চোখের আলোয়

ইন্দ্রাণী ঘোষাল
গল্প
Bengali
চোখের আলোয়

রোহানা অবধি রেলের কামরাটা আমার দখলে ছিল, তারপর মেয়েটি উঠল। যে দম্পতি ওকে ছাড়তে এসেছিল, সম্ভবত ওর বাব-মা; মনে হল মেয়ের সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে তারা বেশ উদ্বিগ্ন। মহিলাটি বিশদে নির্দেশ দিচ্ছিল কোথায় জিনিশ-পত্তর রাখবে, জানলার বাইরে কখন ঝুঁকবে না আর কীভাবেই বা অচেনা লোকজনদের সঙ্গে কথাবার্তা এড়াবে।

ওরা বিদায় নিল। ট্রেনও স্টেশন ছাড়ল। যেহেতু আমি সম্পূর্ণ অন্ধ ছিলাম, আমার চোখ শুধু আলো আর অন্ধকারের প্রতি স্পর্শকাতর হোত। তাই বলতে পারব না মেয়েটাকে কেমন দেখতে, শুধু ওর গোড়ালির চটপট শব্দে বুঝছিলাম একজোড়া হাওয়াই পড়েছে।

মেয়েটাকে কেমন দেখতে জানতে সময় লাগবে।হয়ত জানতেই পারব না। কিন্তু ওর কন্ঠস্বর আমার ভাল লাগছিল। এমনকী ওর হাওয়াই চটির শব্দও।

‘আপনি কি সেই দেহরা পর্যন্ত যাচ্ছেন?’ জিজ্ঞাসা করলাম। আমি নির্ঘাত অন্ধকার কোনো কোণায় বসেছিলাম, কারণ আমার গলার স্বর ওকে চমকে দিল। হালকা বিষ্ময়ের সাথে বলল, ‘আর কেউ এখানে ছিল, আমি জানতামই না।’

হ্যাঁ, অনেক সময়ই দৃষ্টিওয়ালা মানুষের সাথে এটা হয় যে সামনে থাকা জিনিশটাও দেখতে সক্ষম হয় না। বোধকরি তাদের একসঙ্গে অনেক কিছুই দেখতে হয়।অথচ যারা দেখতে পায় না বা খুব অল্প দেখে তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিশগুলোকেই নেয়, য কিছু গ্রাহ্য হয় তাদের অন্যান্য ইন্দ্রিয় অনুভূতি দিয়ে। বললাম ‘আমিও আপনাকে দেখিনি, কিন্তু ভেতরে এলেন শুনতে পেলাম।’ ভাবছিলাম কোনোভাবে যেন ও বুঝতে না পারে যে আমি দেখতে পাই না। আমি তাই নিজের সিটেই রইলাম, ভাবলাম এটা খুব কঠিন ব্যাপার নয়। মেয়েটি বলল, আমি সাহারানপুর নামব। ওখানে আমার আন্টি থাকবে।

‘বাবারে, তাহলে বেশি পরিচয় না হওয়াই ভাল। আন্টিরা যা দশাশই হন।’

‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ সে প্রশ্ন করল।

‘’দেহরা, তারপর মিসৌরি।’

‘ওহ , কি ভাগ্যবান! ইস যদি মিসৌরি যেতে পারতাম। আমি খুব পাহাড় ভালবাসি। বিশেষ করে অক্টোবরে।’

‘হ্যাঁ, এটাই সবচেয়ে ভাল সময়,’ আমি স্মৃতি থেকে বললাম।’ পাহাড়গুলো বুনো ডালিয়ায় ছেয়ে যায়, সূর্য চমৎকার, আর রাতে কাঠকুটোর আগুনের সামনে বসে সামান্য ব্র্যান্ডি খেতে পারেন। বেশিরভাগ পর্যটকই চলে গেছে, রাস্তাগুলো তাই শান্ত, যেন পরিত্যক্ত। হ্যাঁ, অক্টোবরই সবচেয়ে সুন্দর সময়।’

মেয়েটি চুপ করে ছিল। কৌতুহল হচ্ছিল আমার কথা কি ওকে ছুঁয়েছে নাকী আমায় বোকা আবেগপ্রবন ভাবছে। তারপরই আমি একটা ভুল করলাম।

বাইরেটা কেমন’ আমি জানতে চাইলাম। মনে হল প্রশ্নের ভেতর ও অদ্ভূত কিছু পেল না। ও কি আগেই খেয়াল করেছে যে আমি দেখতে পাইনা? কিন্তু ওর পরের প্রশ্ন আমার সব দ্বিধা দূর করে দিল।

‘’আপনি কেন জানালার বাইরে দেখছেন না?’ প্রশ্ন করি। বার্থ ধরে ধরে আমি সহজেই সরে এলাম আর জানালার কিনার অনুভব করলাম। জানালা খোলা ছিল, জানালার দিকে মুখ  ঘুরিয়ে বসলাম, যেন বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছি, ইঞ্জিন হাঁফাচ্ছিল শুনতে পাচ্ছিলাম, চাকার ঘস ঘস, আর মনের চোখ দিয়ে দেখছিলাম টেলিগ্রাফের তারে কেমন বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে।

আমি রোমাঞ্চ করে বললাম, ‘দেখেছেন, গাছগুলো কেমন দৌড়াচ্ছে মনে হচ্ছে, আর আমরা যেন স্থির?’

‘এটাই হয়। আপনি কোনো পশু-পাখি দেখলেন? ‘

‘না; আমি বেশ বিশ্বাসের সঙ্গে বললাম। জানতাম, দেহরার কাছের জঙ্গলে বলতে গেলে কোনো পশুই নেই।

জানলার থেকে আমি মুখ ঘোরালাম মেয়েটির মুখোমুখি। কিছু সময়ের জন্য আমরা নিশ্চুপ হয়ে রইলাম।

‘আপনার মুখটা বেশ ইন্টারেস্টিং জানেন।” আমি মন্তব্য করলাম। খুব সাহসী হয়ে উঠছিলাম। তবে এটা নিরাপদ মন্তব্য। কিছু মহিলা মিথ্যা স্তুতি মোটেও পছন্দ করে না। মেয়েটা কিন্তু মনোরম হাসল-স্বচ্ছ ধ্বনিময় হাসি।

‘ভাল লাগল যে আমার মুখটা আকর্ষণীয়, কারণ লোকের থেকে সুন্দর মুখ শুনে শুনে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।’ ওহ, তাহলে আপনার মুখটা সত্যিই খুব সুন্দর- আমি ভাবলাম আর ওকে বললাম,’আকর্ষণীয় মুখ সুন্দর হতেই পারে।’

‘আপনি বেশ সাহসি দেখছি, কিন্তু এত রাশভারী কেন?’ মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল।

একথায় ভাবলাম ওর জন্য একবার হাসতে চেষ্টা করি, কিন্তু হাসির কথা ভেবে আরও বিপন্ন বোধ করলাম, আরও একাকী।

‘আমরা খুব শিগগিরি আপনার স্টেশনে পৌছে যাব।’ আমি বললাম।

‘বাঁচা গেল এটা একটা ছোট জার্নি। ট্রেনে আমি দু-তিন ঘণ্টার বেশি বসে থাকতে পারি না।’

যদিও, আমি মনে মনে যে কোনো দীর্ঘ সময়ের জন্য বসে থাকতে প্রস্তুত ছিলাম শুধু ওর কথা শোনার জন্য। ওর কণ্ঠস্বরে পাহাড়ি ঝরণার চমক ছিল। ট্রেন ছেড়ে গেলেই ও আমাদের এই সামান্য দেখা সাক্ষাৎ ভুলে যাবে। কিন্তু বাকি যাত্রাপথটুকু, এমনকী তারপরেও এটা আমার সঙ্গে থেকে যাবে।

ইঞ্জিনের বাঁশি তীক্ষণ হয়ে উঠল, বগির চাকা ধ্বনি বদলাল। মেয়েটি উঠে পড়ল। নিজের জিনিশপত্র গুছিয়ে নিতে শুরু করল। আমি কল্পনা করছিলাম, ও কী চুলটা খোঁপায় বেঁধেছে নাকী বিনুনি, হয়ত খোলা চুল গুলো কাধের ওপর আলগোছে ঝুলছে নাকী একদম ছোট করে কাটা? ট্রেনটা নিজেকে টেনে টেনে স্টেশনে ঢুকল।

ইরে হরেক কুলী ও ফিরিওয়ালার হাঁকডাক। এমন সময় কামরার দরজার কাছে তীক্ষ্ণস্বরের নারীকণ্ঠ শোনা গেল। নির্ঘাৎ মেয়েটির আত্মীয়া।
‘চলি।’ মেয়েটি বলল।

মেয়েটি খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, এতটা কাছে যে ওর চুলের সুগন্ধ আমায় প্রলুব্ধ করছিল। আমি হাত তুলে ওর চুল ছুঁতে চাইছিলাম, কিন্তু ও সরে গেল। কেবল সেই সুগন্ধটুকু দীর্ঘায়িত হচ্ছিল যেখানে ও দাঁড়িয়েছিল।

দরজার কাছে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। একটা লোক কামরায় ঢুকতেই অপ্রস্তুত ভঙ্গীতে মাপ চাইলেন। ধড়াম শব্দে দরজা বন্ধ হয়ে গেল, আর পৃথিবী যেন আবার শোরগোল করে উঠল। আমি নিজের বার্থে ফিরে এলাম। গার্ড বাঁশিতে ফুঁ দিল। আমরা এগিয়ে চললাম। আরও একবার নতুন সহযাত্রীর সঙ্গে খেলার সুযোগ। জানলার বাইরে কত কী ঘটে যাচ্ছিল। বাইরে কী চলছে তার অনুমান করা-দারুণ রোমাঞ্চকর এক খেলা, নতুন সহযাত্রীটি আমার দিবাস্বপ্ন ভেঙ্গে দিল ‘নিশ্চই আপনি হতাশ হয়েছেন।’ তিনি বললেন।’ এইমাত্র যিনি নেমে গেলেন আমি নিশ্চই তার মতো আকর্ষণীয় নই।’

‘ও বেশ চিত্তাকর্ষক।’ আমি বললাম। আচ্ছা বলুন তো ওর চুলটা লম্বা না ছোট?

‘’মনে নেই তো’ ওর গলা হতভম্ব শোনালো।

‘শুধু চোখ দুটো লক্ষ করেছি, চুল নয়। কী অপূর্ব দুটো চোখ-কিন্তু কোনো কাজের নয়। মেয়েটা সম্পূর্ণ অন্ধ, খেয়াল করেন নি?’

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..