চিৎ হয়ে শুয়ে আছি টেবিলের পরে

প্রদীপ চক্রবর্তী
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
চিৎ হয়ে শুয়ে আছি টেবিলের পরে

কবিতা কেন পড়ি? কেনই বা লিখি? না পড়লে না লিখলে কারোরই তো ছেঁড়া যেত না… তাহলে? এর উত্তর সরাসরি দিলে এক কথায় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু এনিয়ে বেশকিছু অনুভূতির গজগজানি আমাকে জ্বালিয়ে মারছে,,, তাই নিজের কাছেই এই কথাগুলো এভাবেই এসেছে আগেও, এলো আবার …

ধরা যাক দু একটা ইঁদুর এবার …

অন্য যে কোনো সময়ে আমরা ঘোরে হেঁটে যাই প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে। তার বহু চর্চিত রঙ প্রদাহ ঘনতা আর দর্শনকে অগ্রাহ্য করে। কিন্তু বৃষ্টি নেমে এলে তখন বাধ্যত স্মৃতিরস আর অনুভবের গ্রহণে আনমনা – উদাসী হই যেহেতু তখন আর কিছু করার থাকে না। অংশত বিচ্ছিন্নতাই ক্রম আসক্তির ডানা মেলে দেয়।

আর এরপর থেকেই আমি অনুভব করি একটা পরম্পরাকে। আমার দ্বিতীয় ডোরবেল। চিরজীবী নীলবস্তুর খোঁজে আমরা দ্বিতীয় পৃথিবীর বিমূর্ত সম্ভাবনাকে এক্সপ্লোর করি। যখন এই সকালে এ লেখাটির সর জমে উঠলো, তারপর যখন বৃষ্টি নামলো অস্ফুট আদিম নৃত্যের ঢঙে সামনের সজনের গাছে, আরো দূরের পিয়াশাল – ডাগর ইউক্যালিপ্টাস – আটারি লতা ভুররু ফুলের  জংলি কটম গন্ধে তখনই জানলার সার্সি দিয়ে দেখতে পেলাম আমার ত্বক – হাড় – মাস – ঘিলু – প্রাণ এমনকি আমার আমি’ র অবয়বও মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অবধারিত ভাবনাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে ব্যক্তিত্বের বিনাশী এই অকিঞ্চিৎকর প্রথম আমি’ র দৃশ্যত ” প্রদীপ ” কে ….

দুই

জন্ম: বীজ ও ক্ষেত্র

অনেক সাধারণের মধ্যে হদ্দ সাধারণ সে। তার পরিচিতি অল্প। তবু তার যেটুকু কবিতা পড়া তা কেবল নিজের দ্বিতীয় কাল্পনিক পৃথিবীর জন্য বা প্রিয় একাকিত্বের জন্য রসদ সংগ্রহ। যাবতীয় সমাজ ও পারিবারিক দায় মিটিয়ে সমস্ত কিছুর মধ্যে দ্বিতীয় পৃথিবীর অবলীন ডাক ও তাতে রেস্পন্স করার এই একাকিত্বে সে ছাড়া কেউ নেই। এমনকি একটি কবিতা তখনই তাঁকে ছোঁয় যখন শব্দের  আঁশ শব্দের কঙ্কাল শব্দের নগ্নতা ত্বক গন্ধ ঘাম যোনি ব্রণ ব্রা পেন্টি  স্ট্রিপটিজ  সব কিছুর আবরণ একটু একটু খুলে ফেলে সেই বিমূর্ত ভাবনা যা লেগে থাকে কবিতার  সংক্রামি ভাইরাসের মতো যা দুরারোগ্য যার থেকে মুক্তি নেই সেই না দেখা কবিতাটির কাল্পনিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের ভাবনার দহন ছাই ও বিন্দুগুলো সে একাকার করে ফেলে এবং সেই লেখাটি বদলাতে বদলাতে একসময় গ্রেগর সামসার মতো হয়ে যায়। একটা কমলালেবু রঙের ভ্রমর যা গুনগুনিয়ে ওঠে মস্তিষ্কের অতল পাতাল পাথুরে ফাটলের ভেতরে, এমন চুলচেরা যেখানে অন্ধকারের সর্বোচ্চ পাখি ওড়ে নি তখনো, তখনো গোধূলি সন্ধির নৃত্য দেখে যাচ্ছে,  পেটকাঠি ঘুড়ির বল্গা…

তার ও মেটামরফোসিস ঘটে ….

