খোকনকে চিঠি

মৌসুমী লাহিড়ী
কবিতা
Bengali
খোকনকে চিঠি

সামাজিক সচলতা

পারস্পরিক দূরত্ব
মানসিক অবস্থান।
পাশাপাশি অথচ
অগণিত আলোকবর্ষ।
কাজ শেষ, এড়িয়ে চলো
অপ্রয়োজনীয় ওরা।
উলম্বী সামাজিক সচলতা
ওপর মহলে যাও।
স্টেটাস আপডেট করো
ওঠো, আরো ওপরে ওঠো।
মাটি থেকে অনেক ওপরে
সাধারণের সংস্পর্শের ঊর্ধ্বে।

বর্ষার স্পন্দন

তোমাকে চায়, মন শুধু তোমাকেই চায়,
প্রকৃতির মাঝে মন শুধু বর্ষাকেই চায়।

আকাশে কালো মেঘ ঘনীভূত হয়ে
জানিয়ে দেয় তোমার আগমন বার্তা,
মন থাকে তোমার আসার প্রতীক্ষায়।
টিপ টিপ করে ঝরে পড়ার শব্দে
চঞ্চল মন গেয়ে ওঠে বৃষ্টির গান।
প্রকৃতি সুন্দর হয়ে ওঠে মুষল ধারায়।
মন তখন কোথায় যে হারিয়ে যায়,
তাই তোমাকে চায়, মন শুধু তোমাকেই চায়।

রিম ঝিম শব্দে যখন নেমে আসো বৃষ্টি,
মন ময়ূরী নেচে ওঠে তা থৈ তা থৈ বোলে।
বৃষ্টির পরশ পেতে চলে যাই ঘরের বাইরে,
অঝোর বর্ষণে প্রকৃতির মাঝে প্রকৃতির সাথে,
সারা তনুমন স্নাত হয়, সিক্ত হয়, শীতল হয়।
তোমার অঝোর ধারা ওষ্ঠে, ললাটে ঝ’রে
শরীরে ভালোবাসার স্পন্দন জাগায়।
তাই তোমাকে চায়, মন শুধু তোমাকেই চায়।

 

অস্থির শৈশব

আজকের খবরের কাগজটা পড়েছিস?
পড়েছিস তো-
একবারও ভেবে দেখেছিস কেন এমন হলো
সমাজে তো আকছার এ ঘটনা ঘটে চলেছে।
যৌথ সংসার ভালো লাগে না আজ আর
মানুষ চায় তুমি-আমি নিউক্লিয়ার পরিবার
দুহাত ভরে দুজনে করবে রোজগার
সন্তান মানুষের মতো মানুষ হবে তার
অতই কি সহজ?

শিশুকে না দিলে সময়
তাদের মনের কথা কি জানা যায়?
বাইরে থেকে তাকে যতই দেখায় স্হির
ভিতরে ভিতরে সে তার চেয়ে বেশি অস্থির।
গ্রাস করছে শিশুদের একাকিত্ব আর হতাশা
খুঁজে পায় না জীবনে তারা বাঁচার আশা।
আত্মহননের পথই তারা বেছে নেয়
ঘরে ঘরে কিশোর-কিশোরী হারিয়ে যায়।
দাও শিশুদের ফিরিয়ে যৌথ পরিবার
শিশুরা পাক নিরাপত্তার আধার।
দাও শিশুদের মাঠ ও খোলা আকাশ
শিশুদের হোক মানসিক বিকাশ।

 

বিষাক্ত

ধূসর আকাশ
নীলের অভাব
বিষাক্ত বাতাস
কার্বনের প্রভাব।

উন্নয়ন অপরিসীম
চেয়েছিল যারা
বিশ্ব আজ কৃত্রিম
দায়িত্ব এড়ায় তারা।

কি হবে সমাধান
অপূরণীয় ক্ষতি
নেই কোনো জ্ঞান
শুধু নিজেদের স্তুতি।

 

খোকনকে চিঠি

খোকন তুই যখন সাবালক হবি
তখন এই চিঠি পড়িস।
কিছু কথা তোকে বলে যেতে চাই
আমার বিশ্বাস তুই তা রাখবি।
ছেলেবেলায় আমি পিতৃহীন হই,
মা একা কষ্ট করে আমাকে মানুষ করে।
জীবিকার তাড়নায় চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে
সেনাবাহিনীতে একটা চাকরি পাই।
না শুধু দেশপ্রেমের জন্য নয়,
বাঁচার জন্য, হ্যাঁ জীবনে বাঁচার জন্য
সেনাবাহিনীতে চাকরিটা নিয়ে নিই।
যৌবন, প্রেম ভালোবাসার অনুভূতি পাইনি।
পেয়েছি কঠোরতম প্রশিক্ষণ
কি করে দেশকে রক্ষা করতে হবে।
আমাদের জীবনের কোনো ভরসা নেই রে
চোখের সামনে সহকর্মীদের মৃতদেহের স্তুপ।
আমাকেও যে কোনো দিনই হয়তো
এভাবেই তোকে ছেড়ে, তোর মাকে ছেড়ে
দেশ ছেড়ে চিরবিদায় নিতে হবে।
সেদিন তোর মাকে দেখিস খোকন
তোর মা যেন আমার অভাব বুঝতে না পারে।
তোরা ভালো থাকিস খোকন…
তোরা ভালো থাকিস।
– বাবা

মৌসুমী লাহিড়ী। কবি।  জন্ম ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুরে। লেখাপড়া করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম,এ এবং বি,এড। এরপর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। পেশাগত জীবনে তিনি সরকারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