গ্রহণের কাল

মঈনুল হাসান
গল্প, পডকাস্ট
Bengali
গ্রহণের কাল

ঝাপসা চোখে দূরে তাকিয়ে কিছু একটা ঠাওর করার চেষ্টা করে হেকমত। হাতের তালু দিয়ে আড়াল করলেও রোদের প্রখর তেজে ভাবলেশহীন চোখ দুটো আরও সরু হয়ে আসে তার। চিন্তাগ্রস্ত মুখ কেমন রক্তশূন্য, পাণ্ডুর। পোড়াটে-কালো ঘামেভেজা সে মুখমণ্ডলের গায়ে কপালের ভাঁজগুলো গভীর থেকে গভীরতর হয় শুধু। সহায় সম্বলহীন সংসারের ঘানি টেনে টেনে হেকমতের শীর্ণকায় শরীরের মাঝে সে ভাঁজগুলোই আজ প্রকট হয়ে থাকে। মাথার উশকো খুশকো চুলগুলো পাকা তোষাপাটের মতো লালচে-সাদা রংয়ের উজ্জ্বল। গালভাঙা থুতনির নিচে ফিনফিনে কয়েকটা দাড়ি তিরতির করে হাওয়ায় কাঁপছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও জীবনের কাছে হার মানতে মোটেই রাজী নয় সে।

এই গল্পটির অডিও শুনুন এইখানে-

প্রকৃতির খামখেয়ালি আচরণে বুকের ভেতরকার শূন্যতা অতলে গিয়ে ঠেকে তার। ভাবনার জগতে সারাক্ষণ খেলে যায় বিদ্যুৎ চমকের মতো কঠিন এক অশনির উন্মাদনা। যেন তরবারি উঁচিয়ে কেটে ফালা ফালা করে দিতে চাইছে তার শান্ত সুস্থির মন। এমনিতেই কয়েকদিন ধরে শঙ্খিনীর পাড় ভাঙার শব্দ তার শরীরের রক্ত জমাট হিম করে দিয়ে একটু একটু করে অবশ করে দিচ্ছিল মনের সাহসটাকে। কারণ, সুদূরে কান পাতলে আগ্রাসী জলরাশির তাণ্ডব নৃত্যের ঝুমঝুম বাজনা ছাড়া আর যে কিছুই শোনা যায় না।

কার্তিকের এ সময়ে নদীটা হঠাৎ এমন বুভুক্ষু হয়ে উঠল কেন? কীসের অমন রাক্ষুসে ক্ষুধা তার? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে হেকমত। কিন্তু, শূন্য মাথা খালি ভোঁ ভোঁ করে, কিছুই বুঝে আসে না। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর যে কোনো ক্ষমতাই নেই তার। জীবনের শেষ বেলায় দাঁড়িয়ে আবারও ভিটামাটি হারানোর ভয় তাকে গ্রাস করে নেয় প্রবলভাবে। নিশ্চল চিন্তাগুলো কুড়ে কুড়ে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে তার সমগ্র দেহে, মনের জীর্ণ জমিনে।

শঙ্খিনীর ফেনিল তরঙ্গের যুদ্ধংদেহী থাবায় নিজেদের স্বেচ্ছায় গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে ধূসর মৃত্তিকার দুর্বল যোদ্ধাগণ। প্রতিপক্ষকে বশ মানাতে পারেনি, তাই পালিয়ে বেঁচে থাকার সর্বব্যাপী চেষ্টা। আগাম সতর্কতার প্রস্তুতি হিসেবে শেকড় ছড়ানো পরিবারগুলোর প্রায় অনেকেই ধীরে ধীরে সরে পড়েছে যে যার মতো।

মাত্র দুদিন আগে পুব পাশের ভিটার মোক্তার ও সকিনার ঘর ঝুপ করে বিলীন হয়ে গেল নদীর বুকে। নদীটা যে শঙ্খিনী। সে তো প্রমত্ত হয়ে ছোবল হানবেই। নদীটার এ ভয়াল রূপ হেকমত আগে দেখেছে কিনা ঠিক মনে করতে পারে না। কালকেউটের ফণার মতো উদ্দাম জলস্রোত যেভাবে ঘূর্ণি তুলে ফুঁসে ফুঁসে ধেয়ে আসছে তাতে যে কোনো সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে হেকমতসহ সকলের শেষ এক চিলতে মাটির রেখা।

হেকমত এদিক ওদিক তাকিয়ে মোহাচ্ছন্নের মতো বাস্তুহারা মানুষগুলোর ভিটা ছাড়ার শেষ প্রস্তুতি দেখে। শেকড় উপড়ে যাওয়া মানুষগুলোর জীবনযুদ্ধের এ প্রস্তুতি তাকে দহন করে যায় তীব্রভাবে। প্রকৃতির পয়গাম এসেছে ধ্বংসের। আর সকল ধ্বংস শেষেই তো সৃষ্টির সূচনা হয়। সকল শঙ্কা মুছে ফেলে হয়তো ছিন্নমূল এ পরিবারগুলো আবার উঠে দাঁড়াবে নতুন করে নতুন কোনো ঠিকানায়। এমনই সুখের আশায় বিভোর হতে চায় সে।

আমিনার কবরের দিকে তাকিয়ে হেকমতের শূন্য দৃষ্টি বার বার হোঁচট খায়। বুকের কাছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা বেদনার নীলস্রোত কেমন দলা পাকিয়ে উথলে ওঠে। বুকের চিনচিনে ব্যথা তখন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে উঠে আকাশ ছুঁতে চায় নির্দ্বিধায়।

আমিনার ভাঙা কবরখানা থাকবে তো? এই প্রশ্ন করার জন্য দবির-কবিরকে তার চোখ দুটো অনবরত খুঁজে বেড়ালেও তাদের ছায়াও দেখা যায় না কোথাও। ওদিকে ধীমান আর জয়দীপ ঘরের খুঁটি হতে টিনের চালা আলগা করে মাটিতে নামিয়ে রাখছে থমথমে মুখে। নিরাপদে মালামাল গুছিয়ে রাখার তোড়জোড় দেখতে পেয়ে হেকমতের একটুখানি হুঁশ হয় এবার। কাঠের মূর্তির মতো নিশ্চল পা দুটোতে সহসা প্রাণ ফিরে আসে।