সেই উৎসকবিতার নেসেন্টগুলো খোঁজা ও নিজের ভাবনার অভিজ্ঞতার ভালো মন্দ লাগার রঙ ও বহুরৈখিক জীবনকে মেলানোর জন্যই হয়তো বা কবিতা আসে কবিতা পড়ে সে ….

পড়া আর লেখার মাঝখানে তখন আর কোনো এক চুলের শূন্যতা থাকে না …..

আসলে এর পরে আমার একাকিত্বের অভিযান। এক ট্র্যাক থেকে অন্য এক প্রসারিত আকাশের ব্লু – লেগুনে সাদা মেঘের পল্লবী। নতুন শূন্যের ভেতর ডিঙ্লা ফুল ঝরে। আনস্টেবল কোয়ার্ক থেকে ক্ষুধা – অস্তিত্ব, ক্ষয় ও বৃদ্ধির মধ্যে বেঁচে ওঠে আমার কাল্পনিক জগতের চিহ্নগুলো। শব্দ যেখানে সেতু আর তারো বাইরে দৃশ্যের সূক্ষ্ম অনুভবের কর্ক – টোটা কিংবা বন্দুকবাজের স্নায়বিক আয়তশব্দের নতুন টুরিস্টের ধূপ ছায়া অঙ্কন। অন্ততপক্ষে মাদুলি কিংবা কর্তাভজা গুরুমন্ত্রে অ – দীক্ষিত থেকে দল – মন্তাজ – প্রচার বা সমিতির সদস্যপত্র না নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত একাকিত্বের দরজায় দাঁড়িয়ে শুধু’ নয়ন ভরে চেয়ে থাকা …..”

তিন

বৃদ্ধি

এই অন্ধকার নীলব্লেড ছুঁয়ে আছে ফ্ল্যাশ ব্যাকের ব্যবহারে। প্রজেক্টারের ভেতর ফ্লিম রিল যে গতিতে যায়, তার সেই মৃদুল অন্ধকার চলাচলের মতো আমার মনে হয় প্রত্যেকেরই একটা ’ওপেন ডোর’ আছে। একটা খোঁজ আছে। কোনো একটা দৃশ্যের শরণার্থী সায়ংকালে বা আণবিক রিয়েক্টরের পরতে পরতে জমা ধুলো এক একজনের দেখার পৃথিবীতে এক এক রকম অর্ধস্ফুট অনুভব, বিস্ময় আর সম্পর্ককে জারিত করে। আমারও দেখার চেতনস্রোত ও অর্জনগুলো নতুন নতুন ভাবে আমার কাছে ধরা দেয়। হয়তো লেখাটিতে নয়, অনুভবের  মশহুর চিত্রকর অচানক পাঁজর চটকানো কাঁচা পানির জ্বালায় টুপটাপ পাতা পড়ার স্তব্ধতায় রঙ করে মগজের নিরালা ভ্রমণে। আমি দেখি সেই দরজা খোলা দৃশ্যের হাটে চাঁদের জেব্রা দাগ। ঝিরঝির বাতাসে ইহুদি মেনুহিন। চৌরাশিয়ার বাঁশিতে কোন ভিস্তিওয়ালা জ্যোৎস্না ছিটিয়ে যায় আমার বিকল্প বেঁচে থাকার অদৃশ্য বনপথে। আমি দেখি অদৃশ্য নাচঘরের জানলা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে  বেলোয়ারি তামাশা। কতো বেনেবৌ খোকাহোক টিয়ামারা বাটুল ঘুঘু ও জখম কুবো পাখি। কেঁদ  বহেড়া শাল অর্জুন গামারের জঙ্গল খুঁড়ে চলা এক অদৃশ্য ক্র্যাক। অমলতাসের ডালে ওপেন জুয়েলারি। চোখে জল নেমে আসে আনন্দে। ভেতর চিরে গলায় ধরকা বাজে ধ – র – র …ধ – র -র।  হিঁরৌ – হিঁ – ড় – ও – ঔ। ধিকচাক …ধিক ….ধি – ন –ন — না ….আ ….আ …

