গভীর অনুভূতির খেলা

জিললুর রহমান
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
গভীর অনুভূতির খেলা

কোথায় যেন শুনেছিলাম, কম শব্দে বড় কথা বলাই কবিতা। তবে, বিষণ্ণ বালকের জানালার ফাঁক গলে দিগন্তের দিকে চেয়েথাকাও হয়তো কবিতা। আলুথালু উদ্ভ্রান্তির মাঝে প্রেয়সীর একচিলতে হাসিও হয়তো কবিতা।

কবিতা আনন্দের মিষ্টি ঝলক, আবার কবিতাই বিষণ্ণতার ম্লানমুখ, একতাল গাম্ভীর্য কখনও। শব্দের পরে শব্দ সাজিয়ে অনন্ত সম্ভাবনা তৈরি হলে কবিতা জন্মনেয়। কবিতা মোক্ষ- কবিতা রূপক উপমা নিয়ে অদ্ভুত স্বপ্নরাজ্যে ঘুরিয়ে আনে পাঠককে- কবিকে করে তোলে স্বপ্নাতুর আলুথালু।

মনের ভাব প্রকাশই যদি কবিতার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে সকল বেদনার ভাষা কবিতা, সকল আনন্দের ভাষা কবিতা। কিন্তু কীএমন বস্তু এই কবিতা নামের সোনার হরিণ, যার পেছনে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হারিয়ে যায় জীবনের প্রবল বৈভব!

কোন্ মোক্ষ লাভের নেশা তাড়িয়ে ফেরে ঘর থেকে পথে, পথ থেকে আড্ডায়? সে কোন পরশ পাথর আমি খুঁজে ফিরি খ্যাপার মতোন?

এখনও ঘোরের মধ্যে সে কোন বনলতা প্রশ্ন রাখে “এতদিন কোথায় ছিলেন”? কে এই বনলতা? কে তারে দেখেছে হৃদয়ে? সিংহল সমূদ্র থেকে কেন কবি ফিরে আসেন এই বাংলার মাঠ লতা ভাঁটফুলের সৌন্দর্যের কাছে? তবে কি কবিতা সে সকল অনন্তঅক্ষর- যা হাজার বছর ধরে রয়ে যাবে মানুষের মনে?হালদা নদীর মতো জোয়ারে ভাটায় দুলে দুলে উঠবে বিপুল  বৈভবে? কবিতা নশ্বর জগত থেকে কবিকে অবিনশ্বরতায় নিয়ে যায়।

এতোদিনে জেনে গেলাম “ট্রয় ধ্বংস করবে, প্রেম আজ আর অতো শক্তিমান নয়”। আমাদের ইঁট সুরকির নাগরিক জীবন, বিচ্ছিন্নতার ভেতরে বিবমিষাতাড়িত কবিতার জালিকা বুনন করে ফেরে।

আমরা চেতন কী অবচেতন সকল জগত থেকে ঝেড়েফেলে দিই যতো অতীন্দ্রীয় ভৌতিক-আধিভৌতিক দেব-দৈব ধর্মাচার। একটা সময়ে এসে সকল দৃশ্য কী অদৃশ্যের প্রতাপের দিকে আমরা আঙুল তুলতে শিখে নিই এই কবিতার কারণে। দৈব ধর্মাচার। একটা সময়ে সকল দৃশ্য কী অদৃশ্যের প্রতাপের দিকে আমরা আঙুল তুলতে শিখে নিই এই কবিতার কারণে।

কবিতা এক সৌম্য সভ্যতার প্রাজ্ঞ সংস্কৃতির উত্তরাধিকার; আবার কখনো কখনো কোনো নারী, ‘স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের তুমি’। আমি কখনো তীব্র আবেগে ভাসতে ভালোবাসি, আবার কখনো ছন্দ-শব্দ-রূপক ইত্যাদির উচ্ছ্বাসে সংযমে হাসতে ভালোবাসি। কবিতা যেন সারাটা জীবনই মধুভাষিণী-বহুরূপী হয়ে থাকে! কবিতা যেন সারাদিনমান ভালোবাসাটাকে ডাকে! অভিজ্ঞতা আর বহমানস্বপ্ন ধরে রাখবার চিরন্তন সাধনাই কি তবে চির-চলমান কবিতা? সাথে নেই কি প্রতিবাদের বিপন্ন সংক্ষুব্ধ স্বর?

তার পরও যে স্বপ্ন এখনো বুনতে পারিনি, যে শব্দ এখনো ধরতে পারিনি- তার পেছনে নিরন্তর ছুটে চলাই যেন আমার সাধনা। আমি জন থেকে জনে- মন থেকে মনে- আর বন থেকে বনে শব্দের কথামালা গেঁথে গেঁথে যে শ্রুতিকল্প, দৃশ্যকল্প, ভাবনারাশি সাজাতে চেয়েছি- তা-ই হয়তো খুঁজে ফিরি কবিতায়।

সম্ভবত কবিতাই একমাত্র মাধ্যম যা হৃদয়ের একান্ত গভীর অনুভূতিকে কয়েকটি শব্দে ধারণ করে গভীর ব্যঞ্জনা জাগায়। তাই কবিতা পড়তে ভালোবাসি, লিখতেও। গোপন একটি ব্যাপারও আছে, হয়তো চালাকি বা ধান্দা করার মতো যোগ্যতা অর্জন করিনি বলে এখনও কবিতা লিখি, পড়ে যাই কবিতা নিরন্তর।

জিললুর রহমান। কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে বসবাস করেন। কবিতার মাঝেই তাঁর বিচরণ। তবে নন্দনতাত্ত্বিক প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভ্রমণগদ্য এবং অনুবাদ কর্মেও দক্ষতার সাক্ষর রেখেছেন। প্রকাশিত বই: কবিতার বই: অন্যমন্ত্র (লিরিক ১৯৯৫), শাদা অন্ধকার (লিরিক ২০১০),  ডায়োজিনিসের হারিকেন (ভিন্নচোখ ২০১৮) দীর্ঘ কবিতার পুস্তিকা:...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..