ক্যারিকেচার

নাজনীন খলিল
কবিতা
Bengali
ক্যারিকেচার

চশমার কাঁচের ছবি

তখন হাঁটছিলাম রংধনুর পথে
এতোটুকু বাজেনি দুর্লঙ্ঘ অতিক্রমের কোন ব্যাথা,
পথের দুপাশে থোকা থোকা
বর্ণালী রডোডেনড্রোন ফুটেছিল।
এক উল্লসিত পুষ্পবিহার শেষে
চিহ্নিত হলো পায়ের পাতার গাঢ় ক্ষতদাগ।
খুব দ্রুত ঝরে পড়ে সোনালি পরাগ, তাই
ডানায় খুশীর সুগন্ধ মেখে প্রজাপতি উড়ে গেলে
ঈর্ষা হয়।
সেই থেকে
সোনালি নূপুরে একফোঁটা দ্বেষণার মেঘ,
সযতনে আগলে রেখেছি ;
কোন একদিন
পাথুরে নাচঘরে ঝরে যাবে শিঞ্জিনীর তালে।

সব ছবি জমা থাকে চশমার কাঁচে।
মাঝেমাঝে চোখ ঝাপসা হলে
অসময়-আচমকা বৃষ্টির ছাঁট ভেবে মনকে ভুলাই।

 

ক্যারিকেচার

এক ঢেউসমুদ্রের খুব মন কেমন করা অন্ধকারে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে,
ইচ্ছে করে নিষিদ্ধ করে দিতে
জানালার ফাঁক গলে অনাহুত ঢুকে পড়া
আবছা চাঁদের ছড়ানোছিটানো পাপড়িগুলো।
দূরে কোথাও একটি ‘পিউ কাহা’র কুহুতান
থেকে থেকে নাহয় ডেকেই গেলো অনিবার।

যখন আগাপাছতলা দেখে নিলাম একটি সম্পূর্ণ জীবন ;
মনে হলো এই দিনযাপনের ছবিটা
উদভ্রান্ত কাঁপা হাতে আঁকা এক ক্যারিকেচার।
ঈর্ষাতুর তাকিয়ে থাকি অনিমেষ
কোথাও আঁকা হয়নি সেই অসম্ভব ছবিটির দিকে।

কতো কী যে বদলায়!
নিজস্ব অবয়ব দ্বিধাহীন উহ্য ফেলে রেখে
মহুয়ামাতাল ঘোরে
ভিন্ন কোন জীবনের ছায়াপাঠে মগ্ন হই।
চিহ্নিত হবার আগেই শরীরে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রামক-দুরারোগ্য রোগের কণিকা।
প্রতিচ্ছবি বদলে যায়, রোগাক্রান্ত এক আকৃতি ভেসে ওঠে
তবু প্রতিদিন হাসপাতালের রাস্তার এক ফার্লং দূরপথ দিয়ে হেঁটে গেছি।

জীবন ফুরিয়ে যায় যেমনতেমন;
খোলামকুচির মতো অবজ্ঞায় ফেলে দেয়া সময়ের হাহাকার তবু বেঁচে থাকে,
গোধূলির রংয়ে বেজে ওঠা বিদায়ী সানাইয়ের ধুনে
জেগে ওঠে শেষঘন্টার হা-হুতাশ;
অস্তরাগের আবীরে মাখামাখি কিছু প্রত্যাশাও
বাকী থাকে যেন।

মানচিত্রের বাইরে থেকে পৃথিবীটাকে একবার দেখে নিতে চেয়েছিলাম;
জ্বলজ্বলে লাল দাগের বাইরে যেতে পারলোনা চোখ।

কিছু আচ্ছাদন থাক

প্যাস্টেল পটচিত্রে মোড়ে যাক
দেয়ালের বুদবুদ ওঠা নোনাক্ষতগুলো।
বেজে যাক যুথবদ্ধ নান্দনিক শব্দের ম্যাজিক
উঠুক করতালে ঝমাঝম ধ্বনি
চকচকে ব্লেডের ধারে কাটা আঙ্গুলের ডগা
ধ্রুপদী তালের কিছু রাগরংয়ে ঢাকা পড়ে থাক।
শোণিতস্রোতের ফল্গু বয়ে যাক গোপনে গোপনে।