তখন আমি কবিতা লিখতে পারি কি না জানি না। যা লিখি তার অনেকটাই একটা ঘোরে একটা বিদ্যুৎচমকের স্পার্কিং মুহূর্তের সামান্য ভগ্নাংশের অণু অনুভবে। মানের খপ্পরে এ জীবনে আর পড়া হলো না। কবি ওয়ালেস স্টিভেন্সের দেবদূতের মতো যে আসে’ seen for a moment standing in the door’ …

এক মুহূর্তের জন্য লহমায়। বারংবার। কাফকার’ দি মেটামরফসিস’’ দি ট্রায়াল’ বা’ দি ক্যাসল’ — এর চরিত্রগুলোর মতো ঘুম থেকে ভিন্ন কোনো জাগরণের দিকে পৌঁছোবার সম্ভাবনায়।  নীল চাঁদোয়ার নীচে’ সুড়ঙ্গলালিত এক সম্পর্কের স্বাদ পেতে পেতে। আর সেই সম্ভাব্য এবং বিগত লেখার মধ্যে সময় জেগে ওঠে  অডেনের প্রশ্নে।  Will it ever happen again?  আমাকেও তা তাড়িত করে। আর যদি না হয়? আর একটা লেখা বা ভাবনা হঠাৎই সেই অমোঘ অদৃশ্য দরজার নেপথ্য থেকে কে যেন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যবর্তী অভিযানে দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন আবারো আনন্দঘন একার যাত্রা। সঙ্গীবিহীন নির্ভার ….

চার

মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থাকে …

পাঠক হিসেবে বুঝেছি কবিতা জীবন্ত বস্তুর মতো। তারও জন্ম, বৃদ্ধি, জনন, ক্ষমতা, বৃদ্ধি ও মৃত্যু আছে।অনুশীলিত পাঠকের ও দ্বন্দ্ব আছে, বিভিন্ন কবিতাকে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে। অদৃশ্য, মহাজাগতিক কোনো কোনো আলোর রশ্মি যেমন আমাদের দেহ ভেদ করে যায় অলক্ষ্যে, তেমনই অজস্র কবিতার ভাঙা তীক্ষ্ণ অংশ পাঠকের মনকে সর্বদা ভেদ করছে। আমরা লক্ষ করি না, কিন্তু তার দাগ থেকে যায় পাঠক — কবির ভাষা ব্যবহারে, কল্পচিত্রে। এইসব ভগ্নাংশের ছায়া কবির স্বকীয়তাকে আরো তীক্ষ্ণতা, ঔজ্জ্বল্য ও বিস্তৃতি দেয়। তাই কবিতা কোনো টুকরো লাইন জোড়া দেবার খেলা নয়, নয় কবিতার কয়েকটি আলাদা পংক্তিকে আলাদা ভাবে দেখার উপায়। প্রতিটি কবিতা তার সম্পূর্ণ অবয়ব নিয়েই এক একটি জৈব সম্পূর্ণতা। মানুষের চাহিদাময় স্বার্থপূর্ণ বাহ্যিক যাপন কেবলমাত্র কবিতায় এলে তা সংবাদ কিংবা ইস্তেহার হয়ে যায়। কবিতা যাপন বলে তার কাছে কিছু হয় না। তার ভালোলাগা, আনন্দ, কারুবাসনা, পুরোনো গাছের ছায়ায় উঠে আসা শহরতলি, এঁদো বস্তি, পানাপুকুর, বাঁশবন, হোগলাবন, নর্দমার শ্যাওলায় ভেজা ছুটির বসত বাটি, কাঠের পুল টপকে ফিরে আসা ভাঙা সাইকেলের গড়ানো চাকা, কিশোর মহিষের লেজে পাক খাওয়া সরু সুতোর মতো নদীর পতঝড়, সমস্ত সুদূরতা ঘনিষ্ট নাগরিক নিসর্গের ঘর পালানো দুপুরবেলা, দূরের উৎস হতে ভেসে আসা প্ল্যাটফর্মে মেঘের হালকা — সুগন্ধ, খোলা হাওয়ায় শিশিরের কোণে কোণে পাখির চকিত শৃঙ্গার, এই সব মুহূর্তগুলোই সে কেবল ভাষা দিতে চায়। ভাবে শুধু সীমানার পরের কথা। তার মনে হয় দেখা, কল্পনা, মন, ভাবনা, আকাশ, অবকাশ, বৈষ্ণবীর আখড়ায় তীব্র নিশাচর লেবুফুলের ডিগদো ডিগো শব্দগুলোরও সীমা আছে। মানুষ বারে বারেই Limitation এর কাছে। সম্পর্কে, প্রেমে, চিনতে শেখায়, বিশ্লেষণে এমনকী, অনুভবেও। সীমার ওপারে তাহলে কী থাকে!’ অসীম’ কী শুধুই শব্দ। চিরকালীন শব্দ থেকে। জানা অজানা শব্দ থেকে শব্দের কী মুক্তি নেই? মুক্তি আসলে কী? এই সীমা  ভাঙনের জন্যই তার আর্তি। অনুভব প্রকাশের হু বহু চেষ্টা। আরো চেষ্টা। আসলে নিজের ভাষা খোঁজার তাগিদ থেকেই নীল কনকের সর জমে ওঠে ভোরের আজানে।

