চন্দনা

তারিক রেজা আলী
গল্প
Bengali
চন্দনা

১. অসুস্থ ছেলের পাশে বসে আছে চন্দনা। বাচ্চার অসুখ হলে এত মন খারাপ হয়! ওর কষ্ট যদি নিজে নিয়ে নিতে পারতো! পর পর দু’দিন জ্বরে ভোগা ছেলেকে বাড়ীতে একা রেখে অফিসে গেছে সে। ছেলে একটু বড় হয়েছে, একা থাকতে পারে, বাড়ীতে কাজের লোকও আছে। তবু অসুস্থ ছেলেকে রেখে অফিস যেতে এত খারাপ লাগে! তৃতীয় দিন জানা গেল ছেলে আসলে জন্ডিসে ভুগছে। জ্বর নামাতে এই দু’দিনে যে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দেওয়া হয়েছে, তা হয়তো লিভারের আরো ক্ষতি করেছে। নিজেকে অপরাধী লাগছে। সে যদি বাড়ীতে থাকতে পারতো, হয়তো ছেলের এত ক্ষতি হতো না। কিন্তু কি করতে পারতো সে! অফিস থেকে হুটহাট ছুটি ম্যানেজ করা সম্ভব নয়।

ছেলে যখন ছোট, কতবার অফিসে নিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। বাড়ীতে দেখার মত কেউ না থাকলে অফিসে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। কখনো অসুস্থ হলে কত কসরত করে ছুটি ম্যানেজ করতে হয়েছে। অসুস্থ ছেলেকে রেখে আজ আর অফিসে যেতে মন চাইলো না। সিদ্ধান্ত নিল, যা হয় হোক, ফোন করে দেবে অফিসে, আজ আর যাবে না।

ছেলের পাশে শুয়ে সাত পাঁচ ভাবছে চন্দনা। চাকরি টা মনে হয় আর করা যাবে না। প্রতিটা চাকুরিজীবি মাকেই হয়তো এমন কষ্ট করে এগুতে হয়। ছোটবেলায় ওদের বাসায় কাজ করতো এক ছুটা বুয়া। ছোট বাচ্চাকে সাথে নিয়ে আসতো। নিচের তলায় খেলনা দিয়ে বসিয়ে রেখে ও উপরে এসে কাজ করতো। ছেলে নীচ থেকে ডাকতো, ” মা গো”। মা সুরে সুরে উপর থেকে বলতো, ” কি গো” বাচ্চা বলতো, ” ও মা” । মা বলতো, “কি মা”। … এভাবে উপর নীচ কথোপকথন চলতো। কেমন রোগাটে ছিল বাচ্চাটা। পেট টা ছিল অনেক বড়। মনে হয় অপুষ্টিতে ভুগতো। কিছুদিন পরে শুনেছিল , বাচ্চাটা মারা গেছে। মা টা কেমন পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল। আজ বহুদিন পর সেই বাচ্চার চেহারা মনে করে চন্দনার চোখ জলে ভরে উঠলো। ও ছেলেকে বুকের সাথে আরো আঁকড়ে ধরলো।

বেলা হয়েছে অনেক। ছেলে উঠছে না। পাশে বসে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কি এক বেদনায় ছেয়ে গেল চন্দনার বুক। ডাকলো ছেলে কে। আধো ঘুমে মাকে দেখে ছেলে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “অফিসে যাও নি?” চন্দনার মনে পড়ে আগে ছেলেকে ঘুমে রেখেই বাইরে যেতে হতো তার। মা কে কোথাও যেতে দেখলে কেঁদে একসার হতো ছেলে। সে আশ্বস্ত করলো, আজ আর অফিসে যাবে না। খুশী হয়ে ছেলে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো চন্দনা, অঘোর ঘুমে তলিয়ে যাবার সময় সেই ছোটবেলার মত চমকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সে মায়ের দিকে। মা কে দেখে পরম নির্ভরতায় আবার ঘুমিয়ে গেল। একটা হাত দিয়ে মায়ের শরীর ছুঁয়ে থাকলো, মা যেন কিছুতেই তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যেতে না পারে!

২.কাগজের ঠোঙা থেকে একটা ‘ভাল’ বাদাম খুঁজে বের করে সন্তর্পণে আলাদা করে হাত ব্যাগে রাখলো চন্দনা। সেই ছোট বেলায় বান্ধবী শিখিয়েছিল, সব শেষে খেতে হবে এই বাদামটা। তাহলে আর সব শেষের বাদাম খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না, মুখে লেগে থাকবে ভাল বাদামের স্বাদ দীর্ঘক্ষণ। বিকেল প্রায় শেষ, তবে রোদ আর আলো বাইরে ঠিকই খেলা করছে। চন্দনা উঠেছে জয়দেবপুর থেকে ঢাকা যাবার লোকাল ট্রেনে। সারাদিন একলা ঘুরেছে সে এদিক সেদিক। দুপুরে খেয়েছে এক নাম না জানা হোটেলে। এখানেও এখন ঢাকার মতো পাওয়া যায় নানা রকম ভর্তা। তার সাথে খেয়েছে সে ইলিশ মাছের ঝাল তরকারী। এর পর ঘুরে দেখেছে ভাওয়াল রাজবাড়ী, শ্মশানঘাট, রথখোলা। না, কেউ সন্দেহের চোখে তাকায় নি, কোন রকম খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীনও হতে হয় নি তাকে। যথেষ্ট সুন্দরী সে, নিজেও জানে, অনেকেই তাকিয়েছে, কিন্তু কোন প্রশ্ন করে নি।

