চিরদিন আছে মিশে

রোমেনা লেইস
গল্প
Bengali
চিরদিন আছে মিশে

সকাল থেকে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে।মিতা আর রানী দুজনেই রোকেয়াহলের মেইনবিল্ডিং এ তিনতলার রুমে থাকে। মিতার বাড়ি নড়াইল।কলেজ শিক্ষক বাবার বড় সন্তান ।ইতিহাস নিয়ে পড়ে।এবার সেকেন্ড ইয়ার।সাবসিডিয়ারির ঝামেলা শেষ হয়েছে।আগামী বছর অনার্স হয়ে যাবে।ওর ছোট আরো দুই ভাই আছে।ওরা একজন কলেজে।আর একজন ক্লাস টেন এ পড়ে।মিতার মা হাই স্কুলের এসিসট্যান্ট হেড টিচার। । ওর বাবা নড়াইলে সরকারী কলেজের ইতিহাসের প্রফেসার ।

রানীর বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি ।রানীর আরো তিনটা বোন।কলেজে একজন আর ছোট দুইজন স্কুলে।একজন নাইনে আর একজন টেনে।রানীর বাবা ব্যবসা করেন। ওর ভাই সবার বড়।ভাই আর বাবা মিলে ব্যবসা দেখাশোনা করেন দাউদকান্দিতে।রানী পড়ে বাংলায় অনার্স নিয়ে।এবছর ফাইনাল দিবে।রানীর মা গৃহিনী ।

এই রুমের আরেকজন বাসিন্দা চিত্রা।সে পড়ে ফিলসফিতে অনার্স ।তার ফাইনাল সামনে।পড়তে পড়তে তার পাগল হওয়ার অবস্থা ।এরমধ্যে আবার প্রেমও করে।ওর প্রেমিক একই ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করে সেই ডিপার্টমেন্টেই জয়েন করেছে।সেই ছেলে পরীক্ষার আগেই বিয়ে করতে চাপ দিচ্ছে ।তাই চিত্রার মনমেজাজ সারাক্ষণই উতলা।চিত্রার বাড়ি রংপুরের কুড়িগ্রাম।বাবা আইনজীবী ।মা প্রাইমারী শিক্ষক ।ওর মা ভীষন সমাজ সচেতন।নিজে গান করেন।।উদিচীর সাথে জড়িত।গান শিখিয়েছেন সব সন্তানদের।চিত্রার বড় এক ভাই আর ছোট এক ভাই ও দুই বোন।এক ভাই আর একবোন মেডিকেলে পড়ে।অন্য ভাই বোনরা পড়ে স্কুলে।

রাজশাহী খুলনা চট্টগ্রামে গুলি করে নিরাপরাধ মানুষ হত্যার প্রতিবাদে প্রতিদিন ই অসন্তোষ মিছিল জোড়ালো হয়ে উঠছিলো ।রানীর এক মামা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স এর ছাত্র ছিলেন।মার্চের প্রথম সপ্তাহে মন্নুজান হল থেকে ছোটবোনকে নিয়ে আরেক বোনের বাসায় যাচ্ছিলেন ।তখনই আচমকা গুলি করে জনতার উপর ।রিকশাওয়ালার গায়ে আর রাণীর মামার পায়ে গুলি লাগে।খালার গায়েও লাগে।কোনোরকমে কে বা কারা তাদের ইউনিভার্সিটির মেডিকেল সেন্টারে পৌঁছে দেয়।রানীর মামাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়।গভীর রাতে উনার এক ভাই যিনি সার্জন উনি সার্জারী করে গুলি বের করেন।পরে গোপনে তাকে এক বাসায় সরিয়ে দেন।নতুবা ছাত্র আন্দোলনে জড়িত দেখিয়ে আ্যরেস্ট করা হতো।পরে পালিয়ে শিলিগুড়ি পৌঁছান।

শেখ মুজিবের সাতই মার্চের ভাষণের পর ব্যাপক ধড়পাকড় চলছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতাদের দিকে নজরদারি বেশী।এসব কথা গভীর রাতে ওরা চুপচুপ করে আলোচনা করে।বিছানায় শুয়েও মনটা আজ আনচান করে।বাড়ির কথা মনে পড়ে।এক্সটেনশন বিল্ডিং এর তক্ষকটা ক্ষণে ক্ষণে ডেকে ওঠে।একসময় ঘুমিয়ে পড়ে সবাই ।

আচমকাই ঘুম ভেঙ্গে গেল।চলচ্চিত্রে দেখা যুদ্ধের ছবির মত গুলির শব্দে ।মুহূর্মূহু গুলি আর আকাশ জুড়ে বিদ্যুতের ছুটাছুটি ।প্রথমে ভাবলো স্বপ্ন !একটু পরেই বুঝলো না।সত্যি সত্যি সত্যি গোলাগুলি হচ্ছে ।যুদ্ধশুরু হয়ে গেল নাকি! ।এখন কী করবে? একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো ।মেঝেতে শুয়ে পড়ে সবাই।

গোলাগুলির শব্দ ছাপিয়ে কখনো চিৎকার কান্নাকাটির শব্দও আসছে। অন্ধকারে ওরা ক্লোজেটের ভিতরে ঢুকার চিন্তা করলো।পরে চিন্তা করলো বাথরুমে ঢুকে তিনজনেই একসাথে থাকবে ।ওরা বাথরুমের উপরে পাটাতনমত জায়গায় দুইজন উঠে গেল।তারপর দরজা খোলা রেখে তৃতীয় জনকে টেনে উঠালো ।নিঃশ্বাস বন্ধ করে সময় পার করছে।ওরা বুটের শব্দ শুনলো ।লাথি মেরে দরজা ভেঙ্গে ঢুকলো ওরা।বাথরুমে উঁকি দিয়ে কাউকে নাপেয়ে তিনটা ক্লোজেটের দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেঙে ফেলার শব্দ হলো।কেউ নেই ভেবে একসময় চলে গেল।নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে এযাত্রা বেঁচে গেল মনেকরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ওরা।