নতুন শূন্যের ভেতর মশহুর চিত্রকরের দরজা খোলার  বুঁদ। কবিতার মাতৃভাষা হয় না। প্রতিটি কবির নিজস্ব মিতভাষা ছাপা কুরুশ কাঁটায় বোনা কুয়াশা। এ ভাবেই ভাষাঞ্চল। রিদমিক আঁখ  মিচোলি । কেবল আলোর ভিস্তিওয়ালা। ডানায় তুলিন তিলক। ঘন বৃষ্টিভেজা বিকেলের বনে কতো মুনিয়া  তিলেবাজ বগেরি কাজলগৌরি সোয়ালো বাঁশপাতি নীলবগলা। তার চলা নীল শালুকের পোটো পাড়ায়। নতুনের ভদ্রাসন নেই রে মন পাগলা। নেই কেরদানি, কুরু কুরু কুরু কাঁই নানা বোল। ব্রজবুলিতে    .  ” কনহইয়া ” ছাড়া গীত নেই, রাজস্থানী ডিঙ্গল ভাষায় ” ঢোলা ” ব্যতীত ’  গাথা ’, তেমনই নতুনের আনন্দ চলায়। মুসাফিরের অপমানে আনন্দ, বিষাদে আনন্দ, যন্ত্রণায় আনন্দ। দেদার হাঁড়িয়া পচাই, আদিবাসী জনপদ, ধামসা মাদলের বোল, সারিন্দার ছড়, ভাদরিয়া — ঝুমুরের লহর। রাজস্থানের চারণকবিদের ঢোল তার আনন্দের আসর গম গম ….

‘ বাজরিয়া হরিয়া লিয়া, বিচি বিচি ফুল। / জৌ ভরি বুঠউ ভাদ্র বউ, মারু — দেস অমূল।| / ধরনীলী ধন পুন্ডরী, ধরি  গহগহই গামার। / মারু — দেস সুহামনউ সাঁবনি সাঁঝি বার।’