ঘরভাঙা অসহায় পরিবারগুলোর অজস্র মুখ কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবে সেই ভাবনায় হেকমতের চোখে এমনিতেই ক’দিন ধরে ঘুম ছিল না। বুকের গভীরে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত জীবনের ছন্দহীন ঢেউ আছড়ে পড়লেও কোথায় যেন একটুখানি আশার আলো মিটমিট করে জ্বলছিল। সবকিছুর মধ্যেও তার একমাত্র ভরসা ছিল দুই ছেলে দবির ও কবিরকে নিয়ে; যারা ছিল তার বেঁচে থাকার সন্ধ্যা প্রদীপের মতো। এ কারণে বুকের খাঁচায় নিরাশার দোলাচল দুলে উঠলেও মনের অজানা কোণে মাঝে মাঝেই সুখের চর জেগে উঠত তার। বেঁচে থাকার স্বপ্ন-সাধ-আশা সেখানে নোঙর ফেলে যেত অবচেতনে।

হেকমতের মনে পড়ে, বহু বছর আগে একবার মাথা গোঁজার ঠিকানা হারিয়ে নিঃশেষ হয়েছিল সে। তবে নদীর ভাঙনে নয়, বরং হাসমত মৃধার মতো কুচক্রী লোকের অন্যায় জবরদখলের কারণে। তার বেঁচে থাকার রক্ত শুষে নিঃসাড় করেছিল তারা। আজ সে দিনগুলোর কথা মনে হলে বুকে অশনিপাতের ধ্বনি শুনতে পায় ক্রমাগত।

আমিনার ছায়া বুকে নিয়ে এ এক টুকরো জমি তার জীবনের শেষ সম্বল। যত্নে আগলে রাখা আমিনার শেষ ঠিকানাটুকুও যদি এবার হারিয়ে যায় সে হয়ে পড়বে একেবারে নিঃস্ব। কারণ, নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে তার বুকের পাঁজরভাঙা কষ্টের মতো। সর্বগ্রাসী নদীর মরণ ছোবলে আজ যদি সব হারিয়ে যায় তবে ভাসমান ভূমিহীন হয়ে সে পড়ে রইবে চিরদিন। প্রকৃতির আগ্রাসী মরণ থাবা সে কীভাবে প্রতিহত করবে? সর্বস্বখোয়ানো একজন মানুষ পারবে কি জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে? হেকমত ভালো করেই জানে, প্রকৃতি ও মানুষের আজন্ম দ্বৈরথে মানুষই বরাবর হেরেছে চিরকাল।

চিত্র: রিয়া দাস

 

দুই.

হেকমত মুন্সি একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম মুখর উত্তাল দিনগুলোতে সে ছিল সেই সূর্যদিনের গেরিলা। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছিল মোটামুটি অক্ষত শরীর নিয়ে। তবে নারায়ণপুর থেকে জেলা সদরের বড় রাস্তায় ওঠার লোহার ব্রীজ উড়াতে গিয়ে গ্রেনেডের আওয়াজে কানের পর্দা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছিল তার। এখন আর তাই ঠিক আগের মতো শুনতে পায় না সে। লোহার ব্রীজ পার হয়ে ধনাইতরী বাজারের নবতরঙ্গ ক্লাবঘরে ছিল খানসেনাদের ঘাঁটি। স্মৃতিবহুল সেই খণ্ডযুদ্ধে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হলেও জীবনের তরে হারিয়েছিল বাল্যবন্ধু ইলিয়াসকে। বোরহানের ডান হাত আর বাকী সহযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ তার এই বেঁচে থাকা।

বেদনাকাতর দিনগুলোর কথা মনে পড়লে হেকমতের মন আর্দ্র হয়ে ওঠে। সবাই অনেক কিছু বিলিয়ে দিলেও অনেকে সবকিছুই বিসর্জন দিয়েছিল সে যুদ্ধে। নিঃস্বার্থ প্রাণ বলিদান বা অপূরণীয় সে ক্ষতির বিনিময়ে সবাই পেয়েছিল নারায়ণপুরের স্বাধীন নরম মাটি। দেশ স্বাধীন হবার আরও অনেক পরে হেকমতও তার প্রতিদান পেয়েছিল কিছু কিছু।

মুকুল কমাণ্ডারের দস্তখত করা একখানা কাগজ কে যেন তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল; ‘যত্ন করে রাখ, পরে কাজে লাগবে’। কাগজখানা ছিল তার সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রমাণপত্র। এছাড়া সীমানার ওপারে ক্যাম্পে কঠোর প্রশিক্ষণের সময়ে তার ক্যাম্প ইন চার্জের দেয়া সনদটিও সে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল। সুযোগ বুঝে অনেকে আবার নাকি গাঁয়ে বসেই এদিক ওদিক ঘুরে আদায় করে নিয়েছিল এসব সনদ; এমন কথাও মাঝে মাঝে লোকমুখে শোনা যায়। হেকমত মুন্সি কানে তেমন শুনতে পায় না বলে রক্ষা; নইলে ধুন্দুমার কাণ্ড বেঁধে যেত যখন তখন।