ফেরার জন্য ট্রেনে বসে বেশ ফুরফুরে লাগছিলো তার। আজ সে ফাঁকি দিয়েছে সবাইকে। গত ক’দিন ধরে কেমন এক অস্থিরতায় ভুগছিল। সংসার, ছেলে-মেয়ে, অফিস সব ঠিক রাখতে রাখতে কেমন ক্লান্ত বোধ করছিল। সব জায়গাতেই তাকে হতে হয় অতিমাত্রায় সফল। কোথাও কোন ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয়। অভিমানও হচ্ছিল সবার উপর। আজ অফিসে যাবার জন্য রোজ সকালের মত বের হওয়ার পর হঠাৎ তার মনে হলো, আজ সে নিয়ম মানবে না। কি করবে বুঝতে পারছিল না। অফিসেও গেল। অস্থির ভাবে সিনিয়র কে বললো, শরীর ভাল লাগছে না, বাড়ী চলে যাবে। সবার বিস্মিত চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে পড়লো। নিজেকে আবিষ্কার করলো কমলাপুর রেল স্টেশনে। যে ট্রেন সামনে পেলো উঠে পড়লো তাতেই। অবচেতন ভাবে নিশ্চয়ই চিন্তা করেছিল ভাওয়াল রাজবাড়ীর কথা। জয়দেবপুর আসতে নেমে পড়লো আর ঘুরে বেড়ালো সমস্ত দিন নিজের মতো।

বাদাম খেতে খেতে দিনে এই প্রথম অন করলো সে মোবাইল ফোন। একসাথে পঁয়ত্রিশ টা মিসড কল দেখে দিশেহারা বোধ করলো। আছে স্বামী-সন্তানের ফোন এমনকি শাশুড়ির ফোনও। একটু কি ভাল লাগছে তার? সবাই তাকে নিয়ে চিন্তা করে, সবাই নিশ্চয়ই ভালোও বাসে। তারপরেও মনের গহীনে তালাশ করে দেখলো তার ফেরার কোন তাড়া নেই। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। ফিরে যেতেই হবে চেনা গন্তব্যে। সে গভীর মনযোগের সাথে দেখতে লাগলো গাছ-গাছালিতে দ্রুত ধাবমান আলো আর আঁধারের খেলা। কানে ভেসে আসছিল জয়তীর গাওয়া গান-

যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা
কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা।
বুঝি এলি যার অভিসারে
মনে মনে দেখা হল তারে,
আড়ালে আড়ালে দেয়া-নেয়া–
আপনায় লুকায়ে দেয়া-নেয়া
ছায়া ঘনাইছে বনে বনে।।

৩. আজ কোজাগরী পূর্ণিমাতিথি। বিকেল থেকেই দেখা যাচ্ছে পূর্ণ চন্দ্র। আশ্বিনের এই সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ী ফিরছিল চন্দনা। মন- মেজাজ খুবই খারাপ। অফিসে বস সবার সামনে বলে বসলেন সঠিক সময়ে চন্দনা ই-মেইলের জবাব না দেওয়াতে এক বিরাট অর্ডার বাতিল হয়েছে তাদের। চন্দনার কারণে কোম্পানি বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন। কোন দিন যা হয় না, বেশ কিছু কটু কথা শুনিয়ে দিলেন চন্দনাকে। জোৎস্নার আলো তাই চন্দনাকে স্পর্শ করছে না। তার মেজাজ খারাপের আরেক কারণ, সে তার স্বভাব মতো কোন জবাব দিতে পারে নি। নীরবে হজম করেছে সব অপমান। কেন করলো? কেন সে বলতে পারলো না, সে দায়ী নয়, এখানে তার কোন ভুল নেই?

ছোট বেলা থেকেই চন্দনা এমন কোমল স্বভাবের ছিল। আশেপাশের সবার আদর পেয়ে, সবার ভালবাসা পেয়ে বড় হতে হতে তার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল তাকে সব জায়গায় ভাল থাকতে হবে। সে চাইতো সবাই তাকে ভাল বলুক। কিশোরী বয়সে সে যা চাইতো, আরেকটু বড় হয়ে শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ পার হয়ে নিজের জগৎ তৈরি করতে করতে তা আরো ব্যাপক আকারে রূপ নিতে লাগলো। তার প্রার্থনা তখন ছিল সে বড় হয়ে ভাল অফিসে ভাল কাজ করবে অথবা অধ্যাপনা করবে, সে ভাল বৌ হবে, ভাল মা হবে, নিজের আর শ্বশুরবাড়ীর সবাই তাকে ভাল বলবে। নিজেকে আরও ভালো করার, নিখুঁত করার প্রতিযোগিতায় সে মগ্ন থাকতো।

একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। ওর দু’বছরের বড় ভাই খুব চঞ্চল আর দুষ্টু ছিল। বাসায় ভাইয়ের সাথে ও খেলতো, ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর সময় সাথে থাকতো। ভাইয়ের সাথে খেলার মাঠেও যেতো পাড়ার ফুটবল খেলা দেখতে। একদিন ছাদে খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে ভাইয়ের মাথা অনেকখানি কেটে গেলো। ঘরে ফিরে এলে বাবা চন্দনাকে অকারণে বকলেন। যেন সব দোষ ওর। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। সবার অলক্ষ্যে বাড়ী থেকে বের হয়ে গেল। এ রাস্তা সে রাস্তা ঘুরে দু-তিন ঘন্টা পর দেখলো, তার যাবার আসলে কোন জায়গা নেই। সন্ধ্যার পর বাড়ী ফিরে এলো সে। না, সে যে ছিল না, কোন আলোড়ন ফেলেনি তা। আশ্চর্য হয়ে চন্দনা লক্ষ্য করলো, তার বড়বোনকে রান্না করা শিখাচ্ছে মা। একথা ওকথা বলে হাসছে দুজনেই। ভাই শুয়ে আছে পাশের ঘরে। মা তাকে কিছু জিজ্ঞাসাও করলেন না। বাবা শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় গিয়েছিলে?” খুবই অবাক হয়ে চন্দনা শুনলো তার নিজের উত্তর। কে যেন তার ভিতর থেকে বলে উঠলো, “কয়েকটা খাতা আর বই কিনতে গিয়েছিলাম বাবা!” বড় হওয়ার পর সে বহুদিন ভেবেছে, কেন এমনটা হলো, তার তো রাগ করা উচিৎ ছিল, চিৎকার করা উচিৎ ছিল, সবার ভুল ভাঙিয়ে বলা উচিৎ ছিল, সে নির্দোষ, তাকে শুধু শুধু শাস্তি পেতে হয়েছে। সে কেন এই কাজটি করতে পারলো না। এখানেও কি তার ভাল থাকার, সব কিছু বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেয়ার অবচেতন মন কাজ করেছে?

শরতের এই সন্ধ্যায়, অফিস থেকে ফিরে চন্দনা এসব কথা মনে করছিল। খুব মন খারাপ লাগছিল। অন্ধকার ঘরে একা বসে ছিল। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। ফোন করেছেন ওর খুব প্রিয় একজন মানুষ, বাবার বন্ধু। ও ফোন ধরে দৌঁড়ে ছাদে গেল। “কেমন আছিস মা?”…কেঁদে ফেললো, সব খুলে বললো। চাচা বললেন,” অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করবি না”। ও আকাশের দিকে তাকালো। বাহ, কি সুন্দর জোৎস্না আজ! নারকেল গাছগুলোর পাতা চাঁদের আলোয় যেন ঝলমল করছে। প্রকৃতি কখনো বঞ্চনা করেনা।
শান্ত স্নিগ্ধ চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো চন্দনা। আর নয়। এবার সে প্রতিবাদ করবেই। দরকার হলে চাকুরী ছেড়ে দেবে, কিন্তু আর সহ্য করবে না এই অকারণ অপমান।

৪. খুব সকালে উঠে আকাশ দেখার অভ্যাস চন্দনার অনেক দিনের। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এসেও সে অভ্যাস পাল্টে যায় নি। এ বাড়িটি দোতলা, আশে-পাশের সব বাড়ী হাই রাইজ বিল্ডিং এ রূপান্তরিত হয়ে গেছে কবেই। তাই আকাশ দেখার একটাই জায়গা, ছাদে যেতে হবে। নিজের বাড়ীর ছাদে নিরোপদ্রব ঘুরে বেড়ানোর ক্ষমতাও ওদের নেই, কারণ সব বাড়ি থেকেই এ বাড়ীর ছাদ দেখা যায়।

আজ সকালে ছাদে যাবার চিলে কোঠার দরজায় দাঁড়িয়ে চন্দনা দেখতে পেলো ছাই রঙের আকাশ। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। কাল সারা রাত অঝোর ধারায় বৃষ্টির জের এখনো চলছে। ছাদে পায়চারী করতে না পারায় কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হলো সে। নীচে নেমে অফিসে যাওয়ার জন্য দ্রুত তৈরি হয়ে পেলো সে দিনের সবচেয়ে খারাপ খবর। ওদের গাড়ী বাচ্চাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আসার সময় এক গর্তে পড়ে নষ্ট হয়ে আটকে আছে। এখন তার অফিসে যাওয়ার কি হবে? জরুরী কাজ আছে। যেতেই হবে অফিসে।

