চৈতি

সামিয়া ইতি
ছোটগল্প
Bengali
চৈতি

 

ভেতরে ভেতরে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম আমি; চাকরির দুনিয়ার উপর একদম বিরক্তির শেষ সীমানা ক্রস করার পর ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপরই লক্ষ্য করলাম আমার হাজবেন্ড কত ব্যস্ত থাকে সবসময় তার ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ব্যবসা নিয়ে, আগে নিজেও ব্যস্ত থাকার কারনে ব্যাপারটা লক্ষ্য করিনি; বিয়ের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর চলে; শ্বশুর শাশুড়ি গত হয়েছেন বিয়ের অনেক আগে; আমার স্বামী তার মামা মামীর কাছে থেকে লেখাপড়া শেষ করেছিলো; পরে সেই মামা মামী পারিবারিক পছন্দের মাধ্যমে আমাদের বিয়ে দিয়ে মা বাবার কর্তব্য পালন করেছেন।

বিয়ের পর আমরা আলাদা এই এপার্টমেন্টটায় থাকি, কেউ এপার্টমেন্টে তেমন একটা আসেনা, সময় ও‌ নাই, যে যার যার মতন ব্যস্ত জীবন।
আমারো কারো না আসাটা খারাপ লাগেনা, বরং কেউ এলে ঝামেলা ঝামেলা লাগে, এই যেমন সেদিন মামা মামী এলেন এইটা করো ঐটা করো, খাটটা এইদিক করে রাখো, ডাইনিং টেবিল দেয়ালের সাথে চেপে রেখেছো কেন!? ঠিকঠাক করো নয়তো নষ্ট হবে তোমার ফার্নিচার।
মা বাবাও দেশে নেই; সুইডেন থাকেন তারা, আমার জন্মের পর পরই দুইজনই সুইডেন চলে গিয়েছিলেন; আমি বড় হয়েছি নানা নানুর কাছে একা একা, স্বামীর সাথে আমার মিল এইদিক থেকে।

আগে যে চাকরিটা করতাম বিভিন্ন পলিটিক্যাল ইস্যুর কারনে ওটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি, অফিসের নানান পলিটিক্স নিতে কষ্ট হতো; রোজ রোজ হিন্দি সিরিয়ালের মেলো ড্রামা, নাটকের সাথে টিকতে পারিনি শেষ পর্যন্ত।

কিন্তু চাকরি ছাড়ার পর টানা দেড় মাস ঘরে বসে থেকে সময় কাটে কই, মানুষ সামাজিক জীব একা বেশিদিন বাঁচতে পারেনা এই চিন্তা থেকে আবার সিদ্ধান্ত নিলাম চাকরি করবো।

পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে পাঠিয়ে দিলাম সিভি কয়েক জায়গায়, প্রতিউত্তর এলো দ্রুত, একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে পর পর তিনবার এইচ আর হেড, ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও এডমিন হেড, সিও সহ সবার উপস্থিতিতে যাচাই বাছাই ইন্টারভিউ পর্ব শেষ করে ম্যানেজার পোষ্টে নিযুক্ত হলাম, স্যালারী প্রচুর ভালো।

এতটা আশা করিনি তাই খুব খুশি ছিলাম। জয়েনিং এর প্রথম দিনে অত্যন্ত সাচ্ছন্দ্যে সবার সাথে টুকটাক গ্রিটিংস হলো, কলিগরা ধারাবাহিক ভাবে সবার মজার সব চরিত্র ও ঘটনা বর্ণনা করতে করতে আমার সাথে সহজ হবার চেষ্টার ত্রুটি করলেন না।

আমি কম কথা বলি আর উনাদের প্রথম দিনের আন্তরিকতায় তেমন মুগ্ধ সন্দেহহীন হলাম না আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারনে, একদিনে এমনিতেও মানুষ চেনা যায় না! মানুষ বিচিত্র এবং এই ভালো তো এই মন্দ।
চৈতি নামে এক মেয়ের ব্যাপারে অনেকের মুখ থেকে অনেক কিছু শুনলাম; সে কয়েকদিনের ছুটিতে, সবাই যে কোন ব্যাপারে গল্প করার সময় চৈতির নাম বলে ফেলছেন, আমাদের ডিপার্টমেন্টের দেয়ালে পেইন্টিং লাগানো, কে সিলেক্ট করেছে? চৈতি ম্যাডাম, টি কর্নারটার ফার্নিচার ডেকোরেটর সুন্দর কে চুজ করেছে? চৈতি ম্যাডাম,কোন সমস্যা হলে কার কাছে গেলে সমাধান হবে? ম্যাজিক চৈতি ম্যাডামের কাছে, চৈতির নামের আগে ম্যাজিক শব্দটা মনে মনে‌ সংযোজন করলাম বিরক্ত হয়ে।

