ক্র্যাকডাউনের রাতে

ফরিদুর রেজা খান
গল্প
Bengali
ক্র্যাকডাউনের রাতে

পারুর মনটা আজ খুব খারাপ। মনখারাপের কারণটা সে নিজেও জানে না। আজ পার্থর সাথে দেখা হবে না বা সরোজ মোস্তফা স্যারের ক্লাসটা পাবে না এরকম কোনো একটা কারণ থেকে তার মন খারাপ হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণটা সে খুঁজে বের করতে পারছে না। কারণ খোঁজার খুব বেশি একটা ইচ্ছাও তার মাঝে নেই। সে তাকিয়ে আছে চামেলি হাউসের সামনের পুকুরটার দিকে। খানিক আগেই দুম করে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সেই বৃষ্টিতে সব কিছুতে কেমন যেনো একটা নতুন ভাব এসেছে। বাতাসে খুব ভারী একটা সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে গেছে। পুরনো দেয়াল আর বর্ষীয়ান গাছগুলোর শরীর থেকে কেমন যেনো একটা প্রাণহীন গন্ধ ছড়াচ্ছে। পুকুরটার ওপর ঝুঁকে থাকা ডাব আর শিমুল গাছগুলো থেকে খানিক পর পর শত শত ফোঁটা পানি পড়ছে। সেই পানির ফোঁটাদের পুকুরের পানির সাথে মিশে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে পারু। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার মনে পড়েছে আজ সরোজ মোস্তফা স্যারের ক্লাস হবার কথা ছিলো যেটা চলমান পরিস্থিতির কারণে স্থগিত করা হয়েছে। সরোজ মোস্তফা নামের অসাধারণ এই মানুষটিকে কোনো এক বিচিত্র কারণে বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষার্থীই সহ্য করতে পারেন না। সেটা ঠিক কি কারণে তা কেউই বলতে পারে না। স্যারের নাম উঠলেই সবাই নাক সিটকিয়ে ওঠে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও খুব বেশি একটা ভালো না। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে সব ঠিকঠাকই আছে। কিন্তু আসলে ভেতরে যারা আছে তারাই জানে এখানে কিসের প্রস্তুতি চলছে। এই প্রস্তুতি পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন পতাকা পাওয়ার প্রস্তুতি। প্রেমিকের স্বপ্নে তার প্রাক্তন প্রেমিকা এলেও স্বপ্ন ভাঙার পর ঘুমিয়ে পড়া যায়। কিন্তু স্বপ্নে একবার একটা স্বাধীন পতাকার দেখা পেলে সেই স্বপ্ন ভোলা যায় না।

সরোজ মোস্তফা স্যারের ক্লাসে আজ বাংলা উপন্যাসের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা হবার কথা ছিলো। অন্যান্যদের খবর পারু জানে না। সে নিজে এই ক্লাসটার জন্য খুব অপেক্ষা করে ছিলো। বাংলা সাহিত্যে রচিত উপন্যাসগুলোর ওপর একটা গদ্য লিখছিলো সে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ঔপন্যাসিকদের চরিত্র বিশ্লেষণের জায়গাটিতে এসে তার কলম আর গতি পায়নি। বিশেষ করে যখন সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর লিখা একটি সমালোচনামূলক গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কাদম্বরী দেবীর একটি সম্পর্কের উল্লেখ পায়। বাংলা সাহিত্যের এরকম একজন দেবতুল্য লেখককে নিয়ে এরকম ধাঁচের যেকোনো মন্তব্য করাটা একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের জন্যও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কাজেই পারু দিনকয়েক আগে যখন সরোজ স্যারের কাছে শোনে যে তিনি আগামী সেশনে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রপ্রভাব বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান নিয়ে আলোচনা করবেন তখনই সে ঠিক করে নিয়েছিলো সে ক্লাসে এ বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সে তুলবে। তাতে অনেকেই হাসাহাসি করবে এটা সে জানে, কিন্তু তাতে তার বয়েই গেলো।

–       পারু আপা, বসবো?

পারুর মুখ তুলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। মুখ না তুলেই সে বুঝতে পারে কণ্ঠটা আশালতার। আশালতা তার রুমেই থাকে। পাশাপাশি বেড। আশা দ্বিতীয় বর্ষের হলেও সেও পারুর সাথে একই বিভাগে পড়ছে। পার্থর সাথে পারুর সম্পর্ক  গড়ে ওঠাতে এই মেয়েটার অনেক ভূমিকা রয়েছে।

–       হ্যাঁ, বসে যা। তুই এখানে কি করছিস?

–       তোমাকে দেখলাম এই বৃষ্টির মাঝে এখানে বসে আছো। তাই ভাবলাম এসে জিজ্ঞাসা করি আসলে ঠিক কি হয়েছে। তোমার কি মন খারাপ?

আশার প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পায় না আশা। আসলেই কি তার মন খারাপ? সে জানে না তার মন খারাপ কি না।

–       কেনো মনে হলো আমার মন খারাপ?

–       না বৃষ্টির মাঝে এভাবে এসে একা একা বসে আছো যে, তাই ভাবলাম আরকি।

আশার কথা শেষ হবার আগেই পাল্টা প্রশ্ন করে পারু।

–       কেনো? কারোর মন খারাপ থাকলেই বৃষ্টির মাঝে এসে বসে থাকতে হয়?

এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেয় না আশা। মুচকি হেসে আঁচলের নিচ থেকে একটা চিরকুট বের করে সে। একবার তাকায় পারুর মুখের দিকে। তারপর সেটা এগিয়ে দেয় ওর দিকে।

–       কে দিয়েছে এটা?

–       দাদা দিয়ে গেছে। বলেছে ও এরেস্ট হলে তোমাকে এটা পৌঁছে দিতে।

–       ওর সাথে তোর কখন দেখা হলো?

–       কাল সন্ধ্যায় গেস্টরুমে দেখা হয়েছিলো।

পারুর একবার বলতে ইচ্ছা হলো, এত কাছে এসেও কেনো ওর সাথে একবার দেখা করে গেলো না? কিন্তু পরক্ষণেই সে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। ওর চোখের কোণে জমে ওঠা জল সে আশাকে দেখাতে চায় না। মেয়েটা তার পাশে আরও কিছুক্ষণ বসে তারপর হঠাত উঠে চলে গেলো।

দুই

–       স্যার, ইসলোগকো চালান কারনেকা অর্ডার আগেয়া হে।

–       কই দেখি?

ডাকযোগে আসা সেই দাপ্তরিক নির্দেশপত্রটির দিকে একবার চোখ বুলান আসগর সাহেব। তিনি এই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। নিউমার্কেট থানায় আছেন বহুদিন যাবত। গতকাল রাতে নিউমার্কেটের পাশের একটা ঘুপচি গলি থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে। তার সাথে আরও তিনজনকে। চারজনের নামেই গ্রেপ্তারের আদেশ এসেছিলো। ভাগ্য ভালো বলে এক জায়গাতেই সবাইকে একবারে পাওয়া গেলো। টেবিলের সামনে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি একবার কামরুল নিগারের দিকে তাকান। এই মূহুর্তে তার মুখে একটা বিচিত্র হাসি খেলা করছে। কোনো এক অজানা কারণে এই বেলুচি অফিসার কোনো বাঙালিকে নাজেহাল অবস্থায় দেখলেই কৌতুকবোধ করেন। সেটা ঠিক কি কারণে কেউ জানে না। সেদিন তিনি গলা নামিয়ে বেলুচি হেড কনস্টেবল আজম নায়েকের সাথে আলাপ করছিলেন।

–       সামঝে আজম, ইস বাঙ্গালকো বহাত জলদ মে হাম সাবাক সিখায়েঙ্গে। ইস নালায়েকলোগ তো ফাস গেয়া।

থানার গ্যারেজের সামনে ওসি আসগর সাহেবের ছায়া দেখতেই তাদের চাপা হাসি আর গুঞ্জন হঠাত বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। বাঙালি সিনিয়র অফিসার আসগর সাহেবের এরকম আকস্মিক আগমন তারা প্রত্যাশা করেনি। নাকমুখ কুঁচকে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলো সেন্ট্রি রুমের এক কোণায়। আসগর সাহেব তাদের কিছু বলেননি। তিনি নিজেও খুব ভালো বুঝতে পারছেন এই লোকগুলোর কথাই আসলে ঠিক। বাঙালি জাতিকে শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই শিক্ষা দেয়ার জন্য টিক্কা সাহেবকে উড়িয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসা হয়েছে। দেশে নেমেই তিনি বিভিন্ন জায়গায় নীরব প্রভাব ফেলতে শুরু করেছেন। ১৯৫২ থেকে বিভিন্ন সময় যারা বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার ছিলেন তাদের সবাইকেই একের পর এক গ্রেপ্তারের হুকুম আসছে। এইসব সামরিক কর্তারা এত খবর কোথা থেকে বা কিভাবে পান সেটা আসলেই ভাবার বিষয়। আর ওদিকে শেখ সাহেবের সাথে আলোচনা চালাচ্ছেন ইয়াহিয়া খান সাহেব। সাথে আছেন পিপিপির ভুট্টো সাহেব। এই ভূট্টোকে দেখলেই আসগর সাহেবের নিজের দূরসম্পর্কের এক চাচার কথা মনে পড়ে যায়। সাদেকুল ইসলাম নামের সেই ভদ্রলোকের চাহনি, আচরণ বা কথা বলার ভঙ্গি ছিলো ঠিক ভুট্টোর মতোই। পাশের বাড়ির নিজের মেয়ের সমান বয়সী এক মেয়েকে ধর্ষণ ও তার খুনের সালিশে ভরা বাজারে গলায় জুতার মালা পড়া আর মাথা ন্যাড়া হওয়ার পর অপমানে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি।