ছাতা মাথায় গলি থেকে বড় রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই ভিজে গেল চন্দনা। যা ভেবেছিল তাই। কোন ট্যাক্সি নেই, স্কুটার নেই। আর সবার মত এক গাছতলায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো সে। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলো তার তেমন বিরক্ত লাগছে না। বরং ভালই লাগছে। মানুষ ঠেলে ভিড়ে ভর্তি বাসে উঠেও গেল সে। রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে খারাপ লাগছিল না। আশে পাশের সব অফিসগামী যাত্রী। কতদিন পর সে বাসে উঠলো? অনেক বছর পর সাধারণ ভাবে বাসে উঠে সহযাত্রীদের খুব আপন আত্মীয়ের মত মনে হচ্ছিল। বাস চলছিল ধীরে। ট্রাফিকজ্যাম এখন এ শহরের নিত্যসঙ্গী। তাই বিরক্ত না হয়ে সে অন্যদের দেখার চেষ্টা করতে লাগলো। মনে পড়লো তার বাবা আজীবন বাসে করে অফিস করেছে। তখন এত জ্যাম ছিল না। বাসে করে অফিস করতে করতে কতজনের সাথে আত্মার বন্ধুত্ব হতো। ছুটির দিনে তারা বাসায়ও আসতেন। ছোট্ট চন্দনার কাজ ছিল মায়ের হাতে বানানো মুড়ি আর গরম চা পৌঁছে দেওয়া। কতদিন হলো বাবাকে স্বপ্নেও দেখেনি সে। এতক্ষণে বসার জায়গা পেয়েছে সে, তাও জানালার ধারে। বসে থাকতে থাকতে সে হারিয়ে গেল সুদূর অতীতে। একবার ও বাবার সাথে যাচ্ছিলো পঞ্চগড়। লম্বা জার্নি। তখন যমুনা ব্রিজ হয়নি। ফেরী পারাপার ছিল। ফেরীর রেলিং ধরে ও বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিল। নদীর পানি ছিটে আসছিল মাঝেমাঝে। তখন ও কিশোরী। সব কিছুই ভাল লাগে। যা দেখে, তাই নতুন মনে হয়। দেখতে ও অনেকটা মায়ের মত, যে মা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। বাবাই ওর সব। বাসে যখন ঘুমিয়ে পড়ে, বাবা ওর মাথা বুকে নিয়ে রেখেছিল। ঘুমানোর আগে ও বাবাকে বলে রেখেছে, সূর্যোদয়ের সময় জাগিয়ে দিতে। বাবা ঠিক ই ডেকে দিলো, ‘ মা সূর্য উঠছে, দেখো” । …সেটাই ছিল বাবার সাথে শেষ জার্নি। এর ক’মাস পর বাবা মারা যান।

হঠাৎ বৃষ্টির ছাঁট এসে চোখে মুখে লাগলো। এই জল আর সেদিনের ফেরিঘাটের জল কি একই জল? বৃষ্টির জলে কি তবে বাবার হাতের ছোঁয়া আছে? বাস থেকে নামার সময় চন্দনা উপলব্ধি করলো জীবন আসলে সুন্দর। সাধারণের মাঝে বড় হয়ে সাধারণের মাঝে বেঁচে থাকলেই বোধ হয় জীবনটাকে বেশী উপভোগ করা যায়।

৫. মাঝে মাঝে মনে হয় সময় যেন ফিরে আসে। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল, ঠিক একই রকম কিছু একটা এসেছিল জীবনে এরকম ভ্রম হয়। মনের মাঝে এক বিশাল আকুতি, কেন যেন মনে পড়ে না পুরোটা। কিন্তু মন স্থির, সে বলে সত্যি এরকম একটা সময় কাটিয়েছিল সে কোন এক দিন।

তুমুল বৃষ্টিতে বাড়ী ফিরতে ফিরতে চন্দনা কিন্তু ঠিক টের পেল সে সময়ের কথা। আজ সারাদিন বৃষ্টি। সকালে অফিসে এসেছে খুব কষ্টে, ভিজতে হয়েছে অনেকটা। সারাদিন টেলিভিশনে দেখেছে ঢাকার সব রাস্তা জলমগ্ন। গাড়ী, রিকশা সব আটকে আছে, ডুবে আছে। বাড়ী ফেরা নিয়ে একটা টেনশন কাজ করেছে পুরোটা সময়।

তখন কেবল কিছুদিন আগে বিয়ে হয়েছে চন্দনার। নতুন বৌ, কিন্তু পড়াশুনা শেষ হয় নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিল সে কি এক কাজে। ফেরার সময় আজকের দিনের মত বৃষ্টি। রাস্তা জলে ডোবা। কোন রিক্সা নেই, গাড়ী নেই। বৃষ্টিতে ভিজে, ময়লা পানিতে পা ডুবিয়ে বহু কষ্টে সে যখন বাড়ী পৌঁছালো, দেখলো শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সবাই বসে টেলিভিশন দেখছে। এত রাত হয়েছে, কেউ একবার খোঁজ পর্যন্ত নেয় নি কিভাবে ফিরবে চন্দনা। সে যে জলে ভেজা, এটাও যেন দৃষ্টি এড়িয়ে গেল সবার। ভীষণ অভিমানে বাথরুমে শাওয়ার নিতে নিতে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল চন্দনা। আরো অনেক পরে স্বামী প্রবর বাড়ী ফিরলে তিনিও একবার জিজ্ঞাসা করেন নি চন্দনা কিভাবে বাড়ী পৌঁছালো। যেন এটা তো কোন বড় ঘটনা নয়। চন্দনা তো পারেই, তার তো পারাই উচিত নিজের কাজ নিজে নিজে করা।

আজ যখন চন্দনা অফিস থেকে বের হলো, মনে পড়লো সেদিনের কথা, মনে হলো সেই সময় যেন ফিরে এলো। তাকে অবাক করে দিয়ে আজ কিন্তু ফোন করলো অনেকেই। প্রথমে স্বামী, তারপর ছেলে, মেয়ে, এরপর শাশুড়ি। কিভাবে পৌঁছাবে চন্দনা? কোন যান বাহন কি পেয়েছে?