গুলির শব্দের মধ্যে নারী কন্ঠে চিৎকার শুনে শিউরে উঠছে বারবার।একসময় সবকিছু থেমে গেলো যেন।স্তব্ধ রাতের অন্ধকার চিড়ে পূর্বাকাশে ঈষৎ আলো ফুটে উঠছে।রানী সাহস করে নামলো।পেছনের বারান্দায় চেয়ে মনে হলো আক্রমণ কারীরা চলে গেছে।সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে নামতে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় অনেককে পড়ে থাকতে দেখলো ।পাশের রুমের মেয়েটিকে অর্ধমৃত উলঙ্গ পড়ে থাকতে দেখে জড়িয়ে ধরতে চেয়েও সাহস করে পেছনে আর তাকাতে পারলো না।কিচেনের দিকে গিয়ে হাউস টিউটরদের বাসার গেটের পাশে যে একটা কাঁঠালগাছ ছিলো সেই গাছে চড়ে পাচিল টপকে বাইরে আসলো ওরা।রক্তের গন্ধে বমি আসছে কিন্তু ওদের শুধু নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর চিন্তা ।

ওদের মধ্যে সবচেয়ে দূর্বল রানী।ওর পাঁচফুট তিন ইঞ্চির শরীরের ওজন পঁচানব্বই পাউন্ড।বাইরে বের হতেই দেখলো অনেক মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত ।ফুলার রোডের অন্ধকারে সবাই দৌড়াচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো ওরা কোথায় যাবে ? রানী বলে দাউদকান্দি সবচেয়ে কাছে।নড়াইল আর কুড়িগ্রাম অনেক দূর।চল সবাই একজায়গায় থাকি। একদল মানুষ যারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হাঁটছে তাদের সাথে হেঁটে হেঁটে ওরা পৌঁছে গেল ফুলবাড়িয়ায় ।ফুলবাড়িয়া থেকে কুমিল্লা সিলেট অঞ্চলের বাস ছেড়ে যায়।ওদের সাথে হাঁটছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসার আব্দুল বারী পরিবার পরিজন নিয়ে।ফুলবাড়িয়া থেকে কারফিউর কারণে কোন বাস ছাড়বে না।তখন বারী সাহেব বললেন দ্রুত সদরঘাট যেতে হবে।নৌকাই একমাত্র বাহন।যদি লঞ্চ পাওয়া তাহলে ভাগ্য।
একটা নৌকা পাওয়া গেলে।

নৌকাটা বেশ বড়।আঠারো জন মানুষ নিয়ে নৌকা ছেড়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো।চিত্রার মন ভীষণ খারাপ ।সুমিতের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবে।সুমিত পুরাতন এলিফ্যান্ট রোডে এক বাসায় ভাড়া থাকে।ওই বাসার বাড়িওয়ালার ল্যান্ড ফোন আছে।দুএকবার ফোন করেছে। ওরা সুমিতকে ডেকে দেয়।সুমিতের মন খুব পরিস্কার ।সে উনাদের বলেছে যে চিত্রা ওর বাগদত্তা।সামনের মাসেই বিয়ের পরিকল্পনা করেছিলো।এখন কীভাবে সুমিতকে খুঁজে পাবে! বারী সাহেবের কাছে শুনলো

-ইকবালহলেই প্রথম আক্রমণ শুরু করে।ওখানে কেউ বেঁচে নেই মনেহয় ।

–সূর্যসেন হল?

-ওখান থেকে ছেলেরা কিছু পালিয়ে বাঁচতে পেরেছে মনেহয়।বারী সাহেব ফুলার রোডের বাসা থেকে সপরিবারে বেরিয়ে এসেছেন।বারী সাহেব বললেন নৌকা মুন্সিগঞ্জ যাক প্রথম ।ওখানে গিয়ে প্রথম অবস্থা যাচাই করে তারপর সীমান্ত পার হয়ে আগরতলা বা ত্রিপুরা চলে যেতে হবে।তিনটা মেয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের।মিতা তার ডিপার্টমেন্টের ।তিনজনের বাড়ি তিনদিকে।রানীর বাড়ি দাউদকান্দি ।মিতার নড়াইল আর চিত্রার বাড়ি কুড়িগ্রাম ।

তার নিজের দুটি ছেলেমেয়ে ।সেভেনে পড়ে ছেলে তুষার আর কণা পড়ে টেনে।তার স্ত্রী ঝর্না উদয়ন স্কুলের টিচার।গতকাল কারফিউ দেয়ার আগে পর্যন্ত কিছুই আঁচ করতে পারেননি।তবে কারফিউ দেয়ার পর কিছু ঘটতে পারে বারবার এমনই মনে হচ্ছিলো ।