আসগর সাহেবের ভাবতেও খারাপ লাগে যে দেশের এই অবস্থায়ও রেডিও পাকিস্তান চুপ। সারাদিনই নিয়মিত অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে সশরীরে না এসে কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয় যে আসলে পূর্ব বাংলায় ঠিক কি অবস্থা চলছে। মাঝে মাঝে অবশ্য ঘটনার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় যদিও সেটা হয় অত্যন্ত গূঢ়ভাবে এবং ইঙ্গিতে। খোলাখুলিভাবে এখনও রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা স্টেশন থেকে বাঙালিদের কোনো বিবৃতি বা ইঙ্গিত আসছে না। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুরকে আন্দোলনের মাধ্যমে আগরতলা মামলা থেকে বের করে আনায় বাঙালি জাতির মনস্তাত্ত্বিক শক্তি বা সামর্থ্যের একটা পরিচয় তাদের নিজেদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। তার অব্যবহিত পরেই সাধারণ নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয় তাদেরকে একটি আকাঙ্খিত বিজয় এবং তার মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। আর তার মাঝেই একটা খবর খুব গাঢ়ভাবে ছড়িয়ে গিয়েছে। খবরটি হলো, শেখ সাহেব নাকি আসম আব্দুর রব আর তোফায়েল সাহেবকে ডেকে দেশ স্বাধীন করার অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন। আসগর সাহেব প্রথম শোনায় সে কথা বিশ্বাস করা তো দূরে থাক, কানেই তুলেননি। কেননা পাকিস্তান ভেঙ্গে নতুন একটি রাষ্ট্র করার দায়িত্ব কে নেবে? যে ইয়াহিয়া আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানের খাস মেহমান, তাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর সাহস কি করে করবে এই বঙ্গরাখাল সেটাই তার মাথায় ঢুকছিলো না। কিন্তু দোসরা মার্চ বটতলায় রব যেভাবে বুক ফুলিয়ে লাল সবুজ পাড়ের বাংলাদেশের পতাকা তুললেন সেটা স্বচক্ষে দেখার পর তার মনের সমস্ত সন্দেহ দূর হয়ে গিয়েছে। শেখ মুজিবের আদেশ বা অনুমতি ছাড়া রবের পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব হয়নি। ঘটনা আরও পরিষ্কার হয়ে গেলো যখন মার্চের সাত তারিখ শেখ সাহেব মিটিং ডাকলেন। মূলত সেই মিটিং এর পর থেকেই সবজায়গায় তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। দেশের সব জায়গায় আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী আর ছাত্রনেতাদের ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। পার পেয়ে যাচ্ছে শুধু মুসলিম লীগ আর জামায়াতে ইসলামীর চ্যালারা। এই দুটো দল সৃষ্টির পর থেকেই বারবার আদর্শ হারালেও লেজুরবৃত্তির রাজনীতি বা ধর্মের মিথ্যা আবরণে পশ্চিমা ঈশ্বরদের পা চেটে খাওয়ার অভ্যাস ছাড়তে পারেনি।

আসগর সাহেব হাঁটতে হাঁটতে পার্থদের সেলের সামনে চলে এলেন। দেয়ালঘড়িতে এখন সময় রাত ৪ টা। রাতের অন্ধকার কেটে আস্তে আস্তে আকাশের বুক চিড়ে আলো ফুটছে। সেই আলোয় কেমন যেনো একটা গুমোট ভাব। শুয়ে শুয়ে পার্থ ভাবছিলো আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করতে থাকা সব তারা একইরকম হয় কি করে? হঠাত দেয়ালের ওপরের ফাঁক দিয়ে একটা তীক্ষ্ণ আলো প্রবেশ করতে শুরু করলো সেই অন্ধকার সেলে। আঁধারে নিমজ্জিত সেই কক্ষে আলোর আকস্মিক আগমনে অন্ধকার দূর হলো না। বরং আলোর সেই তীক্ষ্ম রেখাগুলোই যেনো অন্ধকারকে তাচ্ছিল্য করে বুল ফুলিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে শুরু করলো। হঠাত লোহার ফাঁকগুলোতে একটা ছায়া দেখে তার তন্দ্রামত ভাবটা ভাঙে। উঠে বসে সে। ওসি আসগর সাহেবকে আসতে দেখে আবার শুয়ে পড়ে। খানিক পরে আবার চোখ মেলে দেখে আসগর সাহেব সেই সেলের তালা খুলছেন। সাথে থাকা ফয়সাল আর আব্দুল্লাহ খোঁচা দেয় তাকে।

–       কি রে? বিচার ছাড়াই লটকিয়ে দেবে নাকি?

ওসি সাহেব সেলের ভেতরে ঢুকে হাতের ইশারায় ওদের ডাকেন। পার্থ, ফয়সাল, আব্দুল্লাহ আর অহিদরা আস্তে আস্তে উঠে বসে। মাথা নিচু করে সেলের দরজা পেরোয়। তাদেরকে থানার গ্যারেজের দিকে নিয়ে এসে আসগর সাহেব একবার চারপাশে তাকান। তারপর নিজের পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করে সেটা পার্থর হাতে ধরিয়ে দেন। স্পর্শের আন্দাজে পার্থ বোঝে ওর ভেতরে টাকাপয়সা আছে। অল্প নয়, বেশ ভালো পরিমাণেই টাকা পয়সা আছে।

–       দেখো, তোমাদের আমি খুব স্নেহ করি। কয়েকদিন আগে শেখ সাহেব যে ভাষণ দিলেন তাতেই দেশের অবস্থা খুব ভালো করে বোঝা হয়ে গিয়েছে। তোমরা যা করছো সব ভালোই করছো। তোমাদের জেলের ভেতর না, রাজপথে থাকা উচিত। আমি চাই তোমরা বেঁচে থাকো। বাংলাদেশের এখন খুব বিপদ।

