গোপন শোক

ইসরাত জাহান
কবিতা
Bengali
গোপন শোক

মৃত নিস্তব্ধতা

শ্মশানে সাজানো চিতা
কাঠের পরে কাঠ
তুমি শুয়ে আছো চিৎ হয়ে
তোমার মুখাগ্নিতে জ্বলছে
আমার হৃদয়
চন্দনকাঠ-আগুন-ঘিয়ের ঘ্রাণে
ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায় বিষাদ ওড়ে
অথচ সেসব তুচ্ছ করে
তোমার ঘ্রাণ নাসারন্ধি পেরিয়ে
চলে যাচ্ছে আমার মগজের গহীনে
কেন চেয়েছিলে?
বিষণ্ণতায় মগ্ন মেঘ হয়ে উড়ে উড়ে অতীত হতে।
মরণেই বুঝি সব আঁধার
ঘোঁচানো যায়!
অথচ জীবন বলে গেল
কানে কানে
মরণের পরে আরো বেশি
অন্ধকার
বন্ধ-পোড়া-ছাই হওয়া চোখে
নিস্তব্ধতাও হার মেনেছে
তোমাকে পোড়ানোর শোকে।
অতনু—
শুনতে পাচ্ছ?

ধূলোপড়া শহরে একলা মন

ধূলোপড়া হতশ্রী শহরে ঘাসেরা নেই মৃত্তিকা আঁকড়ে
পালিয়ে বেঁচেছে অস্বিস্ত্বটুকু গুটিয়ে নিয়ে।
অনিচ্ছাকৃত ধূলোর ছদ্মবেশে ডালেদের আদরের রসে ঝুলে থাকে পাতারা
ঝরে যাওয়ার ভয়ে ঝিরিঝির বাতাসে,
হাপিত্যিস করে চাতকের মত
ফোটাফোটা বৃষ্টির জল ধুয়ে দেবে পাতাগুলোর প্রলেপ
ফিরতে চায় তারাও নিজের সবুজে,
অথচ বৃষ্টিহীন মেঘগুলো বাষ্প হয়ে উড়ে পালায় ধূলোর অত্যাচারে।
তীব্র রোদের ঝাঁজ
সেও তো
ভিড় করা ইমারতের আনাচে-কানাচে স্থবির
মনুষ্যত্ব ঝলসে খাওয়ার বাহানায়।
নিয়ন আলোকছ্বটায় লজ্জিত নক্ষত্রমন্ডল লুকায় অজানার খাঁজে,
শুন্যতায় খাঁ-খাঁ করে আকাশ
পিচঢালা পথের পিচ আর গলেনা বিগলিত অবহেলায়
বরং ভাঙে আর গুঁড়ো হয় টায়ারের চাপে
গল্প হাঁটে অভিমানী কাব্যের নাম খুঁজে পেতে।
‘মিতসুবিসি ল্যান্সার এভ্যুলেশন টেন’ এর স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ছুটে চলা ইচ্ছে থমকে থামে ট্রাফিক জ্যামের লাল রঙের খপ্পরে,
তীর্থের কাক চোখের দৃষ্টি আটকে থাকে সবুজ বাতির জ্বলে ওঠা দেখবে ভেবে।
ইটের পর ইট
সিমেন্ট-বালু-খোয়া-পাথর-পানির মশলায় শুকনো কংক্রিটের এই শহরে
কংক্রিট মন
কংক্রিট বেঁচে থাকা,
ধূলোপড়া এই শহরে ইদানিং ভীষণ একলা লাগে
ভীষণ একলা।

সোনা রৌদ্রের ঝিলিক 

নিলাম হওয়া দিন
ব্যস্ত শহরের অলিগলি ঘুরে অট্টালিকার জানালা খোঁজে
পালিয়ে যেতে সাঁঝে,
রৌদ্রের তাপে যেটুকু পোড়ে
সেতো
ফাঁকির কৌশলের ফাঁকফোঁকর ছেড়ে পিচঢালা পথের বেরিয়ে আসা
ভাঙাচোরা পাথরের ব্যথা।
অথচ সূর্য চেয়েছিল রৌদ্রস্নানে ভিজিয়ে লজ্জাহীনের লালিমা ফেরাতে,
ভিড় করা ইমারতের একচ্ছত্র আধিপত্যে বিষাদের চাওয়াও খারিজ হয় দোটানার অন্ধকারে।
অতঃপর,
বিপন্ন মনঝিরির জল খুঁজে পেতে মাছরাঙাদের সাথে গড়ে তোলা সখ্য হয় ভাবনার প্রতারক।
জাগতিক মন তবুও কি পিছু হটে
মনঝিরির বালুচরে সোনা রৌদ্রের ঝিলিক দেখবার প্রতিশ্রুতির গাঁট ছেড়ে?

