চেতন বা অবচেতন (পর্ব ৬)

বর্ণালী মাহমুদ
গল্প, ধারাবাহিক
Bengali
চেতন বা অবচেতন (পর্ব ৬)

সকাল থেকেই আজ তরু বেশ আনমনা। কিছু করলে ভুল করছে, নাহলে করতেই ভুলে যাচ্ছে। সকালে এমনিতেই অফিসে যাবার তাড়া থাকে, এর মধ্যে সব ভুল ভাল করে তরুর মেজাজ সপ্তমে। যাই হোক কোনোমতে সব গুছিয়ে বাসা থেকে বের হতে তরুর দশ মিনিট লেট। এরপর গাড়িতে বসে অর্ধেক রাস্তা পার হবার পর তরু আবিষ্কার করে, ফোন বাসায় ফেলে এসেছে। এবার একদম বিরক্তির চরমে পৌঁছে গেলো সে।

অফিসে ঢুকলো পুরোই অফ মুডে, এমনিতে তরু খুব মিশুক স্বভাবের। অফিসে ঢুকে সবার সাথে কুশল বিনিময় করা, হাসি ঠাট্টা বা মজা করা ওর প্রতিদিনের কাজ। অফিসে মাত্র একজন কলিগ ছাড়া সবাই ওর থেকে অনেক সিনিয়র। অফিসে প্রথম দিন এসে তরু তো বেশ ভড়কে যায়। একে তো সবাই সিনিয়র, তার উপরে অফিসে পরিবেশ চরম রকমের গুরুগম্ভীর। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, ওদের এম.ডি.! প্রথম দিনেই তরু আবিষ্কার করে ওর বস একটা খারুস টাইপের আইটেম। তার ভয়ে অফিসের সবাই লাঠির মতো সোজা হয়ে থাকে।

তরু অবশ্য খারুস বসের ধার না ধেরে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই অফিসের পরিবেশ অনেক সহজ করে নিতে সক্ষম হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সে অফিসে সবার প্রিয় হয়ে ওঠে। ওদের এম.ডি বড়োই কঠোর সময়ের হিসাবে। প্রতিদিন ঘড়িতে ঠিক ১১ টা বাজার সাথে সাথে উনি অফিসে ঢুকেন। তাই ৯ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত অফিসের পরিবেশ অনেক হালকা থাকে, ঠিক ১১ টায় যখন সি.সি. কি.ভি তে খারুস বসের চেহারা দেখা যায় সবাই আবার আগের মতো অটোমেটিক লাঠি হয়ে যায়। শুধু তরু বাদে। বস তার চেম্বারে ঢোকার পর পরই তরু উনার পছন্দের এক কাপ কফির অর্ডার দিয়ে জরুরি কিছু ফাইল নিয়ে ঢুকে সাইন করানোর উদ্দেশ্যে। এটা ওর প্রতিদিনের কাজ। খারুস বসের কিভাবে যেনো সবথেকে সুক্ষ্ম ভুল গুলোও নজর এড়ায় না। আর তারপর থেকেই শুরু হয় ডেস্কে ডেস্কে তলব, আর এর সাথে জঘন্য ঝাড়ি ফ্রি। চুপসে যাওয়া ফাইল নিয়ে এক একজন কে রুম থেকে বের হয়ে যেতে দেখে তরু করুন চোখে। মাঝে মধ্যে ও নিজেও বাদ পরে না।

