গ্রহণের আলো

তৌহীদা ইয়াকুব
গল্প, নারী
Bengali
গ্রহণের আলো

আজ পঞ্চাশতম জন্মদিন সায়মা মাহমুদের।

নরম মিষ্টি রোদ আর এই ঝিরি ঝিরি বাতাস এক পবিত্র আঁচলে জড়িয়ে রাখে প্রতিটা সকাল বেলা। পঞ্চাশ বছরের এই যাপন একই সাথে অসম এক বিন্দু মুঠোয় নিয়ে বয়ে গেছে। সায়মা মাহমুদ কত কত দিবস পেরিয়ে আজ এখানে এক হাসপাতালের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। একটা বেসরকারি ব্যাংকে উচ্চ পদের জব। মাস শেষে মোটা বেতন। এ সব কিছুই কোন মানে রাখেনি এই সংসারের প্রকৃত উৎসের কাছে। প্রতিটা দিন এসেছে সায়মার কাছে কাজ নিয়ে প্রয়োজন নিয়ে। ঘরে বাইরে। প্রতিদিন বের হওয়ার সময় ফিরে আসার তাগিদ নিয়েই গেছে। যদিও প্রতিদিন ফিরেছে নিজের মত করে, কেউ খেয়াল করেনি, কারো কোন রকম অপেক্ষাও ছিল না কোন দিন। তবুও তার এই অতি প্রিয় আপন গৃহকোণ।

স্বামী মাহমুদ চৌধুরী, ব্যবসার কাজ, পার্টি, বন্ধ্‌ আড্ডা আর তার বাব -দাদার রেখে যাওয়া ঐশ্বর্য নিয়েই থেকেছে। কখনো সায়মাকে তার পাশের যোগ্য জায়গাটা দেয় নি। এই না দেয়ার কারণ বুঝার মত কোন বোধ যুক্তি কিছুই কখনো খুঁজে পায় নি, এখন এসব সায়মাকে আর ভাবায় না। সায়মা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ছকে বাঁধা হয়ে গেছে তার জীবন।

মাহমুদ চৌধুরী হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। আজই তাকে ইনসেন্টিভ কেয়ার থেকে এখানে ট্র্যান্সফার করেছে। সে এখন বিপদ মুক্ত। হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে। রিং পড়ানো হয়েছে। শরীর খুব দুর্বল। সায়মা অফিস ছুটি নিয়ে আজ ১৫ দিন এক টানা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। লম্বা সুদেহী মানুষটাকে কোন দিন এভাবে শুয়ে থাকতে দেখেনি। সারাদিন কাজ নিয়ে অবিরাম তার দৌড়ে চলা। বিজনেস ছেলে মেয়ে সব দিকে তার নজর। সায়মার প্রতি অবহেলাটুকু আলাদা করে দিলে এই মানুষটাকে ভালবাসার অনেক অংক মিলে যায়। সারাজীবন সায়মা এই ভেবে গেছে তার কি কোন অতীত আছে যা সায়মাকে ওর প্রাপ্য পুরোটুকু দিতে পারে না। এটা হয়তো অপারগতা, অনিচ্ছা নয়। কিন্তু তারো কোন হদিস খুঁজে পায়নি। হাসপাতালের এই কয়টা দিন ওর দেখার চোখ বদলে গেছে। সায়মার শুশ্রূষার হাত, তার ক্লান্তি শুয়ে শুয়ে মানুষটা যেন বারবার ছুঁয়ে দিতে চাইছে। এক একবার এমন ভাবনাগুলো পেয়ে বসেছে সায়মাকে। ভাবতে ভাল লেগেছে। তারপর আবার অভ্যস্ত জীবনে ফিরে এসেছে। না তার কোন চাওয়া নেই। বরাবরের মতই সায়মা তার কর্তব্য করে যাবে। নার্স এর কাজগুলোও সে নিজ হাতে করছে। এ যেন শেষ চেস্টা তার কিংবা এ যেন করে যাওয়া শর্তহীন, পরিণামহীন। জীবনের এই শেষ বেলাতে অন্য ভাবে কিছু ভাবার বা বদলে দেয়ার কোন অভিপ্রায়, বদলে যাওয়ার অপেক্ষা সব ফুরিয়ে গেছে। নিজের সাথেই কথা বলে গেছে সারা জীবন কিংবা নিরবতা তাকে অনেক বেশী গভীর জীবন ভেবে যেতে সুযোগ করে দিয়েছে।

মাহমুদ চৌধুরী, বড় ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে অঢেল ঐশ্বর্য নিয়েই জন্মেছিলেন। দেশের বাড়ির মধ্যবিত্ত, অভিজাত বংশের সুন্দরী মেয়ে সায়মার সাথে খুব শখ করে বাবা মায়ের পছন্দে বিয়ে হয়েছিল তিরিশ বছর আগে।