গোপন শোক

দু’মুঠো বিকেলের গল্পে
আমার চোখে
প্রবাহমান নদী দেখেছিলে তুমি,
স্নান করবে বলে আয়োজন আড়ম্বরের ঘাটতিটুকু মেনে নিয়েই
ডাহুক ডাকা সন্ধ্যায় সন্ধ্যা মালতির রঙ মেখে নিশ্চুপ ডুবেছিলে
আমার চোখের নদীতে ডুব ডুব সাঁতারে।
জলের ভেতর জল তবুও অতল তলের জলকেলি,
মুগ্ধতার তৃপ্তিতে তোমার সন্ধ্যা বয়ে যেতে যেতে রাত ক্ষয়েছিল তারায় তারার ঘর্ষণে।
তারপর?
চুরি যায় বোধ নিশ্চুপতা হারানো
কোলাহলের হাপিত্যিস ভোরে অংশুমালীর চোখে।
তোমার ডুবে থাকার সকল সংকল্প খসে যায় অনাগত সমৃদ্ধির শিরস্ত্রাণে,
আমার চোখে তখন প্রবাহহীন নদীর খরা
ডুব ডুব সাঁতার যেনো অন্য কোন যুগের স্মৃতির শহরের ভাঙা দেয়ালের খাঁজে লুকানো গোপন শোক।

স্পর্শ থাক চিঠির ভাঁজে

ঝিরিঝিরি বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে গাছেদের ধূলো
সন্ধ্যা নেমেছে নিষাদের মত্ততায় বর্ষণের ঝুমঝুমিতে
ডাকছে কেউ!
চিঠি আছে, চিঠি।
ডাক হরকরা!
এই ভর সন্ধ্যার মুখরিত মৃদু বর্ষণে?
গতানুগতিক হলুদ খাম হাতে নিতেই বিস্ময়ের ঘোর লাগে চোখে!
হ্যাঁ, প্রাপকের ঘরে তো আমারই নাম লেখা
প্রেরক, অতনু
অতনু লিখেছে চিঠি!
তাও আবার আমাকে?
ত্রস্ত হাতে খাম ছিড়ি বড্ড নির্দয়ে
ভাঁজ করা এক টুকরো সাদা কাগজ শুধুই কাগুজে গন্ধ নিয়ে মুক্তির স্বাদ পেলো যেন,
অথচ ভাঁজ খুলতে ইচ্ছে করছে না আমার মোটেও
ভাঁজ করা কাগজ হাতে বিহব্বল চিত্তে মুগ্ধতা নিয়ে ভাবছি
অতনু, চিঠি লিখেছে আমায়!
কত-কত-হাজার-হাজার-দিন পর
চিঠি লেখার অভ্যাস এখনও অতনুর আছে তাহলে
যদিও আমাকে মনে করার দায় তো নেই।
তবে কেন?
এত হাজার দিন পরে আমার জন্য চিঠি
খুলব কি চিঠির ভাঁজ?
যদি চিঠির ভাঁজের পরত ভেঙে হারিয়ে যায় বেদনার প্রগাঢ় রঙ মিশ্রিত এক মুঠো ভালোলাগার অনুভূতি,
যদি লেখা থাকে সেই শেষ লেখা চিঠির মতো
অনিন্দিতা, তুমি চলে যাও আমার জীবন থেকে।
না, তা কেন হবে?
অতনুর জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছি আমি নামের অনিন্দিতা সেই কবেই
তবে কি লেখা আছে
পৃথিবী ছেড়ে চলে যাও অনিন্দিতা।
আমি বেঁচে আছি সেটাই তো বড্ড দূর্বলতা অতনুর
আমার স্পর্শের বাইরে বেঁচে থাকা যায় দিব্যি
অথচ আমার অস্তিত্ব মেনে নেয়া যায় না বুঝি!
দূর ছাই!
কি সব ভাবছি
কত-কত- হাজার-হাজার- দিন পর
অতনুর লেখা চিঠি,
অতনুর স্পর্শ এসেছে আমার কাছে সন্ধ্যা বেলার আঁধারিয়া প্রেমের হারানো সুরের বেহাগ হয়ে,
এও তো কম নয়!
থাক বরং রেখে দিই স্পর্শের শিহরিত স্পন্দনে ভাঁজটুকু ভাঁজেই কাগুজে গন্ধের আলিঙ্গনে।

ইসরাত জাহান। কবি। জন্ম বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী। বর্তমান নিবাস ঢাকায়। তেরোবছর বয়স থেকে লেখালিখি শুরু। লেখা শুরু করেছিলেন দৈনিক বাংলার বাণীর মাধ্যমে। তারপর দৈনিক আজকের কাগজে নিয়মিত লেখালিখিতে ছিলেন। এরপর হঠাৎ করে বারোবছর লেখালিখি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন। প্রকাশিত বই: 'তোমার...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..