অহিদ, মিঠুন আর আব্দুল্লাহরা অবাক হয়ে আসগর সাহেবের কথা শোনে। নিজের কানে না শুনলে তারা কোনোদিনই এসব কথা বিশ্বাস করতো না। নিজের কানে শুনেছে বলেই আজ নেহায়েত ওদের এসব কথা বিশ্বাস করতে হচ্ছে। অবশ্য পার্থকে বেশ স্বাভাবিকই মনে হলো। সে যেনো ধরেই নিয়েছিলো যে মাঝরাতে ওসি এসে এভাবে তাদের থানার বাইরে নিয়ে আসবেন আর বলবেন, ‘ভাগো বাবারা। পেছনে অনেক বিপদ।’

তিন

পার্থ বসে আছে ‘ভাই ভাই হেয়ার সেলুন’ লিখা প্ল্যাকার্ড টাঙানো একটা গাছের নিচে। আজিমপুরের এই ভ্রাম্যমাণ সেলুনের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। একেকদিন একেক গাছের নিচে তাদের সেলুন। হাতে লেখা এই প্ল্যাকার্ড গোছের ব্যানারটি ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের আর কোনো সনাক্তকারী উপাদানও নেই। এই দোকানের মালিক নন্দনদা পার্থকে ফ্রিতে চুল দাড়ি কামিয়ে দেন। মাস তিনেক পর পর সে এই প্ল্যাকার্ড ঝোলানো গাছ খুঁজে বের করে। বেশিরভাগ সময়ই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাওয়া যায়। পার্থ আসে, গাছতলায় বসে। নন্দনদা তার সাথে চলমান রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন আলাপ জমান আর পাশে তার চুল দাঁড়ি কামানোর কাজও চলতে থাকে। কাজ শেষ হলে পার্থ বিদায় নিয়ে চলে আসে। নন্দনও কোনোদিন টাকা চায়নি, পার্থও কোনোদিন দেয়নি। যেনো এটা একটা নিয়ম যে মাসখানিক পর পর একজন চুল দাড়িতে ঢাকা যুবক আসবে আর নন্দন বিনে পয়সায় সেসব কামিয়ে দেবে। শুরুর ঘটনাটা অবশ্য একটু অন্যরকম। টাকা চাওয়ার ঘটনা যে একেবারেই তা নয়। টাকা চাওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং সেটা একবারই ঘটেছে।

সেদিন ছিলো পহেলা বৈশাখ। পার্থ বসে ছিলো জিন্নাহ হলের গেটের ঠিক বিপরীতের বটগাছটার দিকে। খানিক আগেই এক কপোত-কপোতীও ঠিক এখানেই বসে ছিলো। পার্থ এসে বসার খানিক পরই তারা উঠে চলে গেছে। পার্থ বুঝতে পেরেছিলো তার এখানে এসে বসাটা মোটেও উচিত হয়নি। অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে এভাবে হুড়মুড় করে ঢুকে যাওয়াটা নিতান্তই ভালো কিছু নয়। অবশ্য ওদের উঠে চলে যাওয়ার পরপরই সে ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে, এর আগে নয়। ওরা উঠে কিছুটা দূরে চলে যাওয়ার পর পার্থর চোখে পড়ে ওদের বসার জায়গাটায় দুমড়ে মুচড়ে থাকা এক ঠোঙা বাদাম। সেই বাদামের ঠোঙাটা হাতে নিয়ে পেছনে পেছনে বারকয়েক ডেকেও সেই জোড়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি সে। পার্থ যতই ডাকে, তাদের হাঁটার গতিও ততই বাড়ে। এক সময় ক্লান্ত হয়ে সে এসে আবার আগের জায়গায় বসে। খানিক দূরেই একটা তরুণীকে বসে থাকতে থাকে সে। পার্থ এগিয়ে যায় তার দিকে। তরুণীটিকে সে চেনে। তারই বিভাগের সহপাঠিনী। কাছে গিয়ে বাদামের ঠোঙা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, বাদাম খাবেন?

মেয়েটি একবার মুখ তুলে তাকিয়েছিলো পার্থর দিকে। পার্থর প্রশ্নের উত্তরটা শুনেও সে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করেছিলো বলে মনে হয়নি। পার্থ ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসতে বসতে আবার বলতে শুরু করেছিলো, আমি জানি আপনি আমাকে দেখতে পারেন না। পুরো বিভাগে এমনকি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো আপনিই একজন যিনি কিনা আমাকে পছন্দ করেন না। সেটা কি কারণে জানতে পারি? মেয়েটি হাতের বই থেকে চোখ তুলে একবার তাকালেও তার প্রশ্নের উত্তর করেনি। পাতলা ঠোঁটে বিড়বিড় করে একটা কিছু বললেও সেটা বাতাসের গোঙানিতে কেবল একটা অস্ফুট উচ্চারণ হিসেবেই ধরা দিয়েছিলো পার্থর কাছে। এবারও তার কাছ থেকে প্রশ্নের কোনো উত্তর না পেয়ে কথাটাকে নিজেই বাঁচিয়ে রেখেছিলো পার্থ।

–       পারু, আমি জানি আপনি কেনো আমাকে অপছন্দ করেন। আমি সারাদিন এই হল ঐ হল ঘুরে বেড়াই, মিটিং মিছিল করি, মাসে নিয়ম করে তিনবার এরেস্ট হই, সিগারেট ফুঁকি আরও কত কি! এসব করলে কোনো ছেলেকেই কোনো মেয়ের পছন্দ হবে না। আমি জানি।