নৌকায় শাঁখারীবাজারের এক হিন্দু ব্যবসায়ী উঠেছেন পরিবার পরিজন নিয়ে।শাঁখারীবাজারে পৈত্রিক ব্যবসা তার ।বৃদ্ধ বাবা তিনভাই তিনি আর তার স্ত্রী।উনার দুই বাচ্চা।আর এক বোন আর দোকানের কর্মচারী দুইজন।মূলত নৌকাটা তিনিই ঠিক করেছেন।ঐ সময় বারী সাহেব নিজের পরিচয় দিয়ে সাহায্য চাইলে তিনি রাজি হন।তাদের বাড়ি লৌহজং।মতিলাল বাবু।বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ।শরীরে একটু থলথলে ভাব।তার স্ত্রী ঝুমা ছিপছিপে ।খুব ফর্সা ।সিঁদুর ধুয়ে ফেলেছে।হয়ত অনেক ঘষাঘষি করেছে তাই কপাল লালচে হয়ে আছে।বয়স পঁচিশ ছাব্বিশ হবে। বড় বাচ্চাটি সাত আট বছরের ।আর ছোটটি পাঁচ বছর।মতিলাল বাবুর বাবা হরলাল বাবু ।বয়স ষাটের মত।হরিনাম জপ করছেন।

মদনলাল ,মোহনলাল, রতনলাল তিনভাই।দোকানের কর্মচারীর একজন লিটন আর একজন খোকন।মাঝি দুজনের একজন হিন্দু আর একজন মুসলিম ।তাদের বাড়ি নবাবগঞ্জের চুড়াইন । মালোপাড়ায় বাড়ি শিবুর।আর দবির আলীর বাড়ি মুন্সিপাড়া ।নৌকা মাঝনদীতে এখন।গতরাতের অন্ধকারকে কাল করে রক্তাক্ত করেছে যে ভয়ংকর তা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে ই যেন সূর্য উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে আজ।আজ শুক্রবার ।নদীর বুকে অনাবিল শান্ত পরিবেশ।কিন্ত আকাশে শকুন আর চিল উড়ছে।।নাকের কাছে বারুদ আর রক্তের গন্ধ।

মতিলাল বাবুর কর্মচারী লিটন আর খোকন খুবই করিতকর্মা ।চালডাল আর আলু মিশিয়ে বেশ নরম খিচুড়ি রান্না করে ফেললো।বাচ্চারা সকাল থেকে মুড়ি খেয়েছে।ওরা রান্না করে থালা বাটিতে করে সবাইকে খেতে দিলো।সাথে ডিমভাজা।মিতা আর চিত্রা কেঁদেই চলেছে।রানী মনের দিক দিয়ে ওদের চেয়ে শক্ত ।সে কাঁদছে না।খাবারের ঘ্রাণ আসতেই ও অনুভব করলো ওর অনেক খিদে লেগেছে ।নিজে ঝটপট খেয়ে নেয়।চিত্রাকে বলে

—শোন তোরা না খেলে নৌকা যখন ঘাটে ভিড়বে পাকিস্তানী সেনারা তাড়া করলে দৌড়াতে পারবি না।ধরা পড়বি।আর ধরা পড়লে কী হবে চিন্তা কর। সুমিতস্যারকেও আর দেখতে পাবি না।

ওর কথায় কাজ হয়।যারা খেতে চাচ্ছিলো না সবাই খেয়ে নিলো।খাবারটাও যেন অমৃতের মত লাগলো আশেপাশে আরো কিছু নৌকা কখনো কাছাকাছি আসলে সবাই কথা বলার চেষ্টা করে।কে যায়? কই যাবে?

মুন্সিগঞ্জ বাজারে থেমে বারীসাহেব আর মতিলাল দ্রুতই গিয়ে বারী সাহেবের বাড়িতে দেখা করে আসলেন।উনার বাবা মা কেউ বেঁচে নেই।বৃদ্ধ চাচা আর চাচী।উনাদের বলে আসলেন আমরা ইন্ডিয়ায় চলে যাচ্ছি ।রেডিওর জন্য চান্দা ব্যাটারী দুই জোড়া নিলেন।

মতিলাল বারী সাহেবের সাথে আলোচনা করতে থাকেন।নদীপথে কোথায় কোথায় বিপদ্জনক পরিস্থিতি বিদ্যমান ।বারী সাহেব বলেন
–রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ি ওরা আক্রমন করেছিল।আর পিলখানাও মনেহয় ওদের টার্গেট ছিলো ।বিশ্ববিদ্যালয় ওদের অন্যতম টার্গেট ।এখন ওরা রাজশাহী , চট্টগ্রাম ,খুলনা,যশোর, কুমিল্লাসহ দেশের বড় বড় শহর গুলো দখলের জন্য পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।ভৈরব আর আশুগঞ্জ ,কুমিল্লা,যশোর ক্যান্টনমেন্ট , সৈয়দপুর, রাজশাহী এগুলো দখলে নেয়ার চেষ্টা করবে।

মদন ,মোহন ,রতন ওরাও মাঝে মাঝে মাঝিদের হাল ধরে সাহায্য করছে।রতনের হাতে একটা হারমোনিকা।সে একটু পরপরই
-‘কারার ঐ লৌহকপাট বাজাচ্ছে।আর বাজাচ্ছে ।

‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা
আমাদের ই বসুন্ধরা।’