একজন বীর যোদ্ধার শেষ সম্বল ও সম্মানের চিহ্ন হিসেবে এই সনদগুলোই তার কাছে সবকিছু। এগুলোই তার মর্যাদার প্রমাণক, জীবনের অমূল্য ধন। নারায়ণপুর গাঁয়ের মাটিকে ঘিরে হেকমতের প্রাণ হলেও দুই ছেলেকে নিয়ে তার আশার ঘুড়ি আকাশ ছুঁতে পারেনি। ছেলেদের ঠিকমতো মানুষ করতে না পারার আক্ষেপটা আজও বুকের গভীরে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে সে। বোধ বিবেচনাহীন সংসারে দুই ছেলে দবির ও কবির অক্ষর জ্ঞানহীন থেকে বেঁচে রইল অকাট মূর্খের মতো। আজকাল পুত্র-পোষ্যদের চাকরিসহ নানা সুযোগে কাজে লাগানো যায় ওই সার্টিফিকেটগুলো। অথচ, নিজের কীর্তি প্রমাণক চিহ্ন বাক্সবন্দি হয়ে রয়েই গেল চিরকাল। সেই আফসোসও থেকে গেল তার সারা জীবন ধরে।

লাল রঙের একখানা নকশি টিনের বাক্সে সযতনে রেখে দেয়া আছে হেকমতের সার্টিফিকেটগুলো। মাঝে মাঝে সেগুলো সে বের করে সাফসুতরা করে শুধু উলটে পালটে দেখে। ধুলোজমা মলিন ম্যাড়মেড়ে কাগজের গায়ে কালির অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু, চোখের তারায় আজও স্পষ্ট জ্বলজ্বল করতে থাকে তার বীরত্বের স্মৃতিগুলো। সেই কাহিনীও ক্ষয়ে যাচ্ছে নীরবে-নিভৃতে; অজস্র মিথ্যার সাথে অবিরাম যুদ্ধ করে। জং ধরা বাক্সের মরচে খসা লাল রঙে তার এ কাগজগুলো কেমন জানি মলিন হয়ে পড়ছে। তারপরও ভাঙা বাক্সখানা তার অন্যরকম এক সম্পদ।

হেকমত কাকা, তুমি এইখানে একা বইসা কী কর? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ধীমান তার পেছনে দাঁড়িয়ে।

কিছু করি না বাজান। কিছু করার কি সত্যই সাধ্য আছে আমাগো? এক এক কইরা সব গিলছে নদীটা। কানে কম শুনি বইলা হয় তো নদীটার গর্জন শুনি না। কিন্তু, বুকের মইধ্যে সারাক্ষণ হাঁপরের মতো সেই গর্জন হয়রে বাজান।

তোমার অত চিন্তা কীসের কাকা? তুমি দ্যাশের লাগি যুদ্ধ করছ। পুরাটাই তোমার দ্যাশ। তোমার মাথা গোঁজার ঠাঁই লইয়া কোনো ভাবনা নাই। কিন্তু, আমাগো কী হইব?

ঘটনা মিথ্যা নয় বটে। যুদ্ধের সে দিনগুলোর কথা আজও খুব মনে পড়ে তার। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে একদিন রাতে ভাত বেড়ে দিয়ে নিচুস্বরে আমিনা বলে, আপনি কি সত্যই যুদ্ধে যাইবেন? চাইরদিকে কী যে শুরু হইছে।

এইরকম সময়ে কি ঘরে বইসা থাকন যায় বউ?

আমার যদি ভালোমন্দ কিছু একটা হইয়া যায়! শরীলডা তো বেশি ভালা না।

তার থিকা দ্যাশটার কথা একবার ভাবো। দ্যাশটার যদি কিছু একটা হইয়া যায়!

আপনি যেইটা ভালো বুঝেন। আমি বাধা দিমু না।

হেকমত সে কথায় নিরুত্তর থাকে। তার মগজে যুদ্ধের ছক কাটাকুটি খেলে যায়। রক্তে জ্বলে ওঠে বারুদ। অদম্য এক জয়ের নেশায় আমিনার এসব কথা তাই বড় দুর্বোধ্য ও অর্থহীন মনে হয় তার কাছে। আমিনার এ অপ্রাসঙ্গিক কথায় তার কোনো ভাবান্তর হয় না। যুদ্ধে যাওয়ার স্থির সিদ্ধান্তে অটল থাকে সে। আর কোনো কথা হয় না দুজনের মধ্যে।

যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার মুহূর্তেই হেকমতের পাশের বাড়ির হাসমত মৃধা যেদিন বুক ফুলিয়ে বদর বাহিনীর কমাণ্ডার হলো আশপাশে জানান দিয়ে; তার কয়েকদিন বাদে পোয়াতি আমিনাকে রেখে হেকমত হঠাৎ গায়েব হয়ে যায় ওপারে। আর অনিশ্চিত এক জীবনকে সঙ্গী করে হেকমতের পিতৃপুরুষের ভিটায় মুখ বুঁজে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে আমিনা স্বামীর ফেরার আশায়।

তিন.

হেকমতের দৃঢ়চেতা চোখের দিকে তাকিয়ে আমিনা সেদিন যে আগুন দেখেছিল, তারপরে আর বাধা দেয়ার সাহস করেনি সে। তবে তার অবচেতন মন ভেতরে ভেতরে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য হেকমতকে তাড়না আর সাহস যুগিয়ে যাচ্ছিল প্রচণ্ডভাবে। তাই নিজের অসহায়ত্বকে গোপন করে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে হেকমতের চোখের আগুন থেকে সে নিজের জন্য একটু সাহস আর আলো খুঁজে নিয়েছিল অসংকোচ সঙ্গোপনে। নিজের ও অনাগত সন্তানের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ভবিতব্য কোনো আনন্দের আভাস খুঁজে নিয়েছিল প্রাণপণে সেদিন। আমিনার অনিশ্চিত জীবনবোধের এ দৃঢ় প্রত্যয় দেখে হেকমতও নিরুদ্দেশ হয়ে যায় কাউকে কিছু না বলে।