হাতের বইটা নিচে ফেলে এবার ওর দিকে তাকায় পার্থ। হঠাত করে পারুর এই আচরণে থতমত খেয়ে যায় সে।

–       আমি আপনাকে পছন্দ করি না তার অন্যতম কারণ আপনার এই চুল দাড়ি। আপনি রাজনীতি করতেই পারেন, মিটিং মিছিলেও থাকতে পারেন। এটা আপনার নাগরিক দায়িত্ব। তাই বলে মাথায় চুলের গোছা আর তাতে হাজার উকুনের সংসার নিয়ে একটা ভদ্র সমাজে আপনি ঘুরতে পারেন না। এটা রুচির মধ্যে পড়ে না।

পারুর কথা শোনে পার্থ মোটামুটি অবাক হয়ে গিয়েছিলো। পারুর কাছ থেকে এরকম উত্তর সে আশা করেনি। জড়ানো কণ্ঠে বলে, আসলে হয়েছেটা কি। মানে, আমি তো চুল কাটি, দাড়িও কাটি। এগুলো নিয়ে আমার তেমন কোনো শখ নেই। কিন্তু প্রতি মাসে তো আর চুলদাড়ি কাটার জন্য বাড়তি পয়সা থাকে না।

পার্থর কথা শেষ হতেই ঘাসের ওপর ফেলা বইটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলো পারু। ইশারায় পার্থকেও উঠে দাঁড়াতে বলেছিলো। কিছু বুঝতে না পেরে পার্থ প্রশ্ন করেছিলো, আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি? মিনিট দশেক হেঁটে ওরা ‘ভাই ভাই সেলুন’ নামের একটা ভাসমান সেলুন আবিষ্কার করেছিলো। সেই সেলুনের খদ্দের বিদেয় হলে পার্থকে বসানো হইয়েছিলো সেই গাছের নিচে। বসাএ জন্য কাঠের বানানো একটা পাতলা মোড়া, পা রাখার জন্য একটা শীতলপাটি। ব্যাস! তেমন কোনো আয়োজন নেই। ঘন্টাখানিকের মাঝেই চুল দাড়ি ছোটো হয়ে এসেছিলো পার্থর। উঠে দাঁড়িয়ে পারুর কাছাকাছি আসতেই পারু মুচকি হেসেছিলো। পারুর এই হাসির মানেটা পার্থ ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি তখন। পার্থ কিছু একটা বলতে চেষ্টা করছিলো কিন্তু তার আগেই পারু ওকে থামিয়ে নিজে বলা শুরু করেছিলো।

–       আশার কাছ থেকে চিরকুটটা আমি পেয়েছি। কাল ১০ টায় মধুদার ক্যান্টিনের সামনে আসবেন। কথা আছে। আজ আমার অনেক তাড়া। আজকের মতো রইলাম।

পার্থকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে পারু হাঁটা শুরু করেছিলো। মুহূর্তেই একটা বাঁকের ফাঁকে হারিয়ে গিয়েছিলো সে। পারুর চলে যাওয়ার দিকে একমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সময়ের দিকে কোনো খেয়ালই ছিলো না তার। শেষে নন্দনের গানে তার হুঁশ ফেরে। পকেট মুচড়ে একবার নন্দনের দিকে তাকিয়ে হাসে। ওর হাসির মানেটা বুঝতে পারে নন্দন। হাসি হাসি মুখ করে বলে, টাকা দিতে হইবো না। আফায় দিয়া গেছে।

নন্দনের দোকান থেকে উঠতে উঠতে এসব কথাই মনে মনে ঘুরপাক খায় পার্থর। আজিমপুরের মোড়টা পেরিয়ে একবার চারদিকে তাকায়। থানা থেকে ওর আর ওর সাগরেদদের হঠাত নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবরটা ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছে। ঢাকা থেকে বের হওয়া পাক প্রশাসনের লেজুরবৃত্তি করা কিছু খবরের কাগজের প্রথম পাতায়ও তার ছবিসহ খবর এসেছে। কাজেই এভাবে ঘোরাফেরা করাটা এখন ওদের সবার জন্যেই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নিজেকে নিয়ে খুব বেশি একটা চিন্তা নেই পার্থর। ওর চিন্তা হচ্ছে নিউমার্কেট থানার ওসি আসগর সাহেবকে নিয়ে। এই জালেমের দেশে একজন সরকারি কর্মকর্তাও ঘাতকের থাবা থেকে নিরাপদ নয়। থানার সেল থেকে এভাবে তাদের উধাও হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাতে অবশ্যই তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সেটা হয়তো আসগর সাহেব ঠিকই সামলে নিতে পারবেন। কিন্তু তার আগেই যদি ওরা পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার হাতে আবারও ধরা পড়ে যায় তবে ব্যাপারটা সবার জন্যই বেশ খারাপ হয়ে যাবে। পার্থর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা মহকুমায়। পার্থ এখন ঠিক বুঝতে পারছে না যে এই পরিস্থিতিতে সে আসলে কোথায় যাবে। তার পিসির বাড়ি ময়মনসিংহেরই গৌরীপুরে। ওই এলাকায় তার পিসোমশায়ই কর্তাব্যক্তি। গ্রাম্যবাজারে বেশ কয়েকটি দোকানঘর রয়েছে তার। ওখানে গেলে আপাতত কয়েকদিনের জন্য নিরাপদে আত্মগোপন করতে পারবে পার্থরা। পরে অবস্থার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। তাছাড়া পকেটে খুব বেশি টাকাপয়সাও নেই। গৌরীপুর গেলে সেটারও একটা বন্দোবস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে নিজেদের বাড়িতে গেলে সেটার পরিণতি খারাপ হতে পারে। গ্রাম্য বাজারে ঈদানীং মুসলিম লীগের চ্যালারা খুব উৎপাত চালাচ্ছে শুনেছে সে। কাজেই নেত্রকোণা গেলে সেটা তার বৃদ্ধা মার জন্য পরবর্তীতে ঝামেলা বয়ে নিয়ে আসতে পারে। অনেক ভেবে পার্থ সিদ্ধান্ত নেয় তারা আজই ঢাকা ছাড়ছে এবং গৌরীপুরের উদ্দ্যেশ্যেই রওনা হচ্ছে।