—বাবু লৌহজং আইস্যা পড়ছি।লৌহজং এ সবাইকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন মতিলাল বাবু।বাড়িতে এক বিধবা পিসি আর কাকু থাকেন।ঐ সময়ই সবজি ডিম রান্না হল।খাওয়া দাওয়ার পর বাচ্চারা সবাই ক্নান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লো।বারী সাহেব তার স্ত্রী ঝর্না মতিলাল বাবু আর রানী,চিত্রা,মিতা বাংলাদেশের ম্যাপ নিয়ে কথা বলছেন।বারী সাহেব বললেন
-আমরা নৌকায় গজারিয়া চলে যাই মেঘনা পারি দিয়ে।ওখান থেকে পায়ে হেঁটে বাস রাস্তায় উঠে বাসে দাউদকান্দি যেতে পারি।ওখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব আগরতলার সব চেয়ে কাছের বর্ডার দিয়ে বের হয়ে গেলে রক্ষা।বারী সাহেব আর মতিলাল বাবু বাজারে গিয়ে শুনলেন ঢাকা থেকে আসা এক পরিবার ফরিদপুর যাবে।কথা বলতে গিয়ে দেখেন তার ডিপার্টমেন্টের এক ছাত্র মিহির তার বড়ভাই আর তার পরিবার ।তখন মিতার কথা বললে ওরা রাজী হয়ে গেলেন।মিহির বললো সে মিতাকে নড়াইল পৌঁছে দিবে।মিহিরকে নিয়ে মতিলালের বাড়ি আসলেন।অশ্রু জলে গলা জড়িয়ে ধরে বিদায় নিয়ে গেলো মিতা।

মতিলাল বলেন

—আমরাত হিন্দু।আমাদের আর বাঁচার কোন উপায় নাই ।এই দেশে জন্ম।বাপদাদার ভিটা এখানে।এখন আমাদের জান বাঁচানোর জন্য পালায় যাইতে হচ্ছে।
রানী বলে

—স্যার আমাদের বাড়িতে চিত্রাদি থাকতে পারে।

—আমি ওর উপর ছেড়ে দিবো।তবে তোমাদেরও বর্ডার ক্রস করে ওপারে যাওয়াই নিরাপদ ।

–দাদা আমি মূর্খ মানুষ ।ম্যাপ রাস্তা কিছুই বুঝি না।আপনি আমাদের সাথে চলেন।বুকে বল পাই।মতিলাল বলেন।

-এখন একটু ঘুমিয়ে নাও সবাই।বারী সাহেব বলেন।

খুব ভোরে উঠে নৌকায় চাল ডাল বিছানাপত্র টাকা ঘটিবাটি চিড়ামুড়ি গুড়,যতটুকু নেয়া যায় নিয়ে আবারো রওয়ানা হলো ওরা। মাঝিরা বললো

-বাবু পাল তুইলা দিলে দাউদকান্দি যাইতে পারবো দুপুরের পরেই।নৌকায় যাইগা।গজারিয়া গেলে হাটন লাগবো ম্যালা রাস্তা।কর্তা কী হাঁটতে পারবো? তখন উনারা মত পাল্টে নৌকায় যাওয়াই স্থির করলেন।
মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছে নৌকা।চিত্রা করুণসুরে গাইছে

“ওকি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে
কোনদিন আসিবেন বন্ধু কয়্যা যান
কয়্যা যান রে।”

এ যেন গান না হৃদয়ের করুণ কান্না সুরে সুরে ঝরে পড়ছে।

সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছে।পাখী আর বাদুরেরা দলে দলে নীড়ে ফিরছে।চিত্রা হঠাৎ আকুল হয়ে কান্না শুরু করে।মা বাবা ভাই বোন কে কীভাবে ফিরে পাবে!মতি লালের বাবা আর স্ত্রী তাকে বুঝাতে থাকেন

—কেঁদো না।ভগবানকে ডাকো।এখন তিনিই একমাত্র ভরসা।

 

দুই)

এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় তিনতলার ছাদে হাফ পরশনে একরুমের বাসা সুমিতের।রাতে কারফিউ দেয়ার পরপরই বাসায় চলে আসে।একটা বই নিয়ে স্টাডি করছিলো সুমিত। ঘড়ির কাটা সবে বারোটা পার হয়েছে ।এমন সময় মর্টার আর ব্রাশফায়ার শুরু হলো।কিছুটা সময় মেঝের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে।দ্রুত চিন্তা করে নেয়।রোকেয়াহলে চিত্রা আছে।ওদিকেই আওয়াজ হচ্ছে বেশী।

আমি বাড়ি যাচ্ছি’— লিখে সেঁটে দিলো দরজায় ।দরজায় তালা দিয়ে নীচে নেমে হেডলাইট না জ্বালিয়ে হোন্ডায় করে প্নেন মসজিদের পাশের বাসা থেকে ওর বন্ধু জীয়নকে নিয়ে নিলো।জীয়ন ফিলসফিতে মাস্টার্স করে ইডেন কলেজে চাকরী করে ।ওরা খুব সাবধানে অলিগলি দিয়ে বের হয়ে গেল টঙ্গী।হোন্ডা ছুটিয়ে জয়দেবপুর পৌঁছালো যখন তখন একটা চায়ের দোকান মাত্র খুলেছে।ওরা চায়ের কথা বলে দোকানের লম্বা বেঞ্চে শুয়ে পড়লো।মাথা কাজ করছে না সুমিতের।চিত্রাকে কোন অবস্থায় কিভাবে ছেড়ে যাচ্ছে ভাবতে গিয়ে মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়।একবার মনেহয় ফিরে যাবে রোকেয়া হলের দিকে।এত গোলাগুলি এতো আক্রমণ সেখানে ফিরাটা আত্মহত্যার মত হবে।মনকে প্রবোধ দিলো নিশ্চয়ই চিত্রা বেঁচে আছে, ভাল আছে।আবার দেখা হবে।পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে।

ওরা ঢাকা ছেড়ে যেতে যেতেও মূহুর্মুহু গুলির শব্দ আর আকাশে বিদ্যুৎ চমকের মত মর্টারের গোলা ফুটতে দেখেছিলো।ওরা শ্রীপুর বাজারে জীয়নের বড়ভাইর দোকানে পৌঁছালে ওর ভাই বললো গ্রামের বাড়িতে কয়েকদিন থাকতে।ওরা বাড়ি গিয়ে রেডিও যোগাড় করে ভয়েস অব আমেরিকা আর বিবিসি শুনলো।বিশ্ববিদ্যালয় , রাজারবাগ পুলিশ লাইন আর পিলখানায় হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষ।জীয়নকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে সুমিত।

বারবার বলতে থাকে
-আমি কী ভুল করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রার খোঁজ না নিয়ে চলে এসে?