মুক্তিযোদ্ধা হেকমত মুন্সির বাড়ি ঘেঁষে ছিল বদর কমাণ্ডার হাসমত মৃধার ঘর। পাশাপাশি বাড়ি হয়তো নামের সাদৃশ্যের কারণে যুদ্ধের সময়ে ভীষণ বিপাকেও পড়েছিল কেউ কেউ। যুদ্ধ শুরু হবার মাসখানেক পরে ডুগডুগি বাজার থেকে মুক্তিবাহিনীর একটা দল রাতে আশ্রয় নেয়ার জন্য এসেছিল হেকমতের বাড়িতে। কিন্তু, ভুল করে তারা হাসমত মৃধার উঠানে পা দিলে দালালদের ষড়যন্ত্র টের পায়। এই ঘটনায় সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও মৃধার খপ্পরে আটকা পড়ে যায় জয়রাজ আর পল্টু। দুজনের বাড়িই নারায়ণপুর ছাড়িয়ে প্রায় সাত মাইল দূরে একেবারে শঙ্খিনীর ভাটির কাছের আমোদপুর গ্রামে। পরে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

যুদ্ধের শেষের দিকে আমিনাকে পাক সেনারা ধরে নিয়ে যায় হাসমত মৃধার ইশারায়। আমিনার সঙ্গীন অবস্থার কথা ভেবে তার সামনেই উপর্যুপরি অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে গিয়েছিল বাকীদের। সংজ্ঞাহীন অচেতন অবস্থায় তাকে পড়ে থাকতে দেখে সেই হিংস্র্র নরপশুরা কেন যে তার প্রতি একটুখানি সদয় হয়েছিল তা কেবল তারাই জানে। অবশেষে তাকে ফেলে রেখে যায় মুন্সিবাড়ির কাছারি ঘরে। আর বিনিময়ে বাড়িখানাই দখল করে নেয় হাসমত মৃধা।

শঙ্খিনীর ভাটি থেকে উজানের দিকে নদী বরাবর বেশ লম্বা দীঘল একটি গ্রাম নারায়ণপুর। তীরের নদীবর্তী বসতিতে আজ এত বছর শান্তিতে বসবাস করলেও সে নদীটাই আজ বেমালুম ভুলে গেল তাদের? বাকরুদ্ধ হেকমতের মাথায় একটি কথাই বার বার চরকির মতো ঘুরপাক খায়। যুদ্ধের পর বাপ-দাদার পুরানো সেই ভিটা হারিয়ে উজানের মাটিতে এসে আবার নতুন করে বসত গেড়েছিল সে। সংসারের কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে দুইখানা হাতের বদলে কর্মীর শক্ত সবল আরও চারখানা হাত যোগ হওয়ায় কিছুটা সাহসও ফিরে পেয়েছিল বুকে।

ধীমানের কথায় কান না দিয়ে হেকমত মুন্সি টগবগে ঘোড়ার মতো দাপিয়ে বেড়ানো জলের দিকে ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে থাকে। ঘরের ভেতর থেকে দবিরের বউ ফিরোজার হাঁকডাক ও মালপত্র গুছানোর খুটখাট আওয়াজ শুনতে পেয়ে সেদিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয় সে। নিস্তেজ কণ্ঠে তাকে একবার জিজ্ঞাসা করে, আমার লাল বাক্সখানা কইগো মা?

ওইটা তুইলা রাখছি বাজান।

যত্ন কইরা রাখো মা।

ঠিক আছে বাজান। আমি রাখছি যত্নে।

জং ধরা বাক্সটা হেকমতের দিকে এগিয়ে দিলে খুশিতে চকচক করে ওঠে তার চোখ। আবার জিজ্ঞাসা তার; এইটা কই ছিল মা? আমি কদ্দিন ধইরা পাগলের মতো খুঁজলাম। আমার কাছে দাও বাক্সখানা। কখন কী যে হয়! জানো মা, আমার জীবন বাক্সটার মধ্যে বান্ধা। আমি মুখ্যু মানুষ, অত কিছু বুঝি নাকি? তারপরও আমার দরকারি সব জিনিস, ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ আর কমাণ্ডারের সার্টিফিকেট সব ওইখানে গুছাইয়া রাখছি মা। কখন কী কাজে লাগে কওন যায়? ওইগুলান দেখলে রক্ত গরম হইয়া ওঠে ভিতরে ভিতরে।

বাজান, আপনার ছেলেরা তো কেউই কিছু হইল না। তাগোর তেমন অক্ষর জ্ঞান নাই। মানুষ না হইয়া মুনিষের মতো দিনান্ত খাটে। কী কাজে লাগব আমাগো এইসব? শুনছি আইজকাল চাকরি-বাকরির সময় নাকি এই সব দরকার লাগে।

ওইগুলান আমার জীবন। কিছু না হোক। আমি নষ্ট হইবার দিমু না। যদি একদিন কোনো কামে লাইগা যায় সেই অপেক্ষায় থাকলামরে মা।

কথা বাড়ায় না ফিরোজা। সাদা একটা কাপড়ে পেঁচিয়ে ছোট্ট টিনের বাক্সটা বৃদ্ধ শ্বশুরের হাতে তুলে দেয় সে। হেকমত অমূল্য গুপ্তধনের মতো সেটি বুকে আগলে ধরে রাখে কিছুক্ষণ। ফিরোজার কাছ থেকে সরে এসে ছলছল করে ওঠা চোখ আড়াল করে নেয়।

এক এক করে ভিটা খালি করে চলে যাচ্ছে নদী সংলগ্ন পরিবারগুলো। কেমন খাঁখাঁ করছে চারদিকে। আকাশ কোণে এরই মধ্যে ঝড়ের আভাস নিয়ে কালো মেঘের হামাগুড়ি দেখা যায়। মধ্যাহ্ন সূর্যের প্রখর তেজ চাপা পড়ে যায় নিমিষে। হঠাৎ পুব দিকের বেলালের বাড়ি ঝুপ করে নদী গর্ভে পড়ে গেলে ভীষণ এক শোরগোল ওঠে সেখানে। আতঙ্কিত সবাই এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকে; যেন কেয়ামতের আলামত চলছে। সবাই সতর্ক হয়ে অপেক্ষা করছে কখন ইসরাফিলের শিঙ্গায় ফুঁক পড়বে আর চারদিক লণ্ডভণ্ড হয়ে ভূলুণ্ঠিত হবে। চারদিকে যেন শুধুই ধ্বংসের ঘেরাটোপ। পৃথিবী নামক নিটোল নর্তকী সর্বস্বান্ত হওয়ার বাহানা খুঁজে প্রহর গুনছে কেবল।

প্রকৃতির খামখেয়ালির কাছে সবাই আজ অসহায়, স্থবির। নদী পাড়ের এই ভয়াল গর্জনের তাণ্ডব, জনমানুষের করুণ হাহাকার, দিগ্বিদিক ছোটাছুটি হেকমতের কর্ণকুহরে তেমন প্রবেশ করে না। নির্বাক ছবির মতো দৃষ্টি সীমানায় খেলা করে যায় সেইসব দৃশ্যপট। ঢিপ ঢিপ করা বুকে অনিশ্চয়তার দামামা বেজে ওঠে তার। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দুন্দুভি বেজে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে, চমকে চমকে।

চার.

