ক্রমশ অমানবিক

উদয়ন চক্রবর্তী
কবিতা
Bengali
ক্রমশ অমানবিক

লাশ

এই তো কিছু আগে লোকটার প্রাণ ছিল
তখন ওর মান ছিল,ইচ্ছে ছিল আবেগ যন্ত্রণা
স্বপ্নের জাল বুনে কত সাধ ছিল—
একটু আগে লোকটা লাশ হয়ে গেছে
এখন ও লাশ হয়ে শুয়ে আছে।
শুয়ে গুনছে সমগ্র যাত্রা পথের বাতিস্তম্ভ,
কতবার শ্বাস নিতে হয়েছে ,চরম সে আকুতি
ও যাতে লাশ না হয়ে যায়।
এখন অতি সহজেই ও শুনতে পারছে ,ওর মত,
অদ্ভুত ও শুনতে পারছে জীবিতের কথকথা,
শুনতে পারছে শ্রদ্ধা জ্ঞাপক স্বরকম্প
শুনতে পারছে সমবেত সমালোচনার অনুস্বর।
না-না ,একি এখন ও দেখতেও পারছে ওর মত,
আস্তরণ ঢাকা সে দৃশ্য পথ অনন্ত উন্মুখ ,
কত কিছু বলতে ইচ্ছে করছে ,শব্দহীন সে ভাষা ,লাশ হয়ে যাবার আগের দূর্লভ খুশি গুলো ওর সাথে কানামছি খেলছে,
ব্যর্থতার উত্তরণ পথ গুলোও দেখতে পারছে—
কিন্তু বিবশ এ শুয়ে থাকা অনন্ত ঘুমে,
তবুও জন সমাগমের হুল্লোড়ে ও ঘুমহীন।
প্রীয়জনের জটলায় ফিস্ ফিস্ ভেসে থাকা কথারা ওকে ছুঁয়ে দিচ্ছে মায়াবী অতীত ,
রেখে যাওয়া সম্পদের হিসেব, আর না পারা ব্যর্থতার ফিতে ফেলা চুলচেরা মাপজোখ ।
তবুও ওর ইচ্ছে করছে ফিরে যেতে সে স্বপ্নিল জীবনে,
যা কতটা মহার্ঘ ছিল লাশ হয়ে যাওয়ার আগে
জানা ছিল না ,জানা ছিলনা প্রাণের সে দৃশ্য কাব্য ছিল কতটা রঙিন —
যদিও এত তাড়াতাড়ি ও লাশ হতে চাইনি।

 

জীবনানন্দ কে ভেবে

ধূসর পান্ডুলিপির কাছে আবদার
রেখেছিল লাবণ্য—
শুধু প্রাত্যাহিক স্বাছ্যন্দ ঘেরা ঘর ,
যে পরিধি ছেড়ে বেড়োতে চায় না সাধারণ
নারী ,তার রক্তের পরম্পরায় ।
তখন সে নীরব পথিক হেঁটে চলেছে
সহস্র বছর এ পৃথিবীর সাথে কারুবাসনায়।
জননী সেদিন হাজার অভিমানে
দেখেছিল ধূসর পান্ডুলিপির ভ্রূণ —
চেয়েছিল জীবনে রিপুর দাসত্ব ছেড়ে
বেড়িয়ে আসুক আত্মজ দাশ।
শব্দের মায়াবী মায়ায় লাবণ্য ধরা দিয়েছিল
বনলতা হয়ে কলমের অধরোষ্ঠ ছুঁয়ে,
লক্ষ শব্দ লিখেও মেটেনি তার আশ।
তবুও সে নির্জনতার কবি খুঁজে পাইনি
সার্থক অন্তহীন নীরবতা ।
তার সে ব্যথা জমাছিল ধাঁনসিঁড়ি নদীর বুকে,
আবার ফিরে আসার আবদার নিয়ে—
এবারকার হাঁটা শেষে চলেগেছে অনন্ত নির্জনতায় ধূসর পান্ডুলিপি সঙে নিয়ে।

ক্রমশ অমানবিক

আগুন নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখে
নিঃস্বার্থ দহন মুক্তি —
আগুনই বুকে ধরে রেখেছিল
এ পৃথিবীর ভ্রুণ,
নিরবিচ্ছিন্ন বিবর্তন এনেছে
পরিবর্তিত জড়ের অঙার গুন।
মানুষ অমৃত ভেবে পান করেছে
মায়াবী কালকূট—
চারিদিকে বিষধর্মী মানুষের রুপান্তর
তৈরি করে চলেছে প্রেতপুরী ,
মানুষই জ্বলছে মানুষের অঙারে।
দ্বিধাহীন লজ্জাহীন দুঃখহীন খেদহীন
এ সমবেতর আত্মসুখ আত্ম উল্লাস।
সূর্যও নিজেকে জ্বালিয়ে করছে নিঃশোষিত ,
সেটা তার সৃষ্টিকার্যের নিজস্ব অঙ্গীকার —
যে প্রাণ নিজেকে মানব বানিয়েছে
ক্রমশ অমানবিক ব্যস্ত দেখতে নিজেরই সংহার।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