জীয়ন বলে
-দোস্ত আমাদের হাতে সময় কম।চল আমরা যত শর্টকাটে পারি ইন্ডিয়ায় চলে যাই।
ওরা হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে বের হওয়ার চিন্তা করলো। আঠাশে মার্চ ওরা হালুয়াঘাট সীমান্ত অতিক্রম করে পৌছে গেল জয়রামকুড়া গ্রামে ।

তিন)

বিকেলের রোদ মরে আসছে।গরুর পাল নিয়ে রাখাল বাড়ি যাচ্ছে ।অল্পক্ষণ পরে অন্ধকার চিড়ে বিন্দু বিন্দু আলো দেখে মাঝি শিবু বলে ওঠে

–বাবু দাউদকান্দি আইস্যা পড়ছি।এসময় ওদের নৌকা দাউদকান্দি পৌঁছালে তীরে উঠে রিকশা পেয়ে গেল।রিকশায় রানী আর চিত্রাকে নিয়ে বারী সাহেব আর তার স্ত্রী গেল রানীদের বাড়িতে ।রানীর বাবা মা প্রথমেই মেয়েকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদলেন।পরে বারী সাহেবকে বার বার ধন্যবাদ জানালেন।হরলালবাবু সহ মতিলাল আর তার পরিবারকেও রানীদের বাড়িতে নিয়ে গেল।রাতে মোহনলাল বিবিসি ধরে খবর শুনলো।খবর শুনে চিত্রা ডুকরে কেঁদে উঠলো।তার কেবলই মনে হতে লাগলো সুমিত নিশ্চয়ই বেঁচে নেই।চিত্রা বললো সে বারী স্যারের সাথে ইন্ডিয়ায় চলে যেতে চায়।

মিতা লৌহজং থেকে লঞ্চে ফরিদপুর চলে গেল মিহির দের সাথে।মন খুবই খারাপ ।ফরিদপুরে ওর এক খালা থাকে সরকারী বালিকা বিদ্যালয় এর কোয়ার্টারে ।খালা ওখানকার এসিসট্যান্ট হেড মিসট্রেস।মিহির ওকে পৌঁছে দেয় ওদের বাসায় পরদিন খালু সকাল সকাল বাসে করে নড়াইল ওদের বাসায় পৌঁছে দেন।বিকালের বাসে খালু আবার ফিরে চলে গেলেন ফরিদপুর ।ওদের বাড়িতে মিতাকে পেয়ে খুশীর হাট বসে।মিতার বাবা মা বললেন

-• যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রচুর পাকিস্তানী আর্মি এসে গেছে।এরা ছড়িয়ে পড়ছে শহর গুলিতে।আমরা সরকারী চাকরিজীবি তাই চোখ মুখ বুজে পড়ে আছি।নতুবা পাড়ার সবাই ইন্ডিয়ায় চলে গেছে আমরাও চলে যেতাম।তোর জন্যও অপেক্ষায় ছিলাম।

-• আজ রাতেই চলো আমরাও ইন্ডিয়ায় চলে যাই।বাবা বলেন মিতাকে।

–না বাবা আর দুইটাদিন থাকি।

পরেরদিন গভীর রাতে আর্মিরা কয়েকটি জীপ নিয়ে ঢুকে পড়লো নড়াইল শহরে।মিতাদের বাসা কলেজ ক্যাম্পাসে ।ঠক ঠক ঠক্।কড়া নড়ছে।মিতার মা মিতাকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিলেন।মিতার মা ও মিতাকে অনুসরণ করলেন।মিতার বাবা দরজা খুলতেই ওরা উনার দিকে বন্দুক তাক করে বললো

-•আপকা বিবি আউর লারকী কাহা?

-•ঢাকা।

-•ঝুট মাত বলো।তুমারা বিবি কিধার?

আর তখনি গুলি করলো।গুলির শব্দ শুনে ওর দুই ভাই বাবার দিকে ছুটে গেলো ব্রাশফায়ার করে ওদের মেরে ফেললো।ওদের আর্ত চিৎকার শুনে তখনই মিতা আর ওর মা ঘুরে বাড়ির দিকে চলে আসে।বাবা আর ভাইদের লাশের কাছে ছুটে যাচ্ছিলো যখন তখন ওরা ক্রুর হাসি হেসে মিতাকে জাপ্টে ধরলো।মিতাকে জীপে তুলে নিয়ে চলে গেলো।জীপের ভেতরই মিতাকে রেপ করলো।মিতা জীপ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিলো।এক অফিসার ওকে জাপ্টে ধরে রাখে।ওরা মিতাকে নিয়ে গেলো যশোর ক্যান্টনমেন্টে ।মিতার মাকে বেশী বাঁধা দেয়ায় গুলি করে ফেলে দিলো জীপ থেকে।

