চোরাবালি

শাহানাজ ইয়াসমিন
কবিতা
Bengali
চোরাবালি

সেই আগস্ট

ফিরে এলো সেই আগস্ট বারুদের গন্ধ নিয়ে
যার বুকে রক্তস্রোতে লেখা রয়েছে নিকষকালো
একটি দিনের নাম –
বঙ্গবন্ধুর সেই ‘পনেরোই আগস্ট’

আগস্ট এলেই অনুভূতিরা নিরবে থেমে যায়
থেমে যায় বুকের চলমান কণিকা আর হৃদয়ের
টিক টিক শব্দ।

পরিবারে একজন মানুষের মৃতশোক বয়ে বেড়ানো
ভয়াবহ কষ্টের।
সেখানে এতজনের মৃতশোক কীভাবে
বয়ে বেড়ানো যায়!

কতোটা ধৈর্য্য কতোটা বিনয়ী কতটা শোক
সামলে এমন মানুষের মতো মানুষ হওয়া যায় তা
আমার বোধগাম্য নয়।
ভাবতে গেলে অথৈ জল শুকিয়ে সমুদ্রের নীচে চৈত্র
মাসের ফাটল ধরে।

বঙ্গবন্ধুকে দেখার সুযোগ হয়নি যদিও আমার,
কিন্তু এটুকু বলতে পারি- একজন মানুষের
আকৃতিও কথা বলে

তাই আজ আমার কাছে বঙ্গবন্ধু মানেই-
বিরঙ্গনা তথা সমগ্র বাঙালির ঠিকানা।
স্নিগ্ধ আকাশ আর স্বস্তির নিঃস্বাস।

আমার কাছে বঙ্গবন্ধু মানেই-
বাঙালির স্বাধীন বাংলা, বুকভরা ভালোবাসা
স্বস্থির নিঃশ্বাস আর মেঠো সবুজ পথ।

আমার কাছে বঙ্গবন্ধু মানেই-
বাংলা ভাষা, রাখালিয়া বাঁশির সুর নজরুলের বীণা
আর কবিগুরুর রবীন্দ্র সঙ্গীত।

ঠিক তেমনি আমার কাছে বঙ্গবন্ধু মানেই-
মায়ের বিশুদ্ধ কোল বাবার মায়বী আদর আর
হেমন্তের গাওয়া সেই পুরোটা গান-
কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না
মনে হয় বাবার মত কেউ বলেনা
আয় খুকু আয়
আয় খুকু আয়…

 

দৃষ্টি

যেদিন অন্তর দৃষ্টিতে দেখেছি
একটি গুহায় দাউ দাউ করে আগুনে পুড়ছে
চড়চড় করে শব্দ হোচ্ছে ভষ্মীভূত হোচ্ছে
আমি বরফকুচি দিয়ে চেপে ধরার চেষ্টা করেছি।
ফোসকা পড়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছি।

একজোড়া চোখ যেদিন দীপ্ত না দেখে দহন দেখেছি
হতাশায় ডুবে যেতে দেখেছি, আমি নিজস্ব দৃষ্টি শক্তি
দিয়ে আলোকিত করতে চেয়েছি।
খতিয়ে দেখা যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছি।

ঠাডাপড়া বৃক্ষ যেদিন মরে যেতে দেখেছি
সবুজ পাতা শুকিয়ে ঝরে যেতে দেখেছি
আমি সারাবেলা যত্নকরে পরিচর্যা করে
নতুন কুশি জন্মানোর চেষ্টা করেছি।

অস্তিত্ব

একা থাকলেই আমার অস্তিত্ব খুঁজে পাবে
কে ছিলাম আমি।
ভুলে যদি যাবে বেশ তবে যাও।
কিন্তু প্রশ্ন,পারবে তো নির্মুলভাবে সবটাই ভুলে যতে?
তুমি যে স্থানটিতে বসে থাকো সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত।
সেখানে যে কৃষ্ণ চুড়ার গাছটি রয়েছে?
ওটাতে আমার দৃষ্টি ফেলে এসেছি।
তুমি তাকালেই আমায় দেখতে পাবে।
বাড়ীর সামনে যে ঘাঁসফুল গুলো রয়েছে?
ওদের আমি আলতো হাতে স্পর্শ করে করেছি।
চোখ পড়লেই তা দেখতে পাবে।
তোমার বিছানার পার্শে যে জানালাটি রয়েছে?
সেটা দিয়ে আকাশের যে অংশখানি দেখতে পাও
ঠিক ওখানে আমি মাঝরাতে বাসে থাকি।
গভীর রাতে যখন নির্ঘুম চোখে জোৎস্নাকে দেখবে?
দেখতে পাবে আমি হাতছানি দিয়ে তোমায় ডাকছি,
আর খিল খিল করে হাসছি।
তোমার বিছানার পাশে যে তাকটি রয়েছে?
সেখানে রবি ঠাকুরের যে ‘রবীন্দ্র উপন্যাস’ বইটি রেখেছো?
ওটা ধুলো ঝেড়ে এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত প্রণয় প্রলেপ
দিয়ে এসেছি।
তুমি স্পর্শ করলেই তোমার হৃদয়ে স্পন্দন তৈরী করবে।
আরও যা যা আছে সব, সব কিছুতেই ছুঁয়ে দিয়েছি।
ওরা ঠিক তোমায় মনে করিয়ে দেবে আমার শুভ্র কাঁতর
অনুভূতিগুলোকে।
ছাঁদ বেয়ে যে পেয়ারা গাছটি দাঁড়িয়েছে?
ওটার পাতাগুলোর সাথে আমি হাত মিলিয়েছি
ঘ্রাণ লেনদেন করেছি।
ওখানে দাঁড়ালেই তোমার নাকে সেই ঘ্রাণ প্রবেশ করবে।
বাড়ীর সামনে যে তুলশি গাছটি রয়েছে?
জল না পেয়ে মরো মরো অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
ওটাতে একঘটি জল দিয়ে এসেছি।
দেখবে সেও ঠিক আমার হয়ে তোমায় দেখে রাখবে।
আর বাইরের দরজার সামনে যে মাটির রাস্তাটি বুক
পেতে দিয়েছে?
সেও আমার চরণচিহ্ন রেখেছে।
আমার অনুপস্থিতিতে সেখানে তোমার চরণ পড়লেই
পুরণো স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলবে।
কে বলেছে আমি নেই।
আমিতো চারদিক তোমার পুরোটা জুড়েই রয়েছি।

