চিনতে হবে নারীর আসল শত্রু এবং ঘাতকদের

শারমিন শামস্
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
চিনতে হবে নারীর আসল শত্রু এবং ঘাতকদের

নারীদিবস নিয়ে আমার কোন বাড়তি উচ্ছাস নাই। আবার কোন আপত্তিও নাই। বরং নারী দিবসের ইতিহাস আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ফেমিনিস্ট মুভমেন্টের প্রথম তরঙ্গেই একটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস আদায় করে নেয়া সম্ভব হয়েছিল। সেই হিসেবে এটি অনেক বড় একটি অর্জণ। যে সময় নারীকে একটি গৃহপালিত পশুর চেয়ে বেশি আর কিছুই ভাবা হত না, সেই সময়টিতে পশ্চিমে নারীবাদ মাথা চাড়া দিয়েছে এবং অসংখ্য দাবি নিয়ে একের পর এক আন্দোলন চালিয়ে গেছে। সময় লেগেছে, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ গেছে সংগ্রামে। তবু কিছু দাবি আদায় করেই ছেড়েছে নারী। নিজের জন্য পুরুষের সমতায় একটি পৃথিবী- এই তো নারীবাদের দাবি।

নারীদিবস এখনও কেন পালন হচ্ছে? এরও যৌক্তিকতা আছে। যেহেতু পৃথিবী এখনও পুরুষের। পুরুষই পিতা হয়ে পিতৃতন্ত্রকে ধরে রেখেছে, দুধকলা খাইয়ে লালন করছে। কারণ পিতৃতন্ত্রে পুরুষ মূলত সুবিধাভোগী। এই সুবিধা পুরুষ ছাড়তে চায় না। ক্ষমতার গদি সবারই পছন্দ। নারীকে সমতা দিলে পুরুষকে ক্ষমতার গদি ছাড়তে হয়। ভাগাভাগিতে যেতে হয়। পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্র সমান ভাগাভাগিতে বিশ্বাসী নয়। এই ‘সমান’ শব্দটিতে এসেই পুঁজিবাদের সাথে পিতৃতন্ত্রের বন্ধুত্ব হয়েছে। পুঁজিবাদের ছায়াতলে পিতৃতন্ত্র আয়েশে বেড়ে উঠেছে, চলছে ফিরছে, করে খাচ্ছে।

নারীরা তাই নারীদিবসে পিতৃতন্ত্রকে বিশেষভাবে একটা হুংকার ছাড়তে চায়। তাদের ন্যায্য দাবি যে এখনও দেয়া হয়নি, সেইটি নিয়েই হুংকার। নারীদিবস সেই হুংকারকে একটি উৎসব আয়োজনের মধ্যদিয়ে প্রকাশের মাধ্যম। দিন একটি, আন্দোলন বছরব্যাপী। শুধু একটি দিনে সীমাবদ্ধ নিশ্চয়ই নয়।

নারীদিবস অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। সরকারি কাগজে নারী অধিকার নিয়ে আইন, নীতিমালা, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ইত্যাদি সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ বটে। এসব তো চলবেই। আমি এগুলোকেও ফেলনা ভাবি না। কিন্তু আমি মনে করি না, আদতে এইসব প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন, রীতিসিদ্ধ অনুষ্ঠান, পরিকল্পনায় আদতে নারীর জীবনে খুব বড় কোন পরিবর্তন আসে। জাতীয় আয় বাড়লে, রাজস্ব আদায় এগিয়ে গেলে, রেমিটেন্স উর্ধ্বমুখী হলে প্রথমেই লাভের মুখ দেখে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, এরপর পিতৃতন্ত্রের সুবিধাভোগী পুরুষ এবং তালিকায় সবশেষে থাকে নারীর নাম। যদিও তালিকা আপনাকে দেখাবে নারীকে তারা রেখেছে একেবারে প্রথম সারিতে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এইখানে তারা এক বিশাল শুভংকরের ফাঁকিতে ফেলে রেখেছে নারীকে।

সব সরকারই বলে, নারীর জন্য সব ধরণের সুযোগ সুবিধা দিয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্র তারা গড়বে। তাদের নীতিমালা বাজেট ইত্যাদিতে নারীকে নিয়ে গালভরা বুলি উপচে পড়ে। রাষ্ট্র হাতে নেয় নারীবান্ধব নীতি; এদিকে একইসাথে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠতে থাকে চরম নারীবিদ্বেষী সমাজ। যত দিন যাচ্ছে, এই সমাজের নারীবিদ্বেষ, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, মৌলবাদ ততই উৎকট চেহারা নিয়ে ফুটে উঠছে। তাহলে এই সমাজটা গড়ে উঠছে কীভাবে? কার মদদে?