বাড়ীর গেটে যখন নামলো তখনো ঝুম বৃষ্টি। ফ্ল্যাট বাড়ীর দোতলা থেকে নেমে এসেছে ছেলে আর স্বামী। তাদের উৎকন্ঠা দেখে নিমিষেই মন ভাল হয়ে গেল চন্দনার। ভুলে গেল এতদিন পুষে রাখা রাগ আর অভিমান। ছেলে টেনে নিল ওর হাতের ব্যাগ। স্বামী এগিয়ে দিল তার হাত। সেই হাত ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল চন্দনা। পরম নির্ভরতায়।

৬. দু’চোখ জ্বালা করছে। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। চন্দনা বুঝতে পারলো জ্বর আসছে তার। কিছুক্ষণের ভিতর শরীর কাঁপিয়ে তীব্র জ্বর আচ্ছন্ন করবে তাকে। ভয় হতে লাগলো। অনেক দিন অসুখে পড়েনি সে। তার অসুস্থ হওয়া মানে পুরো সংসারের ভোগান্তি আর অশান্তি। নিজেকে অভিশাপ দিল চন্দনা। কি দরকার ছিল তার বৃষ্টিতে ভেজবার। অফিস থেকে ফেরার সময় রিক্সা নিতে হয়েছিল তাকে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভিতর দিয়ে আসার সময় শুরু হলো টিপটিপ বৃষ্টি। আর যা হয়, আজই রিক্সাওয়ালার কাছে বৃষ্টির জল ঠেকাবার পর্দা অনুপস্থিত। রিক্সা যখন মহসিন হলের মাঠের পাশে, ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মূহুর্তেই মহসিন হলের মাঠ হয়ে গেল ওদের বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুলের বিরাট মাঠ। রিক্সার হুড ফেলে দিল সে। ভিজতে লাগলো হিম শীতল বৃষ্টিতে। ফিরে গেলো কয়েক দশক আগে ফেলে আসা স্কুলের মাঠে। চার পাশে বড় দেওয়াল যাতে বাইরে থেকে কিছু দেখা না যায়। মাঠের এক কোণায় লম্বা লম্বা ঘাস। ঐ ঘাসের ডগা চিবানো ছিল মেয়েদের শখ। ডগা চিবালেই মিষ্টি রসের স্বাদে ভরে যেত মুখ। আর ঐ ঘাসের মাঝে মাঝে ছিল কি এক কাঁটা গাছ যার ফল ছিল লাল রঙের। মেয়েরা বলতো ঐ ফল খেলে পাগল হয়ে যায় মানুষ। ভয়ে কোন দিন ঐ গাছের দিকেই যেতো না চন্দনা।

বৃষ্টি হলে মাঠে পানি জমতো। মেয়েরা কাগজের নৌকা ভাসাতো। একদিন আজ বিকেলের মতো তুমুল বৃষ্টি, মাঠে এক হাঁটু পানি। ওরা ক’জন তুমুল উৎসাহে ইচ্ছামতো ভিজেছিল। দূর থেকে এক শিক্ষক দেখতে পেয়ে ছাতি নিয়ে লাঠি হাতে তেড়ে এলেন। ওরা ক্লাসের ভেতর পালাতে চেষ্টা করেও ধরা পড়ে গেলো। আসামী ধরার মত লাইন করে ওদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো হেডমিস্ট্রেস এর রুমে। অনেক বকা ঝকা করে সব মেয়েকে এক মহিলা পিয়নের সাথে বাসায় পাঠালেন তিনি। কড়া নির্দেশ দিলেন পরদিন গার্ডিয়ান নিয়ে যেতে হবে স্কুলে। চন্দনা ভয়ে মাকে কিছু বলতে পারলো না। রাতে বাবা এলে লুকিয়ে বললো পুরো ঘটনা। বাবা হেসেই বাঁচেন না। বললেন আমরা কত বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলেছি। অভয় দিয়ে বললেন, কিছু হবে না মা। নিজ হাতে বুকে পিঠে সরিষার তেল মেখে শুইয়ে দিলেন। কাঁথা টেনে দিলেন গায়ে। মায়ের পুরনো শাড়ী দিয়ে তৈরি কাঁথা গায়ে দিলে চন্দনার মনে হতো সে যেন মায়ের বুকেই শুয়ে আছে।

আজ এত দিন পর চন্দনা বাবার হাতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো। কোথায় পাবে তাঁকে? তিনি তো সেই কবে থেকেই অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। একটু পরেই ঘরে ফিরবেন চন্দনার স্বামী। এসে যদি দেখেন চন্দনার জ্বর, কি বলবেন, কি করবেন তিনি? তার কি উচিৎ হবে স্বামীকে সব বলা? সব শুনে তিনি কি হেডমিস্ট্রেস এর মতো বকাঝকা করবেন নাকি বাবার মতো পরম মমতায় অভয় দিয়ে বলবেন, কোন চিন্তা করো না চন্দনা, কিছু হবে না তোমার!