পাঁচ

টুং টাং শব্দ নিঃশব্দ

পলিটিক্স

বি মানুষ হিসেবে নিছক সাধারণ কিন্তু তার নিঃসঙ্গতা অসাধারণ। মানুষের ভূগোলে থেকেও সর্বগ্রাসী আধিপত্যবাদের অনুগত পোষ্য  জীবে পরিণত না হয়ে নির্জন  কুমোঘরে সারাজীবনের ঘোর তাকে অমোঘ সৃষ্টির নেশায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। কবি যেহেতু প্রতিমুহূর্তের ভাবনায় কবি, কোনো বায়াস্ট হয়ে যাওয়া বুরোক্র্যাটদের জগৎ তাকে দুনিয়াদারির  প্যাঁচে ফেলতে পারে না। যখন ভাবি,’ দি মেটামরফোসিস’’ দি ট্রায়াল’ বা’ দি ক্যাসেলের’ তল নেবে যাওয়া গভীরকে বন্ধুর হাতে বিনষ্ট হোক, এই ভেবে উদাসীন হয়ে চলে যাওয়া কাফ্কার কথা, তখন ভাবি বন্ধু ম্যাক্স ব্রড অপ্রকাশিত রচনাগুলি না পুড়িয়ে মানুষকে যে গভীর সভ্যতার কাছে উঠিয়ে নিয়ে আসেন, সে কৃতজ্ঞতার ভাষা আজও আমাদের নেই। কিংবা যাবতীয় স্বীকৃতি এবং প্রাপ্তির ভাঁড়ারকে উদাসীনতায় গুঁড়িয়ে দিয়েও ভেঙে পড়েন না স্বাধীন স্রষ্টা জেমস জয়েস। সিলভিয়া বিচ শেষ পর্যন্ত’ ইউলিসিস’ কে আলোর মুখ দেখান। আমাদের তুচ্ছতাগুলো গ্লানিমুক্ত হয়। স্রষ্টার এই স্বাধীনতা, নীরক্ত হৃদপিন্ডহীন অবয়বশূন্য কৃত্রিম দৈন্য নিঃস্বতা তাবৎ দেউলিয়াপনার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদহীন প্রতিবাদ। সাত্র ফিরিয়ে দেন নোবেল, লোর্কাকে খুন করা হলেও থেকে যায় তাঁর চিরকালীন স্বর। কবির একাকিত্ব যায় না। জীবনের ক্রমাগত রূপান্তর, সামাজিক সম্পর্কের অবিরাম পরিবর্তন, চিরস্থায়ী মৌল অস্থিরতা অনিশ্চয়তা বা সিন্ট্যাক্টিক, মিথস্ক্রিয়া, instincts, auto — eroticism, Narcissism, ego — instincts of self — preservation, ভোগবাদ — এসব কিছুর মধ্যেই কবিকে যেতে হয়। মানুষ হিসেবে বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে হ্যামার করে। কবি একসময় উৎসকেও অস্বীকার করতে থাকে। তাঁর গভীরতা, বহু ব্যবহৃত, অ — ব্যবহৃত, প্রচলিত, আঁকাড়া শব্দ থেকে নতুন ভাবে লিখিত হতে থাকে। শব্দ গৌণ হয়ে যায়। অব্যক্ত অনুভব, ভাষাহীন ধারাবাহিক পুষ্টিতা নয়া রঙ পায়। নিরাবেগ নিরাসক্তির একটা process চলতেই থাকে। জীবিত চলনক্ষম শব্দ সমূহ নিভৃতজীবী কবিকে একা করতে থাকে। কবি সচেতনভাবেই নির্ভার হন। আনন্দময়। কম শব্দে বহু অনুভূতির জগৎকে আরপার করে দিতে চান।  ফিলিং অফ স্পন্টেনিটি, একটা চার্জ বা স্পার্কিংজোন টাটকা  ব্লেন্ডেড ফ্লেভারে  পারিপার্শ্বিক তাৎক্ষণিক অস্থিরতাকে ছাপিয়ে যায়। কবি’ পারোল বা বাণীর’ মুখোশকে পুড়িয়ে ধ্বংস করেন। establishment এর ব্যর্থ concept ভেঙে নিরুদ্দিষ্ট ভ্রমণে পা রাখেন। কবি তাই বন্ধুত্ব করেন, খানিক মেলামেশা, আড্ডা ….এটুকুই। কবিতায়, জীবনে সে একেবারেই একক যাত্রী। তাঁর লেখার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, বারবার, কিন্তু দ্বিচারিতা নয় ….|

আর তাই আমার জীবনের এলোমেলো ছন্নছাড়ায় শুনি আধফোটা নানান দৃশ্যের খেয়ালি সম্ভাবনার ব্যথিত প্রসারণকে। গেরস্তের বহু গিঁটপড়া অনর্গল হাওয়ার নিরাশ্রয়। কতোদূরের আরোগ্য রজনী, কতো বেপুথো পাখি ফিল্মের ক্রমশ জলকণাহীন মেঘের সাদা আর আবছা হয়ে থাকা শেষ রাতের আকাশে ঠিকানা খোঁজার ছলে হারিয়ে যায়। আবহমান বাংলা কবিতার লক্ষ লক্ষ হারিয়ে যাওয়া পাতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে কখনও কখনও কবিকঙ্কনের সোনার গোধিকা, রামপ্রসাদ সেনের গান ও আকুলতা, দশনামী টং ঘর, জনৈক কবির অজ্ঞাতনামা লাস। কল্প চোখে দেখি, জেন গুরু রিয়োকান ও তাঁর নির্জন পাহাড়তলীতে ছোটো এক কুটিরে সরলতম জীবন। দেখি মডার্ন, পোস্টমডার্ন, সুরিয়ালিস্ট, প্রতিকবিতা, কংক্রিট, শাস্ত্রবিরোধী, হাংরি, শ্রুতি কবিদের লেখালিখির ফেলে আসা পাতাগুলো। দেখি যীশুর জন্মের বহু আগের সেই বেদুইন ছেলেটিকে যে রোদ ঠিকরানো চুনাপাহাড়ের এদিকে ওদিকের ছায়ায় বসে ছাগল  চড়াতো।