ওদের দুই ছেলে এক মেয়ে। ছেলে মেয়েরা বাবা ঘেঁষা হয়েছে খুব। মা হিসেবে ওদের উপযুক্ত হয়ে উঠা হয়নি সায়মার। ওদের বাবার কাছে যেমন অনাধুনিক গ্রাম্য মানসিকতায়, অনগ্রসর ভ্যালুজ নিয়ে সায়মা মাহমুদ অযোগ্য একজন স্ত্রী তেমনি ওদের মা। বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই ওদের বাবা বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের মা কিছু জানে না। তাদের মার শুধু পুথিগত বিদ্যা আছে ইহ জগতের কোন ধ্যান ধারনা নেই। এমন কি বাচ্চাদের কে সায়মা মাহমুদের বাবার পরিবার থেকেও দূরে রেখেছে সব সময়।

মাহমুদ চৌধুরীর কাছে সায়মা যেন শুধুই প্রয়োজন শুধুই সামাজিক একটা স্ট্যাটাস। সায়মার জীবনে চাকুরী আর সংসার ছাড়া অন্য কিছু অবশিষ্ঠ থাকে নি। থাকতে দেয় নি মাহমুদ চৌধুরী।বিয়ের পর ওর বান্ধবীদের বাসায় আত্মীয় স্বজনদের বাসায় দাওয়াতে গিয়ে ফিরে এসে নানা কথা শুনতে হয়েছে। কখনো আত্মীয় স্বজনদের আপ্যায়ন ভাল লাগেনি তো কখনো তাদের সাথে সায়মার ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলা ভাল লাগে নি। সায়মার বান্ধবীদের কার বর কি ভাবে সায়মার দিকে তাকালো তার নানা কু – ইঙ্গিত করেছে এমন ভাবে যে সায়মা নিজ থেকেই আর ওমুখো হতে চায়নি। এসব প্রথম প্রথম শুনে অবাক হয়ে গিয়েছে।তীব্র প্রতিবাদ করতে চেয়েছে কিন্তু করতে পারে নি কখনো।তাছাড়া বিয়ের পর সব কিছু বুঝে উঠতেও সময় লাগে। তাই সায়মা ভেবেছে সময়ের সাথে সাথে মাহমুদ বুঝে যাবে এই সম্পর্কগুলো।হয়তো ওর ভাবনাগুলো পাল্টাবে। তারপর ভেবেছে, স্বামী সংসার তার জন্য সবচেয়ে বেশী জরুরি অন্য সব কিছু নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। কিন্তু দিন গেলেও মাহমুদ বদলায় নি। এভাবে সায়মা দি্নে দিনে একা হয়ে গেছে। তেমন কোন শখ বা ইচ্ছে কোনদিনই ছিল না। মাসে একটা মঞ্চ নাটক স্বামী আর বন্ধুদের সাথে কিছু সময় আড্ডা এছাড়া ওর অন্য কোন শখ বা চাওয়া ছিল না। বিয়ের পর একটু আধটু সাজ গোজ করে বের হতে গেলে শুনতে হয়েছে ‘তোমাকে তো পাত্রী দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি না’। আর এই কথা গুলো কখনো আড়ালে বলেনি, বাসার অন্য সবার সামনেই বলেছে। এতটুকু সম্মান রেখে কথা বলার কথাও সে ভাবেনি। সেই থেকে হালকা সাজ গোজে অভ্যেস হয়ে গেছে ওর। এমন কি এক সময় নিজের উপর কনফিডেন্ট হারিয়ে ফেলেছিল। সংসারের ছোট খাটো সব নিয়েই মাহমুদ কথা বলতো। তার সব কাজেই ভুল ধরিয়ে দিত সায়মাকে। প্রথম প্রথম অভিমান করে থাকতো। তারপর সময়ের সাথে বুঝে ফেলেছে তার অভিমান দেখার কেউ নেই। সায়মার দম বন্ধ হয়ে আসতো। মনে হতো সে না থাকলেও এ সংসারে তেমন কিছু যায় আসবে না। বছরে দু একবার মা বাবার সাথে দেখা হলে মা বলতেন, ‘লেখা পড়া শিখে কেন বসে আছিস কেন কিছু করছিস না, জানি প্রয়োজন নেই, তবু নিজের জন্য কিছু একটা কর, দেখবি ভাল লাগবে।” মা বারবার বলতেন বলেই সায়মার এই চাকুরীতে আসা। এই চাকুরিটা না থাকলে হয়তো দমবন্ধ হয়ে মারা যেত অথবা অসুস্থ্য হয়ে যেতো সায়মা এতদিনে। ওই একটা জায়গায় ওকে কেউ কিছু বলার নেই। এই জায়গাটায় সে স্বাধীন নিজের মত। মাহমুদ চৌধুরী এমন এক চরিত্রের মানুষ যার আশেপাশের সবাই তার গুণমুগ্ধ। কোন বাজে অভ্যাস ছিল না কোনদিন। সে তার বিজনেস আর বন্ধু আড্ডা নিয়ে থেকেছে সারা জীবন। অন্য কোন নারী সঙ্গ সে চাইলেই পেতে পারতো কিন্তু তা সে কখনই করে নি। সেসব কাজ শেষে ঘরে ফিরেছে। নিয়মের বাইরে যায়নি কখনোই। সায়মাকেও সে ওভাবেই চেয়েছে, তার সব কিছুতে হাঁ বলে যাওয়া বিনীত আর আনুসারি। ধীরে ধীরে ছেলে মেয়ে বড় হয়েছে। বাবা হিসেবে মাহমুদ তাদেরকেও অনেক বেশী সময় দিয়েছে। টাকা পয়সা বাইরের জগত সব ওদের বাবার কাছেই ওরা অসঙ্কোচে শেয়ার করেছে। মাঝে মাঝে সায়মার নিজেকে খুব অসহায়, অদরকারী মনে হতো। সে যেন থেকেও নেই ওদের মাঝে। খুব কষ্ট পেতো যখন দেখতো ছেলেমেয়েরা সায়মাকে কখনই ওদের প্রয়োজন ওদের আনন্দ শেয়ার করছে না তখন সত্যি খারাপ লাগতো। ওরা অভ্যস্ত ছিল ওদের বাবাকে ঘিরেই ওভাবে থাকাতে। ওদের কাছে মায়ের ভুমিকা আসা যাওয়ার সময় শুধু বলে যাওয়া।সায়মা সবসময়ই মুলত এক মূল্যহীন বিদ্যমানতা।