বারী সাহেবের পরিবার ,মতিলালের পরিবার আর রানীদের পরিবার সবাই নৌকায় করে মুরাদনগর হয়ে কসবা যাবে।পরদিন খুব ভোরবেলায় রওয়ানা হয়ে গেল।ছোট বাচ্চাগুলো তুষার ,কণা ,রূপক আর ঝুমনী সবাই যেন কতো বড় হয়ে গেল।কেউ খাবার নিয়ে কোন বায়না করে না। যা খেতে দেওয়া হয় খেয়ে নেয়।ওরা মুরাদনগরে পৌঁছালে হরলালবাবুর প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হলো।হাসপাতালে নিয়ে গেলেন মদনলাল আর মতিলাল ।আর্মির চেকপোস্টে ওদের আটকানো হয়।তারপর হঠাৎই গুলি করে।কোনরকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এলেন মতিলাল ।হরলালবাবু গুলিতে মারা গেছেন।মতিলাল মদনকে আর খুঁজে পেলেন না।কান্নাকাটি চললো।নৌকা ঘাট থেকে সরিয়ে একদিন একরাত তবু অপেক্ষায় থাকলো সবাই মদনলালের জন্য।পরদিন ভোরবেলায় মতিলাল বলেন

-• নৌকা ছাড় মাঝিভাই।এতোগুলান মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিতে পারবো না।মদন বেঁচে থাকলে আগরতলা আসবে।কান্নায় ভেঙে পড়ে ঝুমা।

-• বাবা বাবা গো।আমারারে ছাইড়্যা কই গেলেন?

বাচ্চা দুটিও কাঁদতে থাকে।ওদের বুকে জড়িয়ে রাখে রতন আর মোহন।বারী সাহেব আর তার গিন্নী ও ছলছল চোখে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়েন।চার পাঁচদিনে সবাই যেন অনেক আপণ হয়ে গিয়েছিলো ।ঝুমাকে কলেমা শিখিয়ে দিলেন মিসেস বারী।চিত্রাও শিখে নিলো কলেমা।

-• জয় হরি বলে নৌকা ভাসায় শিবু মাঝি।দবীর আলী মাঝি আল্লাহ র নাম নিয়ে নৌকা ছাড়লো ।

দেবীদ্বার এসে নৌকা ছেড়ে সবাই হাঁটতে শুরু করে।বেশ কিছু পথ হাঁটার পর বাসের জন্য দাঁড়ালো ।বাস আসলে সবাই উঠে পড়লো বাসে।আল্লাহ আল্লাহ বলে বাস ছাড়লো । কসবা আসতে আর বেশী বাকী নাই।এমন সময় সামনে আর্মির গাড়ির বহর।সবাইকে বাস থেকে নেমে লাইন ধরে দাঁড়াতে বললো।লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই সৃষ্টিকর্তার নাম নিচ্ছিলো

-•নাম ক্যায়া মতিলালকে জিজ্ঞেস করে

-•মোঃ মতিন

-•কিধার যাওগী?

-•ঘর

-•ঘর কি ধার?

-•কসবা মে।

কালেমা জানতা হ্যায়?

-•বিসমিল্ল্ল্লাহ হিররাহমানির রাহীম।

লা ইলাহা ইল্লাল্লা মুহাম্মদ উর রাসুলউল্লাহ।

-•যাও

গাড়িতে উঠতে ইশারা করলো।এরপর ঝুমা আর বাচ্চারা ।

-•আপকা নাম?

-•মোছাঃজামিলা বেগম।

-•যাও।

তারপর একে একে চিত্রা ,রানী,রানীর বাবা মা ভাই বোন , বারী সাহেব আর তার পরিবার সবাইকে ছেড়ে দিলো।কিন্তু মতিলাল বাবুর পিসি আর কাকাসহ আর গাড়ির আরো কিছু প্যাসেঞ্জারকে নীচে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি ছাড়তে বললো।ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলো অমনি গুলির শব্দ হলো ঠাস ঠাস ঠাস।

-•পিসিমা

বলে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন মতিলাল ।আর সাথে সাথে মোহন ,রতন, ঝুমা আর অন্যরাও কেঁদে ওঠে ।কসবা এসে পৌঁছালে গাড়ি থেকে নেমে ওরা কাছেই এক বাড়িতে গিয়ে পানি খেতে চাইলো।গ্রামের মাতবর ধরনের এক লোক বললো

-•আহা আপনাদের দেখে খুবই ক্লান্ত লাগতেছে।আমার বাড়িতে চলেন।বলে উনার বাড়িতে নিয়ে দুধ খই মুড়ি কলা খেতে দিলেন।রতন আর মোহন কাউকে কিছু না বলে দক্ষিণে হাঁটতে লাগলো।

বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়ে ওরা সবাই ঝিমাচ্ছিলো।তখন ওই বাড়ির লোকেরা বারবার বলছিলো

-•তোমাদের জন্যি রান্না করতেছে।তোমরা হাতমুখ ধোও।গোসল করো।ওরা সবাই বাড়ির পুকুরঘাটে পানিতে নেমে গোসল করতে যায়।চিত্রা বলে

-•এদের আমার কেন যেন বেশী সুবিধার মনে হচ্ছে না।আমাদের আজ রাতের আগেই এখান থেকে চলে যেতে হবে বুঝলি রানী?

রানীও বলে
_•ঠিক বলেছ।

-•আচছা তিন্নী ,রিনি আর মিনিকে ডাক।রানী ওর ছোট বোনদের ডেকে আনলো।

-•শোন তোরা কে ভাল রানার? দৌড়াতে পারিস?

তিন্নি বলে
-•আমি।বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমি ফার্স্ট হই।

-•একশমিটার না দুইশ?