অফিস শুরু হয় ৯ টা থেকে, তাই অফিসে ঢুকে কাজের ফাঁকে এর ওর কেবিনে উঁকি দেওয়া, টুকটাক গল্প করা আর চা খাওয়া তরুর রোজকার কাজ। কিন্তু আজ তরু পুরাই অফ, জরুরি কিছু ফোন নাম্বার ফোনে সেভ করা। এগুলো এখন কোথায় পাবে ভেবেই ওর মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। অফিসে ওর একমাত্র জুনিয়র কলিগ হচ্ছে সোমা, অফিসের রিসেপশনিস্ট। তরু কে অফ দেখে আজ খবর নিতে নিজেই ওর কেবিনে ঢু দিতে আসে সে। এটা ওটার পর জানতে চায় ওর অফ মুডের কারণ। ফোনের কথা শুনে মিষ্টি হেসে বলে: আপু এটা নিয়ে এতো ভাবছেন? আমাকে বল্লেই তো হতো। আচ্ছা থাকেন আমি দেখছি। বলে নিজের ডেস্কে চলে যায় সে, দু মিনিট পরে পিয়নের হাতে একটা ফাইল পাঠিয়ে দেয়। অফিসের সব গুরুত্বপূর্ণ ফোন নাম্বার লিস্ট করা ওতে। তরু ইন্টারকমে কল দিয়ে সোমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানায়, তারপর প্রয়োজনীয় নাম্বার খুঁজে নিয়ে কাজে লেগে পড়ে দ্রুত।

সারাদিন মুখ গুঁজে কাজ করার পর ছুটির মিনিট দশেক আগে তরু কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায়। কাল শুক্রবার, ছুটি তাই আজকে অনেক কাজ অগ্রিম গুছিয়ে রাখতে হয়েছে ওকে। সারাদিন পর এবার কেবিন ছেড়ে বের হয়ে এর ওর সাথে টুকটাক কথা সারে। এরপর সোমাকে নিয়ে চা খেতে বসে। যাবার সময় অফিস থেকে গাড়ি পায় ওরা, ওরা মোট চারজন কলিগ একসাথে গাড়িতে ফেরে একইদিকে বাসা হওয়ায়, তার মধ্যে সোমাও আছে। বেশ কিছুদিন অফিসের গাড়ি ব্যবহার না করায় তরু সোমাকে জানিয়ে দিলো একসাথে যাবে।

সোমা গল্প করতে ভীষণ ভালোবাসে। যতোই বলুক ওর কথা কখনও শেষ হয় না। তো গাড়িতে যাবার সময় তরুর সাথে সোমার প্রচুর গল্প হয়। তরুর মনে হয়, পৃথিবীর এমন কোনো কাহিনী নাই যার গল্প বলতে সোমার বাকি আছে। এদিকে প্রতিদিন ই সোমার গল্পের রসদে কোনো টান পড়ে না। তরুর কাছে এ এক মহা বিস্ময়। আজও এর ব্যতিক্রম হোলো না। সোমার হিজিবিজি গল্পে কখন সময় ও জ্যাম পেরিয়ে বাসার কাছে পৌঁছে গেলো বুঝতেই পারলো না তরু। গাড়ি থেকে নেমে সবাইকে বিদায় জানিয়ে বাসার গেট দিয়ে ভেতরে চলে এলো তরু, দোতলায় থাকে বলে শিড়ি ব্যবহার করে ও, লিফট এ ওঠে না। চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে ব্যাগটা বিছানার উপর রাখে তরু। এর পরেই চোখ পড়ে খাটের পাশে টেবিলের উপর ওর ফোন টা। হাতে নিয়ে আনলক করতেই দেখে  ৮৪ টা মিস কল। যার মধ্যে ৭২ টা ই নিবিড়ের। সাথে সাথে কল ব্যাক করে ও নিবিড় কে। অপর পাশ থেকে রেকর্ডেড শব্দ শুনতে পায়। নাম্বার টা বন্ধ।

চলবে…

বর্ণালী মাহমুদ। গল্পকার। জন্ম বাংলাদেশে, বর্তমানে স্পেনের বার্সেলোনায় বসবাস।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

বালির বেহালা

বালির বেহালা

বুড়িমাসি বলেন,জীবনটা বালির ঘর গো।ঢেউ এলে ধুয়ে যায় জীবনের মায়া।তবু বড় ভালবাসা ওদের দাম্পত্যে।রোদের চাদরের…..

তদন্ত

তদন্ত

  এক ড্রইং রুমে বসে রয়েছে সদ্য কিশোর উত্তীর্ণ তরুণ গোয়েন্দা সজীব। সামনের টেবিলে ছড়িয়ে…..