আজ সায়মাকে একবার অফিস যেতে হবে। তার ছুটি শেষ হয়ে গেছে আবার একটা ছুটির এপ্লিকেশন জমা দিতে হবে। তবে আজকে তাকে কাজে জয়েন করে তারপর আপ্লিকেশন জমা দিতে হবে। অফিস এ আগেই কথা বলে রেখেছে সায়মা। ও যখন বের হয়েছে মাহমুদ তখনও ঘুমুচ্ছিলো। তাকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ দেয়া হয় বলে দেরিতে ঘুম ভাঙে। নার্সদের বলে এসেছে তাছাড়া ছেলে মেয়েদেরও বলে রেখেছে।

সকাল দশ টায় অফিস এ পৌঁছে বসের সাথে কথা বলে এ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে কিছু জরুরি কাজ শেষ করতে করতে বিকেল হয়ে গেছে। এর মধ্যে সে দু”বার হাসপাতালের রেসিপশনে ফোন করে নার্সের সাথে কথা বলেছে। অফিস থেকে বের হতে হতে বিকেল চারটা বেজে গেছে। এরপর রাস্তার জ্যাম ঠেলে হাসপাতালে পৌছাতে সন্ধ্যা সাতটা। পৌঁছেই মাহমুদের রুম এর সামনে নার্স এর সাথে দেখা। নার্স জানালো মাহমুদ ওর জন্য অপেক্ষা করেছিল এতক্ষণ, টেনশন করছিল, তাই তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালের রুম এ ঢুকে দেখে বড় একটা ফুলের তোড়া সাথে চিরকুট পাশে রেখে ঘুমুচ্ছে মাহমুদ চৌধুরী। চিরকুটে লেখা – শুভ জন্মদিন আমার সায়মাকে।

আজ তিরিশ বছরের সংসার জীবনে এই প্রথম প্রকৃত অর্থে সে শুভাশিস পেলো মানুষটার কাছ থেকে। চোখ দুটো আদ্র হয়ে উঠেছে। মাহমুদের ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে সায়মা মনে মনে বলল আজই প্রথম তুমি খুব বেশী করে যেন জেগে আছো।

তৌহীদা ইয়াকুব। কবি। জন্ম- ১৫ই মে ১৯৬৯। বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ভুঞাপুর উপজেলায়। বাবা ইয়াকুব আলি তালুকদার, সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা ছিলেন গৃহিনী। চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি ৩য়। ছোট বেলা থেকেই লিখছেন। তবে প্রকাশে একেবারেই অনিচ্ছুক সবসময়। ফেসবুকে নিজের স্ট্যাটাস এ...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..