চার

জমির আলী বসে আছেন গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের ঠিক বিপরীতে। কয়েক দিন আগেও দিনের বেলাতেও এই এলাকায় অনেক ভাড়া পাওয়া যেতো। সন্ধ্যা গড়ালে তো কথাই নেই। ঢাকা শহরের মানুষগুলো সূর্য ডুবলেই কেমন যেনো মিইয়ে যায়। প্রাণশক্তি কমে আসে। তাই হয়তো তিন চাকার একটা রিকশা ডেকে তাতে সওয়ার হয়ে যায়। যেনো জীবন পাড়ি দেয়ার জন্য রিকশায় ওঠাই যথেষ্ট। আর কোনোকিছুরই কোনো দরকার নেই। জমির আলী তার জীবনে অনেক রকম যাত্রীকে তার রিকশায় বসিয়েছেন। এক টাকার দূরত্বে নিয়ে গিয়ে একটা পঁচিশ পয়সার কয়েন দিয়ে গরম দেখানো মানুষ যেমন দেখেছেন আবার এক টাকার দূরত্ব গিয়ে হাতে পাঁচ টাকার নোট ধরিয়ে দেয়া মানুষও কম দেখেননি। ঢাকা নগরীর রিকশাওয়ালারা বছরে এরকম জন পাঁচেক লোককে পান যাদের তারা নিজেদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ মনে করেন। তারা বিশ্বাস করেন এদের সাথে এভাবে দেখা হয়ে গেলে তাদের ঘুণে ধরা, জং পরে যাওয়া জীবনের কয়েকটা দিন অন্তত শুভ হবে। ঘরে চালডালের অভাব থাকবে না, দিনভর যাত্রী পাবেন। রাতে লুঙ্গির কাছা খুলতেই চকচক করতে থাকা, মার খাওয়া, রঙ জ্বলে যাওয়া পয়সাগুলো মাটিতে পড়ার পর একটি অন্যটির সাথে লেগে ঝনঝন আওয়াজ তুলবে। সাথেই বসে থাকা আরও দুজন তার দিকে চোখ তুলে তাকাবেন। তাদের চোখে কাজ করবে একটা না পাওয়ার ক্ষোভে মেশা ঈষৎ বিষাক্ত ঈর্ষার ছোঁয়া। আধুলি, সিকি, ভরা টাকা আর কাগুজে নোটগুলো এক জায়গায় করে তারা ছুটবেন বাজারের দিকে। মধ্যরাতের বাজারে কাতল বা কার্প মাছের পড়ে থাকা বড় বড় টুকরোগুলো থলেতে পুরে নিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে ছুটে যাবেন নিজের ঝুপড়িতে। ভেঙে পড়তে থাকা ছোট সেই ঝুপড়িতে তখন সুগন্ধ ছড়াবে ঈদের খুশি। নিজের মেয়ের মুখের হাসির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শীতলপাটিতে গাটা এলিয়ে দেবেন। পাশেই স্ত্রী এসে বায়নার সুরে বলবে, হুনেন, আইজকা কিন্তু আর মাছের ছালুন পাক করমু না। রোজ রোজ মাছের ছালুন খাইতে খাইতে অস্বস্তি লাইগা গেছে। আইজকা সইষ্যা বাটা দিয়া মাছটা কষায়া একটা রান্ধন দিমু। আফনে কোনটা কন? স্ত্রীর প্রশ্নের কোনো উত্তর দেবে না সে। পায়ের ওপর পা তুলে হালকা কাত হয়ে শুয়ে থাকবে আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তার পাশেই বসে থাকা স্ত্রীকে হাতের ইশারায় হাতপাখাটা আরও জোরে ঘুরাতে ধমক দেবে। মাছের কি গতি হবে সেটা ওপরওয়ালা ঠিক করে রেখেছেন। সরিষা মাখিয়ে রান্না করলেও সেটা পেটে যাবে, সজিনা আর পুঁইশাকের সাথে রান্না করলেও সেটা পেটেই যাবে। এই সময়টা এইরকম ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করার বিষয় না। এইসময় ভাবতে হবে সুখের কথা, দেখতে হবে রঙিন স্বপ্ন। দরিদ্রের ঘরে রঙিন স্বপ্নের দুয়ার প্রতিদিন খোলে না। যেদিন খোলে সেদিন যে অন্তত মাস তিনেকের ক্লান্তি ভোলার মতো একটা রঙিন স্বপ্ন দেখে নেয় না তার চেয়ে বড় অকর্মা আর কে হতে পারে?