আজকাল অন্যরকম এক যুদ্ধের নগ্ন পদধ্বনি শুনতে পায় হেকমত। নিজের উপর আস্থা হারিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করে, পারবে তো সে সাহসী সৈনিকের মতো আসন্ন যুদ্ধেও বিজয়ী হতে? নাকি মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী দিনগুলোর মতো মরণ ছোবল বসিয়ে সর্বাঙ্গে নীল বিষ ছড়িয়ে দেবে হাসমত মৃধার মতো হায়েনারা। হঠাৎ খাওয়া সে ছোবল ক্লান্ত করে দেবে তার দেহ-মন সর্বস্ব। আর প্রতিবাদহীন সরে যাওয়া নয়, নিজের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া নয়। এই ভাবনা তাকে অস্থির করে তুললেও সে একেবারে দমবার পাত্র নয়। কমজোরি শরীরের মাঝেও তেজী রক্তের বান ডেকে ওঠে মাঝে মাঝে। দাঁতে দাঁত ঘষে যখন ঘৃণা পিষে যায় তখনও মনের অজান্তে শীর্ণকায় হাতের আঙুল মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে।

যুদ্ধের বিভীষিকাময় সে বিপদশঙ্কুল দিনগুলোর কথা আজও ভীষণ মনে পড়ে যায় হেকমত মুন্সির। যুদ্ধের আগমনী সময়ে তার দিনযাপন শুরু হয়েছিল অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে। গুটি গুটি পায়ে অমানিশার ঘোর অন্ধকার ভর করেছিল তার চৌচালা ঘরে।

আমিনা ছিল তখন পাঁচ মাসের পোয়াতি। তার দেখাশুনার জন্য সাথে ছিল হেকমতেরই দূর সম্পর্কের এক বোন শরিফা। দুটি মাত্র প্রাণী ছিল মুন্সিবাড়ির গুমোট অন্ধকার ঘরে। এদিকে সুযোগ পেলেই হায়েনার রক্তলোলুপ দৃষ্টি তাদের খুঁজে ফিরত দিনের পর দিন। এক সময় পাশের হাসমত মৃধার বাড়িতে বদর বাহিনীর ক্যাম্প বসে। সেখানে দালালদের আনাগোনা বেড়ে গেলে শুরু হয় বাঁচার অন্যরকম এক যুদ্ধ। মুন্সিবাড়ির কাছারি ঘর দখল করে নিয়ে দেশবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে তারা।

একদিন প্রাণভয়ে নাকি সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে আমিনা ও শরিফা এক খণ্ড নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে চাইলে দুজনই পাক সেনাদের ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। আমিনা ও শরিফার উপর সেই নির্মম পাশবিক নির্যাতনের কথা মনে হলে এখনও হেকমতের শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায়, কাঁটা দিয়ে আসে শরীরে। উপর্যুপরি নির্যাতনের ধকল শেষে যুদ্ধের পর একদিন গলায় দড়ি দেয় শরিফা। আর নারায়ণপুর হাই ইশকুলের হেডমাস্টার মুন্সিবাড়ির কাছারি ঘর থেকে উদভ্রান্ত বোবা অবস্থায় উদ্ধার করে আমিনাকে।

দুঃসহ সে স্মৃতি দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হয় হেকমতকে। স্বাধীন দেশে ফিরে সে তার বাস্তুভিটা বা জমি কিছুই ফিরে পায়নি। সব দখল করে নিয়েছিল রাজাকার মৃধা। আমিনাকে গাঁয়ের সকলে মিলে নতুন ঘর তুলে দিলে সেখানেই নতুন জীবন শুরু করে হেকমত।

যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে জেনেছে জোড়া সন্তানের বাপ সে। আমিনার কোল জুড়ে পেয়েছে ফুটফুটে দুটা সন্তান। তারও অনেক পরে বছর না ঘুরতেই জেনেছে উত্তুঙ্গ জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল হাসমত মৃধার দখলকৃত তার শৈশবের সেই বসত। মনে মনে কিছুটা স্বস্তি পেলেও সুখ পায়নি মোটে।

আমিনা আর দুই ছেলেকে নিয়ে নতুন ভূখণ্ডে নতুন করে জীবন সাজিয়ে নেয় হেকমত। স্মৃতির মণিকোঠায় সযতনে সাজাতে শুরু করে হারিয়ে যাওয়া দিনের সুখানুভূতিগুলো। বুকের খাঁচা ভরে ফুরফুরে বাতাসের দম নেয় ইচ্ছামতো। কত যুগ কেটে গিয়েছে এই মাটি আঁকড়ে ধরে। কিন্তু, আজ এত বছর বাদে প্রকৃতির বিরূপ আচরণের কাছে খেয়ালবন্দি সে। নদীটা আবার কেন ছোবল মারার ছল খুঁজছে হেকমতের জীবনে? শঙ্খিনীর শত্রু-মিত্র খেলার ছলে পড়ে আবার কেন ভিটাহারা হবে সে? অনিশ্চয়তার থাবা তাকে আপাদমস্তক ডুবিয়ে রাখে দুশ্চিন্তার অতলে।

হেকমতের নাড়ি পোতা আছে যে গাঁয়ের মাটিতে সেই মাটির সাথে বেইমানি ভুলেও ভাবতে পারে না সে। কিন্তু, আজকাল বাতাসে কীসের যেন কথা ভেসে যায়। সে বাতাসের ঝাপটা তার কানেও এসে লাগে অকপটে। কানে যদি ঠিকমতো শুনতে পেতো তবে হয়তো আরও অনেক আগেই আঁচ করে নিতে পারতো ব্যাপারটা। দেরিতে হলেও অজানা আশঙ্কার কথা ভেবে ঘরের কোণে তাকিয়ে থাকে হেকমত; যেখানে খুব যত্ন করে ঢেকে রাখা আছে তার সেই পুরাতন টিনের বাক্সটা।

পাঁচ.