ডিপার্টমেন্টের এজিএম ও কথায় কথায় বললেন কোন সমস্যা হলে চৈতিকে বলবেন। মেয়েটা আর সবার মতন না অনেক গুণী বুঝলেন, হীরা হীরা একেবারে খাঁটি হীরা যে কোন বিষয়ে তার অনেক ধারণা মেয়েটার ভেতর একটা কিছু আছে যা সবার থেকে আলাদা করে রাখে।

অপরিচিত একজনের প্রশংসা কারো শুনতে ভালো লাগে না তাদের বোঝাবে কে! মনে মনে ্ হাল ছাড়ার অবস্থা এইখানেও হয়তো বেশিদিন টেকা সম্ভব না, চৈতি মেয়েটা এডমিনে কাজ করে, যেসব গুনের কথা তার বলা হচ্ছে ওটা তো তার অফিস ডিউটি, এই কথা কেউ বুঝতে পারছে না সবাইকে সে অন্ধ বানিয়ে রেখেছে শিওর হলাম আমি ।

ভেতরে ভেতরে অনেক জেলাসও হলাম তখনো তাকে দেখিনি, আমার হিংসাত্মক মন ধরেই নিলো ফালতু মেয়ে হবে গসিপে আর পলিটিক্সে ওস্তাদ বলেই এত সহজে মন জয় করে নিয়েছে সবার।

জয়েনিং এর তৃতীয় দিন চৈতির সাথে দেখা হলো, পরিচিত হবার আগেই অফিসের গেটেই তার সাথে আলাপ, সাধারণত ব্যস্ত সকালে যা হয় আর কি! ভাংতি টাকা ছিলনা সাথে অফিসের আশেপাশে কোন দোকানও নেই, শুধু সিকিউরিটি গার্ড আছে তাকে বলতেই বিনয়ের সাথে না সূচক মাথা নেড়ে উদ্ধার করলেন।

এরকম সময় ঐ মেয়ের আবির্ভাব, সবুজ রঙের জামার উপর শিফনের সবুজ ওড়না মাথায় হাল্কা ঘোমটার মতন টেনে দেয়া, তার চুল লালচে; রঙ করে নয় চুলের ধরনই অমন বোঝা যাচ্ছে অতিরিক্তি সাদা গায়ের রঙ, টিকালো নাক হরিন চোখ আর হাল্কা গড়নের সে, কিছুটা গম্ভীর আর বেশ অহংকারী হয়ে থাকতে পারে মনে হলো।

আমাকে বললো আপু কি হয়েছে ভাংতি নেই, বনানী থেকে এসেছেন? তিরিশ টাকা তো? আমি দিয়ে দিচ্ছি। তার প্রথম কথাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল আমার, ম্যানেজার পোষ্টে জয়েন করেছি আমি, আর সে কিনা ম্যাডাম সম্বোধন না করে বলছে আপু! (পরে অবশ্য দেখেছি জিএম, এজিমদেরও আপু ভাইয়া সম্বোধন করে, এইখানে এই রীতি)!

ও কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে; আমাকে মৃদু হেসে আসেন বলে ভেতরে ঢুকে গেলো, তখনই মনে হল এটাই চৈতি আর আমার অবচেতন মন চাইছিল না এটা খাঁটি হীরা হোক।

অফিসের একুশ তলায় আমার ডেস্কে গিয়ে দেখি আমার পাশের টেবিলটাতেই সেই গেটে দেখা মেয়েটা বসে আছে ওকে এখানে সহ্যই হচ্ছে না আমার; তাও আমার পাশেই!!

