ক্রাইম থ্রিলার

ঋষি
কবিতা
Bengali
ক্রাইম থ্রিলার

ক্রাইম থ্রিলার

সবকিছু আমার সহ্য হয়
সহ্য হয় না তোমার পিঠ বেয়ে গড়িয়ে নামা গরমের শহর ,
প্রচন্ড উষ্ণতার পারদ যখন তোমার নাভি ছুঁয়ে শহরের তাপমাত্রায় ৩৭ ডিগ্রি লেখে
আমি তখন সোজা ছুড়ি চালিয়ে কেটে ফেলি আমার আদর ,
গড়িয়ে নামা তোমার ঘাম আর তোমার রক্ত মিশে
আমি এই শহরে ক্রাইম থ্রিলার।

মিথ্যা লিখি না
সিগারেটের এক টানে যখন সন্ধ্যা নামে
তখন ঈশ্বরের দরজায় এক গজ এসে দাঁড়ায় আর সকালে কচ্ছপ
আর আমি গজ কচ্ছপের লড়াইয়ে ক্লান্ত অধিকার ,
মনখারাপ খুঁজি
তোমার মতো একলা দাঁড়িয়ে ক্লান্ত শহরে।

সমস্ত সহ্যের বাইরে তোমার এমন ঈশ্বরের দৃষ্টি আমার অসহ্য চলন্তিকা
অসহ্য তোমার চোখের না বলায় লুকিয়ে আমাকে ভালোবাসা,
আমি ভিক্তোরিয়ার গোড়ায় বসানো পরীর দিকে তাকাই
তোমার সাথে মিল পাই ,
আমি রামকিঙ্করের পাথরের ভাঁজে লুকোনো কষ্টের শরীরে তাকাই
তোমার সাথে মিল পাই ,
আমি সূর্যের দিকে তাকাই ,আমি বৃষ্টির দিকে তাকাই
আমি জন্মের তাকাই
তাকাই মৃত্যুর দিকে
শুধু তোমার চোখে আমি আমার মৃত্যু দেখতে পাই।
তুমি সেই ক্রাইম থ্রিলারের নায়িকা
যার চোখে সময় শুধু মৃত্যুর দাঁড়ি ,কমাতে অজস্র প্রশ্ন
আর উত্তর

পাথর ভাঙা স্বপ্নদের রক্তাক্ত হৃদয়।

নজ্জা না লজ্জা

প্রধান মন্ত্রী ঘোষনা করলেন সোনার ভারতবর্ষ
আর সেদিন তিন সন্তানের মা ফুলমনি বিক্রি করলো তার তেরো বছরের মেয়েটাকে।
চেনেন আপনারা ফুলমনিকে
আসুন পরিচয় করিয়ে দি
নাম ঃফুলমনি, বয়সঃউনত্রিশ, গ্রামঃমানুষের, জাত ঃ মানুষ।
স্বামী চুরির অপরাধে জেলে আজ তিনমাস
দুই সন্তান অথচ তার পেটে আরেকটা পাঁচ মাসের।

নিজস্ব সংবাদদাতা ভারতবর্ষ পত্রিকা থেকে প্রশ্ন গেলো ফুলমনির কাছে
ছি ! আপনার লজ্জা করলো না আপনি না মা?
ফুলমনির উত্তর দিল
অ বাবু গো তুকে কি বুলি ,তু বোল বাবু ?
খাললি পিট্যে কি মা হউয়া হয়য় ?
মা হউয়া যায় পিট্যের খিদায় ?
মরদ টা জিলে গিছে পরান জুড়ায়ে ,
কি কুরবঅ গ্যেরামের মুড়োলের বুরাবর চুঅখ ছিলঅ
গো ঝরণার দিকা ।
জানিস তুঅ বাবু ঝরণা মিয়াটা গো ভালো দিখত্যে ,
গায়ে গতরে আমার মুতো ছিবরা লয় ।
দিলম বিগরি কুরে ।
খিত্যে পাবিয়ে ভালো বাঁইচবে ….
আর ছিলাটা আর পিট্যের টও তু বাঁইচতে হবেক আমাদিগে ,
আর কি বুলিস গরিব মানুষের আবার নজ্জা , ন্যাংটা লুক্যেদের নজ্জা
হাসাইলি বাবু ,

প্রধান মন্ত্রী সেদিন ঘোষনা করলেন সোনার ভারতবর্ষ
তার বছর পাঁচেক পরে মানুষের গ্রামে গিয়ে জেনেছি
ফুলমনির মেয়ে ঝর্ণার খোঁজ পাওয়া নেই গ্রামের মোড়লের কাছে
জিজ্ঞেস করায় মোড়ল বলেছে
বদচরিত্র মেয়েছেলে মরেছে, মরেছে হয়তো কোথাও গিয়ে,
ফুলমনির স্বামীও ফেরে নি জেল থেকে,পালিয়েছে শহরে।
এই ব্যাপারে ফুলমনিকে প্রশ্ন করায় জানতে পারলাম
ভালো আছে সে, শুধু তার পেটে যেটা ছিল বাঁচে নি
শুধু তার পেটে নাকি পৃথিবীর খিদে
আর গলায় একটু ব্যাথা
কারন গত রাত্রে আচমকা তার গলা চেপে ধরে ছেলেটা বলেছে
খিদে পেয়েছে, খেতে দে।