নদী ভাঙনে নিঃস্ব হেকমতের পুনর্জন্ম হয়েছে সরকারের দেয়া আশ্রয়নের চার দেয়ালের ঘরে। মুক্তিযোদ্ধা বলে কোনো কমতি নেই সেখানে। ভূমিহীন ও গৃহহীন হিসেবে তার ভাগ্যে যে আশ্রয় জোটে সেখানে সাহায্য হিসেবে ঘর তৈরির টিন আসে। আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি সকলের সহমর্মিতা ঘিরে থাকে তাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু, সেই সুখ বা স্বস্তির নাগাল না পেতেই একদিন অসতর্কতা বশে আগুনের লেলিহান শিখায় নিমিষেই ছাই হয়ে যায় সব। মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েও হঠাৎ অঘটনে সত্যিই দিশাহারা হয়ে যায় সে। তার উপর যখন দেখে তার সেই অমূল্য বাক্সখানা পুড়ে কয়লা তখন সত্যিই সে সম্বিৎ হারিয়ে মূর্ছা প্রায়।

হেকমত পরদিন হাজির হয়ে যায় ইউনিয়ন কমাণ্ডারের কাছে। দুই ছেলে সাথে থাকলেও তারা ঠিক এই বিপদের মর্ম বুঝতে পারে না। তারা হয়তো মনে মনে ভাবে, মাথা গোঁজার এক টুকরা আশ্রয়ের চাইতেও ওই বোবা কাগজগুলো কেন এত জরুরী হয়ে পড়ল তাদের পিতার কাছে?

মুকুল কমাণ্ডারের উঠান জনসমুদ্রে পরিণত তখন। কী উদ্দেশ্যে গ্রামবাসীর এই সচেতন অংশগ্রহণ তা সে আঁচ করতে পারে না। সেই জনারণ্যের মাঝে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি গায়ে আসরের মধ্যমণি হয়ে বসে থাকে মুখোশপরা অন্য এক হাসমত মৃধা। তাকে দেখে ঘৃণায় মুখ কুঁচকে আসে হেকমতের। কেউ কেউ বিনা কারণে সেখানে জড়ো হলেও কারও কারও মনে যে স্বার্থ হাসিলের ঈষৎ চিন্তা উঁকি দেয়নি এটা সে হলফ করেই বলতে পারে। কমাণ্ডারও যে আজকাল যুদ্ধ দিনের সাথীদের কল্যাণের চেয়ে নানাবিধ দেশ দরদী ভূমিকা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত এটাও তার অজানা নয়। তার কাছে বিস্তারিত জানানোর আগেই হাঁক ছাড়ে হাসমত মৃধা।

কেমুন আছ হেকমত? অনেকেই আইজকাল তোমার সম্পর্কে নানান কথা কয়।

কী কয় তারা?

তা তুমি ভালা কইরাই জানো।

হ, জানুমই তো। আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমি না জানলে কেডা জানবো?

তুমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলা কবে, হেকমত? সবাই তো কয় তুমি নাকি ভয়ে পলাইছিলা গেরাম থিক্যা।

কথার খোঁচায় থতমত খেয়ে আকাশ থেকে পড়ে হেকমত মুন্সি। তার চারপাশে মাকড়সার মতো বুনে যাওয়া অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের জাল আঁচ করতে পেরে শিহরিত হয় সে। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে উষ্মাভরে বলে, কী সব আজব কথা কও মৃধা? মুখের লাগাম টানো। তোমার কীর্তি বেবাকতেই জানে। কমাণ্ডার কই? আমি তার কাছেই আইছি। তারেই জিগাও।

তোমার কাছারি ঘরে রাজাকারের ক্যাম্প ছিল, এইডাও কি মিথ্যা? অত কথার কাম নাই। মুকুল কমাণ্ডাররে কইয়া দিছি হেকমত মুন্সির নাম কাটাও। হেকমত মুন্সি না হইয়া নামডা হইবো হাসমত মৃধা। আমি এদ্দিন চুপ ছিলাম। দশ গেরামে আমার একটা নামডাক আছে, সম্মানও আছে। মানী লোকের মান আল্লাহই রাখে। সরকারের সুযোগ সুবিধায় আমারো তো হক আছে? নাকি মিছা কইলাম মিয়ারা?

হেকমতের নিস্তব্ধ কানের কাছে হৈ হৈ রব ওঠে। অস্পষ্ট ভাবেই শুনতে পায় যেন; হ হ ঠিক ঠিক। মৃধা ভাই মানী লোক। যুদ্ধের সময় কত মাইনষেরে সাহায্যও করছে। হেকমতের মৌনতার সুযোগ নিয়ে ভিড়ের মধ্য থেকে বৃদ্ধ কে একজন যেন উচ্চস্বরে বলে, সত্য-মিথ্যা জানি না; তয় সে নাকি আমিনারেও ছাড়াইয়া আনছে শুনছি।

উঠানশুদ্ধ লোকের মাঝে হাসমত মৃধার জন্য প্রশংসার বয়ান শুনে মৃদু গুঞ্জন ওঠে। আর কাছিমের শক্ত খোলসের মধ্যে মুখ লুকিয়ে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকে হেকমত।