-•দুইশ।

-•আচ্ছা।

-•শোন আমরা পাঁচজন কিছুক্ষণ পরেই বর্ডারের দিকে হাঁটা মানে দৌড় শুরু করবো।বারী সাহেবকেও বললো চিত্রা সব প্ল্যান । ।একসাথে সবাই গেলে সন্দেহ করবে তাই একজন দুজন করে যেতে হবে।

মতিলাল বারী সাহেবকে বলেন
-•ইন্ডিয়ায় গিয়ে আমি ট্রেনিং নিবো ।তারপর আমি কুমিল্লায় ফিইরা আসবো।আমার প্রতিশোধ নিতেই হইব।আমার বাবা ,কাকা আর আমার পিসি নিরাপরাধ সাধারণ মানুষ তাগো ক্যান হত্যা করলো?

চারটার দিকে ওদের খাবার দিলো খেতে।খেয়ে সবাই শুয়ে আছে তখনই ওরা পাঁচজন প্রথমে দুজন পরে দুজন বের হয়ে গেল।সবার শেষে চিত্রা বের হলো ।জয়নাল মুন্সী নামের মাতবর লোকটি দেখে ফেলে ওকে।বলে

-•আম্মা কই যাইন?

-•না গ্রামটা দেখি।চাচা রেললাইন কতদূর? এই রেললাইন কী ইন্ডিয়া চলে গেছে?

-•না তবে দেড়মাইল দূরের স্টেশনের থেইক্যা বর্ডার কাছেই,আধামাইল।

–•ট্রেনলাইনটা দেইখ্যা আসি চাচা?

কিছুক্ষণ পরে রানীর ভাই রাসেল বের হয়ে আসে।রাসেল দেখে ওখানে একটা সাইকেল আছে।বলে

-•চাচা আমি সাইকেল নিয়ে একটু চক্কর দিয়ে আসি?

অনুমতির অপেক্ষা না করেই চলে যায়।প্রথমে অন্যরা যেদিকে গেছে সেদিকে না যেয়ে ও যায় উল্টা দিকে।গ্রামের একটা বাচ্চাকে

-•বর্ডার কোনদিকে জানতে চাইলে বলে

-•ওইদিকে

আঙ্গুল দিয়ে দেখায়।সাইকেল চড়ানোর কথা বলতেই রাজী হয়ে গেল।রাসেল ওকে সাথে নিযে গিয়ে স্টেশন দেখে ফিরে আসলো।ওর সময় লাগলে বিশ মিনিট।ও ফিরে এসে তুষার আর রূপককে নিয়ে চলে যায়।ও স্টেশনের কাছে বর্ডারে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে ।কিছুক্ষণের মধ্যে রানী আর চিত্রারা এসে যায়।ওদের কাছে বাচ্চাদের দিয়ে রাসেল বলে

-•তোমরা একটু অপেক্ষা করো।আমি আবার আসছি।রাসেল এইবার গিয়ে ঝুমনী আর কণাকে নিয়ে আসলো।

-•তোরা বর্ডার পার হয়ে যা।ছোট একটা টর্চ ছিল সেটা রানীকে দিয়ে দেয়।বলে অন্ধকার হয়ে গেলে মাঝে মাঝে আলো জ্বালাবি।তাহলে আমি বুঝবো তোরা কোথায় আছিস।

-•ভাইয়া দেরী করিস না।

রানীর বাবা , বারী সাহেব আর মতিলাল বাবু মাগরিবের নামাজের পর পরই জয়নাল মুন্সীকে বললেন
-•আমরা এখন চলে যেতে চাই।

-•না না আইজ না । কাইল সকাল সকাল যাইয়েন।আইজ একটু রান্নাবান্না করুক।মুরগী রান্না করতেছে।খাসী জবাই দিছি।বারী সাহের বললেন

-• আপনার অনেক দয়ার শরীর। কিন্তু আমাদের যে যেতেই হবে।

জয়নাল মুন্সী বলে
-•মাইয়া গুলা আসুক।

–•ওদের রাস্তায় পেয়ে যাব।আসি স্লামালাইকুম বলে উনারাও হাঁটতে শুরু করলেন।

-•আপনারা এখন যাইতে পারবেন না।কিছুটা রাগত সুর মুন্সীর।

-•আপনার ছেলে আমার সাইকেল নি গ্যাছে।সে আসুক।মাইয়াগুলা আসুক।সাইকেলে রাসেল আসলো।সাইকেল রেখে বললো

-•আসি চাচা।স্লামালাইকুম।

 

চার)

স্টেশনের কাছে পৌঁছালো ওরা যখন তখন পেছনে দূরে বিন্দু বিন্দু আলো দেখে রাসেল বুঝে গেলো আর্মির গাড়ির বহর।ওরা দ্রুত একটা বাড়ির পিছনে গিয়ে লুকিয়ে গেল।রাসেল,ওর মা ,বারী সাহেব তার স্ত্রী ঝর্না আর ঝুমা । মতিলাল আর রানীর বাবা নিঃশ্বাস বন্ধ করে গোয়ালঘরে বসে আছেন ।আর্মির দুইটা জীপ টহল দিয়ে রেলস্টেশনে গিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে।রাসেল দেখে একটা জীপে জয়নাল মুন্সী বসা।হঠাৎই থেমে গেল জীপগুলো।

ওরা নেমে এসে ঢুকে গেল এই বাড়ি গুলোতে।দরজা ভেঙ্গে সবাইকে বাইরে দাঁড় করালো।ওদের কাউকে না পেয়ে মনেহয় পাগল হয়ে গেছে।বারীসাহেব ঝর্নাকে নিয়ে পুকুরের পানিতে নেমে গেছেন।ঝুমা আর রানীর মাও ।মতিলাল আর রানীর বাবা রয়ে গিয়েছিলেন গোয়ালঘরেই।