প্যাডলকে হাত রেখে চাবি খুঁজে না পাওয়ার মতো
অনুচ্চারে আটকে যাওয়া কথাগুলো
বাতিল পাপড়ির মতো শার্সির বাইরে দিয়েছি তো ফেলে!
তবু কেন যে কখনো কখনো
বাতাসের তোড়ে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে ;
জলতরঙ্গ বাজানোর আহ্লাদ-ইচ্ছায়
জলের নুড়িতে পিতলের মুদ্রা ছুড়ে দিলে
যেমন ভোঁতা একটা টং শব্দ বাজে
বেজে ওঠে তেমনি অস্ফুট এক স্বর শুধু ;
যথার্থ সরব নয়।
কথার শূন্যমাঠে কিছু অনুচ্চারিত হাহাকারের
চিহ্নই কেবল জমা হয়।

বাজুক তুমুল কোলাহলের অর্কেস্ট্রা ;
নীরবতার হীনজীর্ণ মাৎস্যন্যায় ভেঙ্গে
কত্থকের বোলে বেজে যাক এক জোড়া প্রবল ঘুঙুর।

 

রং

কারো গাঢ় নীল চোখ
বেজে যাচ্ছে বেদনার্ত সেতারের মতো ;
যেন ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে এক খন্ড আকাশ,
যেন এক্ষুণি জন্ম নেবে এক নতুন সমুদ্র।
অথবা মনে করো
এক বিভোর উদ্যানে অপরাজিতা ফুটেছে অনেক
যেন নীল নীল ভোরের আধখোলা জানালায়
সবুজ ঝালরের ফাঁকে উঁকিঝুঁকি দেয়া সকালের দূত।
আকাশ অথবা সমুদ্রের এই প্রগাঢ় রং
রআনন্দ নাকি যন্ত্রণার এই প্রশ্ন ভুলে
এক মনোরম ল্যান্ডস্কেপে বিমুগ্ধ,
তাকিয়েই থাকি।
মাঝেমাঝে
দুঃখ ও সুখের সব রং
বুঝি এমনি একাত্ম!

এখনো দুই হাতে বিবর্ণ ধূসরতা মাখা,
ছায়াটাকে আততায়ী ভেবে নিয়েছি সন্ন্যাস ;
রঙিন ফানুশ ওড়ানো কালে
এই চিত্রকল্প খুব বেমানান মনে হয়।

চোখের ব্যাথা দেখি,
অথবা নীলকণ্ঠ ফুলের সুন্দর
কথাতো একটাই
আমার বিবর্ণ ধুসর হাত নীল ছুঁয়ে থাকে।
মনে হয়
এইসব রংয়ের বিপরীতে ভিন্ন কোন রং নেই

ছিলোনা কোথাও।

 

সসেমিরা সময়

গোপন কোঠরে চুপচাপ বসে থাকি ;
আমার চারপাশে গল্প তৈরি হয়
গাছের, ছায়ার, ঝরাপাতা আর শামুকের।

অঙ্গন
তার ছায়ার ভেতরে টেনে নিয়েছে,
একটি গাছ
ডালপালাসহ পাখির ছোট্ট ঘর।
পাতার উপরে পাতা ঝরে গেলে
আধো আধো নূপুরধ্বনি বাজে ;
যেন
তবলার বোলের অপেক্ষায় তৈরি নাচের মেয়েরা
আনমনা টুকছে
অস্থিরআলতো পায়ের ঘুঙুর।
বৃক্ষের এই ছায়ামগ্ন বিলাসের মাঝখানে
আমারো কী কোথাও একটুখানি প্রাপ্যছায়া
পড়ে আছে?

গল্পপাঠে – সাদা পৃষ্ঠায় নিবদ্ধ উৎসুক চোখ ;
পাপড়ির নীচে জমা
হাজারবছরের প্যাপিরাসকথা,
এক অতল অন্ধকার
টানেলবিভ্রান্ত পথিকের গল্পটিও।

ক্যামেরায় ত্রস্ত শাটার টিপে
প্যানোরামার ভেতরের রহস্যরক্তিম এক ছবি
তুলতে গেলে
সমস্ত চিত্রপট উধাও, ঘোরলাল মেঘের আড়ালে।
দৃশ্য কি নিজেই নিজেকে লুকোয় আগুনের আঁচে?

জলভারে নত হয়ে আছে সসেমিরা ঘড়ির সময়।

নাজনীন খলিল। জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯৫৭ সাল; সিলেট। পড়াশুনা এবং কর্মক্ষেত্র সিলেট। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে লেখালেখির শুরু। বিভিন্ন পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি দীর্ঘদিন রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের একজন নিয়মিত কথক, গ্রন্থক এবং উপস্থাপকের দায়িত্বপালন করেছেন। লেখালেখির বিষয়বস্তু মূলত কবিতা, প্রবন্ধ এবং...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