জনরবের সায় নিয়ে খানিক বাদে হাসমত মৃধা বলে ওঠে, তোমার আর সার্টিফিকেট লইয়া কাম নাই। সব সাহায্য সহযোগিতা পাইবা। ঘর তুইলা দিমুনে। যত টিন লাগে আমি দিমু। আমারও তো একটা দায়িত্ব আছে তোমার উপর।

হেকমতকে চমকে দিয়ে ভিড় থেকে দাঁড়িয়ে দবির বলে ওঠে, ওই কাগজগুলান দিয়া কী হইব? খাই খোরাকির একটা পাকা বন্দোবস্ত হওন দরকার। এইবার যুতমতো একটা সাব্যস্তও হওন চাই।

দবিরের এ বজ্রকণ্ঠের হুংকারে হেকমত মুন্সি একেবারে চুপসে যায়। বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে শুধু। চোখের গহ্বর গরম নোনা জলে উপচে ওঠে। জিভ আড়ষ্ট হয়ে মুখে কোনো কথা সরে না তার। মনে মনে ভাবে, তার পক্ষে কথা বলার একজন লোকও নাই? নিজের সন্তানও নয়? এদের জন্যই কি আমিনা নয় মাস ধরে নিজের সত্তা আর বাহিরের জগতের সাথে অনবরত সংগ্রাম চালিয়ে গেছে? এসব দেখে আমিনার আত্মা কি শান্তি পাবে সুদূর থেকে? জগৎ বড়ই অদ্ভুত ও স্বার্থপর মনে হয় তার কাছে।

জীবনের শেষ ছোবলে সারা মুখ নীল হয়ে ওঠে তার। এ কী শুনছে আজ সে? উঠানভর্তি স্বার্থপর মানুষের দলে তার নিজের সন্তান দবির কবিরও যে মিশে গিয়েছে! সেই জনরবে কি তাদেরও সোচ্চার কণ্ঠ ছিল? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করে সে। জীবন-জীবিকার টানাপড়েনে তারাও কি অগোচরে বিক্রি হয়ে গেছে মৃধার কাছে?

কয়েকদিন বাদে ক্ষমতাসীন দলের প্রচার সম্পাদক জনদরদী হাসমত মৃধা নিজেই নিজের প্রচারযুদ্ধে নেমে যায় কোমর বেঁধে। গাঁয়ের চোখ উলটানো মানুষগুলো নীরবে সায় দিয়ে যায় তাতে। সে যে একজন মুক্তিযোদ্ধা এতদিন ঘুণাক্ষরেও কেউ তা জানতে পারেনি। বরং দেশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের লম্বা ফিরিস্তি ছিল তার। কিন্তু, এখন ভাও বুঝে যে যার মতো উদ্দাম হাওয়া লাগিয়েছে পালে। ওদিকে নগদ কাঁচা পয়সা পকেটে ভরেছে মুকুল কমাণ্ডার, সাথে ভবিতব্য নানা ভাগ-বাটোয়ারার অলিখিত আশ্বাসও। তাই মুখে কুলুপ এঁটে মৃধার পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবী করে বসে; যুদ্ধের সময় তার কোনো ভুল ছিল না, সে আসলেই একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। এক সময় হেকমত মুন্সির কাছারি বাড়িতে দালাল-রাজাকারের ক্যাম্প বসলে যুদ্ধ শেষে মৃধাই বিতাড়িত করে সেইসব।

মুকুল কমাণ্ডারের তালিকা থেকে ছিনতাই হয়ে যায় হেকমতের নাম। গোপন আঁতাতের অসীম শক্তি ও লোভের তাড়নায় পাল্টে যায় একটা ইতিহাস। একটা জীবনের সাধ, আজন্ম লালিত একটা লাল সবুজের স্বপ্ন। ক্ষমতাসীন দলের অফিস থেকে প্রচার করে দেয়া হয় হাসমত মৃধা ইচ্ছা করেই তার প্রাপ্য সম্মান কোনোদিন বুঝে নেয়নি। সমাজের দর্পণে আরও আলোকিত হয়ে ওঠে তার কুৎসিত কদাকার মুখ। তাচ্ছিল্যভরা সে মুখ আবার জিজ্ঞাসা করে হেকমতকে, তুমি কী কারণে আসলা তাই তো জানলাম না।

মুকুল কমাণ্ডারের লগে কথা ছিল আমার।

তোমার ঘর পুড়নের খবর আমি আগেই শুনছি। শীত নামনের আগেই আমি সব ব্যবস্থা করুম। এইবার শীতের টান বেশি। তোমার কোনো অসুবিধা হইব না। সব দিয়া দিমু আমি। সামনে মুক্তিযোদ্ধার নাম বাছাইকালে তুমিও আমার নাম কইবা। খামাখা বিপদে পড়নের দরকার কী?

ছয়.

কার্তিক শেষে অঘ্রানের বিকালে এবার আগেভাগেই শীত নেমে গেছে নারায়ণপুর গাঁয়ের কোল জুড়ে। ভবিষ্যতের দূরদর্শী কোনো মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে জনদরদী দেশসেবকদের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অন্ত নেই এখন। শীত আসার আগে তা আরও বেড়ে যায় বরাবরের মতো। সমবেদনার নিবিড় আলিঙ্গনের চাইতেও শীতবস্ত্রের উষ্ণ পরশে চাপা পড়ে যায় গাঁয়ের আনাচ কানাচ পর্যন্ত।

গাঁটের পয়সা খরচ করে হলেও শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তোড়জোড় চলে সেই রেওয়াজ ধরে। লোক জড়ো করে মুকুল কমাণ্ডারের উঠানে তেমনই একটা মতবিনিময় সভার আয়োজন চলছিল হৈ হৈ কলরবে। এতে প্রচার ও ভবিষ্যতের কার্য সিদ্ধি দুইই সম্ভব হয় একসাথে। সেখানে সমাজের সর্বস্তরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমাগম দেখা যায়। সহজ-সরল-নিরীহ মানুষের আড়ালে মুখোশধারী রক্তচোষাদেরও নির্বিঘ্ন আগমন ঘটে। হাসমত মৃধার মতো গিরগিটিরূপী মানুষের গুণ কীর্তনে অকারণে মুখিয়ে ওঠে তারা।