দেশে কয়েক দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও নারী মানেই নারীবাদী নন। এদেশে ক্ষমতাবান নারীও আদতে একজন পুরুষ, পিতৃতন্ত্রের প্রতিনিধি।

তবুও আমরা প্রত্যাশার বীজ বুনি। প্রধানমন্ত্রী নারী। তিনি নারীর কষ্ট বুঝবেন। নারীর ক্ষমতায়ন হবে। তো রাষ্ট্রও দেখায় তারা নারীকে নানাভাবে সুবিধা দিচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ, চাকরিতে নারীর জন্য কোটা, সংসদে নারী আসন! শুনলে মন ভরে যায়। এদিকে বাস্তবে কী হচ্ছে?

ফুটপাথ থেকে মেয়েকে টেনে নিয়ে ঝোপে ফেলে ধর্ষণ করছে পুরুষ, মাদ্রাসার ভেতরে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি করছে প্রিন্সিপাল, প্রতিবাদ করলে গায়ে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে মারছে, তাও প্রকাশ্য দিবালোকে। যৌতুকের জন্য মরছে একের পর এক, আত্মহত্যা নামে চালিযে দেয়া হচ্ছে সব। প্রতিদিন কত শত শিশু ধর্ষণ হচ্ছে। ধর্ষণের পর হত্যা করে ফেলে রাখছে বাড়ির পাশের ডোবায়। ধর্ষণের মহামারী ছড়িয়ে গেছে গ্রাম থেকে শহরে, আনাচে কানাচে। রাস্তাঘাটে একের পর এক ঘটছে যৌন হয়রানির ঘটনা। অফিসে আদালতে মেয়েদের নানাভাবে বঞ্চিত আর প্রতারিত করা হচ্ছে। অনলাইনে নারীকে হয়রানি করছে প্রকাশ্যে। আর প্রতিটি পাড়ায় মহল্লায় মাইক লাগিয়ে মৌলবাদীরা চরম নারীবিদ্বেষী ওয়াশ চালিয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। হাজার হাজার মানুষ সেই ওয়াজ শুনছে।

এই যদি হয় নারীর সমাজ, এখানে রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর সুযোগ আসলে কোথায়? কাগজে কলমে যে নারীবান্ধব নীতিমালা, নারীর জন্য সেই নীতিমালা ‍কীভাবে সুফল বয়ে আনবে, যদি এই হয় সমাজের আসল চেহারা?

আপনি নারীকে শিক্ষার সুযোগ দিলেন। এদিকে ওয়াজ চলছে- নারীকে খুব বেশি পড়তে দেয়া যেন না হয়। আপনি নারীকে চাকরিতে সমান সুযোগ দিতে কোটা বানালেন। এদিকে অফিসে অফিসে যৌন হয়রানির কোন সুরাহা করলেন না। কোটার নামে লোক দেখানো নিয়োগ বন্ধ করলেন না। মাতৃত্ব ছুটি নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চতুর কৌশল আটকালেন না।

আপনি নারীকে গার্মেন্টসে ঢুকিয়ে জাতীয় আয় বাড়ছে বলে গর্বে ঢেঁকুর তুললেন। এদিকে গার্মেন্টসের পরিবেশের দিকে নজর দিলেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের বাথরুমে যেতে দেয়া হয় না, খাওয়ার সময় নেই, সময়মত বেতন নেই, থাকার ভাল জায়গা নেই, এমন সব অমানুষিক নির্যাতনে অতীষ্ঠ নারী শ্রমিকের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না। আপনি নারীর শিক্ষা, ক্যারিয়ার নিয়ে গালভরা বুলি ছাড়ছেন। অথচ কাজের জন্য বাইরে গিয়ে ধর্ষণ আর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারী। রাত বিরাতে বাইরে বেরুতে ভয় পাচ্ছে। তাহলে এসব কেমন নীতিমালা? এ কেমন নারীবান্ধব রাষ্ট্র তা আমার সত্যিই জানা নাই।