স্বামীর মাঝে বাবাকে খুঁজে পাওয়ার এক বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো চন্দনা।

ধানসিঁড়ি নামটার প্রতি কি যে এক আকর্ষণ চন্দনার, সেই ছোট বেলা থেকে ধানসিঁড়ি নদী দেখতে যাবার ইচ্ছে তার। ঘরকুনো বলে সহসা কোথাও যাওয়ার সময়-সুযোগ হয় না। এবার যখন অফিস থেকে বলা হলো মফস্বলের কাজ কেমন চলছে দেখতে যেতে হবে, সে প্রথম সুযোগেই বরিশাল যাবার মনস্থির করলো। বাড়ীর সব পিছুটান ফেলে সত্যি চলে গেল বরিশাল একা একা! কাজ শেষ করে পরদিন এক কলিগের সাহায্য নিয়ে চলে গেল ঝালকাঠি। বারবার তাড়া দিতে লাগলো কলিগ কে, কখন যাওয়া যাবে প্রিয় কবির প্রিয় নদীর কাছে।

বরিশাল অঞ্চলের ভাষা নিয়ে অনেকেই অনেক মজা করে, সে শুধু চিন্তা করে যারা নদীর নাম রাখতে পারে ধানসিঁড়ি, তাদের সংস্কৃতি কত উন্নত ছিল ভাবা যায়? ধানসিঁড়ি শুনলেই কেমন বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠে, শালিক ডেকে যায়, দেখা যায় শুভ্র বলাকার উড়ে যাওয়া। মাথার উপরে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। নদীর পারে কাঁঠাল গাছ খুঁজে ফেরে চন্দনার চোখ। মেলে না। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে কবি জীবনানন্দ দাশের পিতৃব্যের বাড়ীর কাছে। এখানে কবি কতবার এসেছেন। ভাবতে চেষ্টা করে, কবির চোখের সামনে যখন দেশটা দু’টুকরো হলো, ধানসিঁড়ি হলো যখন বিদেশের নদী, কেমন লাগতো তাঁর? কোলকাতার গলির বাড়ীতে বসে দু:খী কবি নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখতেন নদীর দু’পারে পায়ে চলা মেঠো পথের। কবির বিরহে অথবা কবির অভিশাপে একদা বিপুলা ধানসিঁড়ি এখন মৃতপ্রায়। তারপরেও আচ্ছন্নের মত নদীর পার ধরে নেমে আসে চন্দনা। এই সেই নদী, তার প্রেমিক কবির পরম প্রিয় নদী। এর পারে এসে বসে থাকতেন কবি জীবনানন্দ। হাত রাখতেন এ নদীর জলে। একদা প্রমত্তা নদীর বর্তমান শীর্ণকায়া জলে ছোট ডিঙি নৌকায় মাছ ধরছেন জেলেরা । বড় বড় নৌকা চলার প্রশ্নই আসে না। তাও বসে রইলো চন্দনা। নদীর জলে দেখা যায় নিজের ছায়া। তার পাশে ভেসে ওঠে কবির মুখ। কবি যেন বলছেন তাকে, এত দিন পরে এলে চন্দনা আমাকে দেখতে? কত বছর অপেক্ষায় আছি, তুমি আসবে বলে!

অস্ফুট স্বরে বলে চন্দনা, আমিই সেই মেয়ে কবি, যে নাম রেখেছিল ‘ধানসিঁড়ি’!

“এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?’
মাছরাঙাদের বললাম;
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।
আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।”

৮. আজ চন্দনার মন খারাপ। কারন টা বুঝতে পারছে না সে কিছুতেই। পাখীর নামে নাম, পাখীর মত নরম মেয়ে চন্দনা। তবে এমন তো নয় যে সে কিশোরী, কারণে-অকারণে মন খারাপ করবে। বরং সে এখন কিশোরী মেয়ের মা। নিজের মনের আনাচে-কানাচে অনেক খুঁজলো চন্দনা। বিশ্বাসযাগ্য কোন কারণ না পাওয়াতে মেজাজ যেন খারাপ হতে শুরু করলো। এমনিতে কখনো রেগে যায় না সে। কেউ কখনো দেখেনি চন্দনা খুব রেগে গেছে অথবা কারো সাথে রেগে খারাপ ভাবে কথা বলেছে। তার চোখে-মুখে আছে এক আশ্চর্য স্নিগ্ধতা আর কিশোরীর মতো সারল্য। চরম বিরক্ত হলেও সে কখনো ক্রোধের দৃষ্টিতে তাকায় না কারো দিকে।

আজ হঠাৎ গ্রামে বেড়াতে এসেছে সে পরিবার সহ। এটা চন্দনার দাদার বাড়ী। এখানে সে বড় হয়েছে এমন নয়, তবে মাঝে মাঝেই এসেছে। দাদা কে মনে পড়ে না, কিন্তু দাদীকে পেয়েছে। দাদীর স্নেহের রাজত্বে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তার। যে আলমারীতে গচ্ছিত থাকতো সংসারের টুকিটাকি থেকে দামী সব জিনিস, সে আলমারী খুলতেও কেবল চন্দনার অনুমতি ছিল, আর কারো না। ৬ ছেলে, দুই মেয়ে, ৬ ছেলের বৌ, অসংখ্য নাতি-নাতনি কারো অধিকার ছিল না এখানে হাত দেওয়ার।