এরকম একটা দিনের দেখা অনেকদিন ধরেই পায় না জমির আলী। তার বয়স চল্লিশের কোঠায় আছে। নিশ্চিত করে জানেন না তার বয়স কত। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই দেশভাগ দেখেছেন এতটুকু মনে করতে পারেন। তাদের আদিনিবাস ছিলো যশোরের আরও একটু ভেতরের দিকে বনগাঁ গ্রামে। দিনকয়েক ধরে চলতে থাকা দাঙ্গার এক পর্যায়ে বাবা, কাকা আর পরিবারের মহিলাদের নিয়ে একটা বিশাল স্রোতের সাথে ভাসতে ভাসতে এসেছিলেন ঢাকা। বাবা, মা মারা যাওয়ার পর কাকার সাথে আর থাকা হয়নি জমির আলীর। একমাত্র বোন শিউলি কলেরায় আক্রান্ত হয়ে সেই ছুটে চলার সময়টাতেই মারা গিয়েছিলো। নিজের ঝুপড়িতে আজও যখনই তার মেয়ে মালা চুলে ফিতা বাঁধে তখনই জমির আলীর মনে পড়ে তার বোন শিউলির কথা। এভাবেই মুখে একটা রহস্যের হাসি ধরে রেখে চুলে ফিতা বাধতো তার বোন শিউলি। মাঝে মাঝে জমির আলীর ভয়ও করে। শিউলির মুখের ওই হাসিটা ওর বেঁচে থাকার সময় স্বাভাবিকই ছিলো। কিন্তু আরও বছর চল্লিশেক পরে সেই একইরকম হাসি নিজের মেয়ের চেহারায় দেখে জমির আলীর বুক দুরুদুরু করে কেঁপে ওঠে। হালকা গলায় মেয়েকে ধমকের সুরে বলে, চুল বান্ধনের সময় ঐভাবে মুখ কইরা রাখিস কেনে? চুল বান্ধনের মধ্যে আবার হাসির কি আছে এইটাই তো বুইঝবার পারলাম না। মেয়ে মালা ঘাড় নেড়ে বাবার আদেশের প্রতি আনুগত্য জানালেও মুখ থেকে সে হাসি সরে না। ফিতা বাঁধতে থাকা মেয়ের মুখে আবার জমে ওঠা কাঁচা হাসি জমির আলীকে বারবার তার বোনের কথা মনে করিয়ে দেয়। মৃত্যুর সময়ও শিউলির তার মুখে সেই হাসি লেগে ছিলো।

– কি মিয়া, আইজকা কিরম ভাড়া মারলা?

চোখ তুলে পরিচিত আওয়াজটার দিকে তাকায় জমির আলী। তার তিন ঘর পরের আশু মিয়া। বাড়ি সুনামগঞ্জের কোনো একটা হাওর এলাকায়। ঢাকা আসার পর থেকেই তাদের মধ্যে সুসম্পর্কটা বেড়েছে। জমির আলীর স্ত্রী আনোয়ারা আশু মিয়ার স্ত্রীর আপন বোন। এই সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর ধরা যায় তাদের বন্ধুত্বটা আরও সুদৃঢ় হয়েছে। জমির আলী কি বলবে বুঝে পায় না। আজকে সারাদিনে পাঁচ টাকার ভাড়াও নিতে পারেনি সে। সারাদিন বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে পুলিশের বাঁধার মুখে পড়ে ঘুরে আসতে হয়েছে। যাত্রীও যা পাওয়া গিয়েছে সবাই স্বল্প দূরের যাত্রী। কেউই ধানমন্ডি থেকে গাবতলী দূরত্বের যাত্রী না।

–       না গো ভায়রা, ওইরকম যাত্রী তো পাওয়া গিলো না। কিরাম করে আজ রাত্তিরে ঝিবৌয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াবো সেটা চিন্তা করতিছি।

গাবতলী বাসস্ট্যান্ড আসার পর পার্থরা একদম বোকা বনে গিয়েছে। আগে কোনোদিন এরকম জনশূন্য গাবতলী বাসস্ট্যান্ডকে দেখেনি তারা। চারিদিকে কেমন যেনো একটা সুনসান নীরবতা, কিসের যেনো একটা প্রস্তুতি চলছে। শহরের চারপাশ দিয়ে একটা ভৌতিক কণ্ঠস্বর যেনো অবিরাম শিস বাজিয়ে যাচ্ছে।

–       মামা, যাবেন?

স্বল্প দূরত্বের বাসগুলো চলাচল করতে থাকলেও মাঝারি বা বেশি দূরত্বের বাসগুলো চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও শেখ সাহেবের ঘোষণায় সকল গাড়ি ঘোড়া চালু রাখতে বলা হয়েছিলো তারপরও হঠাত কেনো এরকম একটা অবস্থা দাঁড়ালো সেটা তারা কেউই বুঝতে পারছে না। এখান থেকে ময়মনসিংহ দিনে দুটো বাস যেতো। দুটো বাসের যেকোনো একটি পাওয়া গেলেই সেটাতে উঠে পড়বে যতক্ষণই অপেক্ষা করতে হোক না কেনো-এরকম একটা প্রস্তুতি নিয়েই ওরা এসেছিলো এখানে। কিন্তু পায়ে হেঁটে এতটা পথ এসে ওরা শুনতে পায় অধিক দূরত্বের সকল বাস চলাচলই বন্ধ আছে গত দুইদিন যাবত। কাজেই এখন যদি তারা যেতেই চায় তবে কয়েক কিলোমিটার দূরের একটা ঘাট থেকে নৌকায় করে নদীপথে ময়মনসিংহ যেতে হবে। এতটা পথ হেঁটে আসা পার্থদের পক্ষে আর হাঁটা সম্ভব হচ্ছিলো না। একটা রিকশা যে নেবে তারও কোনো বন্দোবস্ত নেই। বাস বা অন্যান্য যানবাহনের সাথে পাল্লা দিয়ে রিকশার সংখ্যাও কমে গেছে হুট করে। অনেক খুঁজেপেতে দুটো রিকশা একজায়গায় আবিষ্কার করে ওরা যখন হাঁফ ছেড়ে একটু দাঁড়াবে, ঠিক তখনই দুই রিকশাচালক তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে প্রস্তাবিত গন্তব্যে তারা যাবেন না। এদিকে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে অনেক আগে। রাত দশটা বাজে এমন আন্দাজে ওরা গাবতলী এসে পৌঁছেছিলো। কারোর হাতেই হাতঘড়ি নেই। তবুও তারা নিঃসন্দেহে বলতে পারে যে এখন রাত বারোটার উপর বাজে। আবার হাঁটতে শুরু করার আগে পার্থরা একটা টঙঘরে বসে জিরিয়ে নেয়াটাকেই সমীচীন বলে মনে করে। দোকানের কিশোর ছেলেটাকে চায়ের কথা বলে বেঞ্চিতে বসার পরপরই ওদের মনে হলো ওদের পায়ের নিচের মাটিটা যেনো একবারের জন্য হলেও ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।

পাঁচ

পঁচিশ তারিখ মধ্যরাত। পুরো গাবতলী এলাকা একটু পর পর কেঁপে উঠছে স্বয়ংক্রিয় রিকয়েলস রাইফেলের গমগমে আওয়াজে। গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের বিপরীত পাশের রাস্তাটা ধরে একটু এগিয়ে একটা ছোট টঙঘরের সামনে পড়ে আছে কয়েকটা দেহ। ওদের উপস্থিতি টের পাওয়ার পরপরই দোকানের ছেলেটা দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছে। তবে একটা পাখি হাতছাড়া হয়ে গেলেও পাওয়া গেছে আরও একগন্ডা পাখি। সেই পাখিগুলোর ওপর কয়েকটা ব্রাশফায়ার করতেই মাটির পুতুলের মতো সেগুলো মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলো। ক্যাপ্টেন জামশেদ ওয়্যারলেস হাতে নিয়ে জানালো, গাবতলী বাস টার্মিনাল ইজ আন্ডার কন্ট্রোল। খানিক বাদেই বিপ আওয়াজ তুলে ওপাশ থেকে ক্যাপ্টেন আগর খানের গলা শোনা গেলো।

– ইউ মিসড এ হট কেক গুফি। উই গাইজ জাস্ট এনজয়েড এ চিলি চিকেন উইথ বেঙ্গল স্পাইসেস। দিজ গার্ল ইজ নাও আন্ডার ক্যাপ্টেন খলিল’স ক্যাপচার। হি ইজ কাটিং হার বাডস। ইয়েস, ইউ গট দ্য পয়েন্ট। উই আর নাউ ইন চামেলি হাউস, দ্য উইমেন হল অফ দ্য ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা। খানিক পরেই ওয়্যারলেস যন্ত্রে আরও একটি বিপ তুলে নতুন একটি কণ্ঠস্বর। লোভাতুর চোখগুলো দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজতে শুরু করার পর ক্যাপ্টেন জামশেদ আরও একটি কন্ঠস্বর শোনে। এবারেরটা পূর্ব পাকিস্তানেরই ছেলে মেজর কামালের।

–       কাম শার্প অফিসারস, উই আর এনজয়িং আওয়ার ডেজার্ট আফটার ডিনার ফ্রম টিক্কা’স ডাইন।

ঠিক সেই মূহুর্তে ৩৭ পেশোয়ার আর্টিলারি ব্রিগেডের মেজর কামাল দ্রুত পায়ে এগুচ্ছে ১২১৯ নং কক্ষের সর্বডানের বিছানাটার দিকে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে কোঁকাতে থাকা মেয়ে দুটিকে ইতোমধ্যে বেয়নেট চার্জ করা হয়েছে। অনেক খুঁজে সে এই দুজনকে অক্ষত অবস্থায় পেয়েছে। চুল লম্বা মেয়েটার হাতে বুজে রাখা একটা চিরকুটের দিকে নজর যায় তার। একবার সেটা কেড়ে পড়ার মনস্থির করেও আবার সিদ্ধান্তে বদল আনে সে।

ফরিদুর রেজা খান। কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষার্থী। জন্ম ৬ এপ্রিল। জন্ম বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলায়। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করছেন। প্রকাশিত বই: 'তখন আঁধার ছিলো' (উপন্যাস)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..