায়া মমতার লাগাতার ঘাটতি তবু উজ্জ্বল নিয়ন আলোয় আবেগহীন, স্বার্থপর ঘেরাটোপের পাল্লা ভারী,
মুখ লুকায় রুদ্ধদ্বার আমিত্ব।

এই কি ভালো আছি ,আধুনিক মনভাসি
তবু যেন বলি মাকে ,খাসা বাঁচো মৌন কেন!
ঝড়ঝঞ্জা দুর্যোগের করাল ছায়া
গাছ হীন,প্রাণহীন ধূসর মানবজমিন ।
পরতে পরতে আধুনিক স্পর্শ মাখা
তবু চুরি হয় সাবলীলতা ,মুখ ঢাকে মুখোশে।

বিঘ্নিত রাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব ,নমনীয়তা,নিয়মনীতি তবু রুচিবোধের বিজয় পতাকা দৌড় দেয় সেরা হবার,
মান-সম্মান ,শিক্ষা-নিরাপত্তা সব বুড়ো আঙুল দেখায় চার বছরের কন্যা রত্ন ,নান,এমনকি
পৃথিবী মা কেউই সুরক্ষিত নয় ।

ভাষাহীন এ লজ্জায় তবু অপেক্ষায় সুদিন
সুভাষ,বিবেকের দিশা ভরসা যোগায়
আগামীর সম্ভাবনার সূর্যোদয়ের।

সুখ বিলীনতা

নোনা ধরা, হাড়-পাঁজর দেওয়াল,
খসে পড়া চুন-সুরকির অস্তমিত সূর্য সাক্ষী রেখে,
বৈঠকখানা ঘরের একরাশ কলরব আজ স্মৃতি!

অনন্ত অপেক্ষায় আজও ঝুলন্ত ডাকবাক্স,
কমেছে ওয়েব স্বাধীনতার ঝড়ে চিঠির আনাগোনা,
নীল ইনল্যান্ড খাম,হলুদ পোস্টকার্ড ,মানি অর্ডারে দুকলম মন ভালো করা সুখ বার্তা,ভুলেছে এ প্রজন্ম!

কখনো একটা দুটো “ওঁ গঙ্গা”লেখা মৃত্যু খবর এসে পড়ে,সঙ্গ পায় এক রাশ বিষণ্ন মনখারাপ!

এক এক করে ছেড়ে চলে যায় ছোটকা,বড়দি,
মেজদা,রঙিন সুখ স্মৃতি,শৈশব গল্প,ছিন্ন করে..!কত মনে পড়ে তাজা সুখ স্মৃতির আহ্বান।

দমকা বাতাসে উড়ে আসা,কখনো কেমন শুকনো পাতা,পায়রা পালক,আমার একাকিত্বের গন্ধ নেয়!
ব্যস্ত ভারি স্কুল ব্যাগের বোঝা সামলে নাতি-নাতনিদের আসতে না পারা,একটু একটু করে ঠেলে দেয় শূন্যতায়,ফিস ফিস করে আমাদেরও যাবার সময়ের আগমন শোনায় চঞ্চল বাতাস।
পাশের রুমে চলৎশক্তিহীন বৃক্ক রোগে আক্রান্ত সহধর্মিনী,বাইরে কালের স্মৃতি মেখে অপেক্ষায় ফাঁকা ডাকবাক্স,ঘরের অলিন্দ থেকে ভেসে আসা
একনাগাড়ে বোকাবাক্সের কল কলানি!
নীরবতা,নিঃসঙ্গতার আঁকড়ে ধরা খড়কুটো,ঘড়ির টিক টিক ,এই বুঝি এলো যমরাজের টেলিগ্রাম,
অনন্ত সুখের বিলিনতার খবর নিয়ে।

ব্ন্ধু সুজন

খোয়াই ঘ্রাণে মাতোয়ারা সোনাঝুরি এক নাম ,
তোমার চোখে পুণ্য স্নান,বন্ধু হোক না বদনাম ।
এক চিলতে আকাশ ছেড়ে তোমার সঙ্গ পাওয়া ।
বন্ধু ,তুমি আপন সাথী ,হৃদয়ে উতল হাওয়া ।

দোসর খোয়াই,সোনাঝুরি,লাল মাটির দেশ,
ব্ন্ধু তুমি থাকলে পাশে এক শির শিরানি রেশ।
বন্ধু সুজন আসবে যাবে,হোয়াটসঅ্যাপ,ফেসবুক,
বিপদে আপদে সঙ্গ বন্ধুর,এ যেন আসল স্বর্গ সুখ।

রাগ অভিমান কান্না হাসি ,এই তো আসল জীবন,
চলো বন্ধু দুজন পথ হাঁটি ভালাবাসায় অবগাহন ।
শিরায় শিরায়,রন্ধ্রে বন্ধু বাঁচে,বন্ধত্ব থাকে মনে,
আসল বন্ধু বড়ো ভরসার,বন্ধুর নাম উচ্চারণে।
তাইতো বন্ধুর হাতটা ধরে হটাৎ বেরুনো,নামা পথে
লোকলজ্জা গুঞ্জন থাকবেই ,কিহবে তা কর্ণপাতে।

 

জীবন মৃত্যু

জীবন-মৃত্যুর সীমানা ছাড়ায়ে,দিয়েছ হাত বাড়ায়ে
তবে আজ তুমি,নীরব কেন দূরে সরে যাও হারায়ে জীবনে যা দেবার ছিল,
সব তো দিয়েছি তোমাকে,
কোন অছিলাতে এ মৌনতা,আঁকড়ে ধরো ক্ষমাকে

এদিন আসবে,হঠাৎ এভাবে,আসেনি এমন ভাবনা
রামধনু রং আজো মুঠোভরে,থমথমে মুখে যাতনা।
কত ঘোরাঘুরি,হাত ধরাধরি,স্বপ্ন,প্রতিশ্রুতির বন্যা
কিভাবো নারী কেবল আবেগী,কলের পুতুল কন্যা

মন চুরি করে পালাই পালাই অশোভনীয় এ কাজ,
ছুটছে সমাজ রকেট স্পিডে,শেকল হাতে মহারাজ
যেটুকু মিশেছি পবিত্রতা, মনের বাঁধন হ্যাচকা টান,
ওগো বন্ধু ,দক্ষ তুমি আজ অস্বাভাবিক লাগে,ম্লান।

কিভাবো পুরুষ,এতো সহজ,পেয়ে যাবে তুমি পার।
তোমরা বড্ড বোকা,মিথ্যা ফানুসে ঢাকো অনাচার।যা করেছো বেশ করেছো,
নতুন জোয়ারে ভাসো,
অবুঝ মন,খোঁজে শুভক্ষণ,শুধু বলে’ফিরে আসো’

রাণা চ্যাটার্জী। কবি। জন্ম ও নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের বর্ধমানে। পেশাগত জীবনে তিনি পৌরদপ্তরে কর্মরত। প্রকাশিত বই: 'মেঘ বালিকা তোমায়', (কাব্যগ্রন্থ) 'এক মুঠো মেঘ নিয়ে এসো' (কাব্যগ্রন্থ), 'নাভিপদ্ম' (কাব্যগ্রন্থ), 'ছন্দে ছড়ায় জীবন' (কাব্যগ্রন্থ), 'কস্তুরী মৃগ' (গল্পগ্রন্থ)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..