গোপন ত্রিকোণমিতি

চিত্তরঞ্জন হীরা
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
গোপন ত্রিকোণমিতি

কীভাবে কবিতার প্রতি আগ্রহ শুরু হয়েছিল সেতো মনে নেই। হয়তো তা ছিল শৈশবের কোনও এক মুহূর্তের হঠাৎ পাওয়া এক খেলা। তারপর শুরু হলো পেয়ে বসা একটা খোঁজ। যেন নিজেকেই খুঁজে ফেরা। খুঁজতে খুঁজতে নিজেকে প্রকাশের এক আর্তিও বোধহয় একসঙ্গে এসে মিশেছিল। ফলে এই দুটি প্রশ্ন আজ আমার কাছে একে অন্যের পরিপূরক মনে হচ্ছে। যদি নিজেকে প্রকাশের আর্তি সেই শৈশবে না জাগতো তাহলে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে এই বিশাল কবিতার জগত, শব্দের কাড়া-নাকাড়া ধ্বনি– এর প্রতি কোনও আকর্ষণই হয়তো সেভাবে জন্ম নিত না।

এই যে একটু একটু করে আমার বেড়ে ওঠা, আমার গ্রাম, আমার বাড়ি, আমার দুঃখ, কান্না, আনন্দ, কোথায় যেন নিজের মতো করে একটা প্রকাশের ব্যঞ্জনা চাইছে, একটা ভাষা খুঁজছে। তাকেই লিখতে শুরু করি আর সুর করে মাঠে ময়দানে খোলা আকাশের নিচে গাছের কাছে, পাখপাখালির কাছে শোনাচ্ছি। শুরু হলো প্রকাশের জন্যে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়া। মন দিয়ে পড়ছি স্কুলপাঠ্য কবিতাগুলো। লিখে উঠতে চাইছি ঠিক সেরকমই।

তখন ক্লাস সিক্স কি সেভেন হবে। স্কুলম্যাগে কবিতা, গল্প দেওয়ার জন্যে ক্লাসে নোটিশ এলো। সহপাঠী বন্ধুরা কেউ কেউ লুকিয়ে দেখে ফেলেছে আমার অংকের খাতা, ফাঁকে ফাঁকে হিজিবিজি কত লেখা। মনে পড়ছে, একজন বললো– আমাকে একটা কবিতা লিখে দিবি ! আমিও কেমন বলে ফেললাম –আচ্ছা, দেবো। তো দিলাম তাকে। সে নিজের নামে জমা দিলো সেটি। আর আমি আরও যত্নে, আরও প্রাণ ঢেলে লিখলাম নিজের জন্যে একটি। জমা দিলাম। পত্রিকাটি যখন প্রকাশিত হলো দেখা গেল বন্ধুর নামের কবিতাটি প্রকাশ পেয়েছে। আমার স্বনামেরটি নয়। এই হলো চলা শুরু। ব্যর্থতা দিয়ে। তবু গোপন এক আনন্দ – যা আমার নয়। অথচ তার মধ্যে কোথাও যেন আমি আছি। বারবার রিজেক্ট হচ্ছে আর দুঃখ জমা হচ্ছে সাদা পাতায়। তো লিখতে লিখতে পড়া আর পড়তে পড়তে বয়স বাড়ছে। শিখে নিচ্ছে গোপন ত্রিকোণোমিতি। উঠছে গোঁফের রেখা। মন উড়ছে পাখনা মেলে।