আমার সাথে খাতির করতে বেশ কয়বার কথা বলার চেষ্টা করেছিল পাত্তা দেইনি একদম, খাঁটি হীরা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে বেশি এটা মানলাম।

চৈতি তার টেবিলে কম থাকতো বিভিন্ন কাজে তাকে সব সময় ছোটাছুটি করতে হতো, একদিন কোত্থেকে হাত ভর্তি কাগজ পত্র ফাইল নিয়ে টেবিলের সামনে এসে দেখে তার টেবিলে এঁটো প্লেট গ্লাস তরকারীর বাটি রাখা, আশেপাশে পিয়ন বা ক্লিনারও নেই পরিস্কার করে দেয়ার, আসলে সকালে নাস্তা এনে খেয়েছিলাম বাইরে থেকে, চৈতি অফিসে আসেনি ভেবে ওর টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম সব, বেশ করেছি।

সে কারো অপেক্ষা না করে ঝটপট সব কাগজ পত্র ফাইল চেয়ারে রেখে নিজেই সব তুলে নিয়ে কিচেনের দিকে গেলো, ফিরে এসে টিস্যু দিয়ে ঘসে ঘসে তরকারির ঝোল পরিষ্কার করতে লাগলো,
কি যে আনন্দ পেলাম দৃশ্যটি দেখে একদম কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেল আমার।

আরেকদিন টি কর্নার থেকে মগ ভর্তি গরম কফি হাতে নিয়ে চৈতির টেবিল ক্রস করার সময় অসাবধানে ওর গায়ে কফি পড়ে গেল ইচ্ছাকৃত না হলেও ভেতরে ভেতরে এটাও ভালো লেগেছে আমার।
ও সাদা রঙের একটা চমৎকার জামা পড়ে এসেছিলো, কফি পড়ে বিশ্রী হয়ে গেলো, তার থেকেও বড় কথা হঠাৎ এইরকম হওয়ায় মেয়েটার চেহারায় প্রচণ্ড ভয় ও আতংক স্পষ্ট, কফি ছিল আগুন গরম পুড়ে গিয়েও থাকতে পারে।
চৈতি মুখ ভার করে ঐ অবস্থায়ই সারাদিন কাজ করলো। আমি সেদিন আন্তরিক নকল সরি বলেছিলাম কয়েকবার।

মাঝে দুই তিনবার বার হাঁটতে চলতে ওর টেবিল ক্রস করতে করতে ওর মোবাইল মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলাম, ধৈর্য্য আছে ওর এত কিছুর পরও‌ কিছু বলেনি আমাকে, একদিন শুনলাম ফোনে কাকে যেন মোবাইল সার্ভিস ভালো কোথায় করায় তার খোঁজ নিচ্ছে।

পুরোনো অফিসের টিয়া আপার ষড়যন্ত্রে আমার চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে হয়েছিল, সেই রাগ, সেই দুঃখ সেই অপমানের শোধ সব চৈতির উপর দিয়ে যাচ্ছিল, এছাড়া মানুষ দূর্বলের উপরই অত্যাচার প্রবন হয়! বেচারি চৈতি! শেষমেষ যা করলাম!

ঘটনার দিন সকাল সকাল চৈতি অফিসে আসার পর পরই ইডি স্যার ওকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন ২৪ লাখ টাকার কমপ্লিট লোন ফাইলটা নিয়ে যেন তার কাছে তক্ষুনি দেয়, সাথে ইস্যু হওয়া চেকটাও, ওটা আর্জেন্ট রিজেক্ট করে দিতে হবে ম্যানেজমেন্ট ডিসিশন নিয়েছেন। আমার টেবিল স্যারের রুমের কাছে হওয়ায় স্পষ্ট কথাগুলো শুনলাম আমি, চেকটা ঐ লোককে দেয়ার জন্য হাতের কাছেই রেখেছিল ও; ফাইলের যাবতীয় জিনিসও।

কি যে এসেছিল মাথায় চট করে ফাইলটি সরিয়ে আমার কেবিনেটে লুকিয়ে রেখে দিলাম, এবার ঠেলা সামলাও মনে মনে বললাম চৈতিকে।

এক সপ্তাহ চৈতি ওটা নিয়ে জবাবদিহি আর খোঁজাখুঁজি করতে করতে বসদের সিদ্ধান্তে কর্মে অবহেলায় ওকে দায়ী করে আরো পনেরো দিন ফাইল খোঁজার সময় দিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার চিঠি ধরিয়ে দেয়া হলো; অপমান আর লজ্জায় মেয়েটা ছাই রঙের হয়ে গিয়েছিল চিঠিটা হাতে নিয়ে।

কি এক ঝামেলা! নিজেকে অপরাধী লাগা শুরু হলো! বরখাস্ত পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়াবে বুঝিনি, কি করি ভেবে ভেবে হয়রান আমি শেষ মুহূর্তে ফাইল বের করে দিলে চাকরী হারাতে হবে, অপমান তো আছেই।