দুহাজার বছর জিনের গুহায় নীরব থাকার পর, সম্পূর্ণ এক অন্য পৃথিবীতে, ওই রকম এক. মূর্খ বেদুইন ছেলে হারানো ছাগল খুঁজতে গিয়ে সভয়ে দেখলো, সারিসারি আলাদিনের কলসিতে গুটিয়ে রাখা সেই পুঁথির গ্রন্থশালা — বিখ্যাত  ডেড সী  স্ক্রোল ! বাইবেলের জগৎ লুপ্ত। অশক্ত এসিনরা চলে গেছেন। কিন্তু শতাধিক পার্চমেন্ট  স্ক্রোলের কী দুরবিসারী অমরতা!

এসব দেখতে পাই কল্পনার চোখে ….আর মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে এক অসুখ এক যন্ত্রণাক্লিষ্ট বোধ। আমাকে ঘুমোতে দেয় না। দেশে দেশে যুগ যুগ ধরে কতো প্রস্পেক্ট, কতো কবি, কতো কবিতা! মানুষের কবিতার কতো বিচিত্র ধূপছায়া রঙ কতো বিচিত্র মুখশ্রী!

আমি আজ আর কবিতা বলি না। বলি গভীর যাপনের নিরঙ্কুশ এক  চলচ্চিত্র। ক্রমাগত দৃশ্যের জন্ম হয় আর একঝাঁক কলহাসি নুড়ির মতো বাজতে বাজতে খাদে — খোঁদলে গড়িয়ে যায় …

অবেলার জ্বরে জলটপ্পা ভিজিয়ে  আঁচল মাথায় জুড়ে থাকে। পিয়ন  গ্রীল করে দু — চারটুকরো চিঠির সঙ্গে। সবুজ স্তনের তিল আমাকে ওঠায় বসায়। টলটলে সড়কের মুঠোভরা মুকুল নেমে যায় ছোটো ছোটো সিরাজিতে চুমুক দিতে দিতে। আমার না হয় ঘরে ফেরা না হয় দূরে যাওয়া। যখন যে ভাবে পারি, বলি। সেটুকুই জন্মনাড়িতে লেগে থাকা শব্দ, সেটুকুই মৃত্যুচিৎকার থেকে বড়ো ও সমানে ছড়িয়ে যাওয়া নিরীক্ষা, সেটুকুই জঙ্গলে শরৎ–এ মধ্যখানে, যে মাঠ ময়দান এমন ভুবন ও তার আকাশ দেখে দেখে পাগল হয়ে যাওয়া, সেটুকুই কেবল। গভীরে থিতু হওয়া অসুখে যে ভাবনাগুলো ওঠে, কবিতা নামক মনুষ্য সমাজে প্রচলিত ফর্ম বা কন্টেন্ট বা শব্দের মধ্যে যদি কখনও কখনও তা ধরতে পারি, পাহাড় জল বেহালা কাঠের গাছগুলোকে পিছনে রেখে ধামাচাপা ছুটি পেরিয়ে কখনও কোনো এক সকল ও সুদূর এসে লাগে তাতে, তখন এই ইতস্তত আমি, সেই লেখাকে’ কবিতায় ফেলা লেখা’ বলতে পারি। মোদ্দা কথায় আমার লেখা কবিতা নিচ্ছে বলতে পারি। হাওয়ার ফিনকি দিয়ে ওঠা চারদিকের শূন্যতাগুলো, আমায় কি সত্যি শব্দে উগরে দিয়ে চলে যায়? নিজের এই প্রশ্নে গুম হয়ে বসে থাকি কেবল ….

প্রদীপ চক্রবর্তী। কবি ও প্রাবন্ধিক। জন্ম- ১১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭১, পশ্চিমবঙ্গ,ভারত। প্রদীপ চক্রবর্তীর কিছু কবিতা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতা সংকলন ও পোস্টমডার্ন ইংলিশ পোয়েট্রিতে তাঁর নির্বাচিত কবিতা প্রকাশিত। বিভিন্ন লিটলম্যাগ ও ওয়েবজিন ও ম্যাগে তাঁর কবিতা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