কাগজে বিজ্ঞাপনের পাতায় চোখ চলে যায় – “শারদীয় সাহিত্যরূপার জন্য গল্প/কবিতা পাঠান। ….”। যত্নে লিখে রাখা হলো ঠিকানাটি। যথা সময়ে পাঠিয়ে দেওয়া। তারপর কোনও এক অনির্ধারিত নৈঃশব্দ্যের মধ্যে ছাপা হয়ে গেলো আমার মৃত্যুটি। ছাত্রবন্ধুর মতো ঢাউস একটি পত্রিকা, হাতে নিয়ে পথে পথে ঘুরি। বেড়াতে এসেছি হাতে পত্রিকা, বাজারে চলেছি হাতে পত্রিকা। একদিন অচেনা একজন সেই পত্রিকা দেখে কাছে বসলেন, স্টেশনের বেঞ্চে। বললেন – দেখি কী পত্রিকা ! দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন – তোমার লেখা আছে ! দেখালাম। পড়লেন। অনেক কথা বললেন। ঠিকানা নিলেন। নিজের পরিচয় দিলেন। নিজেদের পত্রিকার কথা বললেন। ঠিকানা দিলেন। বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ একদিন চলে এলেন দুই বন্ধু আমার গ্রামের বাড়িতে। কবি স্বপন নাগ ও কবি-গল্পকার স্বপন মুখোপাধ্যায়। সেই থেকে হাতে ধরে তাঁরাই শেখালেন। বারবার বলছেন, লিখতে গেলে পড়তে হয়। খুলে দিলেন পড়া ও লেখার জগৎ, কবিতার বই, পত্র-পত্রিকা, সাহিত্য পাঠ, আলোচনা। শুরু হলো পাঠ বিনিময়। তাঁরাই আমার মধ্যে জাগিয়ে তুললেন কবিতায় বেঁচে ওঠার আশ্চর্য প্রেরণা।

আজ এই চল্লিশ বছরেরও বেশি, কবিতার সঙ্গে পথ হেঁটে হেঁটে নিজেকেই  বারবার প্রশ্ন করতে হয় – কী লিখি আমি ! কেন লিখি ? কিছু কি লিখি ! ভেতরে ভেতরে এই কথাগুলোই বাজে।

তো কবিতা কেন পড়ি – এ প্রশ্নেরও বয়স কম হলোনা। এখন এটুকু অন্তত বলা যায়, চলতে চলতে একটা জীবন খাওয়া-পরা-বাঁচার বাইরেও এক অন্যরকম বাঁচাকে যেন খুঁজছিল, তখনই কবিতাকে পেয়ে বসা। মাঝে মাঝে মনে হয় কবিতার মধ্যে নিজেকেই কাছে পাওয়া। কারও নিঃসঙ্গতার উট হয়ে মরুভূমি পার করে দিতে পারিনা, তাই কবিতার কাছে বসি। নিজের জন্যেই। নিজের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী করে নিতে। কবিতাপাঠ তাই এখন জীবন জড়িয়ে।

আর কবিতা কেন লিখি, বলতে গেলে সেও আসে ওই অন্যরকম বাঁচার প্রেরণা থেকে, ওই পাঠ থেকে। প্রতিটি পাঠের পর আত্মবোধের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে সে প্রকাশ পেতে চায়। এ প্রকাশ, আত্মার দ্বিতীয়তা। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার সমস্ত অহম্ ছেড়ে উন্মুক্ত আকাশের নিচে এসে  দাঁড়াই। সেই শিশু আমি আজও। মাঠে মাঠে ঘুরছি, আমার শৈশবের গ্রাম, কৈশোরের গ্রাম। আর আছে আমার এই ‘আমি’র এক শৈশব। সে খুঁজে চলেছে আত্মার মধ্যে আরেক আত্মাকে। এক আমির মধ্যে আরেক আমিকে। সেই আমিকে জাগিয়ে তুলতেই যেন অক্ষরের পায়ের কাছে এসে বসা। নিয়ত পাঠ আর অক্ষরের হাত ধরে পথে পথে চলা। সবার মধ্যে থেকেও একা। ভেতরে একটা অস্থির আলোড়ন যেন ঘটতেই থাকে। ঘুমে-জাগরণে। সেই আলোড়ন তিষ্ঠোতে দেয় না। বারবার সাদা পাতার কাছে টেনে নিয়ে যায়। জীবন আর অস্তিত্বের মাঝখানে ফেলে নিজেকে চিনতে বসায়। এর বাইরে কি লিখি আমি ! কী যে লিখি, কিছুই বুঝি না।

চিত্ত্রঞ্জন হীরা। কবি। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতা। প্রকাশিত বই:

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