নারী উন্নয়ন ইস্যুতে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা কেমন সেটি বোঝা যায় সমাজের চরিত্র দেখেই। মনে রাখা উচিত, রাজনীতিতে ভারসাম্য আর কৌশল করতে গিয়ে যদি মৌলবাদীদের সাথে হাত মিলাতে হয়, তবে তার বোঝা টানতে হয় নাগরিকদের। আর সেই নাগরিকদের মধ্যে নারীর প্রতি অবিচারের দায় সবচেয়ে উৎকট হয়ে ধরা পড়ে। রাষ্ট্র যত মৌলবাদী ধর্মান্ধদের পিঠে হাত বুলিয়ে যাবে, ছাড় দেবে, ততই দুরূহ হয়ে উঠবে নারীর সমাজ। একদিকে গালভরা বুলি আর অন্যদিকে ধর্মান্ধতার হিজাব দিয়ে মুড়ে দিলে আর যাই হোক, নারীর জীবনে কোন সুস্থ পরিবর্তন আসবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমিক পাঠিয়ে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু এর প্রভাব হিসেবে দেশজুড়ে একটি শ্রেণির ভেতরে মধ্যপ্রাচ্যের চিন্তা চেতনা জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণের যে চেষ্টা ঢুকে পড়েছে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে, সেই দিকটিকে অগ্রাহ্য করেও নারীর উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব না। কারণ এর বড় শিকার হয়ে উঠছে নারীই। নারীকেই পড়তে হচ্ছে বোরখা হিজাব, নারীকেই ঢোকানো হচ্ছে ঘরে, নারীকেই বঞ্চিত করা হচ্ছে আধুনিক শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকে। ধর্মের নামে এই নতুন উদ্ভট জীবন পদ্ধতিকে গ্রাহ্যে এনে এর নাগপাশ থেকে নারীকে মুক্ত করার দায় কার?

রাজনীতি এক জটিল জিনিস। রাজনীতিই সবচেয়ে বেশি পিতৃতান্ত্রিক। তাই রাষ্ট্রও একই রকম পিতৃতন্ত্রের ধারক। যদি সে রাষ্ট্রের পরিচালক নারীও হন, তবু তিনি পিতৃতন্ত্রের বাইরে সহজে যেতে পারেন না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হয়তো তাকে সয়ে যেতে হয়। অথবা এমনও হতে পারে নারীবাদ বিষয়টি তার কাছেও স্পষ্ট নয়। তিনি নারীবাদ ভেবে আদতে পিতৃতন্ত্রেরই চর্চা করেন।

নারীদিবস নিয়ে তাই আমার খুব বেশি উচ্ছাস নেই বা এ দিনে আমি তেমন কোন আশা ভরসার কথা বলি না, ভাবি না। সমতার পৃথিবীর জন্য যুদ্ধ তো কেবল শুরু। যেতে হবে বহু বহুদূর। পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে করে এগিয়ে যাওয়া, পথ দুর্গম। আদতে পাশে কেউ নাই। যারা আছে তাদের অধিকাংশই মুখোশে ঢাকা। তবু পথ চলা তো থামিয়ে রাখা যায় না। সংগ্রাম চলবে তাই, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদের নোংরামির বিরুদ্ধে, নারীবাদের আড়ালে পিতৃতন্ত্রের সেবকদের বিরুদ্ধে আর অবশ্যই মৌলবাদ আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। কারণ এরাই নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু ও ঘাতক।

শারমিন শামস্। লেখক, নারীবাদী অ্যাকটিভিস্ট ও সাংবাদিক। জন্ম ২৬ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের খুলনায়। লোকপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পেশায় সাংবাদিক। দীর্ঘদিন কাজ করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়। বর্তমানে নারীবাদী অনলাইন ম্যাগাজিন ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের প্রকাশক ও সম্পাদক।  নারীবাদ তার...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