সেখানে টর্চ হাতে উকি মেরে মুন্সী বলে

-•ইধার আও ইধার আও।

গরুর ঘরে পড়ে থাকা লাঠি নিয়ে মতিলাল ঝাঁপিয়ে পড়েন এক আর্মির উপর আর রানীর বাবা আরেক জনের মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেন।।ব্যাস গুলি করে ঝাঁজরা করে দেয় তাদেরকে।একজন আর্মি মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যায় আর অন্যজন আহত হয়।ঝুমা আর ওর মায়ের মুখ চেপে ধরে রাসেল নইলে ওদের চিৎকারে ওরা সবাই ধরা পড়ত।

এতোগুলি মেয়ে হাত ছাড়া হওয়ার কারণে কিছুক্ষণ পরে জয়নাল মুন্সীর বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখলো।

ওরাও একসময় শরনার্থীদের শিবিরে পৌঁছে গেল। কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে।ঝুমা বলে

-দিদি জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের হাতে সিঁথির সিঁদুর মুছে দিয়েছিলো আমার । সিঁদুর মুছে আমার জীবন বাঁচলো কিন্তু আমার সিঁদুর তো মুছেই গেলো।

সুমিত আর জীয়ন হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে বর্ডারের কাছাকাছি জয়রামকুড়া নামে এক গ্রামে আশ্রয় নেয়।প্রতিদিন বহু মানুষ আসে।কাঁটা তারেরবেড়া ডিঙিয়ে চলে যায় শরনার্থী শিবিরে। ।সুমিত ওদের মধ্যে চিত্রাকে খুঁজে।আজকাল ঘনঘন বৃষ্টি হচ্ছে ।ওরা ইপিআর অফিসারের আন্ডারে কাজ শুরু করে দেয়।বর্ডার রোড ধরে চলে যায় তুরা ক্যাম্পে।

মিতাকে যেখানে নিয়ে আসে সেখানে আরো কয়েকটি মেয়ে ছিলো।ওরা বয়সে আরো কচি। স্কুল কলেজে পড়ে।প্রায় পাঁচমাস পর এক ভোরে এক সুইপারের সাহায্য নিয়ে সাথে দুটো মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায় মিতা।ঐ সুইপারের সহায়তায় ওরা বোরখা পরে সীমান্ত পার হয়ে বনগাঁ পৌঁছায়। সেখানেই এক হাসপাতালে ভর্তি হয় মিতা। পরে ওকে কলকাতায় পাঠানো হয়।কারণ সে ছিল সন্তানসম্ভবা।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে একটি মেয়ে হয়। সেই শিশুটিকে দত্তক দেয়া হয় ডেনমার্ক এর এক দম্পতির কাছে।মিতা দেশে ফিরলেও আর কখনো রুমমেটদের মুখামুখি হয়নি।কিছুটা মানসিক বিকার গ্রস্থ হয়ে পড়ে।নড়াইলে না ফিরে যশোরের মনিরামপুরে এক স্কুলে গানের টিচার হিসাবে কাজ করে।

যুদ্ধ হবে সেনাবাহিনীর সাথে সেনাবিহিনীর৷অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারীর। কিন্তু এই সাধারণ বেসামরিক মানুষের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর যে ন্যাক্কারজনক আচরণ এবং আক্রমণ, সেটা কেন? চোখের সামনে নারকীয় দৃশ্য৷ এখানে সেখানে মা-বোনদের ধর্ষণ৷ কখনো গণধর্ষণ৷ নির্যাতনের শিকার নারীদের আর্ত চিৎকার৷ সেই বিভীষিকা থেকে বের হতে পারেনি মিতা।আর পাকিস্তানী আর্মিদের এঁকে দেয়া ভ্রুন নয়মাস দশদিন বয়ে বেড়ালেও কোন মায়া বা মমতা জন্মায়নি সেই সন্তানের জন্য। ভীষন এক ট্রমার ভেতর যাচ্ছে জীবন।

রতন,মোহন, রাসেল মেলাঘরে ট্রেনিং নিয়ে তেলিয়াপাড়া, কুমিল্লা সিলেটে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। গুলিতে আহত মদনকে পেয়ে যায় ওরা। মদন অনেক তথ্য জানায়। মৃতের ভান করে পড়ে থেকে কীভাবে জীবন বাঁচায়। বারী সাহেব আর ঝর্না মুক্তি যোদ্ধাদের খাবার সংগ্রহ করে আর রান্নাবান্না করে।চিত্রা আর রানী নার্সিং করা শুরু করে। ঝুমনী, মতিলালের মেয়েটা কলেরায় আক্রান্ত হয়। বমি করতে করতে কাহিল। ওকে আগরতলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে মারা যায়। মেজর খালেদ মোশাররফ আর মেজর হায়দারের অধীনে ট্রেনিং নিয়ে বিচ্ছু জালালদের সাথে ওরা চৌদ্দজন একসাথে একটা অপারেশনে যায়। রাসেল, মদন, মোহন ওরা সবাই শত্রুপক্ষের আক্রমনে প্রাণ হারায়। কিন্তু ফিরে আসে সাতজন।সেই সাতজনের মধ্যে ফিরে আসে শুধু রতন। সবুজ ধানের জমিন রক্তে লাল হয়ে যায়। বুক চিড়ে বের হয় দীর্ঘশ্বাস।

রোমেনা লেইস। জন্ম বাংলাদেশে, বর্তমান নিবাস নিউইয়র্কের ব্রুকলিন। প্রকাশিত বই: 'মেঘের দেশে মেঘবালিকা', 'ভালবাসার রঙ নীল', 'মিতুলের বন্ধু বটগাছের ভূত ও ঘুঙুর' 'চন্দনী'।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..