একটু একটু যেন বুঝতে শুরু করেছে চন্দনা তার মন খারাপের কারণ। কি যেন নেই, কোথায় যেন বিরাট ছন্দপতন, ধরতে পারছে না সে। এ বাড়ীতে এলে সে এখনো প্রথমে যায় দাদীর সেই ঘরে, যেখানে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন প্রায় এক যুগ আগে। হাতের ব্যাগটা রেখে ঘুরে দেখে বাড়ীর চার পাশ। হঠাৎ কি মনে হোল তার; উঠোনের কাঠবাদাম গাছে হাত বুলানো বন্ধ করে দ্রুত ফিরে এলো দাদীর ঘরে। চমকে উঠলো, নেই তো, সেই আলমারীটা তো নেই! কি হলো, কোথায় গেল? দাদীর খাটটাও নেই, অন্য এক আধুনিক খাট ঢুকেছে এখানে। কি বিশাল ছিল সেই পূরনো দিনের খাট! অনেক উঁচু। পাঁচ-ছয়জন আরামে শুয়ে থাকতে পারতো। শুয়ে শুয়ে চলতো গল্প আর গল্প, গভীর রাত পর্যন্ত। দাদী কতরকম গল্প বলতেন পুরোনো দিনের! দাদীর জন্য পান বানানোর দায়িত্বটা সেধে নিত সে। পান সুপারী ছেঁচে দাদীর মুখে নিজ হাতে পুরে দিত সে।

ঘরের চারপাশ আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। নিশ্চয়ই তার চাচারা করেছেন এই কাজ। তারা তো আর চন্দনার মত কল্পলোকে বাস করেন না। বাস্তবতা মেনেই এ পরিবর্তন। কিন্তু চন্দনা কোনভাবেই তা মেনে নিতে পারছে না। বের হয়ে এলো ঘর থেকে। পুকুর পারে চলে এলো । বিরাট এই পুকুরে ছোট বেলায় কত ঝাপাঝাপি করেছে সে আর সব ভাই বোনের সাথে। অবাক হয়ে লক্ষ করলো, কেউ তো নেই পুকুরে। এই যে বাড়িতে এত শিশু, তারা কেন জলে নামছে না? বুঝতে পারলো এখানে এখন মাছের চাষ হয়, এই জল বোধ হয় শিশুদের দাপাদাপির জন্য উপযোগী নয়।

মন খারাপ বেড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে বসে পরলো শান বাঁধানো ঘাটে। কান্না পাচ্ছে ওর। শ্রাবনের আকাশ হঠাৎ মেঘে ছেয়ে গেল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির জোর বেড়ে ঝিরঝির থেকে টিপটিপ, তার পর ঝরতে শুরু করল মুষল ধারে। পুরো ভিজে গেলো, তাও উঠলো না সে। বৃষ্টির ফোঁটা গুলো কি চমৎকার আল্পনা তৈরী করেছে পুকুরের জলে! ঠিক তার ছোটবেলার মত। এই একটা জিনিসই আছে আগের মত। জল যেন আহবান করছে তাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মত পুকুরে নেমে এলো সে। ডুব দিল শীতল ঠান্ডা জলে পরম শান্তিতে। ফিরে এলো তার অতীত দিন গুলো। কত শুনেছে সে বৃষ্টির গান জলের নীচে। সে এক অদ্ভুত ছন্দের মাদকতাময় সুর। মনে হলো আর সে উঠবে না জল থেকে, ফিরে যাবে না ডাঙায়। বর্ষার ফলার মত বিঁধবে জলের ছাঁট তার চোখে-মুখে। তারপর আবার ডুব দিয়ে শুনবে সেই খই ফোটা শব্দ। পাখী থেকে পরিণত হবে চন্দনা জলকুমারীতে।

৯. কুশল নামে এক ছেলে ছিল। সাত বৎসরের বাচ্চা। সমুদ্রে যাবার জন্য উতলা হয়ে গিয়েছিল। বাবা-মা কে অস্থির করে ফেলেছিল, কবে নিয়ে যাবে তাকে কক্সবাজার। স্কুলের পরীক্ষা শেষে গেল তারা সমুদ্রস্নানে। আর ওখানেই ঘটলো সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা। ভাটার টানে ভেসে গেল ছোট্ট কুশল। বাবা-মার প্রাণান্তকর চেষ্টাও রক্ষা করতে পারলো না তাকে। কিছুক্ষণ পর দেখা হলো তার মৃত্যুবুড়োর সাথে। মৃত্যুবুড়ো তাকে বললো, কুশলকে নিয়ে যাবার জন্যই এসেছে সে। কুশলতো তার সাথে যাবে না। সে বললো, আমি বাবা-মার কাছে যাব। মৃত্যুবুড়ো তাকে অনেক বুঝালো। বললো, এখন এমন এক ঘটনা ঘটে গেছে, তার বাবা-মা তাকে আর দেখতে পাবে না। সে এখন অদৃশ্য এ দৃশ্যমান জগত থেকে। মা-বাবা কেন, দুনিয়ার কোন মানুষই আর তাকে দেখতে পাবে না। কুশল নাছোড়বান্দা, সে যাবেই মায়ের কাছে। শেষে তাই হলো, মৃত্যুবুড়ো নিয়ে গেল তাকে ঢাকা শহরে, একেবারে পাখীর মত উড়ে উড়ে গেল তারা। গিয়ে নামলো কুশলদের বাড়ীর সামনে এক গাছে। বুড়ো বললো, কুশল, আমি এখানেই থাকি, তুমি যাও তোমাদের বাড়ীতে। ভীষণ আনন্দ নিয়ে বাড়ী গিয়ে দেখে কুশল, মা একরুমে বসে কাঁদছে। কোলে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো সে মাকে। দেখে মা তার দিকে তাকাচ্ছেন না। মার আঁচল ধরে কত ডাকলো কুশল, মা কিছুই শুনলো না। যতই বলে, মা এইতো আমি, তুমি কাঁদছ কেন, মা শুধু কেঁদেই চলে। পাশের রুমে গেল কুশল। দেখে বাবা বসে আছে এক চেয়ারে পাথরের মত মুখ করে। বাবার হাত ধরে টানলো সে। বাবাও ফিরে তাকালো না। তাকে চিনতে পারলো শুধু পোষা বেড়াল টা। আর্তস্বরে ডেকে উঠলো বেড়াল। কুশল আদর করলো বেড়ালটাকে। বেড়াল আরো জোরে চিৎকার করে উঠলো। অবাক হয়ে কুশল দেখে, তার বাবা বিরক্ত হয়ে বেড়াল টাকে দিল এক লাথি। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল কুশলের। সে ফিরে গেল মৃত্যুবুড়োর কাছে। বললো, দাদু, আমি তোমার সাথেই যাব। বাবা-মা সত্যি আমাকে চিনতে পারলো না, তারা আমাকে ভুলে গেছে।