তারপর আমার বিবেক বিবেচনার সাথে বোঝাপড়া করে একদিন সকাল সকাল অফিসে এসে ফাইলটা কেবিনেট থেকে নিয়ে সোজা ইডি স্যারের কাছে গেলাম যা আছে কপালে।
ব্যাখা আগেই রেডি করে রেখেছিলাম বললাম যে চেকসহ ফাইলটা কিভাবে অন্য কাগজপত্রের সাথে রেখে দিয়েছিলাম খেয়ালে ছিল না, এখন কর্মে অবহেলার জন্য আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিন স্যার চৈতি হীরা(হীরা শব্দটা মনে মনে বলেছি) নির্দোষ।

সবাই জানলো ব্যাপারটা, চুপচাপ চাকরি চলে যাওয়ার নোটিশের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে দেখলাম চৈতির চোখে মুখে বিপদের ছায়া সরে গিয়েছে, বরখাস্তের‌ চিঠি ফেরতসহ ম্যানেজমেন্ট দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আমাকেও কোন জবাবদিহি করতে হয়নি বলে অবাক হলেও আমি বিপদমুক্ত ধরে নিলাম সে কথা।

একদিন লজ্জাকে উপেক্ষা করে ম্যাজিক হীরাকে বললাম সরি চৈতি বয়সে ছোট বলে নাম ধরে তুমি করেই বলতাম আমি; ডেসিগনেশনে যে আমার থেকে ছোট সেটা বোঝানোর কুট বুদ্ধিও ছিল কিছুটা।

সরি শুনে ওর চেহারায় একই সাথে বিশ্বয় অবাক বিষাদ আনন্দের মিক্সড অনুভূতি ভেসে উঠলো তারপর তার শান্ত মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বললো থাক সরি বলতে হবে না ইচ্ছে করে তো করেননি।
আমি আমার সৎ সাহস এক করে ওর চোখে চোখ রেখে বললাম ইচ্ছে করেই করেছি; বলে বুঝলাম ও জানে ব্যাপারটা, তবু সে কি করে চুপ ছিল।
বললাম
– তুমি জানতে? ইডি স্যারকে কিছু বলোনি কেন?
-আপনার চাকরি চলে যেত
-আমাকে ও তো বলোনি
-আপনি নিজে থেকে বলবেন সেই অপেক্ষায় ছিলাম,
-আর এতদিন যা যা করেছি
-সব জানি
-তবু তুমি স্বাভাবিক ছিলে
-কেউ ভুল করলে তাকে সময় দিতে হয় ভুল শোধরানোর, বুঝতে দিতে হয় কেন সে করছে ভুলটা, নিশ্চয়ই কোন লজিক থাকে তার পেছনে।
-আগের অফিসের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছিল চৈতি, অফিস জুড়ে তোমার কত সুনাম সব নষ্ট করে দিলাম আমি, আবারো সরি শব্দটা বললাম,
ও বললো
-শুধু সরিতে চলবে নাকি!? খাওয়াতে হবে, গিফট দিতে হবে, বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে,
– কই কই বেড়াতে চাও বলো
দেখলাম ‌চোখে জল ভরে উঠেছে ওর
-আমি শব্দ করে কেঁদে দেই ততক্ষণে; এতদিনের সকল কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হই মন থেকে।
ইডি স্যার তার রুমেই ছিলেন, সেখান থেকে নিজের সন্তানদের শাসন করার মতন গলা খাকাড়ি দিয়ে বললেন এএএএইইইইই আস্তেএএএ।

সামিয়া ইতি। গল্পকার। প্রকাশিত বই: 'অস্তিত্বে অন্তরালে' (গল্পগ্রন্থ), 'অন্বেষা' (উপন্যাস), 'শঙ্কিত শহরে' (গল্পগ্রন্থ), 'হ্যালুসিনেশন' (গল্পগ্রন্থ), এছাড়া সংকলন গ্রন্থ 'উতল হাওয়া', 'মাতাল হাওয়া', 'লেখাজোকা সংকলন'-এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গল্প। ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত দুই বাঙলার যৌথ কবিতা সংকলন 'কাঁটাতারের এপার...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

জয় পরাজয়

জয় পরাজয়

নরম-কোমল স্বভাবের মানুষ আকরাম হোসেন। সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন। তার মতো সরল আর ভালো মানুষ খুব…..