জনকল্যাণের নাতিদীর্ঘ আলোচনা শেষে অন্যান্যদের মতো হেকমত মুন্সির ছেলেদের হাতেও ওঠে টকটকে লাল রঙের কম্বল। বাকরুদ্ধ হেকমতের জমে যাওয়া শীতল শরীরে সেই কম্বল হতে উষ্ণ পরশ এসে লাগে। হাসমত মৃধার কাঁচা পয়সার উম্মাদনা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে গিয়ে গ্রাস করে নিতে চায় গাঁয়ের নির্লোভ মানুষগুলোকে। আগপাছ নানান কথা ভেবে অগত্যা বাড়ির পথ ধরে সন্ধ্যার অন্তিম অন্ধকারে হারিয়ে যায় হেকমত।

রাতের বেলা চালাহীন পোড়া ঘরের অন্ধকার কুঠুরির ভেতর থেকে এক ফালি চাঁদ দেখা যায় কোনোমতে। তেলচিটে বালিশের উপর মাথা রেখে হেকমত ভাবে, ষাটোর্ধ্ব জীবনের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে নির্লোভ একজন মানুষ হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিল সে। কিন্তু, নিয়তির অদ্ভুত খেলার ক্রীড়নক হয়ে জীবনের কোনো থিতি হলো না তার। মায়ের জঠর থেকে বেরিয়ে যে ভূমিতে বেড়ে উঠেছিল, সংসার পেতেছিল, সেই ভিটা হয়েছিল কলঙ্কিত। রাজাকারের পেটে গিয়ে শেষমেশ সাবাড় হয়েছে সব। নতুন দেশে আমিনা ও দুই সন্তানকে নিয়ে শঙ্খিনীর পাড়ে আবার যখন নতুন করে বাঁচতে শিখেছিল সেও গেল অবাধ্য নদীটার পেটে। যেখানে ছিল তার সুখের সংসারÑ সেই স্মৃতিও আজ বিলীন।

হেকমতের দেশাত্মবোধের যে মলিন প্রমাণটুকু ছিল তাও আজ পুড়ে ছাই। এখন যদি তার সম্মানের শেষ পরিচয়টুকুও বিক্রি হয়ে যায় তবে সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? অসংলগ্ন এসব চিন্তায় অনেক রাত অবধি ঘুম আসে না তার। গভীর রাতে বুকে চিনচিনে ব্যথা নিয়ে আকাশ কাঁপিয়ে জ্বর এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অন্ধকার হাতড়ে বেড়িয়ে ছেলেদের অস্ফুট স্বরে ডাকে, দবির, ও দবির। কই গেলিরে সব? আমার যে কেমুন লাগেরে বাপ। ও কবির, আমার যে ভীষণ শীত লাগে। কিছু লইয়া আয়রে বাপ।

বুকের সকল কষ্ট বাষ্পরুদ্ধ হয়ে চোখের কোণ ছাপিয়ে ওঠে। হু হু করে কেঁদে ওঠে হেকমত। মরণ ছোবলে তার শরীর নীল হয়ে আসে। বাইরের খোলা উঠানে গভীর রাতের নৈঃশব্দ্যে কেঁউ কেঁউ করে করুণ স্বরে কুকুর ডেকে যায় সঙ্কটাপন্ন সে সময়কে উপলব্ধি করে। মানুষের মতো সে কান্নায় অনাগত অশুভ এক ইঙ্গিত ছড়িয়ে যায় সর্বত্র।

ঘরসদৃশ দোচালা সে কাঠামোর মাঝে ঠাণ্ডা খোলা হাওয়া দাপিয়ে বেড়ায়। সে হাওয়ার দাপটে সারা শরীর ঠক ঠক করে কাঁপে হেকমতের। দবির দৌড়ে গিয়ে নিজের কাছে রাখা কম্বল এনে শরীরের উপর চেপে ধরে তার। কাঁপুনি থেমে গিয়ে কম্বলের সে ওমে হেকমত মুন্সির চোখে অন্ধকার হয়ে এক গভীর ঘুম নামে।

ঘুমের অতলেই যেন জেগে জেগে সে দেখে, টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে সব। মানুষের বিবেক, স্বপ্ন, জীবন-জীবিকা সবকিছু। অন্তহীন অচেনা জগতে পাড়ি জমাতে গিয়ে আরও দেখে, বিশাল এক সবুজ মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হাসমত মৃধা। লাল একটা টিনের বাক্স হাতে সেদিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে দবির। আগুনে পুড়ে যাওয়া সার্টিফিকেটগুলো তার হাতে তুলে দেয় সে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির পকেট থেকে দবিরের হাতে টাকার বাণ্ডেল ধরিয়ে দেয় মৃধা। গাঢ় সবুজের জমিনে তার লাল বাক্সটা যেন সবুজের বুকে লাল রক্তখচিত পতাকা। কিন্তু, লালটা এমন ফিকে হয়ে আসছে কেন? সকালের সূর্যটা কেমন নীল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আস্তে আস্তে সে নীল ক্রমশ কালো হয়ে গিলে খেতে শুরু করেছে তার প্রিয় নারায়ণপুর গাঁয়ের মাটিকে, তার প্রিয় মাতৃভূমিকে।

মঈনুল হাসান। কথাসাহিত্যিক ও ছড়াকার। ১৯৭৮ সালের ৪ আগস্ট (বাংলা ২০ শ্রাবণ, ১৩৮৪ বঙ্গাব্দ), ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার তেজগাঁওয়ে শৈশব কাটলেও পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলায়। বাবা মরহুম মোঃ আব্দুল আউয়াল এবং মা বেগম শামসুন নাহার। বটমলী হোম বালিকা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..