প্রায় একমাস পর বাবার বাড়ী বেড়াতে এসে বহুদিন আগে, একেবারে ছোট বেলায় পড়া এই গল্পটা মনে পড়ছিল চন্দনার। বিয়ের পর আরো ঘনঘন আসা হতো, প্রায় প্রতিদিন। এখন নিজের সংসার, অফিস সামলে সময় বের করা খুবই কষ্ট। তাও যখনই সময় পায়, চলে আসে সে বাবা-মার টানে। কিন্তু খুব সূক্ষ্ম ভাবে সে যেন বুঝতে পারে সে আর আগের মত আন্তরিক ব্যবহার পাচ্ছে না বাবার বাড়ীর সবার কাছ থেকে। পুরো বাড়ীতে সব ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিল তার বাবার সবচেয়ে প্রিয়। তার বাবা মুখে বলতেনও, পুরো দুনিয়া একদিকে আর চন্দনা একদিকে তার কাছে। যখন যা চেয়েছে, তৎক্ষণাৎ সব পেয়েছে সে। কি সুন্দর করে সে গুছিয়েছিল নিজের ঘর। পড়ার টেবিল, শোবার খাট, আলমারি, বুকশেলফ সব কিছু কিনেছে অনেক সময় নিয়ে। একটা একটা করে জড়ো করেছে তার পছন্দের যত বই। খাবার টেবিলে বসে সে দূর থেকে দেখলো তার ঘরটাকে। যেতে ইচ্ছে করলো না। তার ড্রেসিং টেবিলটা এলোমেলো। বই গুলো কি আছে? কি জানি, জেনে কি হবে। বাবা যেন তাকে দেখেও দেখছেন না। একবার এসে কুশল জিজ্ঞাসা করে চলে গেছেন নিজ ঘরে। মা ব্যস্ত তার ছেলের ঘরের নাতিকে নিয়ে। গোসল করালেন, খাওয়ালেন। ভাই চলে গেছে বাইরে, তার বৌ ব্যস্ত রান্না ঘরে। এই তো সেই ভাই যার সাথে কত মারামারি করে বড় হয়েছে সে। বাইরে যাবার আগে সে অবশ্য জিজ্ঞাসা করেছে চন্দনা চা খেয়েছে কি না। একসময় একটা চকোলেটও ভাগ করে খেতো চন্দনা ভাই এর সাথে। পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলা নিয়ে মারামারি করে ঘরে ফিরতো ভাই, কত বাঁচিয়েছে সে তাকে বাবার বকুনি থেকে। একবার স্কুলের পিকনিকে যাবে, চাঁদার টাকা দিতে চাইলো না বাবা, কত অভিনয় আর অভিমান করে বাবার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে সে সেই টাকা। অবশ্যই গভীর ভালবাসা আছে তাদের মধ্যে, তারপরেও কি যেন নেই, কোথায় যেন ছন্দপতন। কিভাবে কখন যে নিজের বাড়ীটা পরিণত হয়েছে বাবার বা সা অথবা মার বাসা, চন্দনা বুঝতে পারে নি।

খাবার টেবিলে একা বসে ভাবছিল চন্দনা, বিয়ের পরে সব মেয়েরাই একটু একটু করে পর হয়ে যায়, এটাই তো বাস্তবতা। তারপরেও কেন সে মেনে নিতে পারছে না, নাকি সে নিজেই বেশী সংবেদনশীল, সবকিছু একটু অন্যভাবে নিজের মত করে চিন্তা করে নেয় সে। সমস্যা কি তাহলে তার মাঝেই, হয়তো বাবা-মা, ভাই-ভাই বৌ যা করছেন সেটাই সঠিক।

দ্রুত শ্বশুর বাড়ী, মানে নিজের বাড়ী ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো চন্দনা।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..