সত্যি জীবন আর মিথ্যে শান্তি

নিমতলার চিতার আগুনে মানুষের বডি পোড়ে
অথচ কিছুতেই পোড়ে না নাভি,
শুনেছি নাভির ভিতর মানুষের অভিমান লোকানো থাকে
আর একরোখা অভিমান কিছুতেই পুড়তে চায় না।
আরো অবাক কি জানো চলন্তিকা
যে মানুষগুলোর নাম আছে আজ মৃত্যুর পর সেগুলো সব বডি
আর এও সত্যি মৃত্যুর থেকে জীবিত কিছু হয় না।

চৌরাস্তার মোড়ে ভিখিরি মা তার চোদ্দ মাসের সন্তানকে চুমু খাচ্ছে
সেই সন্তানের বাবা অজানা,
সেই চোদ্দ বছরের শিশুটার বুকে, পিঠে ঘা পাঁচড়া
তার সারা শরীরে মাছি ঘুরছে
তবু ভিখারি মা তার সন্তানকে চুমু খাচ্ছে।
পথচলতি মানুষগুলো ভাবছে এর থেকে সুন্দর দৃশ্য কি হতে পারে
অথচ জানো চলন্তিকা
খিদের থেকে সত্যি কিছু হয় না।

অভিমান, সুখ, কষ্ট সব স্পর্শগুলো আজকাল আবছা লাগে বড়
মাকে দেখেছি আমাদের দুই, ভাইকে গলা অবধি গিলিয়ে
নিজে উচ্ছিষ্ট খেতে
তারপর বাসন মাজতে মাজতে চোখের জল ফেলতে,
আর জানো চলন্তিকা আমার চোখের জল অসহ্য লাগে
আমি বিশ্বাস করি কোন জাতি উঠে দাঁড়াতে
মাথা, মন কিংবা গায়ের জোর দরকার
আর দরকার বাঁচার ইচ্ছা।

আমার খুব ইচ্ছে মৃত্যুর পর আমার নাভিটা তোমায় দেওয়া হোক
কারণ আমি জানি তুমি ছাড়া কেউ বুঝবে না আমার অভিমানের মানে,
কি লাভ বলোতো শ্রাদ্ধ, শান্তি করে আমাকে শান্তি দেওয়ার
বরং আমার অভিমানগুলো নাম বদলে শান্তি রাখা হোক।
আসলে কি জানো চলন্তিকা শান্তির থেকে মিথ্যে কিছু হয় না
শুধু আমরা ছুটি
সারাজীবন ছুটি
শান্তি আগে আমরা আমাদের জীবন নিয়ে পিছনে
হাঁপিয়ে যায় তবুও ছুটি
কিন্তু দূরত্ব কিছুতেই কমে না আমাদের শান্তি আর জীবনের।

তুমি মোটেও খারাপ মেয়ে নও

জীবন মানে জানি না
তবে এটা জানি তুমি খারাপ মেয়ে নয় মোটেও।

শুনেছি যে মেয়েদের বাবা রাতে গলা অবধি দারু খেয়ে বাড়ি ফেরে
তাদের বিয়ে হয় না।
শুনেছি যে সব মেয়েরা মা,মাসীর মতো ঘরের কাজ করে
যারা চুপ করে বাবা, ভাইয়ের থাপ্পড় মুখ বুজে হজম করে,
যে মেয়ের স্বামী বেশ্যা বাড়ি যায় তার ঘর করে
সন্তান, বিছানার চাদর আর প্রতি মুহুর্তের ধর্ষন সব ঢোক গিলে হজম করে
হজম করে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের শরীরে হাত বোলানো
হাজারো জখমে,হাজারো কান্না গিলতে পারে
তাকে ভালো মেয়ে বলে।

আর যারা বাসে কেউ শরীরে হাত দিলে ঘুরিয়ে থাপ্পড় মারে
কারোর স্বামী অকারণে গালাগাল দিলে প্রতিবাদ করে,
যে সব মেয়েরা বাবার ওষুধের কেনার জন্য ডান্সবারে কাজ করে
সন্তানের ভরনপোষনের জন্য শাড়ি তুলে দাঁড়ায়।
যে সব মেয়েরা স্বামীর অত্যাচারে ডিভোর্স করে
সংসার বাঁচাতে ওভারটাইম করে রাতে অফিস থেকে ফেরে,
বসের অন্যায় সহ্য না করে অনায়াসে চাকরীতে রিজাইন করে
কিংবা সামনে দাঁড়িয়ে সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে,
হিমালয়ের সানরাইজ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে একলা সুর্য দেখে
আর ঈশ্বরের চোখের দিকে সরসরি তাকায়
তাকে আমরা খারাপ মেয়ে বলি।

এতসবের মানে আমি বুঝি না
বুঝি না পিতৃতান্ত্রিক কিংবা মাত্রিতান্ত্রিক সময়,
আমি শুধু এটা বুঝি অন্যায়ের প্রতিবাদ মানুষ হওয়ার প্রথম পাঠ,
আমি শুধু এটা জানি নারী ও পুরুষ শুধুই একে অপরের পরিপুরক
তাই আমি জানি
তুমি মোটেও খারাপ মেয়ে নও।

ঋষি। কবি। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা। প্রকাশিত বই: ‘স্পর্শ’ (কাব্যগ্রন্থ), এবং ‘এক মুঠো আলো’ (কাব্যগ্রন্থ)

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