চোরাবালি

সাগর তীরে একটা বালুর ঢিবি দেখে
চঞ্চলতায় অনায়াসে উঠে দাঁড়ালাম সে ঢিবির উপরে।
নির্জনতায় কাছথেকে আকাশ দেখবো বলে।
অমনি খলখলিয়ে জোয়ার এলো হেসেখেলে।
ভরেদিলো চারিদিক পেঁচিয়ে আসা ঢেউ আর অথৈ জলে।
মাঝখানে আমি নীরব একা দাঁড়িয়ে।
যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে পায়ের নীচে সবটা জুড়েই
শুধু আর চোরাবালি।
বুঝিনি কখনো ঢিবিতে ওঠার আগে।
ঢেউয়ের ও যে এত তেজ আর হাসি আনন্দ থাকে।
প্রতিযোগিতায় একের পর এক ঢেউ আসতে শুরু করলো
আর চোরাবালির ঢিবিতে ধাক্কা মারতে শুরু করলো।
আতঙ্কে বুকের ভেতর ধকধক শব্দে তোলপাড় শুরু হলো।
হতাশায় বলতে শুরু করলো অস্তিত্ব-
এই বুঝি জোয়ার আর ঢেউয়ের খেলায় এবার টিবি ধ্বসে গেল।
মনোবল হারিয়ে শুন্যতা আর নির্জনতার সঙ্গী হয়ে
পৃথিবীকে চিৎকার করে বললাম-
আর বুঝি জানে ফেরা হলো না প্রিয়তম।
যদি পারো ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিও।
কথা শেষ হতে না হতেই আমারই মতো কেউ একজন বললো
আর বুঝি জানে ফেরা হলো না প্রিয়তম।
যদি পারো ভ’ল ত্রটি ক্ষমা করে দিও।
আমি প্রফুল্ল মনে স্বস্তির নিঃস্বাস ছেড়ে ভাবলাম
এই তো। আমি একা নই, কেউ একজন আমার মতই বলছে।
আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম।
কিন্তু নাহ্, কোথাও কোনো প্রাণি নেই।
শুধু অথৈ জল আর রূপালী ঢেউয়ের এলোপাথারি খেলা।
যেদিকেই তাকাই শুধু দেখতে পাই-
আকাশ ডুবে গেছে জলের নিচে,
আর জল উঠেছে আকাশের পরে।
আমি ঢিবিতে দাঁড়িয়ে কানপেতে শুনতে পেলাম
চারিদিক শুন্যতাদের করুণ চিৎকার।
তাদের চিৎকার শুনে হতাশ আমার চোখে জোয়ার এলো
আমি শেষবারের মত মাথা উচিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে রইলাম
নিঃম্বব্দ আর নীরবতায় বন্ধ চোখে পৃথিবীকে বললাম-
হে পৃথিবী, আমি প্রস্তুত তুমি নিয়ে যাও আমায়
তোমার যেখানে ইচ্ছে।
নাম না জানা কোনো অজানা চরে।
নয়তোবা কোনো চোরাবালির তরে।

শাহানাজ ইয়াসমিন। লেখক। জন্ম বাংলাদেশের রংপুর জেলায়, পেশাগত সূত্রে ঢাকায় বাস। তিনি অংশুমালী'র বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশিত বই: 'গহিনের প্রেম' (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৭),  'মেঘলা আকাশ' (উপন্যাস, ২০১৮), 'সমুদ্রের তরি' (উপন্যাস, ২০১৯), 'ভালোবাসা ছুঁয়ে গেলে' (উপন্যাস, ২